|
ইভটিজিং!
ফখরুজ্জামান চৌধুরী |
|
মিছিলটি দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো জায়গা থেকে পাওয়া যায় দুঃসংবাদটি। আত্মহননের খবর। কারণ বিরক্তিকর একঘেয়েভাবে একটাই : ইভটিজিং! অপঘাতে এই যে মৃত্যুর খবর শুনি, এর থেকে কবে আমাদের পরিত্রাণ মিলবে, তাই ভাবছি।
শব্দটা কেন ইভটিজিং হলো, এই প্রশ্নও সঙ্গে সঙ্গে মনে জাগে।
উপমহাদেশে প্রথম শব্দটির প্রচলন হয় বিশ শতকের ষাটের দশকে। ভারতের মুম্বাই শহরে তরুণীকে উত্ত্যক্ত করার একটি খবর পত্রিকায় পরিবেশন করার সময় ইভটিজিং কথাটি ব্যবহার করা হয়।
ইভ বাইবেলের সেই শাশ্বত নারী। নারীকুলকে ইভের বংশধর ডাকা হয়। কিন্তু ইভ প্ররোচনা দানকারিণীও বটে! নিষিদ্ধ ফল খেতে অ্যাডামকে প্রলুব্ধ করেন ইভ। ধর্মগ্রন্থের এই কাহিনী সবার জানা।
সেই ইভের পরিচয়ে নারীকুলকে পরিচায়িত করার গভীরে পুরুষশাসিত সমাজের কোনো কূটকৌশল নিহিত আছে কিনা, নারীবাদীদের মনে এই প্রশ্ন আজ দেখা দিয়েছে।
প্রায়ই দেখা যায়, সমাজে যখন কোনো নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, একশ্রেণীর মানুষের লক্ষ্য থাকে কী করে ঘটনার জন্য ভুক্তভোগী নারীটিকে দায়ী করা যায়। বলা হবে, তার চালচলনে ছিল প্রলুব্ধ করার প্রয়াস, কিংবা তার পোশাক-আশাক ছিল না যথেষ্ট শালীন। কিংবা তার রূপচর্চায় ছিল উগ্রতা। ভাবখানা এই যে, অপরাধী পুরুষটি অতিশয় নিরীহ প্রকৃতির। কাজটি ঘটেছে প্ররোচনার কারণে। আজকালও দেখা যায়, এত যে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তার পরও কখনও কখনও কাউকে বলতে শোনা যায়—এসব ঘটনার জন্য নির্যাতিত নারীরও দায় আছে। কেউ কেউ এক হাতে তালি বাজে না জাতীয় হাল্কা প্রবাদ আওড়াতে কসুর করেন না।
আত্মহননে প্রথম নাড়া দেয়ার মতো ঘটনাটি ঘটে বছর কয়েক আগে। আর্ট কলেজের ছাত্রী সিমি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন বখাটেদের উত্পাত সহ্য করতে না পেরে। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। তখন জনমত এতটা এই ঘৃণিত অপরাধ-কর্মের বিষয়ে জাগ্রত ছিল না, প্রতিবাদ উঠেছে। দিন কয়েক পর প্রতিবাদের তীব্রতা কমে যায়। যারা এই অঘটনের নাটের গুরু তারা বুক ফুলিয়ে সমাজে মুখই শুধু দেখায়নি, সিমিকে নিয়ে কটু কথা পর্যন্ত বলতে পিছপা হয়নি। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে গিয়ে তার সম্পর্কে না-হক রটনা করতে চেষ্টা করে। সমাজের মহলবিশেষ থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থনও পায় তারা। সিমির পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে ওঠে।
এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।
কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, সমাজে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, আত্মহননের মিছিলটিও দীর্ঘতর হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। প্রতিবাদে মুখর হচ্ছে সমাজ, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটছে। আরও শঙ্কার কথা, এতকাল যা সীমাবদ্ধ ছিল রাস্তার বখাটেদের মধ্যে, পাড়ার উঠতি মাস্তানদের মধ্যে—এখন তার সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে সমাজের উঁচু পর্যায়ের মানুষের মধ্যে। শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরা শামিল হয়েছেন এই হীন কাজে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষার পাদপীঠে পুরুষ সহকর্মীর হাতে যদি নারী সহকর্মী নিগৃহীত হন এবং নির্যাতনকারীকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসন সহায়কের ভূমিকা পালন করে, তাহলে বুঝতে হবে সামাজিক অবক্ষয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক সময়ে যা ছিল বখাটেদের দুষ্কর্ম, তা এখন অবলীলাক্রমে করে যায় সমাজের তথাকথিত আলোকিত শ্রেণীর কেউ কেউ।
পারিবারিক লাঞ্ছনার কারণে, প্রেমে ব্যর্থতার কারণেও বেশকিছু আত্মহননের ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে। সাধারণত কিশোরী-তরুণীরা যারা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হন, যুক্তিতর্ক দ্বারা পরিচালিত হতে পারেন না, তারা এই দুঃখজনক প্রক্রিয়ায় জীবনের সমাপ্তি ঘটান।
আত্মহনন যে কী কঠিন এবং নির্মম কাজ, তা নতুন করে বলার নয়। ধর্মীয় বিধানেও আত্মহননের মতো নির্মম কাজ থেকে বিরত থাকার বারংবার তাগিদ রয়েছে।
যারা আত্মহননের জীবনবিধ্বংসী পথ বেছে নেন, তারা যে অজ্ঞ তা তো নয়। নিতান্ত অসহায় না হলে কেউ কি এমন চরম সিদ্ধান্ত নেয়!
অল্পবয়সীরা অনেক সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজটি করে বসেন। এরা প্রেমে প্রতারিত হয়ে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পারিবারিকভাবে অপমানিত হতে পারেন—এমন ভীতি থেকেও আত্মহনন করে জীবন থেকে পালিয়ে যান।
অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চাশার সঙ্গে কারও যখন জীবনের বাস্তব অবস্থার মিল হয় না, কাউকে অসঙ্গতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়, বৈরী পরিবেশে বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার দিতে হয়, এক সময় তিনি হাঁফিয়ে যান, ক্লান্ত হয়ে পড়েন। চারদিকে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। কল্পনার ফানুসটি চুপসে যায়, নির্মম বাস্তবতা তার করাল চিহ্ন নিয়ে হাজির হয়, তখন নির্মম বাস্তবতা থেকে পলায়নই একমাত্র মুক্তির পথ মনে হয়।
সম্প্রতি আত্মহনন করেছেন এক গৃহিণী, কবি। স্বামীর সংসারে টানাপড়েন আর অন্যদিকে উন্নততর জীবনের হাতছানি। দুয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত আত্মহনন করে জীবনের সব লেনদেন শেষ করলেন তিনি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিপক্ষের সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা।
বলা হয়, যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, এর সঙ্গে জড়িত পাত্র-পাত্রীর ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। সাম্প্রতিক কালের ঘটনাপ্রবাহ তার প্রমাণ বহন করে।
যারা ঘটনার পরের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, তারা কৃতী মানুষ।
মানববন্ধন, পত্র-পত্রিকায় প্রতিবাদ, বক্তৃতা-বিবৃতি কোনো কিছুই তাদের নাড়া দেয় না।
কষ্ট লাগে যখন দেখি, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কারণে মৃত্যু-পরবর্তীকালেও শান্তি মেলে না আত্মহননকারীর আত্মার।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক
[সূত্রঃ আমার দেশ, ২৪/০৫/১০] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/FakhruzzamanChowdhury |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখক : কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক |
|
তাই, সমাজকে কোন আইনে নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়। সম্ভব যদি সে আল্লাহকে ভয়ূ করে। যিনি আল্লাহকে ভয় করেন তাকে কোন আইনের চাপে রাখতে হয় না। তার উপর বড় চাপ আল্লাহ ভিতি।
আর আল্লাহ ভিতির উৎস আল্ কোরআন। জায়েজ পথে সকল আনন্দ উপভোগ ইসলামে নিষেধ নাই। শুধু পথ আলাদা করা আছে। এই জানার অভাব বা মানার অভাবেই যত সমস্যা।