|
এ যেন ধ্বংসের উৎসব
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী |
|
কখনো কখনো মনে হয় পুলিশ বাহিনী কিংবা ছাত্রলীগ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন কিংবা হত্যার অধিকার পাকাপোক্তভাবেই পেয়ে গেছে। সরকার হয় হত্যাকারীদের পক্ষে দাঁড়াবে, নয়তো আদালতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিতদের রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করিয়ে নেবে। বাংলাদেশেই প্রথম দেখা গেল, একজন রাষ্ট্রপতি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ও সরকারদলীয় লোকদের ক্ষমা করে দিচ্ছেন। ভালো বলেছিলেন লক্ষ্মীপুরের বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের স্ত্রী। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তার স্বামীর হত্যাকারীদের ক্ষমা ঘোষণা করার পর ওই বিএনপি নেতার স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, এরপর তো আর রাষ্ট্রপতির তার স্ত্রী আইভী রহমানের হত্যাকারীদের বিচার করার ক্ষমতা তার আর থাকে না। বলার অপেক্ষা রাখেন। সরকারের পরামর্শেই অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের হত্যাকারীকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিলেন, তখন তার উচিত ছিল তার স্ত্রী আইভী রহমানের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করা এবং অভিযুক্তদের ক্ষমা করে দেয়া। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তা করেননি। তাতে প্রমাণিত হয়েছে, স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো ক্ষমতা তিনি রাখেন না। কিন্তু রাষ্ট্রপতি যুক্তির পক্ষে দাঁড়াতে পারতেন। দাঁড়াননি। না দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি নো বডি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া তার যে কিছুই বলার বা করার ক্ষমতা নেই। আমরা যতই চাই না কেন, নাগরিকেরা তাকে স্বাধীনতা দিতে পারি না। সংবিধান যে বাধা। ফলে রাষ্ট্রপতি সরকারের সাথে পরামর্শক্রমে সরাসরি খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একের পর এক ক্ষমা ঘোষণা করে যাচ্ছেন এবং তার মহানুভবতায় ক্ষমাপ্রার্থীদের সার্কিট হাউজে নিয়ে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রীরা সংবর্ধনা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে এরা দিয়ে দিয়েছেন, ভিন্ন মতাবলম্বী যে যেখানে আছে তাদেরকে শেষ করো। ক্ষমার দরজা খুলে প্রেসিডেন্ট বসে আছেন। ক্ষমা হবেই। কোনো সমস্যা নেই। রাষ্ট্রপতি তো আছেন। তার মাধ্যমে সব কিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে। রাষ্ট্রপতির এমন কর্মকাণ্ডে কি প্রশ্ন করা যায়? আসলে রাষ্ট্রপতির এমন কিছুই করা ঠিক নয়, যাতে তার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। শেখ হাসিনা যখন মইন ইউ আহমেদের সময় কারাবন্দী ছিলেন, তখন বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের পথপ্রদর্শক। নেতাকর্মীরা তার বক্তব্যের দিকে চোখ-কান খোলা রেখেছে।
এখন যেন কিছুতেই আর রাষ্ট্রপতির ওপর নির্ভর করা যাচ্ছে না। তিনি একজন আইনজীবীও বটে। ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের বিবেকবোধ, শুভাশুভ জ্ঞানও অপরিহার্য। তিনি একজন পরিশীলিত ভদ্রলোক। সাধারণত আওয়ামী লীগারেরা যে ভাষায় কথা বলেন, তেমন ভাষায় কথা বলতে সম্ভবত জিল্লুর রহমানকে কেউ কোনো দিন শোনেনি। ফলে বিরোধী মহলেও তার মর্যাদা ও তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে আমরা চাপতে চাপতে একেবারে বোধ হয় মর্যাদাহীন করে ফেলেছি। এক সময় বিধান ছিল, রাষ্ট্রপতি যদি জাতীয় সংসদের কোনো সিদ্ধান্তে অনুমোদন না দেন, তাহলে তা আইনে পরিণত হবে না। সে বিধান বদলে করা হলো যে, পরপর তিনবার সে প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠালে তিনি যদি তার অনুমোদন না দেন, তাহলে বিধানটি আপনাআপনি আইনে পরিণত হবে। এখন তার ভেতরেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো মানে অনুমোদন হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তার সম্মান সব নাগরিকের ঊর্ধ্বে। তাকে এ রকম অসম্মানজনক অবস্থানে ঠেলে দেয়ার কোনো মানে হয় না। সে ক্ষেত্রে এমন বিধান প্রণয়ন করাই ভালো ছিল যে, সংসদ যা সিদ্ধান্ত নেবে তা-ই আইন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতির সম্মান হয়তো কিছুটা রক্ষা পেত।
কিন্তু আমরা তা করিনি। আমরা রাষ্ট্রপতিও চাই। কিন্তু তার যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করতে চাই না। বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে তার পরিচালিত হওয়ার শক্তি আমরা কেবলই ক্ষুণ্ন করেছি। এতে রাষ্ট্রের মর্যাদা যেমন বাড়েনি। তেমনি বাড়েনি রাষ্ট্রপতির মর্যাদাও। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনায় খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ ঘাতকদেরও মুক্তি দিতে বাধ্য হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি।
এর ফলে খুনের মতো ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে। এই জানুয়ারি মাসে দৈনিক গড়ে ১১ জন মানুষ খুন হয়েছে। এখন খুন হলে কেউ আর বিশ্বাস করে না যে, খুনি ধরা পড়বে এবং তার উপযুক্ত শাস্তি হবে। নাগরিকদের এখন আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। খুনের উৎসবে পেশাদার খুনিদের সাথে কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। অনেক জরিপকারী প্রতিষ্ঠান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্থ বলে সাব্যস্ত করেছে। এবং তারাও এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উপরন্তু ক্রসফায়ার নামের অমানবিকতা জারি করার ফলে এখন ক্রসফায়ারের নামে যখন তখন যাকে খুশি হত্যা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তারই শিকার হয়েছিল কলেজছাত্র রিমন। পুলিশের গুলিতে আহত রিমনের একটি পা কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। এই নিরীহ ছাত্রকে অপরাধী সাজানোর জন্য কত কোশেশই না পুলিশ করেছে। সে অমুকের সহযোগী, তমুকের সহযোগী, সে পুলিশকে গুলি করেছিল, এমন সব কল্পকাহিনী সাজানো হয়েছিল। এমনকি পঙ্গু অবস্থায়ও তাকে আদালতে হাজির করে হেনস্তা করা হয়েছে। সে হেনস্তার এখনো অবসান ঘটেনি। জানি না কোনো দিন অবসান ঘটবে কি না। পুলিশকে আত্মরক্ষার্থেই তার বিরুদ্ধে মামলা সাজিয়ে যেতে হবে। কারণ যদি প্রমাণিত হয় যে, রিমন নির্দোষ ছিল, তাহলে তাকে কেন গুলি করা হলো- এ প্রশ্নের জবাব পুলিশকে দিতে হবে। কিংবা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। দেশে আইনের শাসন থাকলে এ ধরনের পুলিশ সদস্যকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। বাংলাদেশ থেকে সে ব্যবস্থা এখন উধাও। ফলে সব কিছুই চলছে ফ্রি-স্টাইলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নেই। সরকার পরিচালনায় জবাবদিহিতা নেই। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জবাবদিহিতা নেই। জবাবদিহিতা নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও। তার ওপর আছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা। সব মিলিয়ে ঘোর দুর্দিনে এখন বাংলাদেশ। যেন এই একবিংশ শতাব্দীর পাদদেশে দাঁড়িয়ে আমরা ফিরে গেছি প্রাগৈতিহাসিক যুগে, যেখানে আইন-বিচার কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।
দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বেড়ে চলা, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, সঙ্কটাপন্ন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এমন এক ঘোর বিপদের মধ্যে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন বিপদ নতুন নয়। আমরা বারবার এমন বিপদ মোকাবেলা করেছি। এ ধরনের সব সঙ্কট এ দেশের লড়াকু মানুষ সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেছি। একাত্তরে দেখেছি, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর দেখেছি, নব্বইয়ে এরশাদের পতন দেখেছি। মানুষ একাট্টা হয়ে পরিস্থিতি উত্তরণে সাহসী ভূমিকা রেখেছে। সব স্বৈরাচার, অপশাসন-দুঃশাসন, বিপদ থেকে নিজেরাই নিজেদের উদ্ধার করেছে। এ রকম সময় সাধারণ মানুষ কখনোই সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ চেয়ে থাকেনি। নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, নাগরিকেরা যথার্থ ছিল। শেষ পর্যন্ত তারাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এবারের বিপদের মাত্রা ভিন্ন রকম। ষড়যন্ত্রও গভীর। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির লোক হরিহর আত্মা হয়ে বাংলাদেশকে পদানত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সেখানে সাম্রাজ্যবাদীদের বলপ্রয়োগ যেমন আছে, তেমনি আধিপত্যবাদীদের চাণক্যনীতিও আছে। তারই অংশ হিসেবে সমাজের ভেতরে এত বিশৃঙ্খলা, এত অরাজকতা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জাতিকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনাকর্মকর্তার প্রাণ গেছে। তারপর বহুসংখ্যক কর্মকর্তা বিতাড়িত হয়েছেন। বিডিআরকে বানানো হয়েছে বর্ডার গার্ড। এর চমৎকার পরিভাষা লিখেছেন অগ্রজ কবি, প্রাবন্ধিক, নিবন্ধকার ফরহাদ মজহার- সীমান্ত দারোয়ান। লাঠি হাতে পাহারা দেয়ার ক্ষমতা আছে। চোর ঢুকলে চিৎকার দেয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু সীমান্ত রক্ষা করতে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা নেই। সমপ্রতি কথিত সেনা অভ্যুত্থানের পেছনে ধর্মান্ধতার তকমা এঁটে বাংলাদেশে বিদেশী হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। সংবিধান তছনছ করা হয়েছে। মানুষের প্রতিবাদের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার বোধ হয় বোঝেইনি যে, বেহুলার নিশ্ছিদ্র বাসরেও দেবী মনসার সাপ গিয়ে হাজির হয়েছিল। এবং সরকার পড়েওনি যে বালির বাঁধ দিয়ে জোয়ারের জল রোধ করা যায় না। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের মসনদ জনরোষে ভেসে যাওয়ার পথ তারা নিজেরাই তৈরি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। সে গণবিস্ফোরণ এখন অনিবার্য বলেই মনে হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
(সূত্র : নয়া দিগন্ত-০৫-০২-২০১২) |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrRezwanSiddiqui |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|