বাংলাদেশের এক দশমাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপূর, কৈশোলগত অবস্থানে অবস্থিত পার্বত্য চট্রগ্রাম ধীরে ধীরে ইন্দোনেশিয়ার পুর্বতিমূরের ন্যায় পৃথক একটি রাষ্ট্রের দিকেই এগুচ্ছে, এটা মনে হয় আর গোপন কোন বিষয় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে অভিশপ্ত ওয়ান-ইলেভেনের (১/১১) আগে ও পরে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, এখনও ঘটছে তা দেখেই অনেক সচেতন স্বদেশপন্থিমহল মনে করছে পার্বত্য চট্রগ্রামকে একটা পৃথক বাফার (Buffer state)খৃষ্ট্রান রাষ্ট্র দেখতে হবে খুব শীঘ্রই। এর জন্য মূল অনুঘটকের ভুমিকা পালন করছে শতভাগ খৃষ্টান মানসিকতায় তাড়িত (Christian-oriented) ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এরা আজ পার্বত্য চট্রগ্রামসহ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতি স্বত্তার জন্য মায়াকান্না শুরু করছে, অথচ নিজ নিজ দেশে ক্ষুদ্র ও সংখ্যালুঘু জাতি স্বত্তাগুলোর কোন অধিকারই স্বীকার করে না।
ক.
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কত মাথা ব্যাথা তা বুঝতে নিচের কিছু টুকরো খবরের দিকে নজর দেই----
১. পার্বত্য চট্টগ্রামে পাচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের গোপন বৈঠক। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ৫টি দেশের রাষ্ট্রদূতরা ২০০৭ সালে রহস্যজনকভাবে পার্বত্য সফর করেন। ২০ থেকে ২২ মার্চ ২০০৭ পর্যন্ত ৩ দিন ফ্রান্স, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতরা পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যান। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা হয়নি। সফরকালে রাষ্ট্রদূতরা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি (জেএসএস) ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার সঙ্গে দু’দফা গোপন বৈঠক করেন। বৈঠককালে জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতা রুপায়ন দেওয়ানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক হারুনুর রশিদ খান ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ৫টি দেশের রাষ্ট্রদূতের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূতরা আমাদের কাছে শুধু নিরাপত্তা চান। তারা আমাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে রয়েছেন ডেনমার্কের জেনসন, নেদারল্যান্ডের মেজিংন্ডার, সুইডেনের ব্রিট হারসন, ফ্রান্সের জেকস এন্ডার, জার্মানির ফ্রাঙ্ক মিয়াকি। এদের নেতৃত্বে ছিলেন ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ইসি ডেলিগেশন ড:স্টিফেন প্রোইন। ২০ মার্চ বিকাল ৩টায় ও ২১ মার্চ বিকাল ৫টায় জেএসএস নেতাদের সঙ্গে তারা দু’দুফা মিটিং করেন। ২২ মার্চ এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারা মতবিনিময় করেন। ৩টি বাঙালি এনজিওকে আমন্ত্রণ জানালেও রহস্যজনক কারণে মতবিনিময় থেকে তারা বিরত থাকে। (আমার দেশ, ৩১ মার্চ ও ৪ এপ্রিল ২০০৭)
২. পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ, নাক গলানো, ব্যাপক টাকা ছিটানো এখন বেশ আলোচিত বিষয়। আগ্রহটা কেমন তার প্রমাণ পেতে সন্তুলারমার সেই সাক্ষাতকারের দিকে তাকাতে হবে। তিনি দৈনিক প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাতকারে বলেছেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাহাড়ী সেটেলারদের (পাহাড়ী বাঙ্গালীদের) অন্য জায়গায় পুর্নবাসের জন্য অর্থ দিতে রাজি হয়েছিল” (দেখুন সন্তু লারমার সাক্ষাতকার, প্রথম আলো, ১৬ আগষ্ট, ২০০৯)। মজার ব্যাপার হলো, পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমনকি দৃশ্যমান স্বার্থ আছে যার জন্য সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে শত শত কোটি টাকা খরচ করে পাহাড়ী বাঙ্গালীদের বিতাড়িত করতে চায়? কি তাদের উদ্দেশ্য?
৩. ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী কথিত পার্বত্য-শান্তিচুক্তি (যা আওয়ামী লীগে নিজে করেও বাস্তবায়ন করতে পারছে না, সংবিধান বিরোধী হওয়ার কারনে) স্বাক্ষরের পর সেটাকে প্রথম অভিন্দন জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১/১১ পর বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস পালন, আদিবাসীদের নিয়ে নানা কিসিমের অনূষ্টান পালন, দেশী-বিদেশী মিডিয়াতে ব্যাপক কভারেজ দেওয়া শুরু হয়। এমন কোন দিন নেই যেদিন আদিবাদীদের উপর কোননা কোন খবর থাকছে না। এর পিছনে মুল ভুমিকা পালন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
৪. অনেকে হয়ত জানেন, বৃটিশ এমপি লর্ড এরিক এভেরীর নেত্রত্বে বাংলাদেশের ড. জাফর ইকবাল, ব্যারিষ্টার সারা হোসেন (ড. কামালের মেয়ে), এ্যাড সুলতানা কামাল চক্রবর্তী(স্বামী, শ্রী সুপ্রিয় চক্রবর্তী), ড. স্বপন আদনানসহ কয়েকজন চিহ্নিত বুদ্ধিজীবী একটি আন্তর্জাতিক ভুমি কমিশন গঠন করেছেন। এই লর্ড এরিক এভেরীই ১৯৮৮ সালে পুর্বতিমূরের আন্তর্জাতিক ভুমি কমিশন গঠন করে সেটিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীন করতে অন্যতম ভুমিকা পালন করেছিলেন। এই ভুমি কমিশন বর্তমানে ইউরোপের গুরুত্বপুর্ণ শহর গুলোতে ঘরোয়া সমাবেশ করে চলেছেন। ইতিমধ্যে হল্যান্ড, জার্মানীর বেশ কিছু বড় শহরে সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশের মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে, পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে বাংগালীদের বিতাড়নে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ভুমি কমিশনের এই প্রচারনায় মূল ভুমিকা পালন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
খ.
বাংলাদেশের কথিত ক্ষুত্র জাতী স্বত্তারগুলোর স্বকীয়তা রক্ষার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন নিজের ঘুম হারাম করেছে, এদের জন্য মায়া কান্না শুরু করেছে, হাজার হাজার ডলার ঢালছে, তখন দেখা যায় নিজ দেশে ক্ষুত্র জাতীগুলোর কিভাবে নিজ নিজ স্বত্তা বিলীন করে ইউরোপীয় করা যায় তার সব ব্যবস্থা পাকা পোক্ত করছে।
১. যেকোন দেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে প্রবণতা হচ্ছে পাশাপাশি গোত্রবদ্ধ হয়ে বসবাস করা।
আমাদের দেশের যদি হিদু সম্প্রদায়ের দিকে তাকান, বা পাশের দেশ ভারতে মুসলমানদের দিকে তাকান তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। এমকি ক্ষুত্র উপজাতিরাও নিজের সুবিধার জন্য পাশাপাশি গোত্রবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে ভালবাসে। ইউরোপীয় ইমিগ্রান্ট বিশেষ করে মুসলমানদের একটি ব্যাপক প্রবনতা হল একসাথে পাশাপাশি বসবাস করা। উদাহরন হিসেবে বলা যেতে পারে লণ্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকা, বার্লিনের ক্রাইসবার্গ এলাকা, ফ্রান্সের বড় শহরগুলোর উপশহর গুলো উল্লেখযোগ্য। বৃটেনের দুই পঞ্চমাংশ মুসলমান ইমিগ্রান্ট বাস করে বৃহত্তর লন্ডন এলাকাতে। ফ্রান্সের এক তৃতীয়াংশ ইমিগ্রান্টদের বসবাস প্যারিসে, আর জার্মানীর এক তৃতীয়াংশ ইমিগ্রান্ট পুঞ্জিভুত হয়ে আছে রাউড় (Rhur) শিল্পাঞ্চলে।
