|
শিক্ষা বিষয়ে আমার দশটি অনুভূতি
ড. সৈয়দ রোকন উদ্দিন |
|
অনুভূতি-একঃ পয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আমার বাল্য জীবনের পাঠশালার বৃদ্ধ শিক্ষককে পেয়ে তার পায়ে ধরে ছালাম করেছিলাম। শিক্ষকের পায়ে ধরে সালাম করার এ দৃশ্যটি দেখে সঙ্গে থাকা ঢাকার স্কুলে পড়ুয়া আমার ছেলে ফিক্ করে হেসে দিয়েছিল। দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ লক্ষ শিক্ষক সমাজের কাছে আমার বিনীত প্রশ্নঃ শিক্ষককে শ্রদ্ধা করার মহড়াটি দেখে আমার ছেলেটি অনেকটা অশোভন ঢঙে ফিক্ করে হেসে দিল কেন? রাজধানী ঢাকার সেরা স্কুলের বাঘা বাঘা শিক্ষকদের স্পর্শে বেড়ে উঠা আমার সন্তানের তুলনায় অজো পাড়াগাঁয়ের স্কুলের সেই দরদি অখ্যাত শিক্ষকদের স্পর্শে বেড়ে উঠা ছাত্র 'আমিই' তো অনে-ক অনে-ক উত্তম!
অনুভূতি-দুইঃ আমার ছেলেটি অসংখ্যবার আমাকে বলেছে,আব্বু, স্কুলের স্যারকে ক্লাসে পড়ানোর সময় কেমন যেন 'খাপছাড়া-এলোমেলো' মনে হয়। আবার বিকেলে তারই কোচিং সেন্টারে তাকে খুবই 'মনোযোগী', 'স্বতঃস্ফূর্ত' ও 'বন্ধুসুলভ' মনে হয়। মন্তব্য নিঃস্প্রয়োজন ভেবে কোন কথাই বলিনি।
অনুভূতি-তিনঃ একজন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক তার মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়া ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন, বাবা তুমি বড় হলে কি হবে? ছেলে বলে, তোমার মত শিক্ষক হবো। বাবা বলেন, কেন? ছেলে নিসংকোচে জবাব দেয়, প্রাইভেট পড়িয়ে তোমার মত অনেক টাকা কামাই করতে পারব, তাই। লজ্জা পেয়ে শিক্ষক বাবা আর কথা বাড়ালেন না।
অনুভূতি-চারঃ বাংলাদেশের তরুন ছাত্র সমাজ এখন আর পিতামাতা বা অবিভাবকের দখলে নেই। কেবল ভরণ-পোষণ ছাড়া তাদের মনন-চলন-বলন-শয়ন-আর স্বপনের পুরোটাই এখন বহুজাতিক কোম্পানীর কিংবা বড় ভাইদের দখলে!
অনুভূতি-পাঁচঃ পাগল নামের এক লোক সেদিন ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল, শিক্ষা থেকে সার্টিফিকেট প্রথাটি তুলে দিলে কেমন হয়? যে কোন স্তরের চাকুরীর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেইতো চলে। এমনটা হলে নোট নির্ভর ও আর মেধা বিবর্জিত সার্টিফিকেটের বদলে শিক্ষার্থীগণ জ্ঞান চর্চায় অধিক মনোযোগী হতো। শুনে এক অ-পাগল বললেন, ধ্যাৎ বেটা পাগল। পাগল আবার বলতে থাকে, তোমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য আর পড়া কিংবা পাশ করার জন্য যায় কোচিং সেন্টারে। এই যখন অবস্থা, তাহলে কোচিং সেন্টারগুলোকে সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হলে ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে গিয়ে পুরো দিনটা আর মাটি করতে হতোনা। অ-পাগল ব্যাক্তিটি আর কথা না বাড়িয়ে মনে মনে বললেন, বেটা পাগল এতো খাঁটি কথা বলে কী করে?
অনুভূতি-ছয়ঃ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়া আমার ছেলে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, আব্বু দেশে নতুন সরকার এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বদলানো হয় কেন? আমি জবাবটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও সে নাছোড় বান্দার মত লেগেছিল। ছেলের সাথে মিথ্যে কথা বলা ঠিক হবেনা বলে শেষ পর্যন্ত বলতেই হলো যে, ঐ পদটি আসলে রাজনৈতিক। জবাবটি পেয়েও তার ধোয়াটে ভাবটি কাটলো বলে মনে হলো না। হয়তো কেটে যাবে যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ওস্তাদমন্ডলীর লালদল আর নীলদলের রহস্যটি বাস্তবে প্রত্যক্ষ করবে।
অনুভূতি-সাতঃ সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করা একজন ছাত্র আমার কাছে এসেছিল ইংরেজিতে একটা দরখাস্ত লিখে দেয়ার জন্য। আমি বললাম, কেনরে বাবা, তুমিতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী একটা ছেলে! সে বললো, আঙ্কেল, আমিতো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ি নাই। আমার এই কষ্টটি প্রিয় বাংলা দেশের সকল স্কুল সমূহের প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বর্ণবাদী' শিক্ষকমন্ডলী ও ভিসিদের প্রতি উৎসর্গ করলাম (যদিও জানি তারা পরিস্থিতির শিকার! কারণ, চোখের সামনে দেখছেন 'বর্ণবাদী' না হলে ভিসি হওয়া যায় না) ।
অনুভূতি-আটঃ ছাত্ররা নানা বিষয় নিয়ে মিছিল, মিটিং, আন্দোলন আর ভাংচুর করে থাকে, কিন্তু পরীক্ষা সময়মত হবার জন্য কিংবা পড়াশেষে চাকরি পাবার নিশ্চয়তার জন্য আন্দোলন করে না কেন? নবম শ্রেণীতে পড়া আমার মেয়ের এই মহা কঠিন প্রশ্নটি আমি এড়িয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবতে বাধ্য হলাম, তার এ প্রশ্নের জবাব এই মাটিতে জীবনেও হয়তো সে পাবেনা। এর সঠিক উত্তরের জন্য একটি বড় ধরনের গবেষণা হতে পারে। যেখানে মেয়েটির এই অপ্রিয় প্রশ্নের অপ্রিয় জবাব মিললেও মিলতে পারে।
অনুভূতি-নয়ঃ ষাটের দশকের ছাত্রনেতারা যখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংসদ নির্বাচন করতো তখন নেতারা নিজেরাই কলম দিয়ে পোষ্টার লিখে নিজেদের নির্বাচনী প্রচার করতো। কিন্তু এখনকার ছাত্রনেতাদের চাররঙ্গা ইয়া বড় বড় পোষ্টার ছাপিয়ে রমরমা প্রচারে অর্থের কোন সমস্যা হয়না। অর্থাৎ এখনকার ছাত্রনেতাদের সাথে টাকাওয়ালা গৌরীসেনদের সাহচর্য খুবই ষ্পষ্ট।
অনুভূতি-দশঃ এক বিদগ্ধ জনকে প্রশ্ন করতে শুনেছিলাম, আচ্ছা বলুনতো, হাট-টিমা টিম-টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং- এ ধরণের ছড়া-কবিতা ছোট বাচ্চাদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় কেন? জবাবে আর একজন বিদগ্ধ জন বলেছিলেন, ছোট বাচ্চারা বড় হয়ে কখনোই যেন সৃজনশীল ও বাস্তবভিত্তিক চিন্তা করতে না পারে সেজন্য অতি অল্প বয়সেই যাতে ওদের কল্পনা শক্তিটা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় । এটা একটা জাতিকে ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ। প্রশ্নকর্তা বিদগ্ধ ব্যাক্তিটি বললেন, হ্যাঁ, উত্তর সঠিক হয়েছে। এমতাবস্থায়, দেশের কর্ণধার সুধীজন ও আইনবেত্তাদের কাছে আমার প্রশ্নঃ শিশুদের কারিকুলামে চুলপাকা বিশেষজ্ঞদের এমন কান্ডজ্ঞানহীন ইচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য যদি কেও কোর্টে মামলা ঠোকে তবে এই অপরাধের জন্য তাদের কি শাস্তি হবার মত আইন আছে? |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrSayedRukanUddin |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
| |
| |
লেখকের প্রকাশিত মোট গ্রন্থ সংখ্যা ১৭ টি। গ্রন্থ সমুহের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, ছড়াবই, শিশুতোশ গল্প, উন্নয়ন-গ্রন্থ, গ্রামিন খেলাধুলা ও সম্পাদনা গ্রন্থ। কর্মক্ষেত্র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা। ব্র্যাক ও জার্মান দাতা সংস্থায় নিয়মিত চাকুরিসহ প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিষয়ে কেয়ার, ইউনিসেফ, এসডিসি, সিডা, ডিএফআইডি, ইউএনডিপি, অ্যাকশনএইড, ওয়াল্ড ব্যাংক, আইএলও, জিআরএম ইন্টারন্যাশন্যাল, নেট্জ-জার্মান, ইফাদেব, এলজিইডি, ডিএই সহ বেশ কিছু সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকল্প সমুহে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিষয়ক সংস্থা প্রমোটিং পারটিসিপেশন এন্ড ট্রেনিং এর (প্রম্পট) নির্বাহী পরিচালক ও উন্নয়ন পরামর্শক ।
তাছাড়া লেখক লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশন্যাল পরিচালিত লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা ক্যাপিটাল এর প্রেসিডেন্ট ও পরে ডিস্ট্রিক্ট চেয়ারপারচন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উন্নয়ন সংস্থা সোসাইটি ফর আন্ডার প্রিভেলেজ্ড ফ্যামিলির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য। প্রশিক্ষণ বিষয়ক সংস্থা বিএসটিডি ও সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
লেখক এডুকেশানএ পিএইচডি করেছেন এবং দাপ্তরিক কাজে বর্হিবিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। পৈতৃক নিবাসঃ গ্রাম-হারানপুর, ইউনিয়ন-বাঘাসুরা, উপজেলা-মাধবপুর, জেলা-হবিগঞ্জ। |
|