|
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রিপোর্ট
এহসানুল হক জসীম |
|
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির শোচনীয় অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট-২০১০ এ। ওয়াশিংটনে এপ্রিলের ৮ তারিখ প্রকাশিত রিপোর্টটি এখন বেশ আলোচিত। সরকারের তরফ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে এ রিপোর্ট প্রত্যাখান করেন। এটাকে দুর্বল এবং তথ্যগুলো অসমর্থিত উৎস থেকে নেয়া বলে মন্তব্য করেন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যও অনুরুপ। বিরোধি দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন-বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব অবস্থা এ রিপোর্টের চাইতে আরো ভয়াবহ। কেউ কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, কোন দেশের উপর এ রকম রিপোর্ট প্রকাশের অধিকার তাদের নেই। আমরা এসবের কোনটিতেই খেয়াল নাইবা দিলাম। ধরেই নিলাম যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার নেই এ রকম রিপোর্ট করার। কিন্তু, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বর্তমান ভয়াবহ রুপ অস্বীকারের সুযোগ আছে কি? রিপোর্টটিতে যে যে ক্ষেত্রে মানবাধিকার লংঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে- আছে সুযোগ এড়িয়ে যাওয়ার?
বিচার বিভাগে চরম দলীয়করণ, বিরোধি মতালম্বীদের বিচার প্রাপ্তির পথ সংকোচন, বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নারী ও শিশু নির্যাতন-এসবই তো এ রিপোর্টের উদ্বেগের কারণ। এসবের অবস্থা কি উদ্বেগজনক নয়? ‘যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্ট প্রকাশের এখতিয়ার নেই’ বলে কি আমরা বলব-বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভাল।
যদি বলি- ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’। কথাটি হাস্যকর। তুমি আবার কে এমন কথা বলার। না বললেও শেখ হাসিনা এদেশের প্রধানমন্ত্রী। এটাই বাস্তব। কিন্তু, আমি বলার কে? আমার বলা না বলার এখতিয়ারকে কেন্দ্র করে বাস্তবতাকে বাদ দেওয়া যাবেনা। অস্বীকার করা যাবেনা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ‘যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার নেই’ এ কথাকে ভিত্তি করে বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের উদ্বেগজনক বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মার্কিন রিপোর্ট অনুযায়ী চরম রাজনীতিকীকরণের ফলে এদেশের বিচারব্যবস্থা আরো সমস্যাগ্রস্ত হয়েছে। বিরোধি মতের লোকজনের বিচার পাওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। তথ্যটি কি ভিত্তিহীন? সে রিপোর্টে ১১ এপ্রিল-২০১০ ইং তারিখে হাইকোর্ট বিভাগে দলীয় বিবেচনায় ১৭ জন বিচারক নিয়োগের প্রসঙ্গটি এসেছে। হত্যা এবং কোর্টে ভাংচুরের অভিযোগে তখনকার প্রধান বিচারপতি তাদের দু’জনকে শপথও দেননি। আবার পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দিক মাথায় রেখে ২৬ সেপ্টেম্বরে দুইজন সিনিয়র বিচারপতিতে ডিঙিয়ে এবিএম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগও যে বিচার বিভাগে নগ্ন দলীয়করণ-সেকথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েক হাজার মামলা প্রত্যাহার এবং বিরোধি দলের মামলা শুধু বহাল নয়; কারো কারো মামলার ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেখানে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে কথা বলেন সেখানে বিচার বিভাগের অবস্থা বর্ণনা করার আর কি আছে।
কারাগারগুলোর ভয়াবহ চিত্র, হাজতি ও কয়েদিদের মানবেতর জীবন-যাপন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিষয়টিও উঠে এসেছে সে রিপোর্টে। ২০১০ সালে কারাগারে ৪৬ জনের মৃত্যুর কথাটি অধিকারের রিপোর্টের। আর পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে আরো ১০৯ জনের। আহত ও পঙ্গু হওয়ার ঘটনা তো অনেক। ক্রসফায়ারের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ক্রসফায়ারে বিচার বহির্ভুত হত্যার শুরু সিরাজ শিকদার থেকে। সর্বশেষ র্যাবের হাতে ঝালকাঠির লিমনের পঙ্গু হওয়ার ঘটনা সবার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। হায় লিমন! তোমার উপর মর্মান্তিক অত্যাচারের কাহিনীর পরও কি বলব ‘দেশে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা উদ্বেগ জনক নয়’!
