|
বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল্লাহ খানের জন্য সশ্রদ্ধ সালাম
ড. মাহবুব উল্লাহ |
|
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১১ আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা নিয়ে তাকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু চিকিত্সকরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও তার জীবন রক্ষা করতে পারেননি। ৭০-ঊর্ধ্ব বয়সে তার মৃত্যু ঘটল। তার অসুস্থতার সংবাদ জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সেমিনারে যোগদান করতে যাওয়ার পথে জানতে পারলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জানা গেল তিনি আর ইহলোকে নেই। বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ আমার হয়েছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবে একাধিক সেমিনার ও রাউন্ড টেবিল অনুষ্ঠানেও আমরা একসঙ্গে কথা বলেছি। সুঠামদেহী এই যোদ্ধার বয়স বোঝা যেত না। তাহলেও বর্তমান সময়ের বিচারে তার এমন কোনো বয়স হয়নি যে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তারপরও মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে. হায়াত-মউত ও রিজিকের মালিক আল্লাহ। স্রষ্টার অমোঘ নিয়ম থেকে আমরা কেউই ব্যতিক্রম নই। আমার দুর্ভাগ্য, সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খানের স্মরণে শহীদ মিনারে যে শোক সভার আয়োজন করেছিল সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ তাতে নগরীর দুঃসহ যানজটের কারণে সময়মত পৌঁছাতে না পারায় আমি যোগ দিতে পারিনি। এই মনোকষ্টের বোঝা আমাকে আমৃত্যু বহন করতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার জন্য অনুশোচনা আজীবন করতে হয়। আমার জীবনে সেরকম একটি অনুশোচনা যোগ হলো।
হামিদুল্লাহ খান সাহেব মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর প্রতীক উপাধিও পেয়েছিলেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন বিদ্রোহী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। একজন বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতার মতে কিছু সময়ের জন্য কেউ বিপ্লবী হতে পারে, কিন্তু চিরজীবনের জন্য বিপ্লবী হওয়া অত্যন্ত কঠিন। আমরা ঠিক একইভাবে বলতে পারি, ’৭১ সালে একবার মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অব্যাহতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা প্রকৃত প্রস্তাবে অত্যন্ত বিরল। কিন্তু হামিদুল্লাহ খান ছিলেন সেসব বিরল মুক্তিযোদ্ধাদের একজন, যিনি স্বাধীনতার চেতনাকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সময় পর্যন্ত অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার শত্রু ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। সেই সময় এদেশের হাজার হাজার তরুণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আত্মসংরক্ষণের তাগিদ থেকে। এই মুক্তিযুদ্ধ কোনো দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়।
যখন মুক্তিযুদ্ধকে দলবিশেষের একচেটিয়া মালিকানা বলে দাবি করা হয় তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটিই নিহত হয়। জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, কেউ যদি বিশেষ দলভুক্ত হয় তাহলে যুদ্ধের ময়দানে না গিয়েও মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেতে পারে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে বিতর্কিত করে তোলা হয়েছে। এই বিতর্কের সূত্র ধরে জাতির মধ্যে খাড়াখাড়িভাবে দুটি ভাগ করে ফেলা হয়েছে। একটি হলো স্বাধীনতার সপক্ষশক্তি এবং অন্যটি হলো স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। বাংলাদেশের বয়স ৪০ বছর হয়েছে। জন্মমৃত্যুর নিয়মে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীতে কোটি কোটি মানুষের যোগ হয়েছে, যারা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি অথবা জন্মগ্রহণ করলেও সেই সময়ে তারা ছিল শিশু। যার ফলে এদের পক্ষে সেই সময়কার ঘটনাবলী সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা সম্ভব নয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো তারা এবং তাদের অন্ধ অনুসারীরা এমন একটি আবহ সৃষ্টি করল যে মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্ত অতিক্রম করে যারা ভারতে যায়নি বা যেতে পারেনি তারা সবাই কলাবরেটর। তাহলে ব্যাপারটি কী দাঁড়াল? সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। এর মধ্যে ১ কোটির মতো মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যায় এবং সীমান্ত সংলগ্ন ভারতীয় রাজ্যগুলোতে শরণার্থী হয়।
ভারতীয় ভূখণ্ডে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে থেকে গেল সাড়ে ৬ কোটি মানুষ। এই সাড়ে ৬ কোটি মানুষ যেহেতু সীমান্তের ওপারে যায়নি, সেহেতু তাদের কপালে কলাবরেটরের তিলক পরানো হলো। কী ভয়াবহ কথা। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে সাড়ে ৬ কোটিই কলাবরেটর। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মহিমা কোথায় গেল? এজন্যই সাপ্তাহিক হলিডের প্রয়াত সম্পাদক এনায়েতউল্লাহ খান যে বহুল আলোচিত কলামটি তার পত্রিকায় লিখেছিলেন তার শিরোনাম ছিল ঝরীঃু ভরাব সরষরড়হ ঈড়ষধনড়ত্ধঃড়ত্ং. এনায়েতউল্লাহ খানের বিখ্যাত এই কলামটি জাতির চৈতন্যে বিশাল আঘাত হেনেছিল। জাতিকে বিভ্রান্ত এবং আশাহত করে মুষ্টিমেয় ফন্দিবাজরা যে সুবিধা লুণ্ঠন করতে চেয়েছিল তার ওপর বিশাল এক চপেটাঘাত হানা হয়েছিল এই কলামটির মাধ্যমে। সাংবাদিকতা পেশায় মহত্ত্ব এখানেই। এরকম সাংবাদিকতাই পারে বিভ্রান্ত ছত্রভঙ্গ জাতিকে দিশার পথ দেখাতে। আজও এ ধরনের সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। বরং বলা চলে, এর প্রাসঙ্গিকতা বেড়েছে বহুগুণ।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের মিত্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা আমরা পেয়েছিলাম। এই সাহায্য-সহযোগিতার কথা অস্বীকার করলে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে। কিন্তু পাশাপাশি এই প্রশ্নটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, ভারতের সাহায্য-সহযোগিতার পেছনে কি নিছক পরার্থপরতাই কাজ করেছিল?
আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরার্থপরতার কোনো স্থান নেই। প্রত্যেক রাষ্ট্রই তার রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বার্থের নিরিখে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি নীতি নির্ধারণ করে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মূঢ়তা ও হঠকারিতা ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। ভারত তার চিরশত্রু পাকিস্তানকে চিরতরে কাবু করে ফেলার জন্য সুযোগটি খুঁজে পায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের বিদ্রোহে। এদেশের নির্যাতিত মানুষ হিসেবে আমাদেরও কোনো দ্বিধা ছিল না ভারতীয় সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করতে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। যুদ্ধের মিত্র ভারতের আচরণ এদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে ফেলে। ভারতীয় সৈন্যরা এদেশ থেকে পাকিস্তানিদের সমর্পিত সমুদয় অস্ত্রশস্ত্র কনভয় বোঝাই করে ভারতে নিয়ে যায়। ভারতীয়রা তাদের স্বার্থ ঠিকই বুঝেছিল। তারা যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিল, এসব অস্ত্র যদি বাংলাদেশ বাহিনীর হাতে থাকে তাহলে বাংলাদেশ বাহিনী তাত্ক্ষণিকভাবে একটি শক্তিশালী বাহিনীরূপে আত্মপ্রকাশ করবে। যে বাহিনী তাদের দৃষ্টিতে স্ট্র্যাটেজিক এনিমিতে পরিণত হতে পারে। এজন্য তারা কোনো দুর্নামের তোয়াক্কা না করেই ধিত্ নু হিসেবে এসব অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিজ দেশে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জলিল এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। সমরাস্ত্র ও মূল্যবান সামগ্রী ভারতে নেয়া ছাড়াও পরবর্তীকালে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রতি ক্রমাগত বৈরিতা প্রদর্শন করে এসেছে। অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার, অসম বাণিজ্য, সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহের উস্কানি, তালপট্টি দ্বীপ দখলসহ ভারতীয় বৈরিতার অজস্ত্র দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। তাহলে ব্যবপারটি কী দাঁড়াল? আমরা পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হলাম বটে; কিন্তু আমাদের পড়তে হলো ভারতীয় শোষণ ও লুণ্ঠনের কবলে। আমরা একটি পতাকা ও ভূখণ্ড পেলাম।
কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ হলো না। হাঙরের চোয়াল থেকে বের হয়ে এসে আমরা কুমিরের চোয়ালে আবদ্ধ হয়ে গেলাম। সুতরাং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ থেকে গেল অসমাপ্ত। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার জন্য কর্তব্য হলো অসমাপ্ত এই মুক্তিযুদ্ধের সফল সমাপন ঘটানো। বীর মুক্তিযোদ্ধা উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান মুক্তিযুদ্ধকে এই বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় লড়াকু সৈনিক। অর্থাত্ তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক চিরন্তন মুক্তিযোদ্ধা। সেরকম একটি মানুষকে হারিয়ে জাতি যে কত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হলো তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নামে একটি সংগঠন আছে। সেক্টর কমান্ডার ও সহযোদ্ধা হয়েও ওরা সেক্টর কমান্ডার হামিদুল্লাহ খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের সৌজন্য বোধ করেনি। এদের এই অসৌজন্যমূলক আচরণের নিন্দা করার ভাষা আমাদের জানা নেই। এসব সেক্টর কমান্ডার ঘুণাক্ষরেও ভারতের আধিপত্যবাদী ভূমিকার নিন্দা করেন না। বরং যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাদের রাজাকার বলে কষে গাল দিতে পারলে বোধ হয় তৃপ্তি পান। যারা রাজকারি করেছে তাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ যেমন সঙ্গত, তেমনি ভারতের প্রতি তাদের মোহগ্রস্ততা অবশ্যই অসঙ্গত।
বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বললে কি মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ম্লান হয়ে যায়? তারা যদি তাদের দৃষ্টিকোণকে ভারসাম্যমূলক করতে পারতেন তাহলে জাতি বহুবিধ বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পেত এবং অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে পারত। বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল্লাহ খান চিন্তা-চেতনা ও কর্মে ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শুধু একাই নন, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে তার মতো এরকম পরিপূর্ণ অনেক মুক্তিযোদ্ধাই রয়েছেন। জাতি যদি এ ধরনের পরিপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ সম্মান দেয় তাহলেই মুক্তিযুদ্ধ অর্থবহ ও তাত্পর্যমণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা এবং দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা আজ অতীতের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল্লাহ খানকে জানাই অন্তিম সশ্রদ্ধ সালাম।
[সূত্র : আমার দেশ-০৭/০১/১২] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMahbubullah |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|