ইউরোপীয় অভিবাসী বিশেষ করে মুসলমান ও সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচিত বিষয় ইন্টিগ্রেশন (Integration) বা মূল সমাজে একিভূতকরন। সরকারি ভাষ্য, দীর্ঘদিন ইউরোপীয় দেশে থাকতে হলে এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতি জানতে হবে। মূল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশতে হবে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মাধ্যমে সংখ্যালুঘুদের নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রবনতা হ্রাস পাবে আর মূল স্রোতে মিশে গেলে উগ্রবাদী প্রবনতাও ধীরে ধীরে দূরীভুত হবে।
২. “ইন্টিগ্রেশনের” নামে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি বুঝায় তার জন্য কয়েকটি উদাহরন দেয়া যায়। সংখ্যা লুঘুদের পাশাপাশি বাস করতে নিরিতসাহিত করা হচ্ছে। তিন জন ব্যাচেলর বা পরিবার যদি পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকে তাহলে বলা হচ্ছে, দুই জন হবে স্বদেশী আরেকজন হতে হবে সংখ্যা লুঘুদের। তাদের ব্যাখ্যা, এর মাধ্যেমে সংখ্যালুঘুরা সংখ্যাগরিষ্টদের ভাষা, সংস্কৃতি জানতে পারবে। একে অপরের কাছা কাছি আসতে পারবে। অন্য ভাষা ভাষিদের জন্য পৃথক কোন স্কুল, কলেজ নেই। নেই কোন পৃথক পাঠ্যপুস্তক। সংখ্যা লুঘুদের জন্য নেই কোন চাকরী কোঠা। এদের কোন গুরুত্বপুর্ণ ধর্মীয় দিনে ছুটি তো দুরের থাক ঐচ্ছিক ছুটিও পালনের সুযোগ নেই।
৩. “ইন্টিগ্রেশনের” নামে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যান্য ভাষাভাষিদের ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষতে বাধ্য করছে। নিজের সংস্কৃতি অন্য ভাষাভাষিদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এর জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ও করা হচ্ছে। কিছু দিন আগে সুইজারল্যান্ডের (swiss) একটি পত্রিকা একটা ছবি ছেপেছে। পাশাপাশি তিন মহিলা, দুজনের পোষাক খোলামেলা, আরেক জনের পোষাক একটু মার্জিত। প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা কি “ইন্টিগ্রেশনের” স্পিরিট? তার মানে “ইন্টিগ্রেশন” হচ্ছে অন্যের সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া!! কি অদ্ভুত যুক্তি
যারা “ইন্টিগ্রেশনের” নামে নিজেদের সংস্কৃতি সংখ্যালুঘুদের জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে তারাই আবার আমাদের দেশে গিয়ে উপজাতিদের ভাষা, সংস্কৃতি, স্বকীয়তা রক্ষার বুলি আওড়াচ্ছে, সবক দিচ্ছে। এর জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থও ব্যয় করছে।
মুলত গত এক দশক ধরে ঢাক ঢোল পিটিয়ে বলা হচ্ছে আমাদের উপজাতীরা নাকি আবার আদিবাসী। প্রতিদিনেই যাক-জমকের সাথে পালন করা হচ্ছে নানান কিছিমের অনুষ্টান। তোলা হচ্ছে নানান সব দাবী দাওয়া। তাদের দিতে হবে আলাদা সংবিধান, আলাদা ভাষা। তারপর আলাদ রাষ্ট্র। এসব দাবীর উপর দেওয়া হচ্ছে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ। ভাবখানা দেখে মনে হয় এত দিন উপজাতিরা বাংলাদেশে সুখে শান্তিতে বসবাস করতো। হটাত করে কিছু দিন আগে বাংগালীরা বাংলাদেশে এসে তাদের (কথিত আদিবাসীদের )বিতাড়ন করেছে, তাই আমেরিকা-ইউরোপ আসুক, দেখুক আর তাদের জন্য একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যাবস্থা করে দিক। মজার ব্যাপার হল, যারা এসব এনজিও, মস্তিক বিক্রিকারি কিছু মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের পিছনে রসত যোগাচ্ছে সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা গোষ্টি, যারা নিজেদের দেশে ক্ষুদ্র জাতীস্বত্তার আলাদা অস্তিত্বই স্বীকার করে না।
লেখকঃ গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, ই-মেইল, hossain.khilji@yahoo.com |
Tribal peoples must not be called ADIVASIs (indigenous people).