নববর্ষের এই দিনে সবার জন্য রইল শুভেচ্ছা, প্রাণঢালা শুভ নববর্ষ। এই জনপদ জীবনের জয়গানে মুখর হয়ে উঠুক, সব প্রতিবন্ধকতার জটিল জাল ছিন্ন করে জীবন বলিষ্ঠ হয়ে উঠুক, সুষ্ঠু জীবনবোধ প্রতিষ্ঠিত হোক_ এই দিনে তাই আমাদের কামনা। সমাজের সর্বস্তরে, ধনী-নির্ধন-নির্বিশেষে মানবতার বিজয় ঘোষিত হোক। তাই হোক এই দিনের স্লোগান। জীবন মানেই যে যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত পরিণতি যে বিজয়, তা যেন সবার অহঙ্কারে পরিণত হয়_ তাই হোক এই দিনের কামনা। কিন্তু কামনা করলে কি হবে, যে পরিবেশে জীবন আমাদের আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত, নিঃশেষপ্রায়, সে পরিবেশও রয়েছে সমগ্র স্মৃতিজুড়ে। পুরনো বছরটা শেষ হয়েছে বটে, কিন্তু শেষ হয়নি বছরব্যাপী যন্ত্রণার রেশ। বৈশাখ এসেছে বটে, কিন্তু চৈত্রের দাবদাহের চণ্ডতার অনুভব এখনো শেষ হয়নি। চারপাশে যেসব হিংস্র হায়েনা প্রশান্ত জীবনের মাংস-মেদকে খুবলে খুবলে রক্তাক্ত করেছে, তাদের আস্ফালন এখনো থামেনি। এখনো তাদের পৈশাচিক উল্লাসে চারদিক থমথমে। পহেলা বৈশাখ তাই সেই চিরন্তন প্রশ্ন নিয়েই উপস্থিত হয়েছে আমাদের দোরগোড়ায়। কীভাবে জীবন জীবন্ত থাকবে? কীভাবে মানুষ পেঁৗছবে তার গন্তব্যে? রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে আহ্বান জানিয়েছেন তার গেরুয়া বস্ত্রাঞ্চল দ্বারা এসব হিংস্র হায়েনা শ্বাপদদের ঢেকে দিতে।
'তোমার গেরুয়া বস্ত্রাঞ্চল
দাও পাতি নভস্তলে বিশাল বৈরাগ্যে আরবিয়া
জরা মৃত্যু ক্ষুধা তৃষ্ণা, লক্ষ কোটি নরনারী হিয়া
চিন্তায় বিকল_
দাও পাতি গেরুয়া অঞ্চল।'
কাজী নজরুল ইসলাম সম্ভবত এমনি পরিস্থিতিতেই সবাইকে পথের দিশা দিয়ে লিখেছেন :
"চারিদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েশির আখড়া দিয়ে
রে অগ্রদূত চলতে কি তুই পারবি
আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?
পারবি যেতে ভেদ করে এই বক্র পথের চক্রব্যুহ?
উঠবি কী তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ?"
চিরন্তনী এসব প্রশ্ন নিয়ে পহেলা বৈশাখ এসেছে আমাদের ঘরে ঘরে। ডাক দিয়েছে সবাইকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যের মূলধনকে সচল করে জীবনযুদ্ধে জয়লাভের প্রেরণার ডালা সাজিয়ে।
জীবন মানে অন্ন-বস্ত্রের মতো পার্থিব সম্ভার যেমন, পরিশীলিত মন-মানসিকতার অলঙ্কারস্বরূপ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও তেমনি। দুই-এ মিলেই জীবন এবং জীবনের সৌন্দর্য। আমাদের সমাজে উভয় ক্ষেত্রেই হিংস্র শত্রুর দৃপ্ত পদচারণা। একদিকে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অসহায়ত্ব জীবনটাকে যেমন করে তুলেছে ন্যুব্জ, অন্যদিকে ছোঁয়াচে দাদ-পাঁচড়ার মতো অপ-সংস্কৃতিও জীবনবোধকে ক্ষত-বিক্ষত করে চলেছে। বিশেষ করে যে তারুণ্যের মধ্য দিয়ে আমরা হাজার বছর বেঁচে থাকতে চাচ্ছি, তাকে পরাশ্রয়ী এবং নির্ভরশীল করে চলেছে। নববর্ষের এই শুভ মুহূর্তে সেদিকেও দৃষ্টিপাত হওয়া ভালো সবার।
আদান-প্রদানে দোষ নেই, বরং আদান-প্রদানের মাধ্যমেই জীবন সমৃদ্ধ হয়। যে ক্ষেত্রে আমার ঘাটতি রয়েছে অন্য জন বা অন্য স্থান থেকে উদারভাব গ্রহণ করে আমরা তা পূরণ করতে পারি। কিন্তু আমি কিছু না দিয়ে শুধু গ্রহণ করলে, সে হাত হয়ে উঠবে ভিক্ষুকের এবং ভিক্ষুকের হাত কোনো সময় মর্যাদাপূর্ণ নয়। যিনি দিতে পারেন, তিনিই শুধু অপরের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারেন। এ কারণেই আত্দসম্মানসম্পন্ন ব্যক্তি বা জাতি নিজেদের অতীত অবস্থানে গৌরববোধ করে এবং অতীত ঐতিহ্যের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণ করে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে নিরস্ত হয়। এই দিনে আমাদের, বিশেষ করে আমাদের তরুণ-তরুণীদের এ কথা স্মরণে আনা ভালো। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সমাজে নববর্ষের দিন শুধু উৎসবের। আমাদের সমাজে এটা একদিকে যেমন উৎসবের, অন্যদিকে তেমনি সচেতনভাবে অতীত দর্শনের। কৃষি উৎপাদন-মৌসুমের প্রাচুর্যের ভিত্তিতে গড়া নববর্ষের আনন্দ একদিকে যেমন মিষ্টিমুখ করার, অন্যদিকে তেমনি সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবনের চারপাশে নিজস্ব ঢংয়ে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে জীবনটাকে এক উপভোগ্য কলায় রূপান্তরিত করার উদ্যোগও।
এ জন্য এই দিনে উৎসব যতটুকু তাৎপর্যপূর্ণ, অন্যদিকে আত্দসচেতন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনমুখী হওয়াও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার The Republic গ্রন্থের তৃতীয় ভাগে বলেছেন, 'স্টাইল শ্রুতিমধুর, আবেদনপূর্ণ আকর্ষণ ও সুমধুর ছন্দের সৌন্দর্যের ভিত্তি হলো সরলতা' (Beauty of style and harmony and grace and good rhythm depend on simplicity)। আমাদের সমাজে কিন্তু পরনির্ভরশীলতা এবং অনুকরণপ্রিয়তার যে মচ্ছব শুরু হয়েছে, তাতে ভয় হয় নববর্ষের সহজ-সরল ও সনাতন রূপকে কৃত্রিমতার রং চড়িয়ে যারা জাতীয় এই দিনটিকে বিজাতীয় স্টাইলে পালনে উদ্যত, আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাতে যেন গা ভাসিয়ে না দেয়।
এ দিনটির আবেদন সমগ্র সমাজের কাছে, বিশেষ করে যারা উৎপাদনশীল উদ্যোগে নিয়োজিত রয়েছে, তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি। উৎসব হিসেবে দিনটিকে পালন করেন সাড়ম্বরে প্রধানত সমাজের উৎপাদনকারীদের উৎপাদনে জোরপূর্বক ভাগ বসানো ব্যক্তিবর্গ। ভয়টা এ কারণেই বেশি। পহেলা বৈশাখের ভোরে সিল্কের শাড়ি ও পাজামা-পাঞ্জাবি পরে পান্তাভাত এবং ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে তারা বসে পড়েছেন; এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন আর জীবনে যেন প্রথমবারের মতো পাওয়া অমৃত নিঃশব্দে গলাধঃকরণ করছেন পরম তৃপ্তির সঙ্গে। খাওয়া শেষ করে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে এপ্রান্তে ওপ্রান্তে যে দৃষ্টিকটু দৃশ্যের অবতারণা করছেন। অনেকের কাছে এটা হলো নববর্ষের উদযাপন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ স্থানে সকালে পান্তাভাত খেয়ে যারা সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিন শেষে শ্রান্ত দেহে বাড়ি ফিরেও পেট ভরে খাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না, নববর্ষের অনুষ্ঠানটি আসলে তাদেরই। কিন্তু তাদের কথা ভাবি কি? কে ভাবে তাদের কথা? তাই কৃত্রিমতা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের ভণ্ডামি এবং প্রতারণাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয় অনেক সময়।
নববর্ষের মতো শুভদিনেও তাই ভণ্ডামিই প্রধান হয়ে ওঠে। এই সমাজের প্রায় অর্ধেকই বসবাস করেন দারিদ্র্য সীমারেখার নিচে। জনসমষ্টির প্রায় অর্ধেক এখনো রয়ে গেছেন নিরক্ষর। তারুণ্যের বিরাট এক সংখ্যা বেকারত্ব অথবা আধা-বেকারত্বের অভিশাপে অভিশপ্ত। সরকার আসছে, সরকার যাচ্ছে, কিন্তু এই দারিদ্র্যপীড়িত, নিরক্ষর, অসহায় ও বঞ্চিতদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসেনি।
নববর্ষের এই দিনে সমাজের এই বৃহত্তর অংশে, বিশ্বখ্যাত, নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়রের (William Shakespeare) কথায়, হতভাগ্যদের জীবনে অন্য কোনো ওষুধ নেই, শুধু আশা ছাড়া The miserable have no other medicine but only hope.- Measure of measure, part III Line 3] নববর্ষের এই শুভ দিনে এসব হতভাগ্যের জীবনে আশা ছাড়াও কিছু প্রাপ্তি ঘটুক_ এটা কামনা করছি।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন,১৫/০৪/১২) |
---------------------
বৈশাখ আমাদের বাংলা বর্ষের প্রথম মাস। বড়ই আনন্দ উৎসবে পালিত হয় বাংলা নববর্ষ। কবি সাহিত্যিকের কত কল্পনাই রচিত হয়ে যুগে যুগে। সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে থাকে নানা আয়োজন, ইদানিং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্টান যোগ দিয়ে নিজেদের বিজ্ঞাপন হিসাবে। থাকবেনা কেন? ভিন্নদেশী ৩১শে ডিসম্বর যদি পালন হতে পারে তাহলে স্বীয় বর্ষের দিনটি পালিত হবেনা কেন? তবে দেখা যায় যারা ৩১শে ডিসম্বর নিয়ে মত্ত থাকেন তারাই আবার ১লা বৈশাখ নিয়ে ব্যস্ত হন, ফলে তাদের আসল পরিচয়টি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তারা আসলে কি বৈশাখী? নাকি ডিসম্বরী। এইসব আচার অনুষ্টানে ভয় আঁতঙ্কও কম নয়। হয়ত বোমা হামলা, নয়ত গনধ্বর্ষণ, মোতায়েন করতে হয় অতিরিক্ত বেতন ভাতা দিয়ে হাজার হাজার আইন শৃঙ্খঁলা রক্ষাকারী বহিনী, তারপরেও ঘটে যায় অপ্রকাশিত হাজারও ঘটনা, হারিয়ে যায় কলিজার টুকরা শিশুটি, পালিয়ে যায় তরুনী বন্ধুর সাথে, অপহরন হয় শত সূন্দরী, গনধ্বর্ষণ হয় বদ্ধ ঘরে, সবই জানে সবাই তারপরও বিজ্ঞ জনেরা প্রসংশায় মত্ত, বৈশাখ যেন আগে কোনোদিন আসে নাই এবং আগামীতে আসবেও না।
------------------------------
বৈশাখ বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বটে তবে আনন্দ উৎসবের নয়। এই বৈশাখীকে ঘিরেই উজ্জিবীত হয় যাবতীয় নরপিচাশের কর্মকান্ড আথচ জাতী হয় আনন্দিত। বৈশাখ নিয়ে আমরা এতো আনন্দ করি অথচ তার নাম দিয়েছি �কাল বৈশাখী� এটি একেবারে স্ববিরোধী কথা, যারা স্ববিরোধী কথা বলেন, কর্ম করেন, বলা হয় তাদের জ্ঞানে �পাপ� ধরেছে। বৈশাখীর তান্ডবে তচনচ হয়ে যায় ঘরবাড়ি, ধ্বংস হয়ে যায় সারা বছরের পুঁজিপট্টা, ভেঁঙ্গে যায় আগামীর স্বপ্ন। আশ্রয় নিতে হয় বেড়ীবাঁধে খোলা আকাশের নিচে। ধেয়ে আসে ঝড় জলউচ্ছাস, ধ্বংস হয় পরিশ্রমের ফসল, মাথায় হাত দিয়ে কাঁদে কৃষক, প্রবল শ্রোতের ভাঁঙ্গনে হারিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম, বন্ধ করতে হয় স্কুল কলেজ, স্তদ্ধ স্বাভাবীক জীবন যাত্রা। আর আমরা কিছু দালান কোটা বসীরা বৈশাখী আনন্দ করি রমনা বটমূলে, টিএসির মোড়ে, রঙ্গীন শাড়ী পড়ে, বছরে খাই একবার পান্থাইলিশ যেন চৌদ্দ গোষ্টির কেউ খায় নাই। এটি কি উপহাস নয় সর্বস্বহারাদের সাথে! -----
বৈশাখ ধ্বংসের মাস, বৈশাখ গৃহ হারা হাওয়ার মাস, বৈশাখ নিরাশ্রয় হাওয়ার মাস, উজ্জত আবরু হারানোর মাস, বৈশাখ স্বজন হারানোর মাস, বৈশাখ গনধ্বর্ষণের মাস, বৈশাখ স্বপ্ন ভঙ্গ হাওয়ার মাস, বৈশাখ অর্থ অপচয়ের মাস, বৈশাখ একটি আঁতঙ্কের মাস। তাই বৈশাখ আমাদের জীবনে আনন্দ নয়, 'কাল' 'মহাকাল' আসুন বৈশাখ থেকে বাঁচি, বৈশাখ থেকে মুক্তি চাই, যিনি মুক্তি দিতে পারেন তার কাছে, যাই সেইখানে যেখানে মুক্তি চাইলে পাওয়ার আশা আছে। বিরত থাকি এই ধ্বংসকে আহ্বান জানানো থেকে। ধন্যবাদ