একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম
ড. মো. সাজেদুর রহমান চৌধুরী
রেডিও ও টেলিভিশনের কিছু কিছু সংবাদ পরিবেশক/পরিবেশিকা বা উপস্থাপক/উপস্থাপিকা এমন একটি বিশ্রী উচ্চারণে বাংলায় কথা বলেন যে মনে হয় তাদের বাবা - মা বা পূর্বপুরুষেরা ইংরেজ বা তারা যে কোনভাবেই হোক না কেন হাইব্রিড বা সংকর জাতের। এই সংকর জাতের তথাকথিত বাংলাভাষী বা বাঙ্গালীদের এখনই মুখ চেপে না ধরলে অচিরেই আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা বদলে গিয়ে সংকর জাতের ভাষায় পরিণত হবে। আমি বলছি না তাদের গলা চেপে বা টিপে মেরে ফেলতে, কিন্তু তাদের মতো তথাকথিত বাঙ্গালীদের গণমাধ্যমে বা যে কোনো প্রচার মাধ্যমে স্থান করে দেয়া তো বন্ধ করতে পারি আমরা। রেডিও - টেলিভিশন সহ সব গণমাধ্যম/প্রচার মাধ্যমের ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, এসব ভাষা বিকৃতকারীদের আপনাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করে অন্তত: ভাষার মাসে রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।
পৃথিবীর কোনো জাতিই ভাষার জন্য জীবন দান করেনি, বাংলা ভাষার জন্য কিন্তু আমরা জীবন দিয়েছি। জীবন দিয়ে অর্জিত মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আমরা লাভ করেছি যার প্রেক্ষিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারী আমরা পৃথিবীব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে পারছি আজ। বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্থান করে দিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে আহ্বান জানিয়েছেন শুনে ভালো লাগলেও খুব বেশি আনন্দবোধ করতে পারছি না বর্তমানে দেশব্যাপী ভাষা বিকৃতকারীদের দৌরাত্বে আমাদের মাতৃভাষার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তার কারণে। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক মতভেদ নেই; বিরোধী দলীয় মাননীয় নেত্রীও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকেও তাঁর দলের নেতৃবৃন্দ ভাষা সৈনিক হিসেবে দাবি করে আসছেন যার প্রমাণ হিসেবে ইউটিউবে একটি ভিডিও চিত্র দেখেছিলাম যেখানে একটি টেলিভিশন চ্যানেল এ ব্যাপারে তাঁর সাক্ষাতকার প্রদর্শন করে।
বাস্তবে যদি অধ্যাপক গোলাম আযম ভাষা সৈনিক হয়ে থাকেন তবে তাঁকেও তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া উচিত। শুধুমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেত্রী ও অন্যান্য নেতা - নেত্রীদের প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষার প্রকৃত রূপ ধরে রাখা বর্তমানে কোনোভাবেই আর সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের নিজের অবস্থান ও সাধ্য অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে বাংলা ব্যবহার করা ও অন্যকে বিকৃত করে বাংলা উচ্চারণে নিরুৎসাহিত ও প্রতিহত করা। এর জন্য প্রথমে প্রয়োজন আমাদের নিজেদের সন্তানদের এ ব্যাপারে সচেতন করা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা কোনো সমস্যা এক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে না; যার কারণে এটি সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো আমাদের সচেতনতা ও উদাসীনতা। বিদেশে বা দেশের মধ্যেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে প্রয়োজন ভালোভাবে ইংরেজি জানা; তাই বিশ্বব্যাপী কর্ম-বাজারে টিকে থাকতে আমাদের সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কিন্তু তাই বলে তারা মায়ের ভাষা চর্চা করবে না বা বিকৃতভাবে ও অবজ্ঞার সাথে তা উচ্চারণ করবে- এটি সহ্য করাও মারাত্মক অপরাধ বলে মনে করি আমি।
আমরা কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার কথা বলি, আবার ভাষার মাসে বলি ভাষা আন্দোলনের বা একুশের চেতনার কথা। কিন্তু এসব চেতনা শুধু বক্তৃতা আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই ব্যবহার করি। একুশে ফেব্রুয়ারীর আগে-পড়ে সপ্তাহজুড়ে আমরা বিশাল বক্তৃতা ও আলোচনার অনুষ্ঠানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু এক সপ্তাহ পরেই আমাদের আর একুশের চেতনা থাকে না। তখন আমরা বাইশ-তেইশ-চব্বিশ বা অন্য কোনো বিশেষ দিকে সচেতন হওয়ায় অসচেতন বা সংজ্ঞাহীন হয়ে যাই আমাদের একুশে বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয় নিয়ে। কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই আমরা হঠাৎ করে সচেতন হওয়ার ভান করি মাঝে-মাঝে। এটিই আমাদের কাল হয়ে দাড়াচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে আমাদের সবার একসাথে একই লক্ষ্যে কাজ যেদিন আমরা করতে পারবো সেদিনই বলা যাবে আমাদের একুশে বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে এবং আমরা ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধে যারা বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে আত্মত্যাগ করেছেন আমাদের জন্য তাঁদের আত্মাকে অন্তত: এই শান্তনা দিতে পারবো যে জাতি হিসেবে আমরা বেইমান নই। তা না হলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আর আমরা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে কাউকে দেখবো না।
আমাদের সাহিত্য চর্চায় ও প্রকাশনায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে- একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন কতজন? আমি জানি, এর উত্তর কেউ দিতে পারবেন না। আমাদের দু’একজন লেখক, যাঁরা এখনো বাংলা ভাষা ও দেশকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করছেন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে, মজাদার ভিন্ন সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ ও রম্য-রচনার বইয়ের ভিড়ে তাঁদের কষ্টার্জিত লেখাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এবারের বইমেলায় ড. সৈয়দ রোকন উদ্দিনের লেখা ও একুশে বাংলা প্রকাশনা কর্তৃক প্রকাশিত ‘কষ্টদহন কষ্টকহন’ বইটি পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এদেশকে ভালোবাসার মতো বা এদেশের জন্য জীবনদান করার মতো মানুষ এখনও আছে। রোকন উদ্দিন সাহেব বড় কবি বা নামকরা সাহিত্যিক নন, তাই তাঁর বইটি স্বাভাবিকভাবেই উপেক্ষিত হবে- এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ভাষার মাসে আমি সব বাংলাভাষাপ্রেমিকদের বিনীত অনুরোধ করছি, ড. সৈয়দ রোকন উদ্দিন সাহেবের বইটি নিজে পড়ুন, অন্যকে পড়তে বলুন এবং সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করুন নিজেদের সন্তানদের পড়াতে। এ ধরণের লেখকদের জাতীয়ভাবে উৎসাহিত করতেও আহবান জানাচ্ছি আমাদের সরকারকে, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ রোকন উদ্দিনদের হারিয়ে ফেলা যাবে না, এ জাতি এমন দেশপ্রেমিক সন্তান প্রতিদিন জন্ম দেয় না।
Yes, i read this book and i have read most of his book which are really good for the social development and social change. After reading this book casta dahan casta kohon my respect to dr. Rukan become in extreme level and I want to salute him as he is fighting to social change which is very much crucial in this moment. I really love him for his brilliant write up. I have interest but I am not capable to write this way. through this mail i request to Dr.Rukan please complete your new book as soon as possible“Bangladesh- Needs future leader as Mahathir mohammad” so that citizens will think about it.
80207
২
গুলশান, ঢাকা থেকে মো: এনামুল হক লিখেছেন,
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২; রাত ১০:১৪
ড. চৌধুরী,
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার জন্য একটি ভাল বই পড়তে পেরেছি অনেকদিন পর। আপনার মতো একজন প্রকৃত মেধাবী লোকই আর একজন মেধাবী লোকের মর্যাদা দিতে পারে। নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম আর মেধা-মনন চর্চ্চা সবক্ষেত্রেই আমরা এখন বিপরীত দিকে অিত দ্রুত ধাবিত হচ্ছি। তাই আমাদের লাগামটা ধরার দায়িত্ব আপনি বা ড. রোকন উদ্দিন সাহেবদের মতো লোকদের এখনই নিতে হবে। কারণ, আপনাদের মতো ভালো মানুষ বা দেশপ্রেমিকদের সংখ্যা দিন-দিন কমে যাচ্ছে। এ ঘুনেধরা সমাজের এখন পরিবর্তন ঘটানো অত্যাবশ্যক। জাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রামের ও আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আমি শুধু একটি কথা বলতে চাই আপনার কথার সাথে সুর মিলিয়ে, আমরা এখনো শেষ হয়ে যাইনি; তবে অনেকটাই অসচেতন বা নিস্তেজ হয়ে গেছি। আপনাদের মতো মেধাবী, সচেতন, দেশপ্রেমিক ও প্রজ্ঞাবান নাগরিকেরাই কেবল পারেন এই নিস্তেজ জাতিকে তাদের গৌরবময় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করায় আবারো সচেতন হতে। লিখে যান, আপনারা লিখা বন্ধ করবেন না বা হতাশ হবেন না। আমি নিশ্চিত, এ জাতির ঘুম আপনারা অবশ্যই ভাঙ্গাতে পারবেন।
অনেক অনেক শুভকামনা ও ধন্যবাদ আপনাকে ও ড. রোকনকে।
80230
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: