খুব ছোট বেলায় বয়োঃজ্যেষ্ঠ কাউকে প্রণাম করতে গেলে তাঁরা পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেন, “বাচা মানুষ হও”। তখন থেকেই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে আমিতো মানূষই তাহলে আবার কেন আমাকে মানুষ হতে হবে? তখন বুঝিনি, এখন বুঝি আসলে মানুষ হওয়া কত কঠিন। মানুষের অবয়ব নিয়ে জন্মগ্রহন করলেই মানুষ হওয়া যায় না , প্রকৃত মানুষ হতে হলে মনুষত্বের চর্চা করতে হয়। পৃথিবীর অপরাপর প্রাণী থেকে কেবল অবয়বই পৃথক নয় মানুষের , তার রয়েছে বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা, রয়েছে আত্ন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিকশিত হওয়ার অপূর্ব সম্ভাবনা। নিজেকে প্রকাশ করার, অপরকে ভালোবাসার, পৃথিবীর রূপ, রস, সৌর্ন্দয্য উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে কেবল মানুষেরই। মানুষ কেবল প্রাণী মাত্রই নয়, তার মধ্যে রয়েছে প্রাণিত্বকে ছাপিয়ে আর এক পৃথক সত্বা, তার নাম মানব সত্বা বা মনুষত্ব। কেবল খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা, বংশ রক্ষা, সম্পদের পেছনে ছুটে বেড়ানোর জন্যই মানুষের জন্ম হয়নি। মানুষের জন্ম হয়েছে অনেক অনেক মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। যদিও আজকের পৃথিবীতে প্রাণীজ মানুষের সংখ্যাই বেশী। মনুষত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল কাড়িকাড়ি টাকার পেছনে ছোটাই যেন প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের। আর এ জন্যেই মূলত পৃথিবীতে এত সংকট, এত অধঃপতন। মূলতঃ নিম্ন মানের প্রাণীজ মানুষে ভরে উঠেছে আজকের পৃথিবী। অপরাপর প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য মানুষকে যে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হবে, মানব সত্বাকে বিকশিত করতে হবে এ বোধ যেন আমরা ভুলেই বসেছি।
কেবল টাকার পেছনে, অবৈধ সম্পদের পেছনে ছোটোছুটি করে আমরা জীবন পাত করছি। আর অবৈধভাবে এ সব করতে গিয়ে আমরা যে মনুষত্বের গলা টিপে ধরছি সে বোধও আমরা হারাতে বসেছি। তাইতো মানুষ নামক প্রাণীর এমন অনেক অমানবিক কাজ আজকে পশুর কাজকেও হার মানায়। মানুষের মনুষত্ব ছাপিয়ে পশুত্বই যেন প্রবল হয়ে উঠেছে আজ। এ অবস্থা থেকে মুক্তির একটাই পথ, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অর্থাৎ সুশিক্ষার চেয়ে স্বশিক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরী। আত্মাকে বিকশিত করতে হবে, নিজের ভেতর লুক্কায়িত শক্তি ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করতে হবে। সৌন্দর্য বোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সক্রেটিস যাকে বলেছেন “Know thyself” । আর এ কাজটি করার জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন লাইব্রেরী। কেননা লাইব্রেরী হলো জ্ঞান চর্চার সূতিকাগার। কোন জাতির জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার সমস্ত রেকর্ড সঞ্চিত থাকে লাইব্রেরীতে। তাইতো এক মনিষি যথার্থই বলেছেন, “ কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাও তবে তার লাইব্রেরী গুলোকে ধ্বংস করে দাও।” বিভিন্ন মণিষির রচিত পুস্তকগুলো যে আমাদের কতবড় সম্পদ তা অনুধাবন করতে হবে। নিয়মিত পুস্তক পাঠের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান চক্ষু খুলে যায়, আত্মার অন্ধকার দূর হয়।
নৈতিকতার প্রকাশ ঘটে। মানুষ ক্রমশ অন্যায় থেকে দূরে সরে আসে। মূলতঃ প্রকৃত জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গঠন করতে না পারলে আমাদের অধঃপতন এর ক্রম বিকাশকে কেউ থামাতে পারবে না। আজকে আমাদের সমাজে কোন মানুষের উন্নতি অবনতির মাপকাঠি হলো কার কত টাকা আছে, সম্পদের পাহাড় কার কত বেশি এ দিয়ে। আমাদের দেশের যে কোন সন্তানের পিতা মাতাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনার ছেলে / মেয়ে মনে বড় হোক সেটা চান নাকি ধনে বড় হোক সেটা চান । আমার বিশ্বাস ৯৯% পিতা মাতা বলবে ধনে বড় হোক সেটা চাই। কেননা ধন দৌলত না থাকলে আজকের সমাজে কেউ কাউকে গন্য করে না। আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন যে শিক্ষা লাভ করে ছাত্র ছাত্রীগণ মনে বড় হোক বা না হোক অন্তত যাতে ধন লাভ করতে পারে সে ব্যবস্থারই প্রানান্তকর প্রচেষ্টা। পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় ভালভাবে উগলে দিতে পারলেই ভাল রেজাল্ট। ভাল রেজাল্টের সুবাদে ভাগ্য লক্ষী সন্তুষ্ট থাকলে এবং মামা ,চাচা ,দুলাভাই এর তদ্বিরের সুযোগ থাকলে হয়ত পাওয়া যাবে ভাল চাকুরী। তারপর কেবলি টাকা পয়সা কামানোর ধান্ধা। কেবলি বাড়ি গাড়ি সম্পদের পেছনে ছোটা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাল মানুষ তৈরীর কোন অবকাশ নেই বিধায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে, এমনকি ডক্টরেট ডিগ্রীওয়ালারাও (স্বল্প সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে) চাকুরীতে বড় কর্তাটি হয়ে দেশ ও জনগণের সেবা করার পরিবর্তে নিজের আখের গোছানোর কাজেই বেশী ব্যস্ত থাকে। দেশের আপামর সাধারণ জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে দু’পয়সা কামানোর সুযোগ তারা কখনোই হাত ছাড়া করেন না। একই চিত্র কিন্তু আমাদের ভাগ্যবিধাতা রাজনীতিকদের বেলায়ও।
জনগণের সরলতার সুযোগে তাদেরকে বিভিন্ন আশ্বাস বাণী শুনিয়ে ভোট ভোট খেলায় জিতে দেশ পরিচালনার ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে যান। এমনকি ক্ষমতায় বসার মুহূর্তে তারা যে শপথ বাক্যটি পাঠ করেন তার বিন্দু বিসর্গটিও পালনের কোন উদ্যোগ দেখা যায় না। আমাদের দেশের শপথ গ্রহনকারী ব্যক্তিগণ যথার্থই যদি তাঁদের শপথগুলো পালন করতেন তবে অনেক আগেই দেশের চেহারা পাল্টে যেত। আমাদের রাজনীতিক কিংবা চাকুরীজীবী আমলাগণ এ শপথকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই নিচ্ছেন, প্রকৃত অর্থে অনেক ক্ষেত্রে শপথের উল্টো কাজটাই করছেন। অথচ শপথ ভঙ্গের দোষে কেউ কোন সাজা পাচ্ছে না। বিবেকবোধ, মনুষত্ববোধ এর অভাবজনিত কারণেই সমাজ আজ এত উচ্ছণে গেছে। কারো কোন দায়বোধ নেই। যে যার মতো অনৈতিকভাবে টাকা কামাচ্ছে এবং মুখোশধারী ভাল মানুষটি সেজে দেশ ও সমাজের সর্বনাশ করছে। নির্দিষ্ট সিলেবাসের আওতায় মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোকটির ভেতরের চেহারা যে কী কদর্য, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দিনের পর দিন দেশের সরল সোজা সাধারণ মানুষদের বিভিন্ন ধরনের কারসাজির মাধ্যমে শোষন করা হচ্ছে, ঠকানো হচ্ছে । বিভিষিকাময় এক অন্ধকার জগতের দিকে ক্রমধাবমান আমাদের যাত্রা। মানুষগুলো স্বভাবে আচরণে ক্রমশঃ পশুর মতো হয়ে যাচ্ছে। ভোগ বিলাসের লক্ষ্যে অনৈতিকভাবে টাকা উর্পাজনের যেন এক প্রতিযোগিত্ শুরু হয়েছে।
এ থেকে পরিত্রান পেতে প্রাণীজ মানুষদের মনুষত্বের চর্চার মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হবে। ভালো মানুষ ব্যতীত ভালো সমাজ গঠন কখনো সম্ভব নয়।
E-mail: halderjb@gmail.com
সমাজ, মানুষ, শিক্ষাসহ বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ অসাধারণ। ভাল লেগেছে। শুভ কামনা রইল; চালিয়ে যান। অপেক্ষায় রইলাম পরের লেখার।
39287
৩
দোহা, কাতার থেকে আল মামুন লিখেছেন,
০২ নভেম্বর ২০১০; রাত ০৯:১৬
সুন্দর লেখা। আরো লিখুন।
39375
৪
ঢাকা থেকে মো. শাহজাহান লিখেছেন,
১১ নভেম্বর ২০১০; সকাল ০৫:৩৫
মানুষ ও তার মনুষত্ব বিষয়ক একটি খুব ভালো রচনা পাঠ করলাম। লেখক খুব সুন্দর ভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন কিভাবে একটি নিষ্পাপ শিশু হতে একজন মানব ধীরে ধীরে বড় হতে হতে ক্রমে মানুষ না হয়ে হয় মানুষ নামের কলংক। এক কথায় সত্যিকার জ্ঞান অর্জনরে বদলে যখন মানুষের জ্ঞান আহরণের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় টাকা কামানো, বড়লোক হওয়া, তখন সে মানুষটি আর মানুষ থাকেনা হয়ে পড়ে দুনিয়াপুজারী, চরম বস্তুবাদী, তথা বস্তুবাদী সভ্যতার গোলাম।
লেখককে অামার আন্তরিক ধন্যবাদ।
40037
৫
জেদ্দা সৌদি আরব থেকে আবু সাইফ লিখেছেন,
১১ নভেম্বর ২০১০; দুপুর ১২:৩৪
পশুরা জন্মগতভাবেই পশু, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় মানুষ। মানুষ-পশু হবার জন্য চেষ্টা নিষ্প্রয়োজন।
""আত্মাকে বিকশিত করতে হবে, নিজের ভেতর লুক্কায়িত শক্তি ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করতে হবে। সৌন্দর্য বোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে। ০ ০ ০ আর এ কাজটি করার জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন লাইব্রেরী। কেননা লাইব্রেরী হলো জ্ঞান চর্চার সূতিকাগার। ০ ০ ০ বিভিন্ন মণিষির রচিত পুস্তকগুলো যে আমাদের কতবড় সম্পদ তা অনুধাবন করতে হবে। নিয়মিত পুস্তক পাঠের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান চক্ষু খুলে যায়, আত্মার অন্ধকার দূর হয়।""
পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য বইপত্র/সাহিত্য পড়ার বিষয়টা এখনকার অধিকাংশ পিতা-মাতা অনুমোদন করতে চাননা, রেজাল্ট খারাপ হবার ভয় দেখান। একাডেমিক ভাল রেজাল্ট করার দৌড়ে ১০/১২ বছর কাটানোর পর নতুন করে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা আর সম্ভব হয়না, আমাদের বর্তমান তরুণদের এটাই চিত্র।
""যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনার ছেলে / মেয়ে মনে বড় হোক সেটা চান নাকি ধনে বড় হোক সেটা চান । আমার বিশ্বাস ৯৯% পিতা মাতা বলবে ধনে বড় হোক সেটা চাই।"" পিতা-মাতার চাওয়াটা পরিবর্তন হওয়া দরকার - তবে """মনে বড়"" নয়, "" "মানুষ" হিসেবে বড়"" । সামাজিকভাবে "মানুষ" এর কদর বাড়ানো এবং "সম্পদশালী কিন্তু "মানুষ" হিসেবে "ভালো" নয়- এমন লোকদের কদর কমানোর একটা ""সামাজিক আন্দোলন"" গড়ে৪ তোলা এখনই দরকার।
40058
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
ধন্যবাদ আপনাকে।
শুভেচ্ছা আপনাকে, স্বাগতম ও বটে.....