চলতি বছরের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নিয়ে আলোচনাকালে ‘বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের’ মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির জন্য সংঘাত তত্ত্ব উদ্ভাবন করা হয়েছে। কেউ কেউ এই তত্ত্বের সূচনা দেখিয়েছেন, দেশে মুসলিম রাজশক্তি কায়েমের সময় থেকেই। এই সংঘাত তত্ত্বটি নানাভাবে গল্পে-উপন্যাসে-প্রবন্ধে-কবিতায়-ছড়ায়, সংবাদপত্রের লেখায় ও রাজনৈতিক রচনায় উপস্থাপন করে গড়ে তুলেছেন তারা যাদের পূর্বপুরুষরা কখনও নিজেদের বাঙালী বলে পরিচয় দিতেন না। আমি এখানে ১৯ ও ২০ শতকের সেসব হিন্দু ব্রাহ্মণ্যপন্থী পুনর্জাগরণবাদী মুসলমানবিদ্বেষী অবিভক্ত বঙ্গের ভারত-পথিকদের কথাই বলছি। এ কথা শুনে অনেকেই চমকে উঠতে পারেন, ভাবতে পারেন। এ আবার কি কথা! আমারা তো প্রায় সবাই জানি ভারত-পথিক ও তাদের জাত ভাইয়েরাই বাঙালী। অর্থাৎ সমগ্রভাবে এ দেশের হিন্দুরাই বাঙালী। আমরা মুসলমান মাত্র । হ্যাঁ এটাই চালু কথা বটে। এটাও কিছুটা সত্য বটে যে, ব্রিটিশ আমলে কিছু কিছু বিদেশাগত মুসলামান পরিবার নিজেদের বাঙালী বলে পরিচয় দিতে চাইতেন না। তাদের ব্যতিক্রমের মধ্যে ফেলা যায়। কারণ ১৯ শতকের আগে কোন শিক্ষিত হিন্দু তা তিনি ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব-যোগী তান্ত্রিক যেই হন; নিজেকে সমগ্রভাবে হিন্দুদের বাঙালী বলে কখনও কোথাও উল্লেখ করেননি। কোন লেখক রামাই পন্ডিতের নিরঞ্জনের রুক্ষ্ণীয় (এটা ধর্মমঙ্গলের অর্ন্তভূক্ত নয়, শূন্য পুরাণ ও ধর্মপূজা বিধান এর অর্ন্তভূক্ত) যে বাঙালী পক্ষের উল্লেখ করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। ঐ রচনায় মুসলিম প্রতিপক্ষ তখনও বাঙালী নামে পরিচিতি হয়নি। ঐ রচনায় যবন বা মুসলমান- এর উল্লেখ আছে। কিন্তু বাঙালী বা হিন্দু নামের কোন নতিজা নেই। অতএব বাঙালী শব্দটি যে তখনও উদ্ভুত হয়নি এমন অনুমান সমীচীন। এর আগেকার দু'একটি রচনায় বাঙালী ও বংগল এর যে নমূনা দেখা যায় তা সমপ্রদায় অর্থে বৈ জাতি অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এ বিষয়ে বেশী বিস্তৃত ও গভীর আলোচনায় যাবার কোন অবকাশ নেই। তাই মুখতাসর এটুকু বলতে চাই যে, আমাদের অর্থাৎ মুসলমানদের বিশেষ করে বাংলাদেশী মুসলমানদের জাত পাতের পরিচয় ও ইতিহাস আমাদেরই খুঁজতে হবে। আমাদের সবকিছুরই অতীত ইতিহাস আমাদেরই টেনে বের করতে হবে। ইংরেজ ও ব্রাহ্মণদের লেখা ইতিহাসে আমাদের চলবে না। পরের চোখে নিজের চেহারা দেখা যাবে না। তাতে প্রকৃত চেহারা অদৃশ্যই থেকে যাবে। চিরকাল কোন জাতি ফীডার খেয়ে বড় হয়ে ওঠতে পারে না। বাঁচতেও পারে না। পরে না সঠিক আত্নপরিচয়ে পরিচিত হতে। কারণ বঙ্গীয় ও ভারতীয় ব্রাহ্মণেরা অব্রাহ্মণ হিন্দুদের ইতিহাসটাই সঠিকভাবে লেখেনি, রাখেনি। আমাদের ইতিহাসও সঠিকভাবে লেখার এবং রাখাও প্রশ্নই ওঠে না। তথাপি আমরা বাঙালীরা (মুসলমান) গত দু'শ বছর সেই বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ ও তাদের অনুগামী, অনুসারীদেরই বানানো ফীডার খেয়ে চলেছে।
শরৎচন্দ্র এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের বালক বলে উল্লেখ করে নসিহৎ করেন যে, হালে দু'কলম লেখাপড়া শিখে আমরা (মুসলামানরা) ধারালো ছুরি হাতে পেয়ে যেন বালকের মত যা তা কেটে না বেড়াই। শতাব্দী প্রায় শেষ হয়ে এল। কিন্তু এখনও কি আমাদের সেই বালকত্ব ঘুচেছে? তা ঘুচলে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে অন্নদাশঙ্কর রায় পর্যন্ত তারা, বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের সম্পর্ক নিয়ে যা লিখেছেন, বলেছেন তা কেবল ক্ষোভ অথবা প্রসন্নতার সাথে আমরা বার বার উচ্চারণ করে তৃপ্ত হতে পারতাম না। বিষয়টিকে পরীক্ষা করার প্রয়াস পেতাম। তা হলে জানতে পেতাম ব্রাহ্মণের ছাগলটা আসলে কুকুর নয়, যথার্থই ছাগল বটে।
এ বক্তব্যের সপক্ষে বলা দরকার বাঙালা বা বাঙালা শব্দ থেকে যে বাঙালী শব্দের উৎপত্তি, সে শব্দটি ড. সুনীতিকুমার চট্টপাধ্যায়ের মতে ফার্সী। অর্থাৎ সেটা মুসলমানী লফজ বা শব্দ। এ শব্দটি মুখে ও কলমে তুলে নিতে হিন্দু ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও তাদের অনুসারীদের আট-নয়’শ বছর সময় লেগেছে। কেননা বিদ্যমান বাঙলা কাব্য ও অন্যান্য রচনা লিখিত সাক্ষ্য দেয় যে, চৌদ্দ শতকের মধ্যভাগে (১৩৫২ খ্রী:) দিয়ারে লক্ষ্ণৌতি, দিয়ারে সাতগাঁও ও দিয়ারে সোনারগাঁও নামক তিনটি এলাকাকে ঐক্যবদ্ধ করে মুসলমান সুলতান শাসসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যে একক একটি বাঙ্গালাহ নামের রাষ্ট্র গঠন করেন; সেটার কোন স্বীকৃতি হিন্দু কবি লেখকগণ কোথায়ও দেননি। অপরদিকে মুসলমান সুলতান ও পীর মাশায়েখ বোজৃগান নিজেদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চৌহদ্দিতে শাহে বাঙালীয়ান বা বাঙালীদের বাদশাহ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বাঙালী উপাধিও নিয়েছে। আজও বাংলাদেশের বহু মুসলমান পরিবার বাঙালী উপাধিধারী রয়েছেন। অপরদিকে হিন্দুদের মধ্যে বাঙালী উপাধিধারী একটি পরিবার বা একজন ব্যক্তিকেও পাওয়া যায় না।
মুসলামানরাই যে এদেশেরে ঐতিহাসিকালের দল সানস অব দ্য সয়েল (Sons of the Soil) বা ভূমিপুত্র তা প্রমাণ করার মত অনেক তথ্য রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর দিকে আজও কারও সচেতন নজর পড়েনি। সেকালে মুসলমানরা কেবল নিজেরাই বাঙালী হতে চায়নি; তারা খন্ড বিখন্ড ও পরস্পর কোন্দল জীর্ণ একটি বিরাট এলাকা এবং তার মধ্যে বসবাসকারী ৩৬ জাতে বিভক্ত একটি জনসমষ্টিকে এক দেশ এক শাসন এক পঞ্জিকা এক জাতি পরিচয়ে (বাঙালী) ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হতে পারেনি। হিন্দু সামন্ত পুরোহিত শ্রেনীর (ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব তান্ত্রিক ইত্যাদি) ধর্মবিদ্বেষ জনবিদ্বেষ ও ভাষাবিদ্বেষ ঐ চেষ্টার মূলে পাঁচ ছয়’ শ বছর যাবত অবিরাম কুঠারাঘাত করে এসেছে। মুসলমানরা যে, দেশকে অখন্ডরূপে বাঙালা নামে চিহ্নিত করেন। ঐ শ্রেনীর হিন্দুরা সেই অখন্ডত্ব নামের ক্ষেত্রেও মেনে নেয়নি। তাই তারা বাঙালী নামটিও (দেশ ভাষা বা জাতি কোন অর্থে) গ্রহণ করেনি। তারা চিরকালই (ব্রিটিশ শাসনের পূর্বপর্যন্ত) গৌড়বঙ্গকে নিম্নবঙ্গ (যার প্রকৃত প্রাচীন নাম ছিল বাঙাল) থেকে আলাদ গণ্য করে এসেছে এবং উপেক্ষা ও নিন্দা করে এসেছে। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় হিন্দু লেখকগণ মৌর্য যুগ থেকে শুরু করে ১৮ শতক অবধি ঐ বঙ্গকে গৌড় দেশ বা গৌড় বলে এসেছে এবং এ দেশের (তথাকথিত পূর্ববঙ্গের) বাঙ্গাল নাম কখনও মুখে আনেনি কিংবা কাগজে লেখেনি। ঐ গৌড়ের বা গৌড়ঙ্গের অধিবাসীদেরও তারা কখনও বাঙালী বলেনি বলেছে গৌড়িয়া, গৌড়জন, বঙ্গজনা, গৌড়ের লোক, গৌড়াই প্রভৃতি। উক্ত হিন্দুসামন্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণ পন্ডিত শ্রেনী মুসলমানী পঞ্জিকা বা বাঙলা সনও গ্রহণ করেনি। তার বদলে ব্যবহার করেছে শক সন বা শকাব্দ। এমনকি ১৮ শতক অবধি তো বটেই ১৯ শতকেরও প্রথম ভাগতক তারা মুসলমানী নাম বলে বাঙালা ভাষা এই নাম দিতে চায়নি, নেয়নি। তার বদলে লিখেছে ভাষা দেশী ভাষা ইত্যাদি।
আলচ্য বিষয়সমূহের প্রমান হিসেবে দেশ-নাম, জাতি-নাম, ভাষা-নাম প্রভৃতি সম্পর্কে কিছুসংখ্যাক দলিলগত সাক্ষী সাবুদ বারান্তরে হাজির করা হবে। তা থেকে দেখা যাবে চৌদ্দ শতক থেকে আঠারো শতকতক; দেশজাতি ও ভাষা-নাম ভিত্তিক বাঙালী ছিল মুসলমানরাই। হিন্দুরা ছিল গৌড়ের গৌড়াই, গৌড়িয়া, গৌড়বাসী, গৌড় দেশবাসী, গৌড়জন, গৌড়ের লোক ইত্যাদি বাঙ্লার বাঙালী নয়।
লেখক: প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।