শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ০১:৩৫ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বিশ্বাসের পাঠশালাঃ আমার সাক্ষ্য

ডাঃ মোস্তফা জাহাঙ্গীর

ঢাকা মেডিকেল কলেজে যখন ভর্তি হই, তখন শৈশব আর কৈশোরের সীমানা পেরিয়ে যৌবনের দরজায় কড়া নাড়ছে আমার বয়স। দিকভ্রান্ত হবার সে এক শ্রেষ্ঠ সময়।

আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আলোআঁধারির জগতে অবলীলায় অবগাহন করতে লাগলো। কিছুটা অবাক হলাম। তবে ভেতরে আমার অস্থিরতা বেড়েই চললো। আল্লাহর উপর বিশ্বাস ছিলো আগে থেকেই। তবে সে বিশ্বাস ছিলো বড়ো নড়বড়ে। সে দুর্বল বিশ্বাস থেকেই আমি আল্লাহ্‌র কাছে মিনতি করি। আমাকে তুমি বাচাও আল্লাহ্‌। সরল পথ দেখাও।

ফাস্ট ইয়ারের শেষ দিকেই সময় পালটে যেতে লাগলো হঠাৎ করেই। কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসি যারা বলেন 'আল্লাহ্‌ সর্ব শক্তিমান। আমরা তারই ইবাদত করি'। জন্মের পরেই এ আওয়াজ আমার কর্ণ কুহরে আমার প্রয়াত আব্বা পোঁছে দিয়েছিলেন। কাজেই এ বাক্য আমি এর আগে শুনেছি। এর আগে পড়েছি। বইয়ের পাতায় দেখেছি। কিন্তু সে শুনা আর পড়ায় আমার শরীরে কোন শিহরণ খেলে যায়নি। যুক্তি আর বিশ্বাসের মাঝে বড় এক ফাঁক থেকে যায়। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে মাঝেমধ্যেই হোঁচট খেয়ে যাই।

তখন মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্র শরীফ ভাই বললেন 'তুমি ডঃ মরিস বুকাইলির বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান বইটি পড়েছ?' আমি বললাম, 'না'। তিনি আমার হাতে সাংবাদিক আখতার উল আলমের (উনি ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ উনাকে বেহেস্ত নসিব করুন) বাংলায় অনুবাদ করা ডঃ মরিস বুকাইলির 'বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান ' বইটি দিলেন। আমি ইতস্তত মন নিয়ে পড়তে লাগলাম। একবার পড়লাম। দুবার পড়লাম এবং বারবার পড়তে লাগলাম।

যুক্তি আর বিশ্বাসের ফাঁক গুলো খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ হতে লাগলো। আমি কোরানকে বুঝার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলাম। মসজিদ লাইব্রেরি থেকে কিছু বঙ্গানুবাদ বা ব্যাখ্যা পড়ার চেষ্টা করলাম। আবার হোঁচট খেলাম। অনুবাদের দীনতা আমাকে কিছু কষ্ট দিলো।এর পরেও পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়তে গিয়ে দেখি কিছু কেচ্ছা কাহিনী বারবার কোরানে বর্ণনা করা হচ্ছে। মাথা মুণ্ড কিছুই বুঝতে পারলামনা। এ সবের মানে কি। মুসলমানরা বলে কোরআন জীবন বিধান। আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা।

২য় বর্ষের ছাত্র মোর্শেদ ভাই 'Towards Understanding Quran' এর বাংলা অনুবাদ পড়তে দিলেন। আমি পড়লাম। পড়তে গিয়ে আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় একটু ঝাঁকি খেয়ে উঠলো। আমি বললাম, 'আমাকে এ লেখকের আরো কিছু বই দিনতো'।

তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন 'তাফহিমুল কোরান'। মাওলানা আবুল আলা মাওদুদীর তাফহিমুল কোরান পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি কোরান কীভাবে পড়তে হবে। কীভাবে বুঝতে হবে।আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি আমার মনে জেগে উঠা অনেক প্রশ্নের জবাব তিনি তাফহিমুল কোরানের ভূমিকায় দিয়ে রেখেছেন। পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনুদিত মারেফুল কোরান। কিছু একটা যেন আমি ঠিক ধারণ করতে পারছিনা।

আমার যাত্রা হলো শুরু।

কিছুটা পথ আমি তখন চলে এসেছি। তবে এ যাত্রা অনেক দীর্ঘ। ইসলামের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায় তাই। 'নারীদের ইসলামে মর্যাদা কী? কেনো ইসলাম দাস প্রথাকে সরাসরি বিলোপ করলোনা? ছেলে মেয়ে কেনো সমান ভাগ পাবেনা পিতার সম্পত্তিতে?' জাতীয় প্রশ্ন আমার সামনে। ফেরদৌস আহমেদ ভুইয়া (তিনি তখন ৩য় বর্ষের ছাত্র) আমার হাতে তুলে দিলেন 'ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম-মোহাম্মদ কুতুব'। চমৎকার একটি বই লিখেছেন মিশরে জন্মগ্রহণকারী এ মুবাল্লেগ। অবিশ্বাস্য ভাষা শৈলী আর চমৎকার সব যুক্তি প্রমাণ।

মোহাম্মদ কুতুবের বই পড়তে গিয়ে আমি সাইয়েদ কুতুবের নাম শুনি। নিজেই বইয়ের দোকান থেকে কিনে আনি 'ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা' বইটি। এ বই পড়তে গিয়ে আমার শ্রদ্ধা আর ভালবাসার সবটুকুই উজাড় করে দিই ইসলামের ইতিহাসের এ ক্ষণজন্মা উজ্জ্বল পুরুষকে। আমি পড়ি জয়নাব আল গাজালির বই 'কারাগারের রাত দিন'। একসময় পড়তে সক্ষম হই সাইয়েদ কুতুবের ইংরেজি 'Milestones' বইটি। তারপর পড়ি ইউসুফ আল কারজাভির 'ইসলামে হারাম হারামের বিধান'। বছর দুয়েকের ভেতরে বাংলায় প্রকাশিত হয় 'তাফসীর ফি জিলালিল কোরান'। তাফহিমুল কোরানের সাথে যখন এ তাফসীর মিলিয়ে পড়ি তখন কোরানের আয়াত আর তার ব্যাখ্যা জীবন্ত হয়ে ভেসে আসে আমার চোখের সামনে।

ঢাকা মেডিকেলে আমার জীবনের ৭ বছর (৫ বছর কোর্স; ১ বছর সেশনজট; ১ বছর ইন্টার্র্নি) জীবন ও জগত সম্পর্কে আমার ধারনা বদলে দিয়েছে সারা জীবনের জন্য। বিশ্বাসের পাঠশালায় আমি ছিলাম এক অমনোযোগী ছাত্র। কিছু আলোকিত মানুষের সংস্পর্শে এসে দেখি ইসলামের এক অনিন্দ্যসুন্দর আলোকিত জগত। সে আলোর কিছুটা আভায় আছে আমার সংসার আর পরিবার আজ। যৌবনের শুরুতে যে জীবনটা ছিল বন্ধন আর বিশ্বাসকে ছিঁড়ে ফেলে হারিয়ে যাবার সময় সে সময় আমাকে হারিয়ে যেতে দেননি কিছু আলোকিত সাদা মনের মানুষ।

আলোর পথের সে যাত্রীদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

যদি বিশ্বাস আর যুক্তির দোলাচালে কেউ এখনো দুলতে থাকেন, তাদেরকে আমার বিশ্বাসের পাঠশালায় আমন্ত্রণ। আলোকিত মানুষের ছোঁয়া যদি নাও পান, এ পাঠশালার বইগুলো পড়তে পারেন নিশ্চয়। পড়ুন একবার। আরেকবার এবং আরেকবার। দেখবেন আপনিও একদিন সাক্ষ্য দেবেন। বলবেন 'আলোর পথের যাত্রীরা, তোমাদের সালাম'।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMostafaJahangir
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
কানাডা থেকে মোহাম্মদ আবদুল খালেক লিখেছেন, ৩০ নভেম্বর ২০১১; রাত ০১:৩০
বিশ্বাসের আলোকিত পাঠশালার বাতি জ্বলে উঠুক আঁধারের কোনায় কোনায়। লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস, বিশ্বাসের সেই বাতিতে বিলীন হোক।
হেরা গুহার হেদায়েতের আপনার এই বার্তা পৌছে যাক সবার অন্তরে।
আপনাকে অন্তরের শুভেচ্ছা।
72523
ঢাকা থেকে সাকী লিখেছেন, ০১ ডিসেম্বর ২০১১; দুপুর ০১:১১
আপনার পাঠ আরো শণিত হোক এ দোয়া করছি। সাথে আমি আরো কিছু লেখকের নাম বলছি এদের বই পাঠ না করলেই নয়।
১। মুহাম্মাদ আসাদ (মাক্কার পথ)
২। আল্লামা ইকবাল
৩। আবুল হাসান আলী নদবী (রঃ)
৪। হযরত আশরাফ আলী থানভী (রঃ)
72654
জেদ্দা,সৌদী-আরব থেকে আবু ওবায়েদ লিখেছেন, ০৯ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ০২:৩৫
জনাব ডাঃ মোস্তফা জাহাঙ্গীর সাহেব আপনাকে ধন্যবাদ ।অনেক সুন্দর লেখা হয়েছে ।
73333
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy