|
দুলের ওজন ছয়আনা জান নিয়েছে তিনখানা
হাসান হাফিজ |
|
জায়গার নাম সরাইল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একটি উপজেলা। সরাইলের কুকুর এককালে বিখ্যাত ছিল। হিংস্রতা ও বিশ্বস্ততার জন্যে। সেই হাউণ্ড জাতীয় কুকুরের নাম এখন স্মৃতির পাতায়। দিনবদল ঘটেছে। মানুষ থাকতে কুকুর কেন হিংস্রতায় সেরা হতে যাবে! মানুষ কি পচে গেছে? তাদের মান-ইজ্জত বলে কথা আছে না?
অতএব লেগে পড়ো কোমর বেঁধে। কুকুরের সুনাম কেড়েকুড়ে নাও। ঘটেছে তা-ই। মাত্তর ছয়আনা ওজনের কানের দুল নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। ঘটনা, নাকি কেলেঙ্কারি? হালফিল বঙ্গদেশে তো কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিয়ে ফেলা কোনো ব্যাপারই না। ৭০ লাখ টাকাভর্তি বস্তা (টাকা না কাঁঠাল—আল্লা মালুম) নিয়ে এপিএস কট। রেলমন্ত্রীর চাকরি নট। পুনরায় কৃষ্ণ মেকুরের (কালো বিড়াল) সদম্ভ প্রত্যাবর্তন। ছয়আনা ওজনের কানের দুল নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বেধে গেছে। তিনটি তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে। নিভে গেছে ১০ হাজার মানুষের মুখের হাসি। লড়াই থামেনি। বন্ধ হয়নি রক্তপাতও। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো অস্তিত্ব টিকে আছে। ভবিষ্যতেও (অদূর এবং সুদূর) আরো রক্ত ঝরাবে—এমন কথা হলফ করেই বলা যায়।
ঘটনাস্থল অরুয়াইল ইউনিয়নের ধামাউড়া গ্রাম। গত ২২ জানুয়ারি ভোররাতে জোছনা বেগমের একজোড়া কানের দুল চুরি হয়। জোছনা গাজী গোষ্ঠীর তাজুল ইসলামের মেয়ে। দুল চুরি করেছিল ওই গ্রামের বারী গোষ্ঠীর নূরুল্লা মিয়া। ওই দুল বেচে দেয়া হয় স্থানীয় স্বর্ণকার ডালু দেবনাথের কাছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে আছে— ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’। সেই গান সত্য হয়ে ওঠে। ফাঁস হয়ে যায় চুরি-ছ্যাঁচড়ামির ঘটনা। এ নিয়ে তোলপাড়। বৃহত্তর হাঙ্গামার সূচনাই বলা যেতে পারে। ‘মামলা’র প্রাথমিক ফয়সালা হলো স্বর্ণকার কানের দুলের যে দাম—সেই দাম দেয়ার পর।
থার্ড পার্টি যখন চিত্রনাট্যে ‘ইন’ করলো, তখন আগুনে ঘি পড়লো যেন। গ্রামের তালুকদার গোষ্ঠীর সিরাজ উদ্দিন আপত্তি করলেন এতে। উনি সাবেক ইউপি মেম্বার। তিনি উসকানি দিলেন বারী গোষ্ঠীর লোকজনকে। ক্ষেপে গিয়ে নূরুল্লা মিয়া (দুল চোর) ছুরিকাঘাত করে জোছনার বাবাকে। ব্যস, শুরু হয়ে গেল। বাংলার মাটিতে এটাই তো স্বাভাবিক। কথায় বলে না, চোরের মার বড় গলা! উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো গাজী গোষ্ঠী ও বারী গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে। তালুকদার গোষ্ঠী অবস্থান নিল বারী গোষ্ঠীর পক্ষে। ২৩ জানুয়ারি ঘটে গেল সংঘর্ষ। রীতিমত যুদ্ধ। হাজারেরও বেশি যোদ্ধা দুই পক্ষে। দেশি অস্ত্রশস্ত্র তাদের হাতে। পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত। দেশি অস্ত্র সমেত গ্রেফতার ১৭ দাঙ্গাবাজ।
পরেরদিন ২৪ জানুয়ারি পুনরায় সংঘর্ষ। গাজী গোষ্ঠীর বোরহানউদ্দিন বল্লমবিদ্ধ হলেন। চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ডেথ টোল ওয়ান। পায়ে টেঁটাবিদ্ধ হয়েছিলেন বারী গোষ্ঠীর জজ মিয়া। সাতদিন কাতরানোর পর তিনি ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। ডেথ টোল টু। গত ১০ মে খুন হয়েছেন বারী গোষ্ঠীর যুবক নবী হোসেন। ডেথ টোল থ্রি। দিনমজুর নবীকে হত্যার দায় বারী গোষ্ঠীর লোকেরা চাপাচ্ছে গাজী গোষ্ঠীর ওপর। মামলা-মোকদ্দমা চলছে। বিবদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ঘটছে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা। গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে তিন শতাধিক পরিবারের লোকজন। য পলায়তি স জীবতি। গ্রামের বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে মানুষজন নাই। যারা আছেন, তাদের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেছে। অজানা আতঙ্কে অনিশ্চয়তায় কাটছে দিনকাল। স্বস্তি শান্তি ‘গুম’ হয়ে গেছে এই গ্রাম থেকে।
প্রশাসন কী করছে? আদৌ কোনো তত্পরতা কি রয়েছে প্রশাসনের? নাহ, যথারীতি প্রশাসন নির্লিপ্ত। জনপ্রতিনিধিরা কেউ যাননি সে গ্রামে। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এমনিতেই গ্রামটিতে শিক্ষার হার কম। বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে শিক্ষার্থীরা দিনাতিপাত করছে চরম আতঙ্কের মধ্যে। ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ওই গ্রামে তিন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ চলছে। আমরা সেটা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। এখন উদ্যোগ নিচ্ছে উপজেলা পরিষদ।
হায় রে ছয়আনা ওজনের কানের দুল! হায় রে প্রতিহিংসা!! মানুষের রক্ততৃষ্ণা কবে কখন মিটবে? যদি মেটেও, ঝরে যাওয়া জীবনগুলো আর কোনোদিনই ফিরে পাওয়া যাবে না। হাজার হাজার মানুষের ন্যূনতম স্বস্তি শান্তি হয়ে গেছে দূর অস্ত। অল্প কিছু মানুষের হঠকারিতা ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে অগুনতি মানুষকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা হলো গিয়ে ওই কানের দুল। যাবতীয় অশান্তিরও মূল। একপক্ষ মানে তো অন্যপক্ষ গোস্বা। টানাটানির চোটে পাবলিক জেরবার। পাটায় পুতায় ঘষাঘষি—মরিচের জান যায়। কানের দুল যদি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হয়—তার রোশনাইও আছে কিছুমিছু। ইলিয়াস আলী গুম, হরতাল, প্রাণহানি, কালো বিড়ালের অন্তর্ধান ও সদম্ভ প্রত্যাবর্তন, জাবি, ঢাবি, বুয়েটে অচলাবস্থা—ইস্যুর কি ভাই সীমা-শেষ আছে? নাই রে নাই। ষোলো কোটি মানুষের এখন পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর পথ খুঁজবার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি এই রকমই। তারা পালিয়েই বা কোথায় যাবে? পালিয়ে পার পাওয়া যাবে না। ১৮ দলের ৩৩ নেতাকে তো সেই সারেন্ডার করতেই হলো। ঢুকতে হলো জেলে। অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে! নিউটনের থার্ড ল’ও আছে এর বিপরীতে। কী সেটা? টু এভরি অ্যাকশন দেয়ার ইজ ইকোয়াল অ্যান্ড অপজিট রি-অ্যাকশন।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
hasanhafiz51@gmail.com
(সূত্র: আমার দেশ,১৮/০৫/১২)
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/HasanHafiz |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক |
|