শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ০২:১১ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর হতে হবে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আয়ুষ্কাল দুই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। কী পেলাম আর কী পেলাম না তা নিয়ে দেশের জনগণ মনের আয়নায় হিসেবে নিকেষ শুরু করেছে। নবম সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদার কথা দেশের আমজনতার কানে এখন ভেসে উঠেছে। নির্বাচন পূর্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার, রূপকল্প-২০২১, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ দিনবদলের প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ ইত্যাদির কথা এখন বেশি করে মনে করছে জনগণ। আদৌ কী এসব পরিকল্পনা প্রায় ২ বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন কী? এ ধরনের প্রশ্ন রাস্তাঘাটে, ট্রেনে চলতে গেলে মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার বাংলাদেশের আমজনতা নীরবে তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাঁচ বছর পর এই পর্যবেক্ষণের প্রমাণ দেয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। ঠিক যেমনটি দেখিয়েছিলেন- বিগত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে বিপুল ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখান করে। চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরের অপশাসন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলবাজির বিপক্ষেই ছিল ওই প্রত্যাখ্যান। যার পরবর্তীতে দেশের মানুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। নির্বাচন পূর্বে জনগণের দেয়া আওয়ামী লীগের কিছু প্রতিশ্রুতি অধিকাংশই ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন। জনগণ শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি বুঝতে সক্ষম হওয়ায় হয়তো বা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। যা মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা কখনো ভাবতে পারেননি। এরপর তিনি (শেখ হাসিনা) জনগণের আশা আকাঙ্খা বাস্তবায়নে নির্বানোত্তর সরকার গঠন করেন। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একঝাঁক আনকোরা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। সরকারের এক বছরে নিজের দল, সরকার ও কূটনৈতিক যোগাযোগসহ অন্যান্য বিষয়ে বেশ দক্ষতার ছাপ রাখতে পেরেছেন।

কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, গত ছয় মাসের ঘটনায় জনগণের মধ্যে সেই আস্থা ফিকে হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্তরিকতা থাকলেও হয়তবা একা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। তাকে সহযোগিতা করার জন্য যেন কারোর কোনো মাথা ব্যথা নেই। সব যেন একক দায়িত্ব বর্তিয়েছে শেখ হাসিনার ওপর। যা কাম্য হতে পারে না। সহযোগিতা করার জন্য মন্ত্রিসভার যেসব ব্যক্তিরা রয়েছেন তারা যেন গা সওয়া ভাবে চলছেন। নিজ দল ও প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। শুধু পাবনা নয়, সুদুর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে এর ঢেউ বইছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ মানছেন না আমলারা। মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মধ্যে মনমালিন্য লেগেই আছে। সংসদীয় কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চলছে সমন্বয়হীনতা। জনপ্রশাসনে জোট আমলে সুবিধাভোগীরা এখনও বহাল তবিয়তে। বরং তারা বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সরকারের প্রায় আড়াই বছরে তারা আস্তে আস্তে খোলস পাল্টে সুকৌশলে সরকারকে অপ্রিয় করার নক্সা প্রণয়ন করছেন। এখনো চারদলীয় জোট সরকারের তিন স্তরের সাজানো প্রশাসনকে মুক্ত করতে পারেনি বর্তমান মহাজোট সরকার। চারদলীয় জোট আমলে বঞ্চিত মেধাবী কর্মকর্তারা এখনো উপেক্ষিত। বরং সরকারের অনেক প্রভাবশালী নীতি নির্ধারকরা প্রশাসনে জোটের সাজানো তিন স্তরের অনেক কর্মকর্তাদের দেয়া ছকেই চলছেন। পদোন্নতি, পদায়ন হচ্ছে তাদের নির্দেশেই। প্রতিটি মন্ত্রণালয় চলছে স্থবিরতার মধ্যে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সমস্যায় মানুষ দিশেহারা। কবে নাগাদ এ সমস্যা সমাধান হবে সাধারণ মানুষের মনে নানামুখি প্রশ্ন জাগছে।

অবশ্য সরকার গঠনের পর সাফল্যের কাজে হাত দিয়েছিল। এরমধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগী হওয়ায় মানুষ খুশি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির কাষ্ঠে নেওয়াতে অনেকে খুশি না হলেও মুক্ত মনের মানুষেরা খুশি হয়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য সংসদের প্রথম দিনেই সংসদীয় কমিটি গঠন করায় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নেয়া হয়েছে নানান প্রকল্প। এরকম হয়তো অনেক সাফল্য বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু দু’বছর আয়ুষ্কালের এই মহাজোট সরকারের গত এক বছরে আওয়ামী লীগের অংগ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দলবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টেণ্ডারবাজি নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব সচিত্র খবর দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অনৈতিক কার্যকলাপ বিপুল ভোটে জয়ী করা সাধারণ জনগণ নীরবে প্রত্যক্ষ করছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের অব্যাহত সন্ত্রাসের কারণে মানুষ যেন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার পরও ছাত্রলীগ যেন চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। মাসখানেক আগে সাংবাদিকদের জমজমাট আড্ডায়রত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার কাছে এ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি অসহায়ের মতো বলেছিলেন, এ ধরনের অপকর্ম থেকে নিবৃত থাকার জন্য ছাত্রলীগ নেতাদের কঠোরভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তারা সাংগঠনিক কাজ ফেলে গণভবনে সময় পার করছে। অন্য কোনো সিনিয়র নেতাদের এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা নেই। তাহলে দলের সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা কী ছাত্রলীগে উপেক্ষিত- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আর মন্তব্য করতে চাননি। তবে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেছিল এ সম্পর্কে দল ও সংগঠনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের। কিন্তু সে বিষয়ে কারোর কোনো মাথা ব্যথা নেই। সব দায়দায়িত্ব যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার!

ইতোমধ্যে জনগণ বলাবলি করছে- গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যেভাবে বিএনপি ও অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অপকর্ম করেছিল ঠিক যেন তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জনবিচ্ছিন্ন হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। যা পুনরুদ্ধার করা হবে কঠিন কাজ।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে- যারা দলকে ব্যবহার করে দখলবাজি, টেণ্ডারবাজিসহ নানান অপকর্ম করছে তারা দলের শুভাকাঙ্খী হতে পারে না। এরা দলের দুঃসময়ের কেউ নন। এরা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে জনগণের কাছে হেয় করছে। একই সঙ্গে সরকারের গতিকে রুদ্ধ করছে। এরা বসন্তের কোকিল। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তারা আবার চলে যাবে। প্রায় আড়াই বছরের সরকারের হাতে গোনা দু’একটি মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের পাল্লা খুবই হালকা। প্রশাসন কীভাবে চলছে সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ভালোভাবে খোঁজখবর নিতে হবে। চারদলীয় জোট সরকারের সাজানো তিনস্তর প্রশাসন নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ কতটুকু সফল হবে সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। জনপ্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা কেন উপেক্ষিত সেটিও দেখতে হবে। বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো অনুকম্পা নয়, সরকার প্রধান হিসেবে প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যদিকে দলীয় প্রধান হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা অন্যন্য সহযোগী সংগঠনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেখতে দেখতে দু’বছর পার হয়ে গেছে। তাই সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আস্থাভাজনদের বসাতে হবে। একইসঙ্গে দলের নাম ব্যবহার করে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে সরকারকে অপ্রিয় করছে তাদের লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরতে হবে। দলের অভ্যন্তরে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে দলের প্রবীন নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে পরিণতি শুভ হবে না।

লেখক: সাংবাদিক
http://www.sonarbangladesh.com/articles/FoshihUddinMahtab
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
চট্টগ্রাম থেকে পারভেজ চৌধুরী লিখেছেন, ০৮ মে ২০১১; দুপুর ০৩:২৬
আপনার সঙ্গে ১০০ ভাগ একমত।
56375
কোরিয়া থেকে আবু তাহের লিখেছেন, ০৯ মে ২০১১; রাত ১২:১০
সরকারকে এ ব্যাপারে এখনই কাজ করতে হবে। Time থাকতে হও careful নইলে হবে all ভুল
56415
জেদ্দা সৌদি আরব থেকে আবু সাইফ লিখেছেন, ১২ মে ২০১১; বিকেল ০৫:০৯
""পূরাণ পাগলে ভাত পায়না, নতুন পাগলের আমদানী"""!!!???
আগাচৌ, বিএসসি এঁদের ভাত মারার ফন্দি!!! অত সহজ নয়!!
56700
Cox's Bazar থেকে Dr. Farooque লিখেছেন, ২০ মে ২০১১; রাত ০৯:০০
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ? ড:ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ?? facility ...uncertain!
57240
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy