|
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালঃ বিচার কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে?
ডঃ আবু রাউসাব |
|
আওয়ামিলীগ প্রণীত “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল” ঈদানিং অনেকটা তামাশায় পরিণত হয়েছে। এ বিচারের ব্যাপারে জাতি প্রচন্ড দ্বিধা-বিভক্ত। এক দল চায় বিচার ছাড়াই অথবা যেনো-তেনো বিচার করে “চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের” ফাঁসি দিতে; দ্বিতীয় দলের দাবী সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে এমনকি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অপরাধীদেরকে বিচার করা। তৃতীয় দল বিচারের বিপক্ষে। তাদের যুক্তিঃ বঙ্গবন্ধুই বিষয়টা ফয়সালা করে গেছেন; চল্লিশ বছর পর এ বিচার করলে জাতি দ্বিধা-বিভক্ত হবে এবং কিছু স্বার্থবাদী মহল ফায়দা লুটবে।
পত্র-পত্রিকা, ব্লগ ও ফেইসবুকসহ অন্যান্য সোসাল মিডিয়া থেকে এটা পরিস্কার যে, প্রথম দলে রয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও গতিপথ এখন প্রথম দলের আকাঙ্ক্ষার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন যে তার “হাত পা বাঁধা”। গত ৮ ই এপ্রিল আদালত চলাকালে ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক সরাসরি বলেছেনঃ “আমরা জাস্টিস (ন্যায়বিচার) করব না”। দ্যা ইকোনোমিষ্ট এবং দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিশ্ববিখ্যাত পত্রিকাতেও এ ব্যাপারে নিখুদ পর্যালোচনা এসেছে। এই ট্রাইব্যুনাল কিছু মহলের স্রেফ একটা ক্যাংগারু কোর্ট হওয়ার ব্যাপারে যে আশংকা ছিলো, সেটায় এখন ধীরে ধীরে পাকা-পোক্ত হচ্ছে।
দাবী করা হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে হত্যা করা হয় ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে। বাংলাদেশের মানুষের ধারণা এবং প্রত্যাশা ছিলো যাকে প্রধান আসামী হিসাবে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হবে, সেতো নিশ্চয়ই কয়েক হাজার না হলেও কয়েকশ লোকের হত্যাকারী হবে। সারা বিশ্বকে হতবাক করে প্রথমে বিচার শুরু হলো আ’ল্লামা দেলোয়ার হূসাইন সাঈদীর। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের কোটি কোটি টাকা খরচ করে সাঈদীর বিরূদ্ধে রচনা করা হয় ৪ হাজার ৭৪ পৃষ্ঠার ১৫ খন্ডের এক অভিযোগনামা। এই অভিযোগনামা অনেক লম্বা হলেও সাঈদীর বিরূদ্ধে একজন মানুষকে হত্যারও সুষ্পষ্ট কোন অভিযোগ আনতে পারেনি প্রসিকিউশন। অন্য যাদেরকের বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটকে রেখে সরকার প্রকারান্তে মানবতার বিরূদ্ধে অপরাধ করে চলেছে, তাদের ব্যাপারেও একই কথা। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এই ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীর হত্যাকারী কে বা কারা, এবং সরকার কেনো তাদেরকে বিচার করছে না?
উল্লেখ্য, ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে এই আওয়ামী সরকারই সিমলা চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাংগালীরা যে ক্ষমা করতে জানে, সে কথা সিমলা চুক্তির পর বঙ্গবন্ধু ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে এসে জোর গলায় বলেছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যদি করতেই হয়, তাহলে ঐ ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করাটাই হলো সবার দাবী। আর সেটা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে যারা তাদেরকে ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এই ট্রাইব্যুনালের প্রত্যেক জাজ এবং প্রসিকিউটর বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে “সোনার বাংলাদেশ” নামক অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এডভোকেট নয়ন খানের (মিশিগান) গবেষণামূলক নিবন্ধগুলোতে। অনেকের আশংকা, এসব জাজদের কাছ থেকে ন্যায় বিচার আশা করা এক ধরণের অবাস্তব কল্পণাবিলাস। ট্রাইব্যুনাল-১ এর জাজ গণআদালতের তদন্ত কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই কেসে তদন্ত কর্মকর্তা এবং বিচারক হিসাবে দৈত-দায়িত্ব পালন করার ইতিহাস দুনিয়াতে কোথাও নেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবার সৃষ্টি করলো এক যুগান্তকারি ইতিহাস। সাঈদীর কেসে জাজকে দেখা গেছে প্রসিকিউটরের ভূমিকা পালন করতে। প্রসিউকিটর ভুল করলে তিনি বার বার শুধরে দিয়েছেন, কিভাবে কেস ফ্রেম করতে হবে সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন, এমনকি নিজের বক্তব্যকে প্রসিকিউটরের বক্তব্য হিসাবেও চালিয়ে দিয়ে রিপোর্ট লিখেছেন অনেকবার। এসবকিছুই ট্রাইব্যুনালকে এক তামাশায় পরিণত করেছে। আওয়ামী বিচারকদের এই চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণেও খুশি নয় অনেক আওয়ামী এমপি। অনেকে এতটাই প্রতিহিংসার আগুনে টকবক করে জ্বলছে যে একজনতো বলেই ফেলেছেন বিচার না করেই আসামীদেরকে ফাঁসি দিতে। প্রায় প্রতিদিন সরকারি মন্ত্রি-এমপিরা তাদের বক্তব্য বিবৃতিতে আসামীদের ফাঁসির রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনালকে বিশ্ব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ তামাশায় পরিণত করেছে।
শেখ হাসিনা অনেকবার ঘোষণা করেছেন যে ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাজ করছে। এটা ডাহা মিথ্যা কথা। গত ২৩শে ডিসেম্বর লন্ডনস্থ এক সেমিনারে যুদ্ধপরাধ আইনে বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ মিস্টার স্টিফেন কেই কিউ সি বলেনঃ “শেখ হাসিনার মতো এমন মিথ্যাবাদী প্রধানমন্ত্রী আমার জীবদ্দশায় দেখিনি। আমি ভেবে পাইনা কিভাবে একজন প্রধানমন্ত্রী অবলিলায় মিথ্যা বলতে পারেন”। ট্রাইব্যুনালের সাথে শুধু “আন্তর্জাতিক” শব্দটাই আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সব মানের সাথে দুরতম কোন সম্পর্ক নেই। আইনমন্ত্রি এটাকে “ডোমেস্টিক আদালত” বললেও বাংলাদেশ সংবিধান প্রযুক্ত অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে আসামীদেরকে।
সাঈদীর বিরূদ্ধে এ যাবত যারা সাক্ষী দিয়েছে তারা অধিকাংশই চোর-চাট্টা, বদমায়েশ, বউ-পেটানো নরপশু ও নানান দাগী আসামী! অনেকের ধারণা, টাকা ও সুযোগ-সুবিধার লোভেই যে এরা সাক্ষী দিয়েছে। লোভ ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে যে জবানবন্দী নেয়া হয়েছে, তার প্রমাণ এই সংক্ষিপ্ত ভিডিওটিঃ http://www.youtube.com/watch?v=EA1JQvKz8W0
সারা বিশ্ব-বিবেককে হতবাক করে সম্প্রতি ১৫ জনের জবানবন্দি জেরা ছাড়াই গ্রহণ করেছে ট্রাইবুনাল। এটা শুধু এ শতাব্দীতে নয়, বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে বলা যায় “শ্রেষ্ঠ তামাশা”। আফ্রিকার জঙ্গলেও এর দৃষ্টান্ত মিলবে কিনা সন্দেহ। জেরা ছাড়াই জবানবন্দি গ্রহণের আদেশ দেয়া হয় সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা “দুরূহ, ব্য্যবহুল এবং সময়সাপেক্ষ” বলে; অথচ এই সাক্ষীদের সবাই ঢাকার গোলাপবাগে সরকারী “সেফ হাউসে” মাসের পর মাস ধরে সাক্ষী দেয়ার ট্রেনিং নিচ্ছে! এক মন্ত্রি সাক্ষী ছাড়া “আবেগ দিয়ে” বিচারের পরামর্শ দিয়েছেন। এসবকিছুই ট্রাইব্যুনালকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
সোসাল মিডিয়াতে অনেকের অভিযোগ, মনবতার বিরূদ্ধে অপরাধের বিচারের নামে সরকার নিজেই এক চরম মানবতার বিরূদ্ধে অপরাধ করে চলেছে। বাংলাদেশের সেরা কয়েকজন আইনবিদ শুরুতেই সরকারকে সাবধান করে বলেছিলেনঃ “এমন বিচার করবেননা যে আপনারদেরকে আবার বিচার করতে হয়”। সরকারের যেকোন কর্মকান্ডের সমালোচনা করার অধিকার প্রত্যেক জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। এই তামাশার বিরূদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য সরকার ও তার রামদাবাহিনী এ পর্যন্ত হত্যা করেছে প্রায় এক ডজন নাগরিককে, গ্রেফতার করে নির্যাতন করেছে কয়েক হাজার, আর মিথ্যা মামলা ঠুকেছে কয়েকশত! আর মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য আইন পাশ করেছে সংসদে, যেটাকে অনেকে “নাৎসি বাহিনীর” সাথে তুলনা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেঃ এই ট্রাইবুনাল নাকি বিশ্ববাসীর জন্য এক অনুসরণীয় মডেল! অথচ বিশ্ববিখ্যাত যুদ্ধাপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ মিঃ টবি কাডম্যানের মতে এই ট্রাইব্যুনাল “ভেড়ার লেবাস পরিহিত এক নেকড়ে বাঘ” ছাড়া কিছুই নয়।
সরকার আসলে জনগণের সাথে এক চরম তামাশায় লিপ্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ওয়াদা করে ক্ষমতায় এসে বিচার করছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে! সরকার যে জনগণের আবেগের সাথে প্রতারণা করছে, তা বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসী বুঝতে পারছে; কিন্তু প্রতিহিংসার কারণে সরকার বুঝতে পারছে না। ৩০ লক্ষ মানুষের হত্যার দায়ভার জামায়াতের মতো তৎকালীন ক্ষুদ্র দলের (১৯৭১ সালে যার জনসমর্থন ১% ও ছিলো না) উপর চাপিয়ে কিছু আওয়ামী মানসিকতার মানুষকে ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকিয়ে (সরকার এবং সরকার সমর্থিত কিছু মিডিয়া এখন যা করছে) রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুন প্রশমিত করা সম্ভব, কিন্তু যুদ্ধাপরধের প্রকৃত বিচার অসম্ভব।
বিএনপি, এমনকি জামায়াতসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের দাবি এক অবাধ ও নিরেপক্ষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসল যুদ্ধাপরাধের বিচার হোক, সরকার সেটা মানেনি। এই ট্রাইব্যুনালকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েসান সরকারকে ১৭ টা বিধিমালা সংশোধনের সুপারিশ করেছিলো, সরকার একটাও মানেনি। আমেরিকান এমব্যাসাডর স্টিফেন র্যাপ (Ambassador-at-Large for War Crimes Issues) বাংলাদেশে এসে সরকারের সাথে আলাপ করে অবাধ ও নিরেপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের জন্য বেশকিছু গঠনমূলক সুপারিশ করেছিলেন, সরকার তার একটাও মানেনি। সুস্থ্য বিচারকার্যে সহায়তার জন্য আইন বিশেষজ্ঞ টবি কাডম্যান বাংলাদেশে এলে ঢাকা এয়ারপোর্টে ৭ ঘন্টা বসিয়ে রেখে ফেরত পাঠানো হয়, এবং উল্টা তার বিরূদ্ধে কেস দেয়া হয়! এমনকি খোদ জাতিসংঘ থেকে সরকারকে শোকজ নটিশ জারি করলেও সরকার সরে আসেনি তার অবস্থান থেকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে (এবং বেশকিছু সূত্র থেকেও তথ্য পাওয়া গেছে), সরকার অন্তত জামায়াতের ৩ জন শীর্ষনেতাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে এবং এটাকে রাজনৈতিক ক্যাপিটাল হিসাবে আগামী নির্বাচনে ব্যবহার করবে।
অহমিকা এবং প্রতিহিংসার আগুন (hate crime) শুধু একজন মানুষকে নয়, একটা পুরা জাতিকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। বর্তমান ক্যাংগারু কোর্টে সরকারের কিছু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ফাঁসি হলে সরকারের প্রতিহিংসা কিছুটা প্রশমিত হবে; কিন্তু জাতি ডুবে যাবে এক অসহনীয় কালো অধ্যায়ে। অনেকের ধারণা, শেখ হাসিনার কথামতো জাতি কলংকমুক্ত অবশ্যই হবে না, বরং জাতির ভাগ্যে জুটবে নিশ্চিত আরেক কলংকের ইতিহাস! সেই কলংক মুছতে বর্তমান ট্রাইব্যুনালের সাথে জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার কথাই হয়তো সত্যে পরিণত হবেঃ “যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলবে”।
লেখকঃ শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং লেখক।
ইমেইলঃ aburawsab@gmail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrAbuRawsab |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|