|
ঢাকার ট্রাফিক সমস্যাঃ আজই উদ্যোগ নিন
প্রকৌশলী মইন খান |
|
ঢাকার ট্রাফিক সমস্যা একটি বহুল আলোচিত ইস্যু। এপর্যন্ত এ নিয়ে বহু আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু সব গবেষণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এ সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। সমস্যা এখন এতটাই প্রকট যে এর থেকে আর একটু খারাপ হলেই সব কাজকর্ম বন্ধ করে মানুষকে ঘরে বসে থাকতে হবে। এর প্রমাণ শহরবাসী গত এক বছরে বেশ কয়েকবারই পেয়েছে এবং এর প্রতিবারই ঢাকা শহর প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, মানুষ রাস্তায় একেবারে আক্ষরিক অর্থেই বসা ছিল প্রায় অর্ধেকটি করে কর্মদিবস।
শিক্ষাসূত্রে আমি একজন ট্রান্সপোর্ট প্রকৌশলী। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাধান খুঁজতে গিয়ে প্রায় প্রতিবারই ভেবেছি, বাসা বদলে চলে যাব অফিসের কাছাকাছি কোন এলাকায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি পুরনো এলাকার মায়ায়। আমার ধারণা, অনেকেই আমার মত মায়ার কবলে পড়ে বাড়ি বদলানো থেকে বিরত আছেন এবং ফলশ্রুতিতে বছরের পর বছর ধরে ভুগছেন ট্রাফিক নামের অমোঘ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে এভাবে চিরদিন চলতে পারে না, সুতরাং বহু প্রায়-বিফল ও অর্ধ-সফল আলোচনার মত একইভাবে এই লেখার অবতারণা এবং যথারীতি আলোচনার ভেতর দিয়ে আমাদের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা।
প্রথমে ঢাকার এই ট্রাফিক সমস্যার মূল কারণের দিকে দৃষ্টি দিই। এ বিষয়ে ঢাকাবাসী বিশেষ করে গাড়ীচালকদের একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হল, ঢাকার ট্রাফিক সমস্যার প্রধান কারণ রিক্সা, সুতরাং রিক্সা উঠিয়ে দিলেই ঢাকার রাস্তায় উচু ভলিউমে গান বাজিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ছোটাছুটি করা যাবে। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা অত সরল নয়। বরং রিক্সা উঠিয়ে দিলে অনেকেই গাড়ীতে যাতায়াতে বাধ্য হবেন যারা আগে রিক্সায় যাতায়াতে অভ্যস্ত ছিলেন। তখন গাড়ির ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে ছোট ছোট গলিগুলোও যে জ্যামের হাত থেকে রক্ষা পাবেনা তা নিশ্চিত করে বলা যায়না কিন্তু।
একটু বইপত্র ঘাটলে যে কেউই বুঝতে পারবেন, ঢাকার ট্রাফিক সমস্যার মূলে আছে এর গঠন, এর অবকাঠামো এবং এর বেড়ে ওঠার ভেতর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবের বিষয়টি। ঢাকার মানচিত্রটির দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে, ঢাকার রাস্তাগুলো গ্রিড ধরনের না, আর এর এলাকাগুলোও আদর্শ বর্গাকৃতির না। বরং ঢাকা বেড়ে উঠেছে লম্বালম্বি, মানচিত্রে যার প্রধান দুটো রাস্তাকে দেখা যাবে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত - যেন দুই মেরুদন্ডের কিম্ভুত এক প্রাণী। হ্যাঁ, কিম্ভুতই বটে ঢাকার এ গঠন - আর এটা বিশ্বাস করাও সত্যিই কঠিন যে একটা মেগাসিটি বেড়ে উঠেছে এবং উঠছে এই কিম্ভুত আকৃতিটিকে কেন্দ্র করেই।
সমস্যা যেহেতু মানচিত্রে, এর সমাধানও হতে হবে মানচিত্রেই এবং স্বাভাবিকভাবেই বড় মাপের। উত্তরা এবং সাভারের মত এলাকাগুলোকে সত্যিকার স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ এদের শুধু উপশহর বানিয়ে ছেড়ে দিলেই হবেনা, কেন্দ্রের সাথে এর যোগাযোগও হতে হবে দ্রুত এবং একান্ত। প্রচলিত রাস্তাগুলো দিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসার ব্যবস্থা করলে কোন লাভ হবে না, যেমনটি এখন করা হয়েছে উত্তরা থেকে ঢাকায় আসা মানুষগুলোর জন্য। উত্তরা থেকে প্রচলিত রুটেই কেন্দ্রে আসার ব্যবস্থা করার ফলে কিছু রাস্তায় চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে শুধু, উত্তরা আজতক আদর্শ উপশহর হয়ে উঠতে পারে নি। এখন আবার পূর্বাচল উপশহর থেকে তিনশ ফিট রাস্তা এনে ফ্লাইওভার দিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, একটুও ভাবা হচ্ছেনা প্রায় বত্রিশ হাজার প্লট থেকে এতগুলো গাড়ী এয়ারপোর্ট রোডে এসে ঢোকার পর সেই রাস্তাটি আদৌ এর চাপ নিতে পারবে কিনা।
বিশ্বের বড় বড় শহরে যা করা হয়, আমাদেরও সেটা করতে হবে। প্রতিটি উপশহর থেকে কেন্দ্রে আসার জন্য ম্যাস ট্রান্সিটের অর্থাৎ গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে - সেটা উড়ালট্রেনের মাধ্যমেই হোক, কিংবা পাতাল রেলেই হোক, কিংবা টোলওয়েতেই হোক। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে, এই রাস্তাগুলো হবে এক্সক্লুসিভ এবং প্রচলিত রাস্তাগুলোর সাথে এদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। উদাহরণ দেই, উত্তরা থেকে একটি উড়ালট্রেনের রাস্তা যদি গুলশান হয়ে ফার্মগেট ধরে মীরপুর গিয়ে ফিরে আসত, আর আরেকটা যদি যেত সায়েদাবাদ হয়ে মতিঝিল স্পর্শ করে গুলিস্তানের দিকে - তাহলে আধাঘন্টার ভেতরে একজন উত্তরা থেকে মীরপুর কিংবা গুলিস্তানে যেতে পারত, মতিঝিল কিংবা গুলশানে আরো কম সময়ে। উত্তরা থেকে একজন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা মীরপুর বা গুলশানে অফিস করতে যেতে গাড়ী ব্যবহার করতে চাইতেন না, কেননা গাড়ীতে লাগে দুই ঘন্টা আর উড়ালট্রেনে বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট। তখন রামপুরা রোড কিংবা এয়ারপোর্ট রোডেও গাড়ীর চাপ কিন্তু অনেক অনেক কমে যেত। ফলে এ রাস্তাগুলোতেও লোকজন সহজে চলাফেরা করতে পারত, এমনকি সীমিত আকারে রিক্সাও হয়তো চলতে পারত এ রাস্তাগুলোতে। একইভাবে সাত কিংবা আটটা উপশহর যদি মেট্রো বা উড়ালপথে ঢাকার সাথে যুক্ত হত, তাহলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এশহর অনেকটাই নিতে পারত বলেই মনে হয়।
তবে আপনি আপত্তি করে বলতে পারেন, এই উড়ালট্রেনের কিংবা পাতালরেলের খরচ কে দেবে। আমাদের মত গরীব দেশের জন্য এটি একটি প্রাসংগিক প্রশ্ন অবশ্যই। কিন্তু সরকার যদি একটি ভালো প্রস্তাব দাঁড় করাতে পারে, দাতা সংস্থাগুলোর এতে আপত্তি করার কোন কারণ নেই। শত হলেও এটাতো সত্যি যে, সংস্থাগুলোর ঢাকাস্থ অফিসগুলোয় কর্মরত বিদেশী নীতিনির্ধারকরাও ব্যক্তিগতভাবে ট্রাফিক সমস্যায় নিয়মিত মূল্যবান সময় অপচয় করছেন, অন্তত ব্যক্তিগত পর্যায়ে হলেও তাদের এ শহরবাসীর প্রতি একটা সহানুভূতি থাকার কথা। আর অর্থায়নের আধুনিকতম পদ্ধতিগুলোর কথা যদি বলেন, তাহলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তো আছেই। পৃথিবীর অনেক আধুনিক দেশেই এখন রাস্তাগুলো বিশেষ করে টোলওয়ে বানাচ্ছে প্রাইভেট কোম্পানীগুলো, বানানো শেষ হয়ে গেলে এ কোম্পানীগুলো দশ বা বিশ বছর ধরে টোল আদায় করে তাদের খরচ ওঠাচ্ছে। আমাদের দেশে যদি বড় বড় নির্মাণ কোম্পানীগুলো মিলে এরকম করে, আমার মনে হয়না টোল বা বাড়তি ভাড়া গুনতে অনাগ্রহী হবে ঢাকাবাসী।
এবার আসা যাক অভ্যন্তরীণ নগর পরিকল্পনার কথা। রাজউক যখন কোন ভবনের জন্য অনুমতি দেয়, তখন সেই ভবন আশেপাশের রাস্তাগুলোর ওপর কোন চাপ সৃষ্টি করবে কিনা সেটা কোন স্বীকৃত বা আধুনিক উপায়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখে নেয় না। পৃথিবীর যেকোন আধুনিক শহরেই কিন্তু ভবনের অনুমতি নেবার আগে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস করতে হয়, যার ফলে বোঝা যায় এ ভবনটি নির্মাণ করার ফলে আশেপাশের রাস্তার ওপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা। এরকম বিশ্লেষণ করা হলে সর্ববৃহৎ শপিং মলগুলো বর্তমান অবস্থানে আর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো ধানমন্ডিতে সারে সারে অনুমতি পেত বলে মনে হয় না। এই বাংলাদেশেই গত কয়েক বছরের ভেতর কারখানা বসানোর জন্য এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যানালাইসিস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার ফলে বোঝা যাচ্ছে একটি বিশেষ কারখানা স্থাপনের ফলে আশেপাশের এলাকার পরিবেশে কোন বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা। একইভাবে ভবনের অনুমতি নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস বাধ্যতামূলক করার সময় এসে গেছে বলেই মনে হয়।
অবকাঠামোর সাথে জড়িত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও একটি বড় বিষয়। কোলকাতায় নাগরিক সেবা (পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন) দানকারী সংস্থাগুলো সব মিউনিসিপ্যলিটির অধীনে মেয়রকে প্রধান মানে এবং রিপোর্ট করে। ঢাকায় কিন্তু এ সংস্থাগুলো (ওয়াসা, ডেসকো, তিতাস, রাজউক, সিটি কর্পোরেশন) আলাদা আলাদা মন্ত্রনালয়ের অধীনে এবং একারণে এদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রাত্যহিক একটি সমস্যা। অন্যদিকে পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়ের জন্য গঠিত ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড বলতে গেলে অকার্যকরই রয়ে গেছে আজতক।
এসবের পর মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মত আছে ভিআইপি সমস্যা - হঠাৎই নোটিশ ছাড়া এবং বিকল্প হিসেবে বাসরুটের ব্যবস্থা ছাড়াই কোন বিশেষ রোডকে ভিআইপি করে দিয়ে রিক্সা উঠিয়ে দেয়া। বারোটা বাজে শুধু মধ্যবিত্তের বা সীমিত আয়ের মানুষের। আর সরকারী ভিআইপিদের জন্য রাস্তার সিগন্যাল আটকানো তো আছেই। সেদিন কোন সিগন্যালে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগায় ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। সে যখন বলল -ভিআইপি যায়- তখনই আমার শিরদাড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যায়, জানিনা কত ঘন্টা এখন বসে থাকতে হবে এভাবে। সপ্তাহে একদিন না একদিন এ আতংকে আমাকে পড়তে হয়ই। অবশ্য সেই রোববারের কথা আলাদা।
সেদিন ছিল রোববার। অফিস থেকে ফিরছি বাসায়, সামনে দেখি রাস্তা অস্বাভাবিকরকম ফাঁকা। আবার ড্রাইভারের স্মরণাপন্ন হই - বিষয়টা কি। সে হাসে, বলে - ভিআইপি যায়। আমি অবাক হই। তখন সে বুঝিয়ে বলে - ভিআইপি পিছনে আছে, সুতরাং যত সামনে যাবেন রাস্তা ফাকা পাবেন। দেখলাম, ঘটনা সত্য। সেদিন বাসায় আসতে আসতে আর উল্টোদিকের রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি থমকে দাড়িয়ে দেধার পরও ভিআইপিকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারিনি - শত হলেও মানুষ মাত্রই স্বার্থপর।
তবে এটাও ঠিক - কোন উপায়ে যদি ঢাকার সব লোকই কাজের পর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারে, তাহলেও আমার তেমন আপত্তি থাকবে বলে মনে হয় না - সে আমি যত বড় স্বার্থপর জীবই হইনা কেন।
লেখকঃ প্রকৌশলী, আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত, ইমেইল, mainulhusain@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/EngrMoinKhan |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|