|
স্বার্থের রাজনীতি বন্ধ হবে কি?
ফরহাদ হোসেন |
|
আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সম্প্রতি লন্ডনে বিভিন্ন গণমাধ্যকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজ দল সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, সেনা সমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে আওয়ামীলীগের এক ধরনের সমঝোতা হয়েছিল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ও ক্ষমতারোহণের পেছনে ছিল এই সমঝোতা। তিনি আরো বলেন· বর্তমান মন্ত্রিসভার ৯০ শতাংশই সংস্কারপন্থী। মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদসদ্যই প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) সাথে সম্পর্ক রাখতেন। তার এ বক্তব্যের পর আওয়ামীলীগের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক নেতা কর্মী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এর অংশ হিসেবে লন্ডনের বার্মিংহামে যুবলীগ নেতা-কর্মীদের হাতে তিনি লাঞ্ছিত হন। দেশে ফিরলে হয়তো পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এ ব্যাপারে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সাংবাদিকদের কাছে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। শুধু কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন জলিলের কথা সত্য নয়। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন।
এদিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবদুল জলিলের এ বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পর যারা বলেছিল আওয়ামীলীগ ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তারা তাদের কথার পেছনে সত্যতা খুঁজে পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সত্য কথা বলার জন্য আবদুল জলিলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কারো মতে হয়তো এবার আওয়ামীলীগের সব জাড়িজুড়ি ফাঁস হয়ে যাবে। অবৈধ সরকারের সাথে আঁতাতের গোপন তথ্য হয়তো জনগণ জেনে যাবে। কিন্তু আজ আমি এ সব কথার বিশ্লেষণ বা প্রমাণে যাবো না। শুধু এতটুকু পাঠকদের সামনে বলার চেষ্টা করবো, আবদুল জলিল এ ধরনের কথা কেন বললেন এবং এর প্রভাব কি হবে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তা কতটুকু হয়েছে? রাজনীতিবিদরা কতটুকু নিজের স্বার্থে এবং জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করেন?
আবদুল জলিল আওয়ামীলীগের প্রথম সারির একজন প্রবীণ নেতা। বলতে গেলে তার জীবনের প্রায় পুরোটাই পার করেছেন আওয়ামী রাজনীতির সাথে। তীলে তীলে নিজেকে তৃণমূল নেতা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। বহু পরিক্ষিত নেতা তিনি। তা হলে তার মুখে দলের বিরুদ্ধে কোন কথা কি মানায়? তিনি কেন এ ধরনের কথা বললেন? দলের গঠন মূলক সমালোচনার উদ্দেশ্যে নাকি নিজ স্বার্থ লংঘিত হয়েছে বলে? আমরা জানি ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরী অবস্থা জারির মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিডর নেমে এসেছিল। কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়াই রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীকেও বাদ দেয়া হয়নি। দু’জনেকেই কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল। অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মত আবদুল জলিলকেও কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। কিছু দিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আর রাজনীতি না করা শর্তে সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান। গণমাধ্যমের সুবাদে দেশের জনগণ তা প্রত্যক্ষ করেছে।
এরপর চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান তিনি। মাঝখানে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। তিনি ফিরেও আসেন। এসে দলের সাধারণ সম্পাকের দায়িত্ব পালন করতে চাইলে তাকে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন দলীয় সভানেত্রী। এর কারণ হয়তো আমাদের অনেকের জানা রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আবদুল জলিল, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু ও আবদুর রাজ্জাক দলীয় প্রধানের রিরুদ্ধে মন্তব্য করেন। তাদের মতে লম্বা সময় ধরে একজন দলীয় প্রধানের পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন না। এটা অগণতান্ত্রিক। দলে একটা সংস্কার হওয়া উচিত। মূলত এ কারণেই ছিটকে পড়েন আওয়ামীলীগের এ সকল প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ নেতারা। তাদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে গঠন করা হলো মন্ত্রীসভা। দলীয় কাউন্সিল হওয়ার পর তাদের কোন দায়িত্ব না দিয়ে সান্ত্বনা স্বরূপ উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য করা হয়। যাদের কার্যত দলে কোন কাজ করার সুযোগ নেই তাদেরই এ পদ দেয়া হয়। দলীয় সভানেত্রী কাউন্সিলে বলেছেন, যারা দলের খারাপ সময়ে সংস্কারের কথা বলেছে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হলেও ভুলে যাইনি।
এখন কথা হলো দলীয সভানেত্রীকে কারাগারে বন্দী করা অবস্থায় কেন সংস্কারের কথা বলা হলো। কেন দলীয় সভায় তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে উত্থাপন করা হলো না? সেই সাহস কি জলিল সাহেবদের নেই? নাকি সভানেত্রী অসন্তুষ্ট হলে দলের বড় পদ পাওয়া যাবে না? মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। দলীয় সভানেত্রীও ভুল করতে পারেন। সেই ভুল ধরিযে দেয়ার সৎ সাহস যদি না থাকে তাহলে রাজনীতি করার দরকার কি। সিনিয়র নেতারই তো তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় সভাত্রেী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তার সাথে অন্য কেউ কি কখনো দলীয় প্রধানের পদের জন্য প্রতিন্দ্বীতা করেছে? করেনি। কিংবা করতে দেয়া হয়নি। দলের ভেতর যদি গণতন্ত্র চর্চা না করতে পারা যায়, তাহলে দেশকে গণতন্ত্র উপহার দিবেন কি করে। দলীয় সভানেত্রীর একার দায়িত্ব নয় দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। সিনিয়র নেতারা কি কখনো দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে? যদি করতো তাহলে আজ ঢাল তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সরদার হতে হতো না।
জলিল সাহেব এমন সময় দলের সমালোচনা করছেন যখন তিনি অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। যদি আগের মত তাকে মন্ত্রী করা হতো, দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হতো, তাহলে কি আজ এই বক্তব্য দিতেন? নিশ্চয়ই না। তাহলে এ ধরনের কথা কেন বলছেন? কারণ আজ তার স্বার্থে আঘাত লেগেছে। স্বার্থ আদায় করতে পারেননি বলে তিনি আজ আহত বাঘের মত গর্জন করছেন। নিজ স্বার্থের জন্যই যদি রাজনীতি করলে জনগণের সামনে বড় বড় কথা বলা উচিত নয়। আজ যদি জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করা হতো তাহলে দেশ এত পিছিয়ে যেত না। দলে গনতন্ত্র ফিরে আসতো। লগি-বৈঠা দিয়ে দিনের আলোতে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করতে আপনাদের বিবেকে বাঁধতো। কিংবা নির্বাচিত সরকারকে ট্রামকার্ডের ভয় দেখিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করার চেষ্টা হতো না।
শুধু যে আওয়ামীলীগে এরকম অবস্থা তা নয়। বিরোধী দল বিএনপিতেও একই অবস্থা। দলীয় কোন্দলের কারণে দলটি আজ ধ্বংস প্রায়। সব স্তরের নেতারা অপরকে টপকে বড় পদ দখল করা চেষ্টায় লিপ্ত। পদ পেলে খুশি। দলীয় প্রধানের গুণগাণ গাওয়া হয়। আর না পেলে তিনি খুব খারাপ, অবিবেচক। দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো আজো পর্যন্ত এক হয়ে কাজ করতে পারলো না। আর এখন দলীয় স্বার্থেও এক হতে পারছে না। কি করে পারবে। যারা রাজনীতি করেন তারাতো এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। অনেকে শেয়ার বাজারের মত বিনিয়োগের উপযুক্ত মাধ্যম মনে করেন। এজন্যই দেখা যায় বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী। ব্যবসায় তারা যেমন মূলধন খাটায়, নির্বাচনের সময়ও সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করে। যাতে করে নির্বাচিত হলে খরচের মুনাফা সহ বিশাল অংকের টাকা তুলে আনতে পারে। এর জন্যই দেখা যায় অহরহ চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। এমপিরা এসকল জানার পরও তা বন্ধ করায় তৎপর হন না। সবাই যে এরকম তা নয়। দু’একজন রাজনীতিবিদ এখনো আছেন যারা মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। দেশের ভালোর জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। নিজের স্বার্থ ক্ষুন্ন হলে চিৎকার করে অভিযোগ করেন না। দলের গঠন মূলক সমালোচনা করতে ভয়ে বুক কাঁপে না। তবে বেশির ভাগই নিজ স্বার্থের জন্য তৎপর। তাইতো আজ রাজনীতিবিদরা সিন্দাবদের ভূতের মত জনগণের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। অথচ তাদেরই উচিত ছিল এ ভূত নামানো। নির্বাচনের সময় যে সকল ওয়াদা দেয়া হয় তার কিছু অংশ পূরণ করতে পারলেও জনগণ খুশি। এ দেশের গরীব মানুষগুলোর চাওয়া খুব বেশি নয়। এটা রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে।
আবদুল জলিলের কথা সত্য না মিথ্যা তা আমরা বলতে পারছি না। তবে এতটুকু বলতে পারি যে কোন জাতীয় নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভোটের হার খুবই অস্বাভাবিক। দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশেই এ পর্যন্ত এরকম ভোটের হার দেখা যায়নি। কোন কোন কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটও পড়েছে। এটা নিশ্বঃন্দেহে বড় ধরনের কারচুপি ছাড়া কিছুই নয়। যাইহোক জলিল সাহেবের কথা যদি সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে দেরিতে হলেও সত্য কথা বলার জন্য তাকে ধন্যবাদ। তার ভয় পাবার কিছু নেই। কারণ দেশে এখনো কিছু মানুষ সত্যবাদীদের সাথে রয়েছে। আর তার সাহসী উক্তি, “সত্য কথা বলার ব্যপারে অনড় থাকবো” আমাদেরকে সত্যভাষী হতে অনুপ্রাণিত করবে। এটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখকঃ পাঠাগার সম্পাদক, কেন্দ্রীয় প্রিয়জন, ইমেইল, farhadh17@gmail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/ForhadHossain |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|