|
প্রবাসীর ভাবনাঃ বাংলাদেশীদের আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ কবে তৈরী হবে?
ড. আহমেদ ইমতিয়াজ |
|
স্বনামধন্য কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ-এর ‘তাঁরা ফেরেন নাই’ লেখাটি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে (প্রথম আলো, ৪/১০/২০১১)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যাঁরা বিদেশে ডিগ্রী করতে গিয়ে আর ফেরেননি তাঁদের নিয়েই মূলত লেখা। দৈনিকটির ওই লেখায় ১১ জন পাঠকের মন্তব্য আছে। বিষয়বস্তুর পক্ষে বিপক্ষে পাঠক মতামত প্রায় সমান। কলামটি সোনারবাংলাদেশ ডটকমও প্রচার করেছে। সেখানে ২৯ জন প্লাস এবং ৪ জন মাইনাস রেটিং করেছেন। মোট ১২টি মন্তব্য আছে যা পড়ে বোঝা যায়নি পাঠকরা লেখককে সমর্থন না অসমর্থন করেছেন। তবে বিদেশে থেকে যাওয়া মোট ১৩৯ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৪ জনের কাছে ১ কোটি ৩৩ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা (গড়ে জন প্রতি ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৩ শত ৯৪ টাকা) অনাদায়ী রয়ে গেছে। অনেক পাঠকরা শিক্ষকের দ্বারা টাকা খাওয়ার বিষয়টি মোটেও স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেননি। অবশ্য কোনো কোনো পাঠকের মতে পুকুর বা নদী চুরি নয় শেয়ার বাজার বা পদ্মা সেতুর মত অতিকায় দুর্নীতিতে ভরপুর সমুদ্র চুরির দেশে ১০৪ জন শিক্ষকের দ্বারা মাত্র এক/দেড় কোটি টাকা ফেরত না দেওয়া মোটেও খবর হওয়ার মত বিষয় নয়। তবুও জনাব মকসুদ বিষয়টিকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে তুলে ধরেছেন। একজন সামান্য লেখক ও পাঠক হিসাবে লেখাটি পর্যালোচনা করছি।
আমাদের আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ কতটুকু?
আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত মানুষের জন্য জব স্যাটিসফ্যাকশন খুবই গুরুত্বপূর্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পৃথিবীর যে কোনো দেশেই অতি মর্যাদা ও সম্মানের। কিন্তু শিক্ষকরা বিদেশে পার-টাইম কর্ম করতে গিয়ে অনেক সময়ই তাঁদের মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেন। অনেক শিক্ষককে অর্থের লোভে আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ ছুড়ে ফেলে নিম্ন শ্রেণীর কাজ ও জীবিকা গ্রহণে কুরুচি দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। জনাব মকসুদ লিখেছেন ‘তাঁদের (শিক্ষকদের) কোনো রেস্তোরাঁয় কিচেনে বসে তরকারি কুটতে, পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে, রাস্তায় গাড়ি মুছতে, কোনো বদমেজাজি বুড়ির বাগানের ঘাস সাফ করতে, কোনো সাহেবের ঘোড়ার ঘাস কাটতে, সপ্তায় ৫ বাড়িতে ৫ দিন গিয়ে কাপড় ইস্তিরি করতে, কোনো নিঃসঙ্গ বুড়ির ৪/৫টি কুকুরকে সকালে-বিকেলে পায়খানা করিয়ে হাওয়া খাইয়ে আনতে, কোনো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে লরি থেকে মাল নামিয়ে ট্রলিতে করে ঠেলতে’ অরুচি নেই। এই যদি সম্মানিত শিক্ষকদের রুচি হয় তবে জাতীয় রুচি ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় গর্ববোধ করে, নিজেকে অ্যারিসটোক্র্যাট বা এলিট সোসাইটির সদস্য ফলায় অথচ গভীর রাতে অন্ধকারে হকার সেজে বাড়ি বাড়ি পত্রিকা দিতে, কুলি হয়ে ট্রাক লোড/আনলোড করতে, কোনো জিমে/স্টেডিয়ামে কিনারের কাজ বা চেয়ার-টেবিল গোজগাছ করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের জাতিশ্রেণী বা পারিবারিক বড়াই বেমানান। এই বিষয়ে কলামিস্ট জনাব মকসুদ এর সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। অবশ্য এই মর্যাদাহানী আত্মঘাতী অপকর্মে শুধু যে শিক্ষক আছে তা কিন্তু নয়, আছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিসিএস ক্যাডার। এমনকি জনগণের কাছে ব্যাম্বু দণ্ডের প্রতীক হিসাবে পরিচিত ধবল ও শুভ্র গোত্রের ম্যাজিষ্ট্রেট-পুলিশও। অনেকেই বলতে পারেন কোনো কাজই ছোট না। আমিও তাদের সাথে একমত। একজন প্রফেসর বা প্রকৌশলী তার নিজের গাড়ি নিজে চালানোতে মোটেও দোষ নাই কিন্তু তাঁদের দ্বারা ট্যাক্সি চালানো এক ধরনের অপচয়। অপকর্মও। অবসরে নিজের বাগানের ঘাস নিজে পরিস্কার করে ফুলগাছে পানি দেওয়া গেলেও অন্যের বাগানে মালীর চাকরি করা যায় না। যারা বিদেশে উল্লেখিত কাজগুলো করেন তারা কিন্তু নিজ দেশে গেলে তা গোপন করবেন। যে কর্মের কথা অন্যকে বলা যায় না তাই এক ধরনের অপকর্ম। এই লুকোচুরির মধ্যেই বিচ্যুতি ও অবিচারের গন্ধ। মানুষের কর্মমতা যদি সীমাহীন না হয়ে থাকে তাহলে রাত জেগে আয়মূখ্য বাড়তি কর্মযজ্ঞের তিকর প্রভাব দিনের প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্যকে কোনো না কোনো ভাবে তিগ্রস্থ করবেই। তাই শিক্ষক বা অন্যান্য সম্মানজনক দায়িত্বশীল পদে কর্মরত (দেশে বা বিদেশে) মানুষের আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ যথার্থভাবে জাগ্রত হবে সেটাই দেশবাসীর কাম্য।
মেধা না টাকা চাই?
বাংলাদেশ দুই ধরনের সম্পদ হারিয়েছে। প্রথমত মহামূল্যবান মেধা-সৃষ্টিশীলতা এবং দ্বিতীয়ত সামান্য কিছু টাকা। শুধু এক/দেড় কোটি টাকা নয় বরং আরও শত কোটি টাকা খরচ করেও যদি মেধা প্রাচার বন্ধ করা যেত, মেধা ফেরত আনা যেত তাতেই দেশ ও জাতির মঙ্গল হত। অথচ জনাব মকসুদ তাঁর লেখায় কেবল টাকা ফেরত পাওয়াকেই গুরুত্ব দিয়েছেন যা খুবই ক্ষীণচিন্তার বহিপ্রকাশ। এমনকি টাকার জন্য তাঁদের উদ্দেশ্যে ঘৃণা প্রস্তাবও করেছেন। যত কম টাকাই হোক না কেনো তা ফেরত না দেওয়াটা অবশ্যই অন্যায় কিন্তু টাকা পেলেই কি দেশ তার তি কাটিয়ে উঠতে পারবে? না। একটি দেশের জন্য এক/দেড় কোটি টাকা কোনো বড় অর্থ নয়। অথচ ১৩৯ জন মেধাবী সুশিক্ষিত মানুষ দেশের জন্য অনেক বড় সম্পদ। আপনি যদি সরকারকে মেধা ফেরত আনা, মেধা প্রাচার বন্ধ করা এবং মেধা সংরক্ষণ ও পরিচর্চা করার সঠিক দিক নির্দেশনা দিতেন তাতে দেশ-জাতি উপকৃত হত। কিন্তু আপনি যা করেছেন তা যেন চোখ হারিয়ে চশমা ফেরত পাওয়ার সান্তনা। আপনার মত এত বড় মাপের লেখকের কাছে আমাদের আশা আরও অনেক বেশি ছিল। হাজারো সম্ভাবনা আর চাকচিক্য নিরাপদ বিলাস বহুল জীবনের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও যারা অহি-নকুল সমস্যা জর্জরিত বাংলাদেশে ফিরে আসে তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা আছে কিন্তু যারা ফিরতে চায় না তাঁদের প্রতি অভিযোগ নয় অভিমান থাকতে পারে।
তাঁরা ফিরবে কেন?
ড. মু. শহীদুল্লাহ, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. মু. কুদরাত-এ খুদা, আচার্য্য প্রফুল্ল রায় প্রমূখরা বিদেশে ডিগ্রী করে ক্ষণকাল বিলম্ব না করে স্বদেশে স্বপদে ফিরেছেন। কারণ, বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডকে নিয়ে তখনও স্বপ্ন দেখার প্রোপট ও সুযোগ ছিল। সম্ভাব্য ভবিষ্যতের স্বপ্নচারী হয়েই তাই তাঁরা দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ, মুমূর্ষু মানবাধিকার, অনিশ্চিত ভবিষ্যত, নির্মম মৃত্যু, নিরাপত্তাহীন জীবন, শৃঙ্খলাহীন প্রশাসন, বিধ্বস্ত অবকাঠামো, দুঃস্থ মানুষের আহাজারি, অরতি শিক্ষাঙ্গন, মেধার অবমুল্যায়ন, বখাটেদের দৌরাত্ম্য, মিথ্যা-গলাবাজির প্রাচুর্যতা সহ হাজারো অন্যায়-অপকর্ম রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে লালিত পালিত সে দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় না। যে দেশে ১৫ মামলার আসামী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৪ মামলাধারী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ভেঙ্গচি কেটে ভৎসনা করতে লজ্জাবোধ করেনা, যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যাঞ্চেলরকে রাজনৈতিক পাতি নেতার ইশারায় চলতে হয়, ভিসির সাথে সাক্ষাত করতে একজন প্রফেসরকে ২/৩ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলেও সামান্য ওয়ার্ড কমিশনাররা কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই বীরদর্পে আসা যাওয়া করে, যে দেশে শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে আত্মীয় বা দলীয় সমর্থনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যে দেশে রাজনীতির গুণ্ডারা তাদের ভাই-ভাতিজা-ভাগ্নের রোল নম্বর লেখা কাগজ ধরিয়ে প্রফেসরদের শাসিয়ে যেতে পারে সে দেশে ফিরবে কেন? পুলিশ, বিজিবি বা আর্মিতে তাদের ঊর্ধ্বতনকে সম্বোধন করার অফিসিয়াল টার্ম/ভাষা আছে। বিসিএস কর্মকর্তারাও তাঁর সিনিয়রকে নির্দিষ্ট শব্দ প্রয়োগে ডাকে অথচ সর্বোচ্চ শিক্ষিত ও পদাধিকারী একজন প্রফেসর/শিক্ষককে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লার্ক (সেকশন অফিসার) বা কর্মচারীরা ভাই/চাচা বলে সম্বোধন করে সে দেশে ফিরবে কেন? যে দেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, টিভি, মোবাইল কোম্পানি, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল ও বাস মালিকরা রমরমা ব্যবসা নিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলছে অথচ দেশ ও জনগণের সম্পদ গরীব মেধাবী ছাত্রদের আশ্রয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মতাসীনদের দাপটে ধ্বংস প্রায়, বিটিভি আজও বাইচস্কোপের যুগে, বিটিটিবি-বিটিআরসি অবৈধ ভিওআইপি কানেকশনে বিনাশময়, ব্যাংক বেসামাল, পাবলিক হাসপাতালে যন্ত্রপাতি-ঔষধ চুরি সহ বেসরকারী হাসপাতালে রোগী প্রেরণের কেন্দ্র। যে দেশে ৫০ সিটের বাস কোনো সময়ই ১৫০ জন যাত্রী ছাড়া চলেনা সেখানে বিআটিসি লুটপাটে লোকসান গুণে সে দেশে ফিরবে কেন?
রং বদলানোর স্বপ্ন
স্বদেশে ফিরে আসার কাঙ্খিত স্বপ্ন নিয়েই প্রত্যেক বিদেশগামী ভিনদেশে পাড়ি জমায়। বিদেশ বিভুঁইয়ে অতঃপর তারা নিজেকে, নিজের দেশকে এমনকি আমাদের আচার-আচরণকে অন্যের সাথে তুলনা করতে শেখে। তাতে আমাদের হীনতা, দীনতা, নষ্টামি, ভ্রষ্টামি তথা সীমাহীন অবয়-অধঃপতনই ধরা পড়ে। সবুজ রং এর পাসপোর্টটি অসহনীয় বিড়ম্বনা ও গ্লানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সভ্য সমাজে পদে পদে নিজেকে অসভ্য-বর্বর সমাজের উপাদান মনে হয়। সেই উপো থেকেই মনের গহীনে জন্ম নেয় রং বদলানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে স্বেচ্ছাচারিতা নেই বরং স্বাধীনতা আছে। প্রতিটি মানুষ/জীব তার নিরাপত্তার জন্য স্বাচ্ছন্দের পরিবেশে যেতে চায়। তাতে কোনো অন্যায় দেখি না। তাঁদের না ফেরার বিপক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নাই, আইনও নাই। বরং আছে শাসক শ্রেণীর সীমাহীন অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা আর ব্যর্থতা। যে মানুষ বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে কাজ করতে পারে সে দেশে গিয়ে অচল অকেজো হয়ে যায়। এটা চলার দোষ নয়, চালকের দোষ। সুতরাং যোগ্য চালক ও কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ পেলে স্বদেশে ফেরার হার বাড়বে। সেই কাঙ্খিত সুদিনের অপেক্ষায় আছে অনেকেই।
লেখকঃ ফুকুওকা, জাপান থেকে- শিক্ষক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রা.বি.।
E-mail: imtiaz269@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrAhmedImtiaj |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
লেখক পরিচিতি
ড. আহমেদ ইমতিয়াজ, সহকারী অধ্যাপক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচের ওয়েবসাইটে ক্লিক করুন।
http://www.linkedin.com/profile/view?id=75824140&trk=tab_pro
http://www.aimtiajbd.webs.com/ |
|