|
তিস্তা চুক্তি নিয়ে সংশয়
ড. আসিফ নজরুল |
|
অবশেষে ভারতীয়রা আমাদের জানিয়ে দিল, তিস্তা চুক্তি অচিরেই হচ্ছে না। হচ্ছে না যে তার বড় কারণ বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান ভারতের কাছে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন, বাণিজ্য সুবিধা, ট্রানজিট, বিনা আপত্তিতে টিপাইমুখ মেনে নেয়ার মতো বহু কিছুতে ভারতের স্বার্থ রক্ষার পর ভারতের এই মনোভাব অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটি সরকারের একপেশে ভারতনীতির ব্যর্থতার একটি বড় উদাহরণও।
তিস্তা নদীর পানি প্রধানত সেচকাজে ব্যবহারের জন্য ভারত জলপাইগুড়িতে গজলডোবায় এবং বাংলাদেশ লালমনিরহাটে তিস্তা (দালিয়া) ব্যারেজ নির্মাণ করেছে বহু বছর আগে। উজানের দেশ হওয়ায় ভারত আগেই ব্যারেজ ও সেচখালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ফেলায় বাংলাদেশের ব্যারেজটি শুষ্ক মৌসুমে অকার্যকর ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আবার বর্ষা মৌসুমে এই পানি ভারত পুরোপুরি ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশে বন্যা ও নদীভাঙনেরও সৃষ্টি হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্যদশা ঘোচানোর একটি বড় শর্ত হচ্ছে তাই তিস্তায় ন্যায্য পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
তিস্তা নদী নিয়ে স্বাধীনতার পরপর আলোচনা শুরু হলেও ১৯৮৩ সালে প্রথম একটি সমঝোতা হয়। এই সমঝোতা অনুসারে তিস্তার পানির ৩৯ শতাংশ ভারত ও ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল। বাকি ২৫ শতাংশের কতটুকু বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তিস্তার গতিপথকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন এবং এটি কিভাবে ভাগাভাগি হবে, তা নিয়ে পরে আরও আলোচনার কথা ছিল। এ আলোচনা কখনও আর সুসম্পন্ন হয়নি। ১৯৮৬ সালে জয়েন্ট কমিটি অব এক্সপার্টের সভায় বাংলাদেশ নদীর পানি ভাগাভাগির একটি সার্বিক রূপরেখা প্রদান করে। এতে বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্র নদের ৭৫ শতাংশ এবং তিস্তাসহ আটটি নদীর পানির ৫০ শতাংশ পানি দাবি করে। পরে বাংলাদেশ নির্দিষ্টভাবে ২০ শতাংশ পানি তিস্তার নাব্যতার জন্য রেখে দিয়ে বাকি ৮০ শতাংশ সমান ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। ভারত এটি মেনে নেয়নি। ভারতের কোন কোন মহল থেকে এ সময় ভারতের অধিক পরিমাণ কৃষিভূমি ইতিমধ্যে সেচ সুবিধা ব্যবহার করছে এই যুক্তিতে তিস্তার সিংহভাগ পানি দাবি করে বসে। যেমনÑ পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য গত বছর ১ সেপ্টেম্বর বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে তিস্তার ৩৯ শতাংশ পানি পেলেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভারত পাবে ৭৫ শতাংশ! ভারতের পক্ষে আলোচনাকারী দেশটির নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন তাকে এ তথ্য দিয়েছেন বলে তিনি বিবিসিকে জানিয়েছিলেন।
আমার ধারণা, তিস্তায় বেশি পানি দাবি করার ক্ষেত্রে ভারত এর পানির বর্তমান ব্যবহারকে (এগ্জিস্টিং ইউটিলাইজেশন) যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছে। এটি অত্যন্ত অসঙ্গত এ কারণে যে, উজানের দেশ হওয়ায় ভারত একতরফাভাবে বেশি পানি ব্যবহার করার ভৌগোলিক সুযোগ পেয়ে প্রথমেই বাংলাদেশকে পানি ব্যবহারের সুযোগ থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত করে ফেলে। এ বঞ্চনা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নয়, তাই এটি নদীর পানি ভাগাভাগির ভিত্তি হতে পারে না। বাংলাদেশের যে পরিমাণ জমিকে সেচসুবিধা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছিল, তাতে সেচ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি অবশ্যই তাই তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে বিবেচনায় নিতে হবে। সেক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ তো প্রশ্নই আসে না, তিস্তার ৫০ শতাংশ পানি পেলেও তা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট হবে না।
আমার ধারণা, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের এত ঢাকঢোল পেটানোর পর ২৫ শতাংশ পানিতে রাজি হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় বাংলাদেশের পক্ষে। অন্যদিকে এর বেশি পানি দেয়া সম্ভব নয়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী রাজি নন এ ধরনের কথা বলে চুক্তি ঝুলিয়ে রাখলে ভারতের কোন ক্ষতি নেই। কারণ উজানের দেশ হিসেবে তিস্তার পানি ব্যবহারের জন্য ভাটির দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোন চুক্তির অপেক্ষা তাদের করতে হয় না। তাছাড়া আরও উজানে তিস্তার যে দীর্ঘ গতিপথ ভারতের সিকিমের ভেতরে এবং সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় প্রবাহিত হচ্ছে, সেখান থেকে ভারত যে পানি প্রত্যাহার করছে বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র করছে, চুক্তি হলেও তাতেও ঝামেলা বাড়তে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে তিস্তা চুক্তি আদৌ কখনও হবে কিনা বা বাংলাদেশ এ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কখনও পাবে কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট
কারণ রয়েছে।
ড. আসিফ নজরুল
: আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
(সূত্র: যুগান্তর,১১/০৫/১২) |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrAsifNazrul |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে আন্তর্জাতিক নদী আইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জার্মানির এনভায়রনমেন্টাল ল সেন্টার থেকে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনে ফেলোশিপ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। আন্তর্জাতিক নদী আইন বিষয়ে তিনি এডিবি, আইইউসিএন, ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। |
|