বিরোধি মতালম্বীদের বিচার প্রাপ্তির পথ সংকোচন বা তাদের চরম মানবাধিকারের লংঘনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উদাহরণই যথেষ্ট। একজন সংসদ সদস্যকে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে গ্রেফতার এবং পুলিশি হেফাজতে তার উপর অকথ্য নির্যাতন প্রমাণ করে বিচার পাওয়া কঠিনই নয়; অসম্ভবও বটে। সাজানো একটি মামলায় আটক করে জামিনের পরও যুদ্ধপরাধের নামে বিনা বিচারে আটক রাখা এবং নির্যাতন করা-এ কোন সভ্য সমাজের দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ, বিরোধি দলীয় চীপ হুইপ এবং স্বয়ং সাকা চৌধুরীর স্পীকারের নিকট সংসদ অধিবেশনে যোগদানের ব্যাপারে চিঠি আদান-প্রদানের পরও আটক রাখা-এ কেবল বর্বর যুগেই মানায়।
সংবিধানে বাক স্বাধীনতা এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি সুস্পষ্টভাব উল্লেখ থাকার পরও এ স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে বলে মার্কিন রিপোর্টে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান আর যমুনা টিভি বন্ধ করে কয়েক হাজার সাংবাদিককের কর্মসংস্থান কেড়ে নেয়া হয়। বিরোধি মতের সংবাদ মাধ্যম এবং সাংবাদিকের উপর সরকারের খড়গহস্তের প্রমাণ একজন মাহমুদুর রহমান। তাকে গ্রেফতার এবং পুলিশি হেফাজতে অকথ্য নির্যাতন, তারপর আবার অসুস্থ অবস্থায় রিমান্ড মঞ্জুর-সরকারের মানবাধিকার লংঘনের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে আদালতেরও ভুমিকা নিয়ে। মাহমুদুর রহমান এবং রিপোর্টার অলিউল্লাহ নোমানকে আইন অমান্য করে কারাদন্ড ও জরিমানা বিধান, শাস্তি ভোগ করে বেরিয়ে আসার পরও রায় না লেখা-আদালতের মানবাধিকার লংঘনের মধ্যে পড়ে কি-না বলার সাহস রাখিনা। এ ধরণের নজির পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি? আরো বিভিন্নভাবে সাংবাদিকরা মানবাধিকার লংঘনের শিকার। অধিকার এবং মিডিয়া ওয়াচডগ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে নিহত হয়েছেন ৪ জন সাংবাদিক, আহত ১১৮, গ্রেফতার ২, মামলা মামলা দায়ের ১২ টি, হয়রানী ৪৩ জনকে আর হুমকি দেয়া হয়েছে ৪৯ জন সাংবাদিককে।
মানহানির নামে মামলা দায়েরের ঘটনা এ সরকারের আমলে এক নতুন রেকর্ড। একজনের বিরুদ্ধে একটি কোর্টে নয়; জেলায় জেলায় মামলা। এক জেলায় হাজিরা দিয়ে আরেক জেলায় রওয়ানা এবং একই দিনে দুই জেলায় হাজিরা থাকায় এক জায়গায় জামিন, আরেক জায়গায় সমন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী শুধু নন; আলেম-উলামা আর বুদ্বিজীবিদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। রেহাই নেই নারী ও শিশুদেরও।
মিছিল-মিটিং গণতান্ত্রিক অধিকার। বিরোধি দলগুলো এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ২০১০ সালে ১১৪ বার ১৪৪ ধারা জারি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সমাবেশে প্রকাশ্যে গুলি করে, সাপের মত লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ২০০৬ সালেই শুধু নয়; এই সেদিনও ঘটেছে। নাটোরে সানাউল্লাহ নুর বাব্রু সে মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে গোটা জাতি। চেঙ্গিস খান কি তার চাইতেও বর্বর ছিল? হত্যার পাশাপাশি গুম করার ঘটনাও ঘটছে। চৌধুরী আলমের হদিস আজও মেলেনি। মুফতি আমিনীর ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার সাম্প্রতিক। এসব কি মানবাধিকার লংঘনের মধ্যে পড়েনা?
