আজকের রাজনীতিঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্ম ও সংবিধান
ড. নাজিবুল ইসলাম
সংবিধান নিয়ে দেশে এখন তুলকালাম কাণ্ড-কারখানা ঘটে চলেছে। তার একটা বিষয় হলো, বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ইসলামী চেতনা বাদ দিয়ে তার বদলে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।’ রাষ্ট্রের মূলনীতি ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’ কথাটি সরাসরি বাদ দেয়া হয়েছে। তার জায়গায় বসানো হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এ চার নীতি এবং এই নীতি থেকে উদ্ভূত অন্য সব নীতিকেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি করা হয়েছে। এই চারটি আদর্শকেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।’ এ কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মহাজোট নেতারা পরস্পরবিরোধী কথা-বার্তা বলে নানান ধুম্রজাল সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সেটা হলো, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে প্রতিষ্ঠিত করা এবং তাকে সুস্পষ্টরূপে ‘ইসলামি চেতনা’র বিপক্ষে স্থাপন করা। আর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলতে তারা মূলত ধর্মনিরপেক্ষতাকেই বোঝাতে চাচ্ছেন। আরো পরিষ্কার করে বললে, তাদের কাছে ধর্ম, বিশেষত ইসলাম, ইসলামী মূল্যবোধ, ইসলামী সংস্কৃতি, ইসলামী সংগঠন ও ব্যক্তিত্বকে উচ্ছেদ ও বর্জন করাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রধান ও প্রথম কাজ। এবং এই চেতনা কোনো সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭১ সালে কোনো ব্যক্তি যদি রাজাকার-আলবদর হয়েও থাকে, কিন্তু এখন যদি সে আওয়ামী লীগ সমর্থক হয় তাহলে তার সাথে দহরম-মহরমে অসুবিধা নেই।
যেমন নূরুল ইসলাম, ফয়জুল হক প্রমুখ যারা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন তাদেরকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে বা মন্ত্রী বানাতে আওয়ামী লীগের অসুবিধা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির দাবি, আওয়ামী লীগেও যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার-আলবদর ও স্বাধীনতাবিরোধী রয়েছে। কিন্তু তাদের চিহ্নিত বা বহিষ্কার করার কোনো উদ্যোগ আওয়ামী লীগের নেই। আবার ১৯৭১ সালে যদি কেউ সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েও থাকেন কিন্তু পরে আওয়ামী লীগের বিরোধী অবস্থান নেন, তাহলে তিনিও স্বাধীনতাবিরোধী। যেমন মেজর আব্দুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমাণ্ডার হওয়া সত্ত্বেও স্রেফ তার আওয়ামী-ভারত বিরোধিতার কারণে তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেক্টর কমাণ্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছে। আর কেউ যদি হয় আওয়ামী লীগবিরোধী এবং ইসলামপন্থী, তাহলে তো কথাই নেই। রাজনীতির বাইরের মানুষ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদের কথাই ধরা যাক। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, তবু স্রেফ ইসলামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে গালাগাল করা হয়। কারো জন্ম যদি হয় ১৯৭১ সালের পরেও, তবু রক্ষা নেই। যেমন ইসলামী ছাত্রশিবির বা তার নেতা-কর্মীদের জন্ম ১৯৭১ সালের পরে হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে চিহ্নিত করে আওয়ামীপন্থীরা। ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর রফিকুল ইসলাম খান ১৯৭১ সালে শিশু ছিলেন। সে সময় তার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়া তো দূরের কথা যুদ্ধ কী তা বুঝতে পারারই কথা নয়। তা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ থেকেই বোঝা যায় তথাকথিত স্বঘোষিত স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের এসব গবেষণা, তথ্য এবং মোটিভ কী।
একথা অস্বীকার করা যাবে না, করা উচিতও নয় যে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তার একটা পরম্পরা আছে। সেই পরম্পরাকে স্মরণ করলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আজকের রাজনীতি অনুধাবন করা সহজতর হবে।
আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের পেট থেকে। তখন তার নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের কিছু নেতা-কর্মী মূল দল থেকে বেরিয়ে এসে এই দল গঠন করেছিলেন। কারা ছিলেন তারা? যারা মুসলিম লীগের অর্ন্তদলীয় দ্বন্দ্বে পর্যুদস্ত হয়ে নেতৃত্ব ও ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। শুরুতে মুসলিম লীগের আদর্শ-লক্ষ্য থেকে তাদের আদর্শ-লক্ষ্য আলাদা কিছু ছিল না। এই দলের গঠনতন্ত্রের ১১টি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ১০ম ধারাটি ছিল: ‘To disseminate knowledge of Islam and its high moral and religious principles among people.' (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র, গতিধারা, ঢাকা; পৃষ্ঠা ৪৫)। সেটা প্রকৃতপক্ষে ছিল দ্বিতীয় মুসলিম লীগ। লোকে সেটাই মনে করত। মানুষের এই ধারণা দূর করার জন্যে দলটির গঠনতন্ত্রে জোর দিয়ে বলা হয়: ‘Awami Muslim League is definitely a separate organization.’ মূলত ক্ষমতায় যেতে না পারার ক্ষোভ এবং ক্ষমতায় যাওয়ার তুমুল উন্মাদনা থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। তাই ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি-বাড়াবাড়ির স্বভাব আওয়ামী লীগের জন্মগত দোষ।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী এবং গণতন্ত্রী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে যে ২১ দফা কর্মসূচী দিয়েছিল তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা বা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উল্লেখ পর্যন্ত ছিল না। সমাজতন্ত্রের কথা তো দূর অস্ত। বরং শুরুতেই লেখা ছিল- ‘নীতি: কোরআন ও সুন্নার মৌলিক নীতির খেলাফ কোন আইন প্রণয়ন করা হইবে না এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নাগরিকগণের জীবন ধারণের ব্যবস্থা করা হইবে। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র, গতিধারা, ঢাকা; পৃষ্ঠা ৮৩)। ১৯৫৫ সালের ২৩শে অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ গঠিত হয় এবং ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত প্রচারপত্রে আওয়ামী লীগ ‘সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ দূর করিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্ত নির্বাচন’ দাবি করে। কিন্তু তখনো একটি তত্ত্ব হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’কে তারা গ্রহণ করেনি। ১৯৬৯ সালে আইউব খানের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করার জন্য ৮টি রাজনৈতিক দল নিয়ে যে ‘ডেমোক্রেটিক একশন কমিটি (ডাক)’ গঠন করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ ছাড়াও তার অন্যতম প্রধান শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ। এইসব ইসলামপন্থী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সাথে ঐক্য স্থাপনে আওয়ামী লীগের কোনো দ্বিধা বা অসুবিধা হয়নি, কারণ তখনো আওয়ামী লীগ পাকিস্তান বা পাকিস্তানের আদর্শিক ভিত্তি মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।
১৯৬৯ সালের ১লা আগস্ট আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল তাতে রাষ্ট্রীয় আদর্শের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। ইসলাম, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বা সমাজতন্ত্র কোনো কিছুরই প্রসঙ্গ তাতে ছিল না। অর্থনৈতিক কর্মসূচী অর্থাৎ ৬ দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব পাকিস্তান গড়ার অঙ্গীকারই ছিল মূখ্য। সে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা পাকিস্তানের জন্যে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। এই সংবিধানের Preamble শুরু হয় ‘In the name of Allah, the Beneficial, Merciful’ অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে। এই প্রস্তাবিত সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে বলা হয়: ‘Further resolving that guarantees shall be embodied in this Constitution to enable the people of Pakistan, Muslim, Hindu, Buddhist, Christian, Persian and of other religions to profess and practice their religions and to enjoy all rights, privileges and protection due to them as citizen of Pakistan, and in pursuance of this object to enable the Muslims of Pakistan, individually and collectively, to order their lives in accordance with the teachings of Islam as set in the Holy Quran and the Sunnah.’ (আওয়ামী লীগ সংবিধান কমিটি কর্তৃক ৬-দফার ভিত্তিতে প্রণীত পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্র (অংশ); বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৭৯৩)। অর্থাৎ প্রস্তাবিত এই সংবিধানে সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয় কিন্তু আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বা সমাজতন্ত্রের কোনো উল্লেখ মাত্র ছিল না। বরং মুসলমানরা যাতে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারে তার ব্যবস্থার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। কে কখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এ নিয়ে বিতর্ক আছে। শেখ মুজিবুর রহমান বা জিয়াউর রহমান যে-ই তা করে থাকুন, তারা কেউই তাদের সে ঘোষণায় বলেননি স্বাধীন বাংলাদেশের মূলনীতি কী হবে। আওয়ামী লীগ কর্তৃক দাবিকৃত শেখ মুজিবের ঘোষণায় ‘জয় বাংলা’ বলে শেষ করার আগে বলা হয়েছে- ‘May Allah bless you.’ (দেখুন আওয়ামী লীগের ওয়েব সাইট)। এই কথাটাই অন্যত্র বলা হয়েছে এইভাবে- May Allah aid us in our fight for freedom. (The History of the Liberation Movement in Bangladesh, Author J. S. Gupta). তার মানে স্বাধীনতার ঘোষণায় শেখ মুজিব ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ স্থাপন করেছিলেন। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের যে ভাষণ সংবিধানে সংযোজন করা হচ্ছে তাতেও তিনি ‘ইনশাল্লাহ’ বলে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ স্থাপন করেছিলেন।
পাকিস্তান গণপরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্যরা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতায় সমবেত হয়ে ’স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করেন। ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে পাঠ করা হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত আইন পরিষদ ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর বলে ঘোষণা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই ঘোষণাপত্র প্রবাসী সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গৃহীত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হওয়া পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল। এই ঘোষণাপত্রে ‘পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার’ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। (দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪-৬)। ১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রচার দপ্তর একটি সার্কুলার জারী করে। সেটি শুরু হয় ‘আল্লাহু আকবর’ দিয়ে, আর ‘জয় বাংলা’ বলে শেষ করার আগে লেখা হয়: ‘স্মরণ করুন: আল্লাহ প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন ‘অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই সুখকর।’ বিশ্বাস করুন: ‘আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী।’ ১৯৭১ সালের ২০শে মে হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এইচএম কামারুজ্জামান বলেন: ‘Our struggle is not opposed to Islam. The value and teachings of Islam shall be preserved.’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র, গতিধারা, ঢাকা; পৃষ্ঠা ৪৫)। ১৯৭১ সালের ২১শে জুলাই আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমপি ও এমএনএ-রা আবার সভায় মিলিত হন।
সেখানে তারা যেসব সিদ্ধান্ত নেন তার মধ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে কোনো কথা ছিল না। ১৯৭১ সালের ৭ই ডিসেম্বর, ভারত কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ার পরদিন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণে প্রথম বাংলাদেশের মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটি উচ্চারণ করেন। পরদিন ৮ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও শব্দ দুটি উচ্চারণ করেন। ১৩ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শাসনব্যবস্থা ও পুনর্গঠন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে সমাজতান্ত্রিক ধরনের অর্থনীতির কথা বলা হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়নি। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪৫৮)।
ওপরের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও তথ্যাবলী এটাই প্রমাণ করে যে, মুসলিম লীগের ধারাবাহিকতায় গঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে কারণে তার মূলনীতিও ছিল মুসলিম লীগের মতোই মুসলিম জাতীয়তাবাদী আদর্শ। ১৯৫৫ সালের পর মাঝে-মধ্যে ‘ধর্মনির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার’-এর কথা বলা হলেও দলীয় মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’-এর কথা আওয়ামী লীগ কখনো বলেনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী মেনিফেস্টো, ১৯৭১ সালের প্রস্তাবিত সংবিধান এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও এসব কথা ছিল না। বরং সবখানে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের’ কথাই ছিল। দেশের মানুষও আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেই, তার সাহায্য কামনা করেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে। দেশের মানুষ নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে, আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে বিজয়ের জন্যে। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র কখনো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ছিল না, হতে পারে না। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় হঠাৎ করেই এর আমদানী ঘটে। এটা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, ভারত এবং সোভিয়েত ইউনয়নের চাপেই এই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্যরা ১৯৭২ সালের এই সংবিধান প্রণয়ন করেন। তাদের কোনোও ম্যাণ্ডেট ছিল না রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’ আমদানী করার। সুতরাং অধিকাংশ মানুষের পরামর্শ ও আবেগের তোয়াক্কা না করে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক সংসদীয় কমিটি যে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে চালিয়ে দিতে চাইছে তা ঐতিহাসিক সত্যের বিপরীত।
১৯৭২ সালের এই সংবিধানকে অনেক বিশেষজ্ঞই তখন ‘clone or copy of Indian constitution’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের এই হঠাৎ উল্লম্ফন থেকে একটা সন্দেহ জাগা অস্বাভাবিক নয় যে, আওয়ামী লীগ ১৯৫৫ সালে তার মূল নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ঝেড়ে ফেলার সময় থেকেই ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’-কে মনে মনে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সে কথা বললে বা ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে জনগণের সমর্থন পাওয়া যাবে না, বা খোদ আওয়ামী লীগেরই বহু নেতা-কর্মী তা মেনে নেবেন না, এই ভয়ে তখন তা প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৭১ সালের শেষ পর্যায়ে এসে যখন এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় অবধারিত এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রাপ্তি নিশ্চিত, তখন আওয়ামী লীগ স্বর্মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। তারা মনে করেছে এখন তারা যা-ইচ্ছা-তাই করতে পারে, আর মুখোশ পরে থাকার প্রয়োজন নেই। তাই বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ ও ‘সমাজতন্ত্র’কে এতটা মর্যাদার সঙ্গে সামনে আনা হলো। বর্তমানেও ঠিক একই দৃষ্টিভঙি থেকেই আওয়ামী লীগ আবারো এই পথে অগ্রসর হচ্ছে।
১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেই আওয়ামী লীগ ক্ষান্ত হয়নি। রাষ্ট্রীয় ও সরকারীভাবে ধর্মহীনতাকে উৎসাহিত করেছিল। এর ফলে ধর্ম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্ম পালনকারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী শুধু যে নিগৃহীত হতে শুরু করে তা-ই নয়, এদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছিল। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ধর্মের ভিত্তিতে দল গঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী বা নেজামে ইসলামী স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করে থাকলে বড় জোর ঐ দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা যেত। ব্যক্তিগতভাবে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল তাদের রাজনীতি করার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারী করা যেত। তা না করে ধর্মকে, বিশেষত ইসলামকে, রাষ্ট্র ও জনগণের শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো, প্রতিপক্ষ বানানো হলো স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির। আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার ও পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা যে ভারতের ডিকটেশন বা প্রেসক্রিপশনে এই সংবিধান প্রণীত হয়েছিল সেই ভারতেও ধর্মকে প্রতিপক্ষ বানানো হয়নি কখনো। তাতে তাদের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়নি। ধর্মের ভিত্তিতে দল গঠনকে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ শুধু যে গণতন্ত্রকেই খণ্ডিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তা-ই নয়, এর মাধ্যমে এই দলটি নিজেই নিজেকে ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ ১৯৭১ সালের শেষ পর্যন্তও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মানুষের এই ধারণা ছিল না।
পরবর্তী কালে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে এতটাই আঁকড়ে ধরে যে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম এবং সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ সন্নিবেশ করার প্রবল বিরোধিতা করে। কিন্তু গত শতাব্দীর নব্বই দশকে এসে আওয়ামী লীগ অনুধাবন করে, অর্থ, পেশীশক্তি এবং বিদেশী মুরুব্বীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও স্রেফ ধর্মবিরোধী ইমেজের কারণে সে ভোটের রাজনীতিতে বারবার মার খাচ্ছে। তখন অতীতের জন্য জনগণের কাছে মাফ চাওয়া, মাথায় স্কার্ফ পরা, নেতা-কর্মীদের মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া এবং ‘নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’ স্লোগান আসতে থাকে। এই করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ কোনো রকমে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় গিয়ে তখন আবার স্বমূর্তি ধারণ করে। ধর্মীয় সংগঠন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেয়। ২০০১ সালে তার আবার পতন হয়। সুতরাং বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মুখে নতুন করে সেই পুরনো কথা শোনা গেলো- ‘কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না।’ মজার ব্যাপার হলো, কথাটা প্রথমে বলেন সাবেক সমাজতন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। তারপর সেটা স্পষ্ট ভাষায় পুনরুচ্চারণ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের সঙ্গে জোট করে। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর এ দুটি দলের মধ্যে সম্পাদিত লিখিত চুক্তিতে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করে, ‘পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়তবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না।’ এমনকি ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করার অঙ্গীকারও ঘোষণা করে। এটা ঠিক যে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নেতৃত্বে আসীন একটি দলের মুখে ‘কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না’ কথাটা খুবই বেমানান, অস্বাভাবিক, স্ববিরোধী, আর সেই কারণে অবিশ্বাস্য।
এটা যে সাধারণ, অশিক্ষিত, অসচেতন ধর্মপ্রাণ মানুষকে ভুলিয়ে ভোট পাওয়ার জন্যে করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে এখনো কঠিন হাতে আঁকড়ে ধরে আছে। তা তাকে থাকতেই হবে। কারণ এই অস্ত্র দিয়ে ভুলিয়ে সংখ্যালঘুদের সিংহ ভাগ ভোট পেতে হয় দলটিকে। বাংলাদেশের ভোট বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সংখ্যালঘুদের অর্ধেক ভোট থেকেও যদি বঞ্চিত হয়, তাহলেও আওয়ামী লীগ ২৫/৩০টার বেশি আসনে বিজয়ী হতে পারবে না। সেজন্যে তাদেরকে সন্তুষ্ট বা আশ্বস্ত রাখার স্বার্থেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে ত্যাগ করতে পারবে না আওয়ামী লীগ। সুতরাং ‘কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না’ কথাটা ভাওতাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। তার জ্বাজ্বল্যমাণ প্রমাণ শেখ হাসিনার পুত্র, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি লেখা। লেখার শিরোনাম ‘Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh’। এটি ছাপা হয়েছে Harvard International Review-তে (অনলাইনে দেখুন)। তিনি একা এটি লিখতে পারেননি, লিখেছেন কার্ল সিয়োভাকো নামক একজন সাবেক আমেরিকান সৈনিকের সঙ্গে যৌথভাবে।
এই ভদ্রলোক ইরাক ও সউদী আরবে কাজ করেছেন। এই প্রবন্ধে জয় কোনো রাখ-ঢাক না করে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন, ইসলামই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু । তারপর বলেছেন: ‘If Sheikh Hasina and the Awami League win the upcoming December election, … Islamism will be averted. This de-radicalization plan has great potential for success. The Bangladeshi people are starting to see the connection between secularism and success in Bangladesh. The time is ripe for them to support these initiatives. In the careful balancing act between Islam and governance in a Muslim country, it appears that the pendulum has tipped to the side of secularism. The Awami League must build on this momentum to ensure its long-term success.’ অর্থাৎ তার সার কথা হলো, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে (নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন) বিজয়ী হলে ইসলামকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে। বাংলাদেশের সাফল্যের জন্যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। এখনই তার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। মুসলিম দেশে ইসলামের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকেই অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য আওয়ামী লীগকে অবশ্যই এই পথে এগুতে হবে। শেখ হাসিনার পুত্র এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় অবশ্যই তার মা এবং আওয়ামী লীগ নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই নীতি-নির্ধারণী প্রবন্ধ লিখেছেন এবং বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্যে তা ইন্টারনেটে ছেড়েছেন। অথবা তারা এই মতামতকে সমর্থন ও অনুমোদন করেছেন। সেজন্যেই তারা এর প্রতিবাদ করেননি। নির্বাচনের পর ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি, শিক্ষানীতি, নারীনীতি, সংবিধানে আবার ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আমদানীর উদ্যোগ একথাই প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের সময় দেয়া ‘কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না’ কথাটা কত বড় ধাপ্পাবাজি ছিল। আওয়ামী লীগের মনোভঙ্গি এখন এতটাই খোলামেলা রকম ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী যে, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকারটুকুকেও তারা সংবিধানে রাখতে নারাজ।
ধর্ম নিয়ে আওয়ামী লীগের ধাপ্পাবাজি কতটা উলঙ্গ তা একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে। ধর্মের মূলকে কেটে ফেলে, অর্থাৎ ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’কে পরিত্যাগ করে, তার বদলে আনা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে, অথচ ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রাখা হচ্ছে, যদিও কিছুটা অন্যভাবে। এই সুস্পষ্ট পরস্পরবিরোধী বিষয়কে গ্রহণ করার একমাত্র উদ্দেশ্য ধর্মপ্রাণ জনগণকে ভুল বোঝানো। এটাই সত্যিকারের ধর্ম নিয়ে ব্যবসা। এখান থেকেই আওয়ামী লীগের ধর্মব্যবসাকে শনাক্ত করা যায়। সমাজতন্ত্র এখন সমাজতন্ত্রীরাই পরিত্যাগ করছে। আওয়ামী লীগ কোনো দিনই সমাজতন্ত্রের সমর্থক ছিল না। এখন তো পুরোপুরি মুক্ত বাজার অর্থনীতির সমর্থক। অথচ সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে মূল স্তম্ভরূপে। এইসব প্রতারণা আওয়ামী লীগ ‘মুক্তিযদ্ধের চেতনা’র নামে চালিয়ে যেতে চাচ্ছে। এ-ও এক ব্যবসা বটে।
যাই হোক, যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে যাওয়া যাক। বলছিলাম ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র কথা। আমরা ওপরের তথ্যাবলী থেকে সহজেই বুঝতে পারছি যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ও তার আগে আওয়ামী লীগের সংগ্রাম, নীতি ও নির্বাচনী অঙ্গীকারে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পরে এটা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। ওপরের আলোচনা ও তথ্য থেকে এটাই প্রতীয়মাণ হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ছিল গণতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত, স্বাধীন ও সার্বভৌম, বৈষম্য ও শোষণহীন, রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। এই কথাই বলা হয়েছে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মেনিফেস্টো, ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো ও প্রস্তাবিত সংবিধান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়ে বারবার এ নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। বিগত নির্বাচনের সময় নতুন করে সেই পুরনো মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি করা হয়েছে। এই মিথ্যাচার ও প্রতারণার রাজনীতিই সংবিধান সংশোধনের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে পুরোপুরি ভারতের দাসত্ব-বলয়ের মধ্যে বন্দী করা এবং এর ফলশ্রুতি হিসেবে নিজেদের ক্ষমতাসীন রাখার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করা। এর পরে যদি আওয়ামী লীগ বলে ভারতের সাথে কনফেডারেশন গড়া ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ছিল তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, সময় উপযোগী এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখাটি লেখার জন্য।
আরো তথ্যবহুল সুন্দর লেখার অপেক্ষায় থাকিব।
63075
৩
সৌদি আরব থেকে আবেদ লিখেছেন,
১৭ জুলাই ২০১১; সকাল ১০:৩০
আমার পরিচিত হিন্দু কলেমা পড়েছেন কিন্ত অন্তর দিয়ে নয়। তাই সে হিন্দ। কারন কলেমা পড়লেই সে ঈমান আনে না। ঈমানের অংশ আল্লাহর উপর আস্থা ও বিস্বাস। এটাকে মুছে বিসমিল্লাহ পড়া সে রকম যে এক প্রকার কাল পোকা ধান গাছের উপরে কোন ক্ষতি করে না কিন্ত গোড়া কেটে দেয়।
63095
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: