শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ০১:২২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
স্বাধীনতার চল্লিশ বছরঃ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি (১১/১২/২০১১)
টিপাইমুখে বাঁধ বাংলাদেশের মরণ ফাঁদ (০৪/১২/২০১১)
বাস্তবতা অস্বীকারের প্রবণতা গণতন্ত্র বিকাশের প্রধান অন্তরায় (০৪/০৬/২০১১)
তৈলমর্দন সংস্কৃতি (০১/০১/২০১১)
বাংলাদেশের শিশু গণতন্ত্র ও তার ভবিষ্যৎ (২৫/১২/২০১০)
কোন্ পথে চলছে বাংলাদেশের ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি (১৩/১১/২০১০)
পুঠিয়া রাজবাড়ি : পর্যটন শিল্পের এক অমিত সম্ভাবনা (০৯/১০/২০১০)
সাংসদ বলে কথা (০২/১০/২০১০)
আগের লেখা
497


স্বাধীনতার চল্লিশ বছরঃ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বয়স ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০১১ তে চল্লিশ বছর পূর্ণ হবে। ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর যে শিশুটির জন্ম তার বয়স এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স এখন একই অর্থাৎ চল্লিশ বছর। যদি দিন গুনি তাহলে বলবো আমরা ইতিমধ্যে ১৪,৬০০ টি দিন অতিক্রম করেছি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং শোষণমুক্ত সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদেশের আপামর জনসাধারণ ১৯৭১ সনে মুক্তি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাত্র নয় মাসে সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতাও অর্জিত হয়। আমরা লাভ করি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আজ চল্লিশ বছর পরে যদি দেশের জনগণ তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্র তথা সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবের খাতায় চোখ বুলায় তাহলে অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে দুটোর মধ্যে অঙ্কের বিস্তর গরমিল পরিলক্ষিত হয়। সংযোজিত হয় একের পর এক অপ্রত্যাশিত বিষয়াদি, যেগুলো জনগণ কখনই আশা করেনি। একথা সত্য, জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা অনেক ও সুদূরপ্রসারী, কিন্তু সে তুলনায় প্রাপ্তিযোগ কতখানি ঘটেছে এবং কতখানি অপ্রত্যাশিত বিষয় এসে সংযোজিত হয়েছে তা বিবেচনার দাবী রাখে।

ইতোমধ্যে অতিবাহিত বাংলাদেশের এই চল্লিশ বছরের ইতিহাস কতকগুলো পর্বে বিভক্ত। এক নজরে পর্বগুলো হলো ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ (১৫ আগষ্ট), ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ (৩০ মে), ১৯৮১ থেকে ১৯৮২, ১৯৮২ (২৪ মার্চ) থেকে ১৯৯০ (৬ ডিসেম্বর) এবং ১৯৯০ থেকে বর্তমান পর্যন্ত। বিস্তারিত না গিয়ে বলা যায় ১৯৯০ সনের পূর্ববর্তী পর্বসমূহেই আমরা তিন ধরনের সরকার পেয়েছি, প্রথমে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার, অতঃপর রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার এবং সামরিক সরকার। ১৯৯০ এর পরবর্তীতে পেয়েছি অনির্বাচিত প্রতিনিধি পরিচালিত তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার এবং মাঝে দুই বছরের সামরিক শক্তি পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাই বলা যায় এদেশের জনগণের এই চল্লিশ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় বহুবিধ সরকারের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু এসব সরকার জাতি হিসেবে এদেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এই চল্লিশ বছরে কতুটুকু সফলতার পরিচয় দিয়েছে তা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষারোপ কিংবা সব দোষ সামরিক সরকারের উপর ন্যস্ত করে নিজেরা সাধু সাজতে পারে। তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলা যায় আমাদের প্রত্যাশার অঙ্ক অনেক বড়, কিন্তু সে অনুপাতে অর্জন অনেক কম হলেও একেবারে নগন্য বলা যুক্তিযুক্ত হবে না। কিন্তু কতকগুলো অপ্রত্যাশিত বিষয় এই অর্জনগুলোকে ম্লান করে ফেলেছে।

প্রথমেই দেখা যাক স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে আমাদের প্রত্যাশাগুলো কি ছিল। প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা ছিল পরাধীনতা থেকে মুক্তি লাভ। সেটি আমরা অর্জন করছি। পেয়েছি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। তবে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশার ফিরিস্তি অনেক বড়। যেমন- অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার লাভের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, সকলের অন্ন-বস্ত্র-স্বাস্থ্য-বাসস্থান-শিক্ষা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান, সকলের জন্য সুশাসন, দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন, নৈতিকতার ভিত্তিতে সংবাদ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, কার্যকরী জাতীয় সংসদ, বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান, দেশের সকল অঞ্চলের অবকাঠামোগত সুসম উন্নয়ন, শিল্প ও কলকারখানা স্থাপন, রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সুসম্পর্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃংখলা প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত স্বায়ত্ত্বশাসিত ও শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন মতামত প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তাসহ আরো অ-নে-ক প্রত্যাশা। একথা সত্য, দেশ স্বাধীনের পর থেকে এপর্যন্ত জনগণের এসব প্রত্যাশার বহুলাংশই পূরণ না হলেও দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যে ঘটেছে তা অনস্বীকার্য। দেশের রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হয়েছে ও নির্মিত হয়েছে অনেক নতুন নতুন রাস্তা (যদিও সংস্কারের বড়ই অভাব), কালভার্ট, বড় বড় ব্রীজ (অনেক ব্রীজের সড়ক সংযোজন ঘটেনি) ইত্যাদি। গ্রামে গঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোজনসহ সম্প্রসারিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি (যদিও বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি)। জমি চাষাবাদে পুরাতন লাঙল-গরুর পরিবর্তে চালু হয়েছে আধুনিক পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর, সেচকার্যে পাম্প মেশিন, ধান কাটা ও মাড়াইয়ে আধুনিক সরঞ্জমাদি ইত্যাদি। এতে করে ফসল উৎপাদনের পরিমাণও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে সরকারের চেয়ে কৃষির উপর নির্ভরশীল গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর ভূমিকাই মূখ্য।

তবে এটিও সত্য যে, একদিকে কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্য অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যের অভাবে বর্তমানে কৃষকরা কৃষিকাজে দিন দিন উৎসাহ হারাতে বসেছে। উপজেলাসমূহে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। নির্মিত হয়েছে অনেক দালানকোঠা। আর রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহররের রাস্তা-ঘাট ও গগনচুম্বী দালানকোঠা দেখে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ। বিশ্বের আধুনিকতম সংসদ ভবনগুলোর অন্যতম একটি আমাদের সংসদ ভবন। যদিও দেশ পরিচালনায় সেই সংসদ ভবনের প্রাণবন্ত কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। সুতরাং নির্মাণ অবকাঠামোগত দিক দিয়ে চল্লিশ বছরে এদেশের উন্নয়ন যে ঘটেছে দৃশ্যত কেউ তা অস্বীকার করতে পারবে না। আরো উন্নয়ন ঘটেছে টেলিযোগাযোগ ও গণমাধ্যমে। শিক্ষার সম্প্রসারণে গ্রামাঞ্চল ও শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে অনেক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। অধুনা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজেরও ছড়াছড়ি। পূর্বের সতেরটি জেলা আজ চৌষট্টিতে, থানাগুলো সব উপজেলা এবং চারটি বিভাগ সাতটিতে উন্নীত হয়েছে। দেশীয় পুরাতন কলকারখানাগুলোর (বিশেষত পাটকল) মৃত্যু ঘটলেও সম্প্রসারিত হয়েছে চামড়া, ঔষধ ও গার্মেন্টস বা পোশাক শিল্পের। সুতরাং সেবা এখন জনগণের দ্বারগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার কথা।

কিন্তু অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয় এতসব উন্নয়ন ঘটলেও উন্নত হয়নি আমাদের মন-মানসিকতার। পরিবর্তন আসেনি আমাদের সর্বত্র প্রশাসনিক পদে নিয়োজিত কর্তা ব্যক্তিদের আচার-আচরণে। প্রতিষ্ঠিত হয়নি আজো আমাদের সত্যিকারের স্বাধীন বিচারালয়, স্বাধীন দূর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। মুখে গণতন্ত্র ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে ফেনা তুললেও আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি আমাদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সরকার। বন্ধ হয়নি সন্ত্রাস ও মানুষের অকাল মৃত্যু এবং মানবাধিকার হরণের মত বিভিন্ন কার্যাবলী। আমাদের প্রত্যাশা ছিল সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি লাভ। কিন্তু দুটোই হয়নি, পান্তরে বেড়েছে আরো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। বেড়েছে ধনী-গরিবের বিরাট ব্যবধান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, কাগজে-কলমে শিক্ষার হারও বেড়েছে, কিন্তু নেমে গেছে শিক্ষার মান। দেশের সকল মানুষের সামান্য অন্নের ব্যবস্থা হলেও বস্ত্র-বাসস্থান ও চিকিৎসা সেবা দিতে সরকারগুলো তেমন সফলতা দেখাতে পারেনি। দেশের চিকিৎসা সেবা আজ গরিবের নাগালের বাইরে। ধনীদের জন্য রাজধানী কেন্দ্রিক নির্মিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে বেসরকারি অত্যাধুনিক হাসপাতাল। আর সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেখানে অর্থ উপার্জনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও লেখাপড়ার নামে চলছে অর্থনৈতিক বাণিজ্য। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে নেই কোন সুসম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও সহিষ্ণুতা। রয়েছে শুধু অতীত বন্দনা ও কাদা ছোঁড়াছুড়ি। দেশের শিক্ষিত ও নাগরিক সমাজের আজ অধিকাংশই দলীয় অন্ধ রাজনীতিতে বিভক্ত। তাদের অনেকেই আজ পদের আশায় রাজনৈতিক দলগুলোর পদলেহনে অভ্যস্ত। তদপুরি এদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অলিখিত কিন্তু প্রকাশ্যে সংযোজিত হয়েছে জনগণের অপ্রত্যাশিত বহু বিষয় যেগুলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বাধা হিসেবে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে এবং এগুলোর চর্চা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে সরকার গঠনকারী দুটি বৃহৎ দলের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কেবল বৃদ্ধিই পাচ্ছে না বরং আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এই অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলো হলো রাষ্ট্রীয় পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সর্বস্তরের ব্যক্তিবর্গের গৃহীত শপথ ভঙ্গের প্রবণতা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নামে সমগ্র প্রশাসন ব্যবস্থাকে দলীয়করণ, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে অযাচিতভাবে যত্রতত্র স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও সেগুলোর শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, লেজুড়বৃত্তি শিক্ষক রাজনীতি, পেশাজীবি সংগঠনের নামে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে দলীয় স্বৈরতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র বা রাজনীতিকে পারিবারিকিকরণ, দলীয় প্রধানের ইচ্ছামাফিক দলে ও দেশের গণতন্ত্র চর্চা, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, নিজেদের সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে অন্যের দ্বারে দৌড়াদৌড়ি, মুখে জনগণের সেবা করার কথা বললেও কার্যত জনমতের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ ও তার তড়িঘড়ি কার্যকরণ, মাত্রতিরিক্ত মিথ্যাচার ও ঘুষ-দূর্নীতির উপদ্রব, দলয়ীকরণের মাধ্যেম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস সাধন, শক্তিশালী স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে সাংসদদের মধ্যে ক্ষমতার কুক্ষিগতকরণের প্রবণতা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংসদদের লাগাতার সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি, ঘন ঘন হরতাল, গাড়ি ভাংচুর ও জ্বালাও পোড়াও এর সংস্কৃতি, কখনো কখনো আইন-শৃংখলা বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, পুলিশকে দলীয়ভাবে ব্যবহার, দেশের উচ্চতর বিচারালয়ের সম্মানিত আইনজীবিদের মাঝে দলীয় রাজনীতির অপচর্চা ও হাতাহাতি ইত্যাদি। এই জননিন্দিত বিষয়গুলো কখনই জনগণ প্রত্যাশা করেনি। কিন্তু চল্লিশ বছরে জনগণের এই অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলোই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রসহ সমাজের সর্বত্র বিস্তার লাভ করে চলেছে। অতি সম্প্রতি জনগণের অপ্রত্যাশিত বিষয়ের ফিরিস্তিতে গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক জনমতের উপেক্ষা ও তড়িঘড়ি করে চার মিনিটের মধ্যে সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দ্বিখন্ডিতকরণের বিষয়টি সংযোজিত হয়েছে। বিচিত্র এই দেশ! জনগণ যা চায় না তা করতে সরকারগুলো ব্যতিব্যস্ত, কিন্তু জনগণ যা চায়, যেগুলো অর্জনের জন্য তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল সেগুলোর বাস্তবায়নে গড়িমসি ও উদাসীনতার নজীর বড়ই কষ্টদায়ক। সুতরাং এই চল্লিশ বছরে আগত সরকারগুলো এদেশের জনগণের জন্য কিছু ভালো কাজ করলেও অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ডগুলো তাদের সেই ভালো কাজগুলোকে আঁধারে নিমজ্জিত করে ফেলেছে। জনগণকে ফেলেছে হতাশার গহ্বরে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যেখানে দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে সেখানে আমাদের দেশ পশ্চাতে চলার আবর্তে আটকে পড়েছে।

কিন্তু এদেশের জনগণ আশার আলো নিয়েই বাঁচতে চায়। তাদের ধৈর্য শক্তি অনেক বেশি। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্ব স্ব ইস্তেহারে জনগণকে এদেশের উন্নয়নে যে আশার আলো দেখায় নীরিহ জনগণ তা অকপটে বিশ্বাস করে এবং ভোটও দেয়। কিন্তু নির্বাচনের পর সম্পূর্ণ দৃশ্যপট পাল্টে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। এটিও ঠিক, জনগণের সকল প্রত্যাশা যে আলাউদ্দীনের চেরাগের মত একবারে পূরণ হবে তা ভাবা হবে একেবারেই অমূলক ও অবিবেচনা প্রসূত। তবে নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী কিছু কিছু করে বাস্তবায়নের কাজতো শুরু করতে হবে। কেননা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ইতোমধ্যেই চল্লিশটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। আমরা জানিনা আমাদের সম্মানিত রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারক মহল তথা সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের নূন্যতম প্রত্যশা পূরণে আর কতদিন সময় নিবেন! ১৯৯০ সনের পরে প্রতিষ্ঠিত কথিত শিশু গণতন্ত্র একুশ বছর পার হতে চললেও কবে যে সে যৌবন প্রাপ্ত হয়ে পরিপক্কতা অর্জন করবে তা অনিশ্চিত। কবে যে জাতীয় সংসদ ভবন হবে জাতীয় সমস্যা সম্পর্কিত সকল আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু তা সুদূর পরাহত। অন্তত বৃহৎ দুটি জোট বা রাজনৈতিক দলের চলার গতি ও আচার-আচরণে এমনটিই মনে হয়। কিন্তু সরকার ও বিরোধী- উভয় দলই যদি জনগণের অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলো বন্ধে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সামনের দিকে এগুতে থাকে তা হলে অচিরেই এদেশ সত্য সত্যই সোনার বাংলায় পরিণত হতে পারবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের জনগণকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাই দেশের জনগণ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথা মহাজোট সরকারের এই স্বপ্ন দুটি বাস্তবায়নের দিকে। নীতি-নৈতিকতা বিসর্জিত রাজনীতিতে ফিরে আসুক তার অতীত ঐতিহ্যের সুস্থ ধারা- এটি আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: kmostafiz@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrKaziMdMostafizurRahman
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
করোনেশন রোড, মোমেনশাহী থেকে আব্দুল্লাহ তাসনীম লিখেছেন, ১২ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ০১:২৫
দেশপ্রেমের অভাব, পরমত সহিষ্ণুতার অভাব, জাতীয় প্রয়োজনেও ঐক্যমত্যে পৌঁছতে না পারা ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যায় স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি ঘটেনি। তাই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
73462
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরিফুল ইসলাম মারুফ লিখেছেন, ১২ ডিসেম্বর ২০১১; সকাল ০৭:০৩
স্যার সালাম নিবেন । সুন্দর এই লেখাটির জন্য ধন্যবাদ । আপনার লেখায় বাস্তবতা ও আকাংখার স্বমন্যয় ঘটেছে । স্বপ্ন সাথে নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চায় । ভালো থাকবেন ।
73469
ঢাকা থেকে ইশরাক আহমেদ লিখেছেন, ১২ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ০৯:০০
Now we need wise and trusted guide and advisor who will lead next political generation to success...
দ্বিদলীয় স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি চাই।
73510
ঢাকা থেকে খায়রুল হাসান লিখেছেন, ১২ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১০:০৮
আওয়ামীদের কাছ থেকে বাঁচার জন্য আরেক যুদ্ধ চাই এবং প্রস্তুতি নিন্। এই ধরনের গনতন্ত্রের আবরনে স্বৈরতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। বাংলদেশটা আওয়ামীদের লীজ দেয়া হয়নি যাতে তারা যা খুশি তাই করবে। আরেক স্বাধীনতা যুদ্ধের আহ্বান জানাই।
73517
Dhaka থেকে Amanot লিখেছেন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১১:৩৫
Hello Mr Khairul
It seems you are very much knowledgeable on Democracy.First you must understand what is Gonotantro.I am not trying to flatter AL.But at least you should feel that there are many many aspects which indicates present govt is not showing autocratic attitude.Rather due to our political culture possibly you are feeling like that which is mostly created by our so called powerless partys to be more specific BNP and allies.Think they are so determined to go to power for that matter they don't want to miss Jamat from their alliance knowing fully well that they are war criminal.Please take care and show your patriotic feelings for this nation.Please don't invite war rather help this govt to lead a better life.You must look around and feel we are still in better position in regards to our basic needs.If you have positive attitude you will find at present people are not dieing due to shortage of food.Let all of us love this contry and help AL govt to lead a continuous better life.
73863
ঢাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ফাকির আলী লিখেছেন, ১৮ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১২:১৩
স্বাধীনতার সুখ
স্বাধীনতা এনেছ বলে বাগাড়ম্বর কর!
যদিও তুমি ছিলে ওপারে।
আর আমরা সম্মুখ সমরে প্রাণপণ লড়াই করি মুক্তির জন্যে।
তুমি তো নেতা ছিলে, হিসেবের গড়মিল দিলে,
পশ্চিমারা নাকি আমাদের ঠকাচ্ছিল দিনের পর দিন।
স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, পতাকাও পেয়েছি, লাল সবুজের পতাকা!
সাথে একটা স্বপ্ন সোনার বাংলা!
এটাই কি স্বাধীনতার রকমফের? আর কিচ্ছুনা?
স্বাধীনতা কি দুর্ভিক্ষের আরেক নাম?
স্বান্ত্বনা ছিল যু্দ্ধবিধ্বস্ত দেশ, এটা অস্বাভাবিক নয়।
সামনেই আসছে সুখের দিন!
তবে স্বাধীনতা কি সবার বাক্ রূদ্ধ করার বিষয়?
বোঝালে স্বাধীনতার সুখের জন্য সবই করতে হয়!
মাথা নোয়ায়ে মেনে নিয়েছি বার বার, সায় দিয়েছি তোমার শত কাজে।
কিন্তু স্বাধীনতার সোণার হরিণটি আমার আর পাওয়া হয় না।
আমি বুভুক্ষ, প্রতারিত, নিস্ব এবং হতবিহ্বল।
স্বাধীন বাংলায় আমি লাঞ্চিত, অপমানিত।
আমি আমার ও তোমার মাঝে বিস্তর ব্যবধান দেখি,
তুমি সুউচ্ছ অট্টালিকায়, আমি বস্তিতে পঁচি।
স্বাধীনতার নামে তুমি আমায় কলা দেখালে,
স্বপ্ন সুখের নামে মুলা ঝুলালে।
সোনার বাংলার মানে কি কাঙগালের লঙগরখানা,
যেখানে তুমি আমায় নেমন্তন্ন করলে?
যুদ্ধ করে স্বাধীন করলাম, তুমি আখের গোছালে!
আখের রসটা খেয়ে ছোবড়াটা ছুড়ে মারলে!
স্বাধীনতার নামে হিংসা আর বিবেদের বিষবাস্প ছড়িয়ে দিলে,
তাতে জ্বলেপুড়ে সবাই চারখার,
বাপে বেটায়, ভাইয়ে ভাইয়ে, সমাজে সমাজে।
তোমার এ শৃঙ্খলিত স্বাধীনতা চাইনা!
সময় হয়েছে আরেকটি লড়াই করার,
সত্যিকারের স্বাধীনতার জন্য আবার অস্ত্র ধরতে চাই,
সত্যিকারের আরেকটা মুক্তি যুদ্ধ চাই।
73867
ঢাকা থেকে সজীব রহমান লিখেছেন, ১৯ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ০৯:৫০
ঢাকার মুক্তিযোদ্ধা ফাকির আলীকে সাধুবাদ জানাই। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে তার কবিতায় আওয়ামীলীগের স্বাধীনতার বিষয়ে ভাওতাবাজি ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করেছেন। আসলে স্বাধীনতা শব্দটি খুবই স্বপ্নীল, মধুর ও কাঙ্খিত হলেও তা এখন কান জ্বালাপালার বিষয়। যেমন ভিক্ষুক বলে, ভিক্ষা চাইনা কুকুর সামলা। স্বাধীনতা এনে দিয়েছ এটাতো যথেষ্ঠ নয়, স্বাধীনতা পরবর্তী যেটা করার বিষয়, পাকিস্তানের অধীনে যেটা আমরা করতে পারিনাই অথবা পাকিস্তান আমাদের যেটুকু পিছিয়ে দিয়েছে অথবা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে যতটুকু আন্তরিকতা দিয়ে সবাই মিলে কাজ করে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিষয়টি ততক্ষনাৎ অর্থাৎ স্বাধনতা পরবর্তী নিষ্পন্ন করা, তার কিছুই করে নাই এই দলটি। দেশে চলছে বিভেদ, বিষম্বাদ। চল্লিশ বছর পরেও শুধু স্বাধীনতা শব্দটা নিয়ে কাড়াকাড়ি, বাদ বিবাদ, হানাহানি, বাড়াবাড়ি। দেশে চলছে, হত্যা, খুন, গুম, বিবেদ, মারামারি, হানাহানি, প্রতারনা, জিঘাংশা। এ অবস্থায় কেউ স্বাধীনতা শব্দটি নিয়ে বাগাড়ম্বর সহ্য করতে চায়না। তারা চায় সুন্দর পরিবেশ, দেশপ্রেম, ভ্রাতৃত্ব-বন্দ্ধুত্ব, উন্নয়ন এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মহা পরিকল্পনা। ভিশন ২০২১ করলাম আর মারামারি করলাম, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ বলে বিবেধ সৃষ্টি করলাম, কাউকে ডাকলাম না, একাই সব করতে চাই, তাহলেতো আর ভিশন ভিশনই থেকে যাবে, বাস্তবে রূপ নিবেনা। মহা পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন কখনো একাএকা করা যায়না, সবাইকে অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সম্পৃক্ত করতে হয়। কিন্তু আ'লীগ সেরকম নয়। ভিশন ২০২১ এর গল্প নিয়ে তারা একযুগ পার করতে চায়, অর্জন করতে নয়। এর একটা উদাহরণ হচ্ছে তারা বিপক্ষ দলকে মারতে যায়, কাটতে যায়, আবার বলে ভিশন ২০২১ অর্জনে তোমরা সহায়তা করো। এটা কখনো হয় নাকি! স্বাধীন হয়েছি ঠিক তবে তা পাকিস্তান থেকে কিন্ত বর্তমান অবস্থা! তাতো আরও ভয়ঙ্কর! কিছু নমুনাই বলে দেয় যে আমারা ভারতের কাছে প্রকারান্তরে পরাধীন । পুরো বর্ডারে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের অমর্যাদা করা, সীমান্তে নির্বিচারে বাংলাদেশীদের গুলি করে হত্যা করা, প্রতিটি নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর পানি সরিয়ে নিয়ে দেশটাকে মরু করা, পুরো দেশের বাজার দখল করে শিল্পকারখানা ধ্বংস করা, মাদক পাচার করে যুব সমাজকে ধ্বংস করা, বঙ্গোপসাগরের বৃহৎ এলাকা তাদের বলে দাবী করা এবং খনিজ সম্পদ আহরনে জরিপ চালানো। আরো অনেক বিষয়ে তারা আমাদের জিম্মি করে রাখতে চায়। একটাই কারন, এদেশটা মুসলমানের। সুতরাং আ'লীগরা কোন স্বাধীনতার জন্যে বাগাড়ম্বর করছে, তাদের কাছে আমরা জানতে চাই।
74026
খুলনা থেকে জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ১৯ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১০:২৮
শুধু স্বাধীনতা নিয়ে মারামারি নয়, স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে চাই। স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। অসভ্যতা ছেড়ে সভ্য জাতিতে রূপান্তর চাই। ইতিবাচক পরিবর্তন চাই। মানুষের মত বাঁচতে চাই। বাঁচার মত বাঁচতে চাই। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে অন্যথা চাই না। শুধু স্বাধীনতার কথা বলে এখন আর পার পাওয়া যাবে না।
74030
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখক...

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy