|
বছরে ৫ হাজার বৃটিশ নাগরিকের ইসলাম গ্রহণ: নতুন এক চ্যালেঞ্জ
ফরীদ আহমদ রেজা |
|
গত ৫ জানুয়ারী লন্ডনের ডেইলি মেইল পত্রিকার একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, হাও হান্ড্রেড থাউজেন্ড ব্রাইটন হ্যাভ চোউজেন টু বিকাম মুসলিম। বিলাতের অন্যান্য পত্রিকাও বিভিন্ন শিরোনামে খবরটি প্রকাশ করেছে। এ খবরের উৎস হচ্ছে সম্প্রতি সোয়ানসি ইউনিভির্সিটি পরিচালিত এক অনুসন্ধানী রিপোর্ট। এ রিপোর্টে বলা হয়, দশ বছর আগের অনুমান ছিল বৃটিশ জনগোষ্ঠীর ৬০ হাজার মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে প্রায় একশ হাজার বৃটিশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। প্রতি বছর ৫ হাজার ২ মানুষ মুসলমান হচ্ছেন বলে সেখানে অনুমান করা হয়। এ সকল বৃটিশ নওমুসলিমদের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই মহিলা এবং তাদের অধিকাংশের বয়স ২৮ বছর থেকে কম। সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে কেভিন ব্রাইস এ জরিপটি পরিচালনা করেন। কেভিন ব্রাইস কিছু বৃটিশ নওমুসলিমের কাছে প্রশ্ন রাখেন, কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করছেন? এর জবাবে অনেকে বৃটিশ কালচারের নেতিবাচক দিকগুলোর কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে নৈতিকতাহীনতা, মদ্যপান, মাতলামি, অবাধ যৌনাচার, নিয়ন্ত্রণহীন ভোগবাদ ইত্যাদি।
আমরা জানি ৯ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংস এবং ৭ জুলাই ২০০৫ লন্ডনে বোমা হামলার পর গোটা পৃথিবীর প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া মুসলমানদের বর্বর, প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাদপদ হিসেবে চিত্রিত করার নিয়ন্ত্রণহীন প্রয়াস চালাচ্ছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিডিয়াযুদ্ধ আগেও ছিল, কিন্তু এ দুটো দুঃখজনক ঘটনার পর এর মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মুসলমানদের অশিক্ষা, দারিদ্র্য এবং অনগ্রসর চিন্তার সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়াযুদ্ধ যোগ হবার কারণে ইসলাম সম্পর্কে ভালো ধারণা সৃষ্টি বা নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের পরিবেশ পাশ্চাত্য সমাজে প্রায় অনুপস্থিত। এমনি পরিস্থিতিতে বছরে ৫ হাজার ২শ বৃটিশ ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ অবশ্যই বিস্ময়কর ঘটনা। কেন প্রতি বছর হাজার হাজার বৃটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করছেন, যাদের মধ্যে অল্পবয়স্ক মহিলারা সংখ্যায় অধিক, অবশ্যই অনুসন্ধানের দাবি রাখে। বৃটিশ সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ নিয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন। এ কাজ প্রধানতঃ অমুসলমানরা শুরু করছেন। ইসলাম বা মুসলমানদের ব্যাপারে আগ্রহের কারণে নয়, বৃটিশ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তারা এ কাজে ব্রতী হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হবার কারণে বৃটিশ সমাজে যে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এর তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা কোন সচেতন সমাজ উপেক্ষা করতে পারে না। তাদের গবেষণা এবং বিশ্লেষণ থেকে আমরা অনেক তথ্য এবং তত্ত্বকথা জানতে পারবো এতে কোন সন্দেহ নেই।
এ দিকে হাজার হাজার বৃটিশ নাগরিকের ইসলাম গ্রহণের খবর আবার অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। যে সকল বৃটিশ প্রত্রিকায় আলোচ্য প্রতিবেদনের খবর প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোতে অনলাইনে মন্তব্য করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে বৃটিশ নাগরিকদের ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে অনেক পাঠক পক্ষে- বিপক্ষে মন্তব্য করছেন। যুক্তিপূর্ণ এবং রুচিসম্মত মন্তব্যের পাশাপাশি সেখানে নানা ধরণের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যও রয়েছে। ইসলামের প্রতি যাদের বিদ্বেষ রয়েছে এবং যারা - ইসলাম নয় - ধর্মকেই সকল অশান্তির কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন তারা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করবে, এটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়ে চিন্তিত বা বিব্রত হবার কোন কারণ নেই। এটা স্মরণাতিত কাল থেকে চলে আসছে এবং কোন দিন তা বন্ধ হবে না। পক্ষান্তরে যারা মানব সমাজের সত্যিকার কল্যাণ চায় তাদের মধ্যে রুচিবোধ এবং সততা রয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, তাদের অনুসন্ধিৎসু মন অবশ্যই একদিন সত্যকে খুঁজে পাবে।
বৃটিশ সমাজের যারা ইসলাম গ্রহণ করছেন তারা সবাই না হলেও অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত এবং অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী। বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আরব বিশ্ব থেকে যারা ইমিগ্রেন্ট হিসেবে বৃটেন এসেছেন তাদের সংস্পর্শে এসেই তারা ইসলামের সৌন্দর্য দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন এমনটি ভাবার দর্শনযোগ্য কোন কারণ আমাদের সামনে নেই। অত্যন্ত ব্যতিক্রম কিছু দৃষ্টান্ত বাদ দিলে সামাজিক আচরণ, জীবন-যাপন এবং আলাপচারিতার মাধ্যমে আমরা ইসলাম বা মুসলমানের যে ইমেজ উপস্থাপন করছি সেটা মোটেই সুখকর নয়। সত্যি কথা হচ্ছে, ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া যুদ্ধের কারণে অমুসলিমদের অনেকে ইসলামের ব্যাপারে জানার প্রতি উৎসাহিত হয়েছেন। অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংস্পর্শে আসার কারণে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আবার অনেকে নিছক নিজের অনুসন্ধিৎসু মনের তাগিদে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেছেন। বৃটিশ সমাজের নৈতিকতাহীনতা, অবাধ যৌনাচার, পারিবারিক বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা এর সাথে যোগ হয়ে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কেউ কাউকে হেদায়াতের রাস্তা দেখাতে পারে না; যারা হেদায়াতের অন্বেষণ করে আল্লাহ তাদের সত্যপথ প্রদর্শন করেন।
আমাদের মতে এ সকল বৃটিশ নওমুসলিম আমরা যারা জন্মসূত্রে মুসলমান তাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করছেন এ প্রশ্নের জবাবে কেভিন ব্রাইসের কাছে তারা বলেছেন, বৃটিশ সমাজের নৈতিকতাহীনতা, মদ্যপান, মাতলামি, অবাধ যৌনাচার, নিয়ন্ত্রণহীন ভোগবাদ ইত্যাদির কারণে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এ দেশের ইমিগ্র্যান্ট মুসলমান - তারা যে দেশেরই হোন না কেন - তারা কি এ সকল দোষ থেকে মুক্ত? আদর্শবাদিতা, সততা, নীতিনৈতিকতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি ভালো ভালো গুণের কথা বই-পুস্তকে পড়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুসলিম সমাজে এসে যদি তারা এর বিপরীত চিত্র প্রত্যক্ষ করেন তা হলে তাদের দুঃখবোধ এবং অনুশোচনার কোন সীমা থাকবে না। আমরা তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো কি পারবো না, আজকের দিনে সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরো আমরা দেখেছি, বিলাতের নওমুসলমানরা মুসলমান হওয়ার পর প্রথম যে কাজটি শুরু করেন তা হচ্ছে অর্থসহ কুরআন অধ্যয়ন। প্রথমেই তারা বুঝতে চেষ্টা করেন কুরআনে আল্লাহ কি বলেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে এক ইসলামী অনুষ্ঠানে একজন বৃটিশ অমুসলমানের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে সে সমাবেশে আসেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনাদের ছেলেমেয়েকে আরবী কুরআনের পাশাপাশি এর ইংরেজি অর্থও শিক্ষা দেয়া দরকার। যে কুরআনে তারা ঈমান এনেছে সেখানে কি লেখা আছে তা তাদের বোঝা দরকার। আমরা বিলাতের মুসলমানরা অনেক কিছু নতুন করে শিখছি, অনেক নতুন কর্মদক্ষতা অর্জন করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে টাকা-পয়সা খরচের ব্যাপারেও আমরা পিছিয়ে নেই। কিন্তু আল্লাহর সর্বশেষ গ্রন্থ কুরআন, যার উপর আমরা ঈমান এনেছি, সেই গ্রন্থটি বুঝেশোনে অধ্যয়ন করার ব্যাপারে আমাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায় না।
বর্তমানে আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যখন এক দল লোক সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ঘোষণা দিচ্ছে, ইসলাম পশ্চাদপদ ধর্ম এবং তাদের মধ্যে অনেক জন্মসূত্রে মুসলমানও রয়েছেন। অনেকে আবার ইসলামের দোহাই দিয়ে বলছে, বৃটিশ সমাজের সাথে ইসলাম চলনসই নয়। এমনি মুহুর্তে বৃটিশ নাগরিকদের ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৃটিশ সমাজের সাথে ইসলামের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা। এটা প্রমাণ করা যে, ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে কোন আপোস না করে বৃটিশ সমাজে বসবাস করা যায়। খাঁটি মুসলমান হবার পরও বৃটেনের সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতায় অংশ নেয়া যায়। ইসলামের মধ্যে সকল যুগে এবং সকল স্থানে চলার মতো ব্যাপকতা রয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া বা আরব দেশের সংস্কৃতি এবং ইসলাম এক জিনিস নয়। বিভিন্ন দেশে যখন ইসলাম গিয়েছে তখন সে সকল দেশের অনেক দেশজ জিনিস মুসলমানদের মধ্যে অনুপবেশ করেছে। ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হলে এগুলো গ্রহণ করার মধ্যে দোষের কিছু নেই। বৃটিশ সংস্কৃতির ব্যাপারেও আমাদের একই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করতে হবে। বৃটিশ সংস্কৃতির সব কিছু খারাপ, এ ধরণের কথার মধ্যে কোন সত্যতা নেই। এ দেশে বসবাসের কারণে আমরা বৃটিশ সংস্কৃতির অনেক কিছু এমনিতেই গ্রহণ করে নিয়েছি। সময়ের প্রয়োজনে এবং অবস্থার তাগিদে আগামীতে আরো অনেক কিছু গ্রহণ করবো। প্রাগ্রসর মুসলিম চিন্তাবিদদের এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা দরকার। আমাদের আলেম সমাজ যদি পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা আরবের চশমা চোখে দিয়ে বৃটিশ সমাজকে বিশ্লেষণ করেন তা হলে তারা ভুল করবেন। বৃটিশ সমাজের কেন্দ্রভূমিতে ইসলামের আলো নিয়ে আসতে হলে প্রথমে বৃটিশ সমাজকে জানতে হবে এবং বুঝতে হবে।
ইসলাম গ্রহণের পর একজন বৃটিশ নাগরিককে কি কি অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয় তা আমাদের অনুধাবন করা দরকার। মুসলমান হবার পর যদি তাদেরকে মুসলিম সমাজের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হিসেবে থাকতে হয় তাহলে এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে? আবিসিনিয়ার গোলাম বেলাল, রোমের অভিজাত সুহাইব এবং কুরাইশ নেতা আবু বকরকে ইসলাম এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। ইসলামের একত্ববাদ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, মানবিকতা এবং উদারতার বাণী বৃটিশ জনগণকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমরা জন্মগত মুসলমানরা যদি এর বাস্তব নমুনা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হই তা হলে এর দায় আমাদেরই ভোগ করতে হবে। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/FaridAhmedReza |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| Poet and columnist Farid Ahmed Reza lives in London. He taught English language in Bangladesh, and worked as an editor and assistant editor in various weekly and daily newspapers in Sylhet and Dhaka. Since arriving in the UK in 1991 he has been playing a positive role for the development of Bengali community, Bengali language and literature. He speaks for his motherland and for the people who live there, but he is not confined in any geographical boundary. He is the editor of Bengali poetry magazine 'Kobita' publishes from London. |
|