|
কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ: ইউসেপ-বাংলাদেশ
ড. মাহরুফ চৌধুরী |
|
দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক দায়। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাবে স্বাধীনতা-উত্তর কালে রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করে আসছে ইউসেপ-বাংলাদেশ নামক সংস্থাটি। এর পুরো নাম ‘আন্ডার প্রিভিলেইজ্ড চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম- বাংলাদেশ’, যার বাংলা মানে দাঁড়ায়- সুযোগবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষা কর্মসূচী- বাংলাদেশ। ঢাকার মিরপুরে ইউসেপ-বাংলাদেশ-এর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত হলেও সুযোগবঞ্চিত কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের জীবন পরিবর্তনকারী মৌলিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের গুরু দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে সংস্থাটি দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে।
সমাজের অবহেলিত শ্রমজীবী শিশুদের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক লিন্ডসে অ্যালান চেইনি। মি. চেইনি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৭০ সালে যখন তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে কর্মরত ছিলেন। সেসময় তিনি ব্রিটিশ একটা ত্রাণ সংস্থার প্রতিনিধি হয়ে ভয়াবহ টর্ণেডোতে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের জন্য ত্রাণ সাহায্য নিয়ে আসেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের বস্তিবাসী শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে ভাবতে থাকেন। তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট লাগবের জন্য তিনি কিছু একটা করার কথা তিনি ভাবতে থাকেন। ১৯৭২ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটেরই একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করে। স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়ে চেইনি মারা গেছেন ১৯৮৬ সালে। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ইউসেপ- বাংলাদেশ আজ মহীরুহ রূপে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং বঞ্চিত শিশুদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।
ইউসেপ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে আছে সব ধরনের শ্রমজীবী শিশু-কিশোর। শ্রমজীবী হলেও স্কুলে আসার কারণে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এদের জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। এসব শ্রমজীবী শিশু-কিশোরদের জীবনে এখন বড় হওয়ার অনেক স্বপ্ন। তারা বড় হয়ে নিজের একটা উন্নত জীবন পাবে। দু:সময়কে পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে যেতে চায়। তাদেরকে ভালোভাবে বাঁচতে, নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শেখাচ্ছে ইউসেপ-বাংলাদেশ। এখানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বেশীর ভাগের জীবনেই ইউসেপ নিয়ে এসেছে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। এর স্কুলগুলো পরিদর্শন না করলে এটা পাঠককে বলে বুঝানো যাবে না।
ইউসেপ কার্যক্রম পরিচালিত হয় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিদের দান এবং প্রধান পাঁচটি বৈদেশিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে। বাংলাদেশ সরকার এ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে আরো ব্যাপক উদ্যোগ নিতে পারলে আমরা একটা দক্ষ মানব শক্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবো বলে আমাদের বিশ্বাস। বর্তমানে ইউকে-এইড (পূর্বের নাম ডিফিড) হলো ইউসেপ-এর সর্বোচ্চ সাহায্য প্রদানকারী দাতা সংস্থা। আমরা আশা করব সরকার এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে জেলা সদরগুলোতে সম্প্রসারিত করতে সহায়তা দান করবেন।
প্রতিটি ইউসেপ স্কুলে শহুরে শ্রমজীবী শিশুকিশোরদেরকে জানুয়ারী ও জুলাই মাসে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সাধারণত ১১ বছর বয়সী ছেলে এবং ১০ বছর বয়সী মেয়েদেরকে এ স্কুলে ভর্তি করা হয়ে থাকে। ইউসেপ এর দু-ধরনের স্কুল রয়েছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা যেখানে তারা ৪ বছর ৬ মাসে ৮ম শ্রেণীর সমমানের সংক্ষেপিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী শেষ করে থাকে এবং তারপর ভোকেশনাল শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে দুবছরের জন্য, যা বিভিন্ন মেয়াদের কোর্সের মাধ্যমে কারিগরী স্কুলে শেখানো হয়। সাধারণ শিক্ষার স্কুলগুলোকে ইউসেপ ফিডার স্কুল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। কারিগরী শিক্ষার স্কুলগুলোকে টেকনিক্যাল স্কুল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। এসব কারিগরী স্কুলে পড়াশুনার মাধ্যমে যখন তারা দক্ষ হয়ে উঠে তখন তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় চাকুরীর ব্যবস্থাও অনেক সময় ইউসেপ স্কুল কর্তৃপক্ষ করে দেয়। ১৯৯১ সালের পর থেকে ইউসেপ তার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের দায়িত্বও নিজেদের কাধে তুলে নেয়। ২০০৩ সাল থেকে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠাতে শুরু করে ইউসেপ। ২০০৫ সাল থেকে ইউসেপ তার শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করে।
এবছর এসএসসি ভোকেশানাল পরীক্ষায় ইউসেপ শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করার বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে। ইউসেপ- বাংলাদেশ এর তিনটি কারিগরী বিদ্যালয় থেকে ১৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের আওতায় জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে ইউসেপ- বাংলাদেশ পরিচালিত তিনটি কারিগরী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯ জন। ১০ জন মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুল থেকে, ৫ জন খুলনা টেকনিক্যাল স্কুল থেকে এবং ৪ জন কালুরঘাট টেকনিক্যাল স্কুল থেকে। কারিগরী শিক্ষাবোর্ডে এ তিনটি স্কুল যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। উল্লেখ্য যে, এ বছর কারিগরী শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ৮২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ অর্জনের হার মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রমজীবি এসব ছেলে-মেয়েরা হয়তো জীবনে শিক্ষার আলো থেকেই বঞ্চিত থেকে যেতো যদি না ইউসেপ- বাংলাদেশ তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ করে দিত।
শ্রমজীবী এসব শিশুদের গড়ে তুলে ইউসেপ-বাংলাদেশ শুধু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়েই এর দায়িত্ব শেষ করছে না, প্রতিষ্ঠানটি এসব সুবিধাবঞ্চিত শ্রমজীবী পথ-শিশু-কিশোরদেরকে তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে ২৫ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ধার দিয়ে থাকে। এধারের টাকা ইউসেপ-বাংলাদেশ এর তত্ত্বাবধানে তারা নিজ নিজ ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্যোগ নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখছে। আর এসব শিক্ষাথীর জন্য রয়েছে একটা সমবায় সমিতি। সরকারী সাহায্য পেলে এধরনের কার্যক্রমকে সারাদেশ ব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব, সম্ভব দেশ থেকে বেকারত্ব দূর করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ইউসেপ-বাংলাদেশের কার্যক্রম সম্পর্কে জানার। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ টিমের সাথে সংস্থাটির সাধারণ শিক্ষা কর্মসূচীর শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন বিষয়ে গবেষণার কাজে অংশগ্রহণ করি। স্বল্প সময়ের এ কাজ করার সুবাদে রাজশাহী ও খুলনা শহরের দুটো স্কুল পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল আমার। ১১ বছরের ব্যবধানে ২০০৯ আগস্ট মাসে আবার ঢাকা শহরে অবস্থিত কয়েকটি ইউসেপ স্কুল পরিদর্শনের সুযোগ আমার হয়েছে একটি শিক্ষা উন্নয়ন প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদে। মাঠ পর্যায়ের এ পরিদর্শনের সময় আমি খুবই ব্যথিত হয়েছি একটি ইউসেপ স্কুলের শোচনীয় অবস্থা দেখে। পূর্ব-পুরুষের দান করা জমি দখল করে নিতে গিয়ে উত্তরাধিকারীরা প্রচন্ড হীন মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রমজীবী শিশু-কিশোরেরা। আমরা আশা করব অচিরেই স্থানীয় সরকার হিসেবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা এবং রাষ্ট্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা এ বিষয়টির প্রতি নজর দিবেন। এ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের গুণগতমান এবং নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ইউসেপ-বাংলাদেশ এদেশে গুণগত মৌলিক শিক্ষা প্রদানের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর অবস্থানকে সুদৃঢ় করে তুলেছে। আমি প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
লেখক: গবেষক, দ্য ওপেন ইউনির্ভাসিটি, যুক্তরাজ্য।
Email: mahruf@ymail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMahrufChowdhury |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| ড. মাহরুফ চৌধুরী লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার বড়খেরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন এবং বর্তমানে সেখানকার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কর্মরত। ঢাকায় অবস্থানকালে দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, শিক্ষা বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন শিক্ষাবার্তা প্রভৃতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি ইন্টারন্যাশাল সোসাইটি ম্যানচেস্টার, ইন্টার ফেইথ সোসাইটি, কালচারাল থিউরী স্টাডি গ্রুপ, সোসিও-কালচারাল থিউরী ইন্টারেস্ট গ্রুপ প্রভৃতির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি পেশাভিত্তিক সংগঠন- ব্রিটিশ এসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশাল এন্ড কম্পারেটিভ এডুকেশন, কম্পারেটিভ এডুকেশন সোসাইটি অব এশিয়া- সদস্য। তিনি ভিজিটিং স্কলার হিসেবে হেলসিংকী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ এবং ইনস্টিটিউট অব ডেভল্পমেন্ট স্টাডিজ-এর যৌথ আয়োজনে গেস্ট লেকচার প্রদান করেন। তিনি কিউবা, ফিনন্যান্ড, সুইজারন্যান্ড, স্টোনিয়া, কাতার, মালয়োশিয়া প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। |
|