|
সেই প্রিয় কণ্ঠস্বর
গোলাম সারওয়ার |
|
মধ্য জানুয়ারির মধ্যাহ্নেও শীত একটুও কমেনি। আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। সঙ্গে বেয়াড়া বাতাস। ক্যালিফোর্নিয়ার চিরচেনা আবহাওয়ার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছি না। সকালেই 'সিবিএস'-এ জেনে নিয়েছিলাম, প্রকৃতির এই বৈরিতা আরও তিন-চার দিন জারি থাকবে। আমেরিকার আবহাওয়াবিদদের আগাম বার্তায় আস্থা না রাখার কোনো কারণ কখনও খুঁজে পাইনি। যাই যাই করেও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে হিউস্টনে যাওয়া হচ্ছে না_ সেখানে প্রকৃতি নাকি আরও রুদ্র। আকাশ মেঘের দখলে। শীতও দারুণ। উদাস দুপুরে হঠাৎ করেই হুমায়ূন ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। চিকিৎসার জন্য তিনি নিউইয়র্কে। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্কে গিয়ে প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে না ভেবে প্রকৃতির মতোই আমার মন খারাপ। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ টেলিফোনে কয়েকবার চেষ্টা করেও বৈরী ভাগ্যের কারণে কথা বলতে পারিনি। দেখি না আরেকবার চেষ্টা করে! শাওন ভাবীর হারানো টেলিফোন নম্বরটি শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়ে ডায়াল করতেই সুরেলা কণ্ঠ ভেসে এলো। ভাবী খানিকটা অনুযোগের সুরেই বললেন, সারওয়ার ভাই, শুনেছি আপনি লস অ্যাঞ্জেলেসে।
আপনার হুমায়ূন ভাইকে দেখতে আসবেন না? আপাত সরল ও নিরীহ এই বাক্যটিতে একটা অনুযোগের সুর ছিল। বিব্রত কণ্ঠে বললাম, ভাবী, নানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি। শরীর আর এখন 'মহাশয়' নয়, যা কিছুই আর সয় না। জানি না শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন ভাইকে দেখতে যেতে পারব কি-না। ভাবী বললেন, ভাই, এত দূরে আপনাকে আসতে হবে না। আপনার হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন। ঢাকা ছেড়ে নিউইয়র্ক আসার আগে 'দখিন হাওয়া'য় গভীর রাত পর্যন্ত আপনি আমাদের যেভাবে, যে আন্তরিকতা নিয়ে অভয় দিয়েছেন তা আমরা কোনোদিন ভুলব না। সমকালে হুমায়ূনকে নিয়ে আপনার লেখা পড়ে শুধু আমরাই নই, তার লাখো শুভার্থী অশ্রুসিক্ত হয়েছেন।
হুমায়ূন ভাই কয়েক দিনের জন্য আটলান্টায়। গভীর ঘুমে। তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম না। শাওন ভাবী বললেন, নিউইয়র্কে যাওয়ার পর যেন টেলিফোন করি। এরপর কয়েকবার চেষ্টা করেও হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন পড়ি সমকাল, প্রথম আলোয়। জীবন থেকে ছুটি না নেওয়া পর্যন্ত লেখার ভুবন থেকে ছুটি নিতে পারবেন না কোটি মানুষের প্রিয় লোক হুমায়ূন আহমেদ। তার লেখা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণে পাঠ করে মুগ্ধ হই।
হুমায়ূন ভাইয়ের কথা ভাবতে ভাবতে প্রায় দু'যুগ আগের স্মৃতির পাতা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমিও হুমায়ূন ভাইয়ের মতোই কেমোর যন্ত্রণায় কাতর ছিলাম ডায়মন্ডবারে। জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার সে রকম দিনই অতিক্রম করছেন হুমায়ূন আহমেদ। আমার 'ক্যান্সার জয়ের' কথা যাকে বলি তিনিই অনুযোগ করেন। আপনার নতুন জীবন ফিরে পাওয়া তো হুমায়ূন আহমেদের গল্পের চেয়েও কম নাটকীয় নয়। এ নিয়ে লিখুন। মাঝে মধ্যে ভাবি, 'সিটি অব হোপে'র পুষ্পিত বিশাল কমপ্লেক্স, আমাকে বাঁচিয়ে তুললেন যেসব মেধাবী চিকিৎসক, নার্স, আমার সব প্রিয়জনের অশেষ সেবা_ সবকিছু লিখব, সকলের কথাই লিখব। তবু লিখি লিখি করে কেন জানি লেখা হচ্ছে না। সিটি অব হোপ, আশা নগরী, যেখানে থেকে আমি ক্যান্সার জয় করলাম, সেখানে একবার যাব ভেবেছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে এবার আমার নিয়মিত সফরসঙ্গিনী স্ত্রী ছাড়াও তার ছোট বোনও রয়েছে। তারাও আমার জীবন জয়ের যুদ্ধক্ষেত্রটি দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। আমেরিকার প্রাণকাড়া সব গন্তব্যে যেতে যেতে ক্লান্ত তাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে 'সিটি অব হোপ' নিভৃতেই মুছে গেল। 'আশা নগরী'তে এবার আর যাওয়া হলো না। আশাকে আমি কখনও কুহকিনী মনে করি না। তাই আশা থাকল, হাজার হাজার মাইল উড়াল দিয়ে আবার ক্যালিফোর্নিয়া গেলে 'সিটি অব হোপ' একবার দু'চোখ ভরে দেখে আসব।
ফিরে এসো, ফিরে এসো, অনেকদিন তো হয়ে গেল। সমকাল থেকে প্রতিদিনই ঘরে ফেরার তাগিদ। ইতিমধ্যে স্ত্রীর আকস্মিক এক দুর্ঘটনার কারণে দেশে ফেরা কমপক্ষে দু'বার বিলম্বিত হলো। তাই বলে হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে একবার কথাও হবে না? হঠাৎ মাযহারের টেলিফোন পেলাম। যারা হুমায়ূন আহমেদকে জানেন, তাদের কাছে মাযহারের পরিচয় তুলে ধরা অনাবশ্যক। হুমায়ূনকে 'স্যার' বলেই সম্বোধন করে মাযহার। 'স্যারের' সুখে-দুঃখে পাশে পাশে থাকা দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন মাযহার। শাওন ভাবীর পরই তার নাম। মাযহার আমারও অনুজপ্রতিম। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের অন্যতম কৃতী ব্যক্তি 'অন্যপ্রকাশে'র কর্ণধার মাযহার শুধু হুমায়ূন আহমেদের সুখের সহযাত্রীই নয়, দুঃখ-দুর্যোগেও সে হুমায়ূন পরিবারের পাশে। আমার জানা মতে, এরকম দৃষ্টান্ত বিরল। মাযহার বলল, একবার নিউইয়র্ক এসে স্যারকে দেখে যাবেন না! আপনি তো স্যারের খুবই প্রিয়জন। স্যারকে নিয়ে সমকালে আপনার লেখা শুধু হুমায়ূন স্যারই নয়, তার পরিবারের সবাইকে আশান্বিত করেছে। আমি অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বললাম, আমেরিকা এলাম, হুমায়ূন ভাইকে দেখতে যেতে পারলাম না_ এর চেয়ে বেদনার কী হতে পারে আমার জন্য!
মাযহার বুঝল। বলল, স্যার পাশেই আছেন। তার সঙ্গে কথা বলুন। 'সারওয়ার ভাই'_ দরাজ, মন্ত্রমুগ্ধ করা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মনে হলো স্বয়ং হুমায়ূন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই হাসি হাসি মুখ। দীপ্ত চোখ। শরীরে ক্যান্সারের কোনো ছায়াপাত নেই। 'কেমন আছেন হুমায়ূন ভাই'_ প্রশ্ন করার আগেই হুমায়ূন ভাই আমার কুশল জানতে চাইলেন। বললেন, মাযহার আপনার কথা বলেছে। কষ্ট করে এত দূরে আপনাকে আসতে হবে না। আমার জন্য দোয়া করবেন। বললাম, আপনার জন্য লাখো মানুষ দোয়া করছেন। পিতা যেমন সন্তানের জন্য, সন্তান পিতার জন্য, ভাই ভাই ও বোন বোনের জন্য যেমন সর্বান্তকরণে দোয়া করে, আপনার জন্যও সবাই তেমনি দোয়া করছেন। আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন। একজন ক্যান্সারজয়ী মানুষের সব শুভকামনাই আপনার জন্য রইল। হুমায়ূন ভাই জানালেন, তিনি আগের চেয়ে অনেক ভালো। ইতিমধ্যে ৮টি কেমো দেওয়া হয়েছে। কেমোর যন্ত্রণা তাকে কাতর করেনি। আরও কেমো দিতে হবে কি-না, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে কি-না তা কিছুদিন পর ডাক্তার বলবেন। আমাকে ক'টি কেমো দেওয়া হয়েছিল, হুমায়ূন ভাই জানতে চাইলেন। আমি আমার ১১ মাসের চিকিৎসার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বললাম, ৬টি কেমো নেওয়ার পর চিকিৎসক দেহে ক্যান্সারের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণার অবশেষ না থাকা নিশ্চিত করার জন্য আমার দেহ থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত স্পিল্গন, অর্থাৎ প্লিহাও কেটে ফেলেছিলেন। আমার শরীরে প্লিহা, গলব্লাডার, অ্যাপেনডিক্সসহ অনেক জরুরি যন্ত্র নেই। তবুও দিব্যি বেঁচে আছি। কাজ করছি। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। হুমায়ূন ভাই জানালেন, সারওয়ার ভাই, দেশের জন্য মন বড় ব্যাকুল। দোয়া করবেন যেন তাড়াতাড়ি ফিরতে পারি। মনে মনে বললাম, হুমায়ূন ভাই, তাই যেন হয়।
একুশের বইমেলার প্রথম দিনেই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস বেরোল। আরও অনেকগুলো বেরোবে। অজস্র হুমায়ূনভক্ত দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে 'অন্যপ্রকাশ' থেকে তার বই কিনবেন। তবে মুহূর্তের জন্য হুমায়ূন আহমেদের দেখা পাবেন না। অটোগ্রাফ দেবেন না তাদের প্রিয় লেখক। তবে জীবন তো থেমে থাকে না। বইমেলা মিলনমেলায় পরিণত হবে। হুমায়ূন ভাইয়ের বই কেনার সময় নিজের অজান্তেই তার কথা মনে পড়বে। দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে হুমায়ূন আহমেদের জন্য শুভকামনা।
সমকাল পরিবারেরও শুভকামনা থাকল হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য।
সবিশেষ : গত রাতে একটি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস লিখছেন। নাম_ 'দেয়াল'। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী ঘটনাবলি এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট।
[সূত্রঃ সমকাল, ০৩/০২/১২] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/GolamSarwar |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|