"এখন একটু করে যেন ভালো লাগতে শুরু করেছে হামিদ আলীর ।একয়েক দিন যে কষ্টটাই না হয়েছে । সপ্তাহ খানেক হতে চলেছে এসেছে হাসপাতালে ,কয়েকজন মানুষ দয়া করে দিয়ে গেছে এখানে । তা না হলে কীযে হতো ! ভাবতেই কেমন যেন মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল । এমন কেন হলো ওর সাথে ? আর ঠিক এই দুঃসময়ে ! নিউমার্কেটে ফুটপাতের একটা দোকান চালায় হামিদ আলী। সেই দোকানের আয় দিয়ে বছর খানেক আগে একটা বিয়ে করেছে নিজ বাড়ি বরিশালে । বউটা তার খুবই পছন্দের । কথায় অনেক মায়া । কী সুন্দরহেসে হেসে কথা বলে ওর সাথে। আরস্বামীর প্রতি অনেক খেয়াল । ওর কথা মনে হলেই যেন আনন্দের একটা জোয়ার আসে মনে । এই প্রানের বউয়ের সাথেও তার বেশী দেখা হয় না । বরিশালে বাড়িতে থাকে মায়ের সাথে । সে যায় মাসে ২/১ বার । যেই আয় তাতে এই ঢাকাতে রাখা সম্ভব না । বউ বলছে পরিবারে নাকী নতুন অতিথি আসছে । সেই আনন্দে তো সে পাগলপ্রায় । যাইহোক এজন্যতো টাকা খরচও হবে অনেক । তাই কষ্ট করে করে মাস শেষে কিছু টাকা জমাচ্ছিল । ডাক্তার বলেছে আর মাত্র ১০-১৫ দিন বাকী । সে ভেবে রেখেছে কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়িতে চলে যাবে । এসময়টা অন্তত তার বাড়ীতে থাকা দরকার । সেই চিন্তাতেই সে তার ব্যবসা কিছুদিন বন্ধ রেখে বাড়ীতে যাচ্ছিল হামিদ আলী। বাড়িতে যাবে ভাবতেই তার মন আনন্দে ভরে উঠল । একদম সকাল সকাল বাড়ির দিকে রওনা দিল সে । পথে বাধলো এক বিপত্তি । রাস্তায় বিশাল মিছিল চলছে । সম্ভবত রাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে সরকারী দলআর বিরোধী দলের মাঝে । এর মধ্যেই পথে কি এক মারামারি লেগে গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে গেল ।
হামিদ তখন বিড়ি যাওয়ার চিন্তায় বিভোর । সে ভাবল হেটে গিয়ে সামনে থেকে বাসে উঠবে । হাতে তার কাপড়ের পুটলী । তাকে সামনে পেয়ে প্রতিপক্ষ ভেবে এলোপাথাড়ি মারতে লাগলো কয়েক জন । সে কোন কিছুই করার সুযোগ পেলো না । সে চিত্কারে করে বলতে লাগলো "ভাই আমারে মাইরেন না , আমার কোন দোষ নাই , আমারে মাইরেন না"।এই অসহ্য কষ্টের মাঝেও সে দু হাত দিয়ে আকড়ে ধরে রাখছে তার সেই পুটলীটা । তার এতোদিনের সঞ্চয় । তার অনাগত সন্তানের জন্য তার তিল তিল করে জমিয়ে রাখা ভালোবাসা । তার কন্ঠস্বর আস্তে আস্তে থেমে যাচ্ছে । আপ্রান চেষ্টা করছে যাতে সে ঞ্জান না হারায় । আর কতক্ষণ চলবে এই নির্মম অত্যাচার । কিছুক্ষণ পর সে নিজকে আর বাচাতে পারল না । তার মাথাটা গড়িয়ে পড়লো রাস্তায় ।
সেই থেকে সে এখনো হাসপাতালে দুইসপ্তাহ হতে চলেছে । সম্পূর্ণ কপর্দক শুন্য এখন , শরীরও যথেষ্ট দুর্বল । এখন তার কীইবা করার আছে । অসীম হতাশায় হাতড়ে মরে সে । সেই পুটুলীটার সাথে সাথে যেন তার সপ্ন গুলোও হারিয়ে গেছে । এর মধ্যে কয়েকবার বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এসেছিলো । ওকে নিজের দলের লোক বলে দাবী করতে ।সে তাদের কাছে সব খুলে বলেছে । কিন্ত তারা রাজনীতি বোঝে, মানুষের দুঃখ বোঝে না । অনেক সহায়তার কথা বলে পরে তারা পরে আর কোন কিছুই করেনি ।
যে রাজনীতির ছায়াও কখনো মাড়ায়নি হামিদ আলী ; সেই রাজনীতিই তার জীবন টাকে এমনি করে ওলোট পালট করে দিল । সে তার বউয়ের উদ্বিগ্ন মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করল । তার অনাগত সন্তানের কথা মনে করতেই শিশুর মতো কেদে উঠলো সে । তার চোখ ভরে উঠলো বিষাদের জ্বলে ।"