|
বুয়েটে মুরগী সমাচার
গোলাম আহমেদ তুহিন |
|
১৯৯১ সালে ক্লাস শুরু হবার পর বুয়েটের হলে থাকা অবস্থায় মুরগী নিয়ে অনেক কথা মনে পড়ে, মাঝে মধ্যে মনে হয় ঘটনাগুলো একটু লিখে সবার সাথে শেয়ার করি।
মেয়েদের হল সহ বুয়েটে তখন মোট ৭ টি হল ছিল। বিএনপির শাসনামল শুরু হলেও তখনো ছাত্রদের মধ্যে কিছুটা এরশাদ আমলের আমেজ দেখা যেতো, এই যেমন ছোটখাট ঘটনা ঘটলেই ক্লাস বর্জন শুরু হত, ভিসি বা শিক্ষকদের কথা ছাত্ররা তখনো শুনে না শোনার ভান করতো। এরশাদ বিরোধী আন্দলোনে অভ্যস্ত তখনকার ছাত্রদের অনেক বেশী ক্ষমতা, যে কোন ছোটখাট ব্যপার ঘটলেই আন্দোলন শুরু হত। যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক, মূগরীর কথা, অনেকে আয়েশ করে মুরগীকে মূগরী বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করত।
আমি তখন নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক ছাত্র যেখানে প্রায় ৩৫০ এর বেশী ছাত্রের বসবাস। হলে অবস্থানকারী একেক ছাত্রকে একেকজন বোর্ডার বলা হত। শোনা যেত বুয়েটের ৭ টি হলের মধ্যে নজরুল ইসলাম হলের খাবারের মান সবচেয়ে উন্নত ছিল। অন্যান্য হলের মতো প্রত্যেক মাসে প্রভোস্ট হলের ডাইনিং চালানোর জন্য ছাত্রদের মধ্যে থেকে একজন করে ম্যনেজার নিয়োগ দিতেন। ম্যানেজার নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অবশ্য তত সহজ ছিলনা। প্রত্যেক মাসের শেষের দিকে পরবর্তী মাসের জন্য ম্যানেজার হবার জন্য প্রভোস্ট ছাত্রদের মধ্যে থেকে দরখাস্ত আহবান করতেন। দরখাস্তের মধ্যে থেকে কেউ যদি ফাইনাল বা চতুর্থ বর্ষের ছাত্র থেকে থাকতো তাহলে তাকেই প্রথমে ম্যানেজার হবার জন্য মনোনীত করা হতো। চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের মধ্যে থেকে কোন দরখাস্ত না পড়লে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের এই দায়িত্ব দেয়া হত। যদি একই বর্ষের ছাত্রদের মধ্যে থেকে একের অধিক দরখাস্ত পড়ে থাকলে সেইক্ষেত্রে লটারী করে ম্যানেজার নিয়োগ করা হত।
হলে দুপুর এবং রাত্রে খাবার জন্য একেকজন বোর্ডারকে মাসে তখন ৪০০ টাকা প্রভোস্ট অফিসে জমা দিতে হত, ৩৫০ জন বোর্ডারের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা জমা হত। ম্যানেজারের দায়িত্ব ছিল প্রতিদিনের বাজারের টাকা প্রভোস্ট অফিস থেকে নিয়ে হলের বয়দেরকে দিয়ে বাজার করিয়ে তারা যাতে ঠিকমত ডাইনিং এ পরিবেশন করে তার তদারকি করা। মাঝে মধ্যে ডাইনিং বয়রা যাতে এদিক ওদিক না করতে পারে তার জন্য বাজার গিয়ে যাচাই-বাছাই করা আর মাস শেষে বড় ধরনের একটা ডিনারের ব্যবস্থা করা যাকে বলা হত ফিস্ট (Monthly feast). যেই মাসে যিনি ম্যানেজার হতেন সেই মাসে তার খাবারের টাকা দেয়া লাগতোনা।
ডাইনিং এর খাবার বলতে ছিল দুপুরের লাঞ্চ এবং রাত্রের ডিনার। লাঞ্চের সাথে থাকতো এক টুকরা মুরগীর সাথে দুই পিস আলুর ঝোল, পিরিচে সামান্য একটু ভাজি, পাতলা ডাল(আন-লিমিটেড) এবং ভাত(আন-লিমিটেড)। মাঝে মধ্যে মুরগীর বদলে মাছ দেয়া হতো। আর যাই হোক, ৯১-৯২ সালের দিকে মাত্র ৪০০ টাকায় পুরো একমাস একটা ছাত্রের দুপুরের লাঞ্চ এবং রাত্রের ডিনার চালানো খুব কষ্টসাধ্য ব্যপার ছিল। তারপরেও ডাইনিং ওই টাকার মধ্যেই চালাতে হোত। যেমন একটা ছোট দেশী মুরগী ১৯ টুকরা করে ১৯ টা কাপ বা ১৯ জন বোর্ডারকে দেয়া হোত (এক টুকরা মুরগীর মাংস এবং দুই পিস আলুর ঝোল একটি পেয়ালায় দিয়ে সেটাকে একটা কাপ বলা হতো)। খাবারের মান ভালো করার জন্য প্রভোস্ট মহোদয় একবার মাসিক ডাইনিং ফি ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা করলে শুরু হয় ছাত্রদের আন্দোলন, বর্ধিত ডাইনিং ফি বাতিল কর-করতে হবে এই টাইপের স্লোগান। যাই হোক, প্রথম বার ছাত্রদের আন্দোলন সফল হয় এবং প্রভোস্ট মহোদয় বর্ধিত ডাইনিং ফি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন (তবে পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় সব ছাত্রদের সম্মতিক্রমে ডাইনিং ফি ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকায় উন্নীত করা হয়)। জানিনা বর্তমানে হলের ছাত্ররা কত টাকা ডাইনিং ফি দিয়ে থাকেন।
এবার মূল কথায় আসা যাক। কথিত আছে কোন কোন অসাধু ম্যনেজার ম্যানেজারির মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কিছু টাকা কামিয়ে নিতেন। যেমন তারা বয়কে বলে একটা দেশী মুরগী ১৯ টুকরার পরিবর্তে ২১ টুকরা করতেন। পাঠকগন একটু চিন্তা করলেই বুঝবেন ৭০ টাকার একটা দেশী মুরগী ১৯ টুকরা কতটুকু হবার কথা(এই যেমন ধরুন একটা রানের অর্ধেক পরিমান মাংস দিয়ে সবাইকে খাবার খেতে হতো), সেখানে আবার ২১ টুকরা? এবার একটা হিসাব করা যাক, ১৯ পিসের জায়গায় ২১ পিস করলে লাভ কতটুকু? একেক বেলায় ৩৫০ জন ছাত্রের জন্য একেকটা মুরগী ১৯ পিস করলে লাগে মোট ১৯ টা মুরগী, আর ২১ পিস করলে লাগে ১৭টা মুরগী। তাহলে প্রতি বেলায় দেখা যাচ্ছে ২টা মুরগী কম লাগছে অর্থাৎ দুই বেলায় (দুপুর এবং রাত্রে) ৪টা মুরগী কম লাগে। এইভাবে অব্যহত থাকলে মাসে ১২০ টা মুরগী কম লাগে। একেকটা মুরগী ৭০ টাকা হিসাবে ধরলে মাসে টাকা বাচে ৮৪০০ (আট হাজার চারশ টাকা)। তখনকার সময় একজন ছাত্রের জন্য এই আট হাজার টাকা অনেক টাকা!! তবে হিসাবে এত টাকা দেখালেও বিভিন্ন কারনে বাস্তবে এত টাকা সরানো যেতনা মনে হয়।
প্রতিদিনের খাবারের মান যাই হোক, ম্যানেজারদের সবসময় লক্ষ্য রাখতে হত মাস শেষে ফিস্টের (monthly feast) দিকে। মাসের শেষের দিন ডিনারটা হত খুবই উন্নতমানের। এইদিন ডিনারে সাধারনত অর্ধেক মুরগীর রোস্ট, খাশীর রেজালা, ভেজিটেবল ভাজি, দই, কোক/পেপসী দিয়ে ডিনার সার্ভ করা হত, অনেক সময় খাবার শেষে পানও সরাবরাহ করা হত। যদিও কিছু কিছু ছাত্র মাস শেষে এত ভাল খাবার পরিবেশন করার বিপক্ষে ছিল (তাদের যুক্তি ছিল এত দামী ডিনার না দিয়ে সেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে প্রতিদিনের জন্য আরো কিছুটা উন্নতমানের খাবার সরাবরাহ করা)। তবে বেশীর ভাগ ছাত্ররা এই যুক্তিকে অসম্ভব বলে আখ্যায়িত করে ফিস্টের পক্ষে মতামত দিত। শেষ ভাল যার সব ভাল তার মতবাদের উপর ভিত্তী করে বেশীর ভাগ ম্যানেজারের লক্ষ্য থাকতো মাসের শেষে ফিস্টটা খুব ভাল মানের করতে।
একবার ম্যানেজার হয়েছিলেন তথকালীন হল সংসদের নির্বাচিত খাদ্য সম্পাদক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবুল ভাই (আসল নাম না বলে একটা নিক নাম দিলাম)। আবুল ভাই ছিলেন বিবাহিত তাই তার সবসময় টাকা-পয়সার টান থাকতো। ঢাকা শহরে একজন ছাত্রের পক্ষে বঊয়ের খরচ চালানো কত যে কষ্টসাধ্য ব্যপার তা মনে হয় আবুল ভাইয়েরাই জানেন। যাই হোক, আবুল ভাইয়ের ম্যানেজারের পারফর্মেন্স ছিল খুব খারাপ, পুরো মাস খুবই সস্তা খাবার খাইয়েছিলেন। আমরা মনে করতাম উনি বিবাহিত তাই ডাইনিংইয়ের ব্যপারে ততটা খোজ খবর নেওয়ার সময় না পাওয়ায় ক্যান্টিনের বয়দের গাফিলতির কারনে খাবারের মান খারাপ ছিল। সবার ধারনা ছিল প্রতিদিনের খাবারের মান যাই হোক, হলের নির্বাচিত প্রতিনিধি অন্তত মাস শেষের ফিস্টটা খুব ভালো খাওয়াবেন। অবশেষে ফিস্টের নির্ধারিত দিনে ডিনার করতে গিয়ে হলের প্রত্যকটি ছাত্রের মাথায় বাজ পড়ে। সবাই দেখে ফিস্টে অর্ধেক মুরগীর রোস্টের পরিবর্তে কোয়ার্টার মুরগীর (একটা মুরগীর চার ভাগের একভাগ)রোস্ট দেয়া হয়েছে। খাবার পরে পুরো হল ধরে আবুল ভাইয়ের বিরুদ্ধে চাপা ইত্তেজনা/গুঞ্জন চলতে থাকে। সবাই সহজ হিসাব করে- তিনশ পঞ্চাশ (৩৫০) জন ছাত্রের প্রত্যেককে অর্ধেক মুরগী খাওয়ালে লাগে ১৭৫টি মুরগী, কিন্তু কোয়ার্টার মুরগী দিলে লাগে ৮৮টি মুরগী। অর্থাত আবুল ভাই সারা মাস খারাপ খাইয়েও খোদ ফিস্টের টাকা থেকে শুধুমাত্র মুরগী থেকেই ৮৭টি মুরগীর টাকা মেরে দিয়েছেন। একেকটি মুরগীর দাম ৭০ টাকা হলে আবুল ভাই কমপক্ষে ৬০০০(ছয় হাজার) টাকা মেরে দিয়েছেন। আবুল ভাইয়ের বিরোধী দলের নেতারা পেয়ে যায় তুরুপের কার্ড, তারা সাধারন ছাত্রদের এই ক্ষোভকে দ্রুত কাজে লাগিয়ে তাদের বিদ্রোহী করে তোলে। নায্য ইস্যুতে বাংলাদেশের সাধারন মানুষ যে কত তাড়াতাড়ি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে তার প্রমান সেইদিন পেয়েছিলাম। ফিস্টের পরে রাত এগারোটার পরে শুরু হয় মিছিল-আবুল ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিছিল। যদিও হলের ক্ষমতাসীন পার্টির অন্যন্য ভাইয়েরা নিজের দলের ছাত্রদের সেই মিছিলে অংশগ্রহন না করতে অনেক বুঝিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কাজ হয় নাই। হলের লাইট নিভিয়ে দেয়া হয়, সবার সতস্ফুর্ত অংশগ্রহনে গভীর রাত্রে মিছিলটি বিশাল আকার ধারন করে। আবুল ভাইয়ের চামড়া-তুলে নেব আমরা, ডাইনিং এর টাকা কোথায় গেল-আবুল তুই জবাব দে, হাফ মুরগী কোয়ার্টার কেন-আবুল তুই জবাব দে, মুরগী কেন কোয়ার্টার হল-আবুল তুই জবাব দে-ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো বুয়েট ক্যাম্পাস। মিছিলটি প্রায় রাত বারোটার দিকে ভিসির বাসায় গিয়ে ভিসিকে আবুলের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ভিসিও বাংলাদেশের সেই চিরাচরিত পদ্ধতিতে ছাত্রদের ঠান্ডা করার জন্য তদন্ত কমিটি করার আশ্বাস দিলে ছাত্ররা আশ্বস্ত হয়। আবুল ভাই সরকারদলীয় ছাত্র হওয়ায় আসলে কোন তদন্ত কমিটি হয়েছিল কিনা বা হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের আর সব বেশীরভাগ তদন্তের মতো সেই তদন্তের কোন রিপোর্ট কখনো প্রকাশিত হয়নি। তখন থেকেই শিখেছিলাম-তদন্ত কমিটি গঠন হলো তাথক্ষনিকভাবে জনগনকে ঠান্ডা করার মোক্ষম উপায়। যাই হোক, ফিস্টের চেয়েও সেইদিন রাত্রের মিছিলটি ছিল আসলে মনে রাখার মতো। ভাগ্যিস বাংলাদেশে তখনো মুরগী-মিলন, সুইডেন-আসলাম, কানা-ফরিদ বা ছোলা-মাসুদ এই ধরনের নাম চালু হয়নি। হলে হয়তো আবুল ভাইয়ের নাম তখন থেকেই মুরগী-আবুল হয়ে থাকতো। সেই ঘটনার পর থেকে আবুল ভাই অবশ্য খুব লজ্জা পেয়েছিলেন-সবসময় মুখ নিচু করে চলাফেরা করতেন। জানিনা এখন আবুল ভাই কোথায় কেমন আছেন।
কলিজা ফাইটঃ হলে খুব নিরবে চলতো কলিজা ফাইট (liver fight). চতুর্থ বর্ষে ওঠার আগ পর্যন্ত জানতে পারিনি কলিজা ফাইটের কথা। আড্ডাচ্ছলে জানতে পারলাম কয়েকজন নিয়মিত কলিজা ফাইটারের কথা। একেকটি মুরগীর কলিজা, গিলা আর গলা দিয়ে তৈরী হোত একেকটি কাপ, বুঝতেই পারছেন একেক বেলায় ১৯টি মুরগী জবাই হলে কলিজা-কাপের সংখ্যা হোত ১৯টি। ১৯ বা ২১ পিস করা একেকটি দেশী মুরগীর মাংসের একেকটি কাপের চেয়ে কলিজা-গলা-গিলা সমৃদ্ধ এই কাপ অনেক লাভবান। তাই এই কাপের প্রতি আগ্রহ ছিল হলের বেশীর ভাগ ছাত্রের। কিন্তু কাকে কাকে দেবে এই কলিজা-কাপ? একজন পেলে আরেকজন ঝামেলা করতে পারে কিংবা নেতারা এই নিয়ে ঝামেলা করতে পারে যে কলিজা যেন তাদের দেওয়া হোক বা আরও অনেক সমস্যা তৈরী হতে পারে। যাই হোক, কলিজা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য হলে নিয়ম ছিল যে প্রথমে যারা খেতে বসবে তারাই শুধুমাত্র কলিজা পাবে। সুতরাং কোন এক বেলায় ১৯ টি মুরগী জবাই হলে প্রথম ১৯ জন কলিজা-গিলা-গলা সমৃদ্ধ এই কাপগুলো পেত। এখন সমস্যা হোল এই প্রথম ১৯ জন কারা? দেখা যেত প্রতি বেলায় কিছু সংখ্যক ছাত্র ডাইনিং এর দরজা খোলার আগেই লাইনে দাড়াতো। এই ধরুন দুপুর ১২টায় ডাইনিং খোলার কথা থাকলে দেখা যেতো ১২টা বাজার কয়েক মিনিট আগেই বেশ কিছু ছাত্র দরজার কাছে ভীড় করে দাড়াতো, দরজা খুললেই শুরু হোত গুতোগুতি করে ডাইনিং এ ঢোকার পালা, যারা টেবিলের প্রথম দিকে বসতে পারতো তাদের ভাগ্যেই মিলতো সেই মূল্যবান কাপ। তবে দেখা যেত হলে কিছু নিদৃষ্ট সংখ্যক ছাত্র প্রায় প্রতিদিনই কলিজা ফাইটে অংশগ্রহন করতো যার ফলে তারা অনেকের কাছে কলিজা ফাইটার নামে পরিচিত ছিল। মজার ব্যপার হোল যে হলের দুই একজন ছাত্র কিভাবে যেন মাঝেমধ্যে ডাইনিং এর বয়দের পটিয়ে নিদৃষ্ট সময়ের আগেই ডাইনিং এর দরজা খুলে টেবিলের প্রথমে বসে থাকতো এই কলিজা খাবার জন্য যার মধ্যে নেতা টাইপের ছাত্রদের সংখ্যাই ছিল বেশী। কলিজা ফাইটের ব্যপারটা আবিস্কৃত হবার পর আমিও যে দুই এক দিন ফাইট দেইনি তা নয়, বেশ মজার ছিল ব্যপারটা।
আজীবন ম্যানেজারঃ মাঝে মধ্যেই শুনতাম অমুক হলের অমুক গত মাসে হলের ডাইনিং ম্যানেজার ছিল আর এই মাসে এলিফ্যান্ট রোড থেকে ৭০০ টাকা দিয়ে নতুন জিন্সের প্যান্ট কিনেছে। ভাবখানা এমন যে ডাইনিং এর ম্যানেজার হলে যেন পরের মাসে নতুন জিন্সের প্যান্ট কিনতে পারবেনা। তখন কিন্তু ৭০০ টাকা ছিল অনেক টাকা। যাই হোক, এবার এক আজীবন ম্যানেজারের কথা বলি। নাম তার ওবায়দুল্লাহ, খুব সহজ-সরল আরে সৎ ছেলে। আমাদেরই ব্যাচমেট এবং তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আমরা। ম্যানেজারের অভিজ্ঞতা নেবার জন্য প্রভোস্টের কাছে দরখাস্ত করে-৩৫০ জন ছাত্রের ডাইনিং চালানোর অভিজ্ঞতা কিন্ত অনেক অভিজ্ঞতা। প্রভোস্ট অনুমতি দিলে ওবায়দুল্লাহ ম্যানেজার হয় এবং সেই মাসে সে খুব ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করে হলের সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে। আর যাবি কোথায়, ছাত্ররা তাকে আজীবন ম্যানেজার রাখার দাবি তোলে। ছাত্রদের দাবীর কাছে প্রভোস্টও ওবায়দুল্লাহকে অনুরোধ করে আরো কয়েক মাসের জন্য ম্যানেজার হবার জন্য। ওবায়দুল্লাহ অবশ্য পরবর্তী কয়েকমাসের জন্য ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়।
ওবায়দুল্লাহ এত সরল মনের ছিল যে পাশ করার পর ডিপার্টমেন্টের কিছু শিক্ষক তাকে বুয়েটের এনার্জি সেন্টারে প্রকৌশলী পদে চাকরী পেতে সহায়তা করেন। সেই থেকে ওবায়দুল্লাহ এখনো বুয়েটের এনার্জি সেন্টারে চাকুরীরত। ব্যাচেলর অবস্থায় ওবায়দুল্লাহ সুইডেন থেকে স্কলারশীপ নিয়ে মাস্টার্স করে আসে এবং বিয়ের কয়েক বছর পর থাইল্যান্ডের Asian Institute of Technology (AIT) তে ডক্টরেট করার জন্য যায়। দেশে বউ রেখে ডক্টরেট করতে যাওয়া বেচারা ওবায়দুল্লাহ বউয়ের টানে কয়েক মাস পরেই পড়াশোনা ফেলে দেশে ফিরে আসে। বর্তমানে ম্যানেজার ওবায়দুল্লাহ বুয়েটের এনার্জি সেন্টারে কর্মরত একজন উর্ধ্বতন প্রকৌশলী, তার বউও একজন বড় সরকারী কর্মকর্তা। রাখে আল্লাহ মারে কে? অবশেষে ওবায়দুল্লাহ দেশে বউ এবং দুই বাচ্চা রেখে এখন বেলজিয়ামে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনের পথে।
মুরগী ধরাঃ মুরগী ধরা নামে বুয়েটে একটি কথা খুব প্রচলিত ছিল। এই যেমন নেতারা প্রায়ই বলে থাকতেন কয়টা মুরগী ধরলি বা মুরগী ধরা কেমন চলছে ইত্যাদি। প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পারলাম যে প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে আসা ছাত্রদের নেতারা সাংকেতিকভাবে মুরগী বলে সম্বধোন করতেন। হলে ভর্তি হয়ে কোন একটি দলে নাম লেখানো না পর্যন্ত বিভিন্ন দলের নেতারা ছাত্রদের অর্থাৎ মুরগীদের খুব তেল দিত। যতই বলা হোক না কেন আমি কোন রাজনৈতিক দল করিনা বা করার কোন ইচ্ছা নেই তারপরও কোন না কোন দলে নাম না দেওয়া পর্যন্ত রেহাই নাই। প্রতিদিন কোন না কোন দলের নেতা রুমে গিয়ে ডিস্টার্ব করবেই। মজার ব্যপার ছিল বুয়েটে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রদের মধ্যে সহ অবস্থান ছিল খুবই চমৎকার। একই রুমে ছাত্রদল এবং ছাত্রলীগের নেতারা স্বচ্ছন্দে বসবাস করতেন। বিভিন্ন সময় নেতারা বিভিন্ন বর্ষের ভালো ভালো ছাত্রদের নিয়ে এসে দেখাতেন যে উনি আমাদের দলের এবং উনি পার্টি করে ঠিকই ভালো রেজাল্ট করছেন, সুতরাং আমাদেরো (মুরগীদের) পার্টি করা উচিত। অবশেষে প্রথম বর্ষের এই মুরগীরা যে কোন একটি পার্টিতে নাম লিখিয়ে দিলে আর কোন দল তার কাছে আর মুরগী ধরার আবদার নিয়ে যেতনা।
মুরগী নিয়ে আরও অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করে, যেমন ডেল কুদ্দুস স্যারের মুরগী দিয়ে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের ম্যাক্সিমা-মিনিমার (Maxima and Minima) উদাহরন বা আরও অনেক ছোটখাট ঘটনা। আশা রাখি পরবর্তী কিস্তিতে আরও কিছু মুরগী সংক্রান্ত ঘটনা বা বুয়েট জীবনের আরও কিছু মজার ঘটনা লিখে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।
পাঠকগন মুরগীসংক্রান্ত আপনাদের ছাত্রজীবনের এইরকম কোন ঘটনা মনে পড়লে লিখে পাঠান, পরবর্তী কিস্তিতে যোগ করার চেষ্টা করবো।
বুয়েটে এখন ডাইনিং সিস্টেম কিভাবে চলে, এখনো দেশী মুরগী না ব্রয়লার মুরগী সার্ভ করা হয়, মাসিক ডাইনিং ফি কত টাকা ইত্যাদি জানিয়ে বুয়েটে অধ্যয়নরত ছোট ভাইয়েরা যদি জানাতে তবে খুশী হতাম।
লেখকঃ গোলাম আহমেদ তুহিন, আমেরিকায় হোন্ডা মোটর কোম্পানীর রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে কর্মরত একজন উর্ধতন প্রকৌশলী ও আবিস্কারক (US Patent Holder). ইমেইলঃ golam2001@hotmail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/GolamAhmedTuhin |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
গোলাম আহমেদ তুহিন ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। বাংলাদেশে বেক্সিমকো গ্রুপে প্রায় ২ বছর চাকুরির পর ১৯৯৯ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে আমেরিকা গমন করেন এবং ২০০২ সালে আমেরিকার “ইউনিভার্সিটি অব ডেট্রয়েট মার্সি” থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় ২০০০ সাল থেকেই তিনি আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ী তৈরীর কোম্পানীর (Ford Motor Company) বিভিন্ন প্রোজেক্টে কন্ট্রাক্ট কন্সাল্ট্যান্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন এবং একইসাথে ফোর্ড মোটর কোম্পানীর যেসব employee স্নাতকপূর্ব পর্যায়ের ছাত্র ছিলেন তাদের বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে তিনি একজন উর্ধ্বতন প্রকৌশলী এবং ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকায় হোন্ডা মোটর কোম্পানীতে (Honda Motor Company) রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে কর্মরত। তিনি একজন আবিস্কারক (US patent holder) ও আমেরিকান সোসাইটি অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের (ASME) সদস্য।
বর্তমানে স্ত্রী শামীমা আহমেদ মুনমুন, এক মেয়ে তাকিয়াহ আহমেদ ও এক ছেলে রাইয়ান আহমেদ সহ আমেরিকার ওহাইও স্টেটে বসবাস করছেন। চাকুরী এবং পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বিষয়ে লিখালিখি, ভ্রমন ও বাগানের কাজে ব্যস্ত থাকেন। ইতিপূর্বে তার বেশকিছু লিখা বিভিন্ন দৈনিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তার লিখা প্রথম বই “মহাকাশ ও নভোচারীদের অজানা কথা” পাঠক মহলে বেশ সাড়া দিয়েছে।
লেখকের সাথে যোগাযোগের জন্য ইমেইল করুনঃ golam2001@hotmail.com |
|
Thanks
Samor, 93 batch, BUET