মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; দুপুর ০৩:৫৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

নতুন বিমান বন্দরঃ প্রয়োজন ও বাস্তবতা

জাকির মজুমদার

আড়িয়ল বিলে নতুন বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংক্ষুব্ধ জনতার সাথে যৌক্তিকপূর্ণ কোন সমাধানের পথে সরকার না হেঁটে বরং তাঁদের আন্দোলন দমনের নানা পদক্ষেপের কারণেই জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত জনতার রোষানলে পড়ে সরকার আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলো। শুরু থেকে সরকার জনতার দাবির প্রতি শ্র্রদ্ধাশীল হলে আড়িয়ল বিল ইস্যুতে যে রক্তপাত ঘটলো তা এড়ানো অসম্ভব ছিলনা।

সরকার ও সরকারদলীয় লোকজনের অভিযোগ- আড়িয়ল বিল ইস্যু বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধন। এ যাবত যা ঘটেছে সব বিরোধী দলের উস্কানিতে হয়েছে। আমাদের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোতে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার আকাল, পরমত সহিষ্ণুতার চরম দৈন্যতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে- বিরোধী দলের বিরুদ্ধে করা সরকার ও তাঁর দলের এ অভিযোগকে অস্বীকারও করা যাবেনা। আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মাণ ইস্যুতে সরকারের কথা অনুযায়ী বিরোধী দল এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে জনগণকে রাস্তায় নামিয়েছে। প্রশ্ন হলো- তাহলে সরকার সব জেনেও শান্তিপূর্ণ পথ না খুঁজে বিরোধী দলের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে জনতার মতামতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করতে গেল কেন। এ পর্যন্ত যা হয়েছে সরকার কোন অবস্থাতেই এর দায় এড়াতে পারেনা। আড়িয়ল বিল ইস্যুতে সহিংস ঘটনায় বিরোধী দলীয় নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে এই ইস্যুকে শেষ পর্যন্ত সরকার নিজে আরো উস্কে দিল। যার ফলে বিরোধী দল সারাদেশে একদিনের হরতালও পালন করলো।

সরকারের নতুন আরেকটি বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তের শুরুতেই এর বাস্তবতা ও যুক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। তবে সেটা পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞ মহলে। প্রথমে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ও পরে মুন্সিগঞ্জের আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর, সাথে বঙ্গবন্ধু সিটি নির্মাণেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিমান বন্দরের জন্য দশ হাজার একর এবং বঙ্গবন্ধু সিটি তৈরির জন্য আরো পনের হাজার একর জমি অধিগ্রহণসহ মোট পঁচিশ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের জন্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। গরিব কৃষি নির্ভর চাষা-বুষা, বিলনির্ভর সাধারণ মানুষ যখন জানতে পারলো তাঁদের বেঁচে থাকার অবলম্বন সোনা ফলা শষ্য ও মৎস্য ভান্ডার আড়িয়ল বিল এবং পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি বিমান বন্দর ও বঙ্গবন্ধু সিটির জন্য ছেড়ে দিতে হবে তখন তাঁরা প্রতিবাদি হয়ে উঠলো। আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে লাগলো। তখন ব্যাপকভাবে সত্যিই দেশে নতুন আর কোন বিমান বন্দর নির্মাণের প্রয়োজন আছে কিনা এ প্রশ্ন গোটা দেশবাসীর মনে উঁকি দিতে লাগলো। মিডিয়ার যুগ বলে মানুষ নিশ্চিত হলো বাস্তবতার নিরীখে ও অদূর ভবিষ্যতেও দেশে নতুন কোন বিমান বন্দরের প্রয়োজন নেই। বরং বর্তমান বিমান বন্দর গুলোর ধারণ ক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরসহ আরো পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর রয়েছে। বিশেষজ্ঞ মতামত ও মিডিয়ার অনুসন্ধান এবং বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটির বছরে যাত্রী পরিচালনা ক্ষমতার অর্ধেক এবং রানওয়ের ক্ষমতার মাত্র চল্লিশ ভাগ ব্যবহার হচ্ছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটির ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ত্রিশ ভাগ। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটিতে কোন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল করছেনা কেবল অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল করছে। পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরের মধ্যে কক্সবাজার ও যশোর বিমান বন্দর ছাড়া সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশাল অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর সম্পূর্ণ অব্যবহৃত রয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর গুলোতে কোন বিমান চলাচল করেনা। তার পর সরকার ইতোমধ্যে কক্সবাজার অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে রুপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা প্রমাণ করে নতুন বিমান বন্দর নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ অদূরদৃষ্টি সম্পন্ন, আবেগ তাড়িত, অযাচিত ও অতি স্বার্থগত আড়ম্বতাপূর্ণ। সামন্ত যুগের রাজা-বাদশাহদের যেনতেন খায়েশ যে করে হোক যেমন তারা প্রজা দলন করে মিটাতো - সরকার যদি সে পথ ধরে তাহলে ভুল করবে।

যখন এ মুহূর্তে এমনকি নিকট ভবিষ্যতেও দেশে নতুন কোন বিমান বন্দরের প্রয়োজন নেই। তার পরও হঠাৎ আড়িয়ল বিলেরমত পরিবেশ সুরক্ষা জলাধারে সরকারের বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত ছিল অবাক হওয়ার মত। কারণ আড়িয়ল বিল একটি পরিবেশবান্ধব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অধ্যুষিত অঞ্চল বা এলাকা হিসাবে বিবেচিত। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও এ সংক্রান্ত ফোরামগুলোতে বাংলাদেশ উঁচু গলায় বিশ্ব জলবায়ু দুষণের সবচেয়ে বেশী শিকার বলে দাবি করে আসছে। অথচ সরকার বিমান বন্দর নির্মাণের নামে পরিবেশের ভারসাম্যপূর্ণ জীববৈচিত্র ও মিঠা পানির এক বিশাল জলাধার ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী বিশেষজ্ঞদের এ মতামতকে আমলে না নিলে পরিবেশগত, আর্থিক ও রাজনৈতিক অস্থীরতার বিশাল ক্ষতি দেশবাসীকে গুণতে হতো।

প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। এর বাস্তবায়ন যদি সত্যিই হয় তাহলে এত টাকা যোগান দিতে সরকারকে নিশ্চয় ঋণ নিতে হবে। বৈদেশিক ঋণের বোঝার এ দায় দেশবাসীকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে। বাস্তবতা বিবর্জিত এ প্রকল্পে এত বিশাল অর্থ না ঢেলে সরকারের উচিত দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সঙ্কট মোকাবেলায় অধিক মনোযোগী হওয়া। আর তাইই দেশের মানুষের কাছে সময়ের সবচেয়ে অগ্রগণ্য দাবি। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের কারণে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের বাজারে