নারীরা আজ পদে পদে হয়রানীর শিকার। ইভটিজিংয়ের সয়লাব গোটা দেশে। মানবাধিকারের লংঘনই শুধু নয়; মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকারও হারাচ্ছে অনেকেই। জীবন বিপন্ন হওয়ার সংখ্যা অনেক। শুধু কি ইভটিজিং? হলে বা ছাত্রাবাসে থাকার গ্যারান্টি পেতে সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের লালসার শিকার অনেকেই। ছাত্রীদের প্রতি সরকার দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের (সুনজর!) সবারই জানা। ইডেন কলেজের অনেক মেয়েকে জ্বোর করে মন্ত্রী-এমপিদের বাসায় পাঠানো হয়েছে কেবল মনোরঞ্জনের জন্য। আরো কত ঘটনা দৃষ্টির আড়ালে। সামাজিক মান-সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেক নারী বর্বর নির্যাতনের কাহিনী প্রকাশ করছেনা।‘বুক ফাটে তো-মুখ ফুটেনা’- এরকম।
শেয়ার বাজারের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে দিশেহারা অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী। মুল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দুরে থাক, নামই প্রকাশ করা হয়নি। সরকার দলীয় একজন এদেরকে ‘ঠান্ডা মাথার খুনী’ বলার পরও কি বলব না ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী অধিকার বঞ্চিত। লংঘিত তাদের মানবাধিকার। পদত্যাগের দাবী উঠার পরও যারা পদত্যাগ না করেন তারাই হয়ত বিষয়টিকে ভিন্ন ভাবে দেখবেন।
অসহায় প্রশাসন। বিরোধি মতের লোকজন আর সাধারণ মানুষ ছাড়াও সরকারী কর্মকর্তা, প্রশাসনের লোকজনের উপরও ভয়াবহ তান্ডব। সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের অমানবিক আচরণে চোখের পানি ফেলছেন প্রশাসনের অনেকে। নির্বিকার পাবনার ডিসির রুমাল হাতে চোখের জল মুছার দৃশ্য এখনো পুরোপুরী ইতিহাস হয়নি এখনো।
ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ মেধাবী ছাত্র আবু বকরের মৃত্যুকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলার পর পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকেনা। সারাদেশের চলে চিরুনী অভিযান আর প্রকাশ্যে গুলী করে আরো দু’একজন ছাত্র হত্যা করে প্রতিশোধ। আবু বকরের ঘটনা কেবল মানবাধিকার লংঘনের মধ্যে পড়েনা।
মানুষের অধিকার রক্ষার নাম মানবাধিকার। এ অধিকার আজ পদে পদে ভুলুন্ঠিত। সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের দখলবাজি, টেন্ডারবাজি আর নানা অপকর্মে অতিষ্ট মানুষ। কোন না কোন জায়গায় নিরীহ মানুষের বাড়ি কিংবা জায়গা-জমি দখলের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। প্রতিকার নেই। পত্রিকার পাতায়ও আসছেনা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বেপরোয়া আচরণে বিরোধি মতের সমর্থকরা নিরুপায়। আবাসিক হলগুলো থেকে বিতাড়িত শুধু নয়; অনেক নেতা-কর্মী ছাত্রলীগের ভয়ে ছাত্রজীবনেরও ইতি টেনেছেন। পরিসংখ্যান নিলে সে সংখ্যা নিতান্তই কম হবেনা। হলে থাকা একজন ছাত্রের অধিকার, শিক্ষালাভ তার অধিকার। সে অধিকার থেকে বঞ্চিত। এরকম আরো কত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা অহরহ ঘটছে, আসছেনা পত্রিকার পাতায়। থেকে যাচ্ছে দৃষ্টির অগোচরে।
মানবাধিকার লংঘনের কিছু খন্ড চিত্র তুলে ধরার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষায় বলতে হয়-আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের ২০১০ সালের মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্টটি দুর্বল। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী যে অর্থ বুঝিয়েছেন সে অর্থে নয়। আমরা বলব-বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের চাইতে আরো ভয়াবহ। ভয়াভহ সব চিত্র পুরোপুরী রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়নি। কিছুটার বিবরণ এসেছে । সেসব ঘটনা বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পেয়েছে রিপোর্টটি তৈরী হয়েছে কেবল সেসব ঘটনার আলোকে। কত ঘটনা যে এখনো অপ্রকাশিত।
লেখকঃ স্টাফ রিপোর্টার, দি নিউ নেশন |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/EhsanulHaqueJasim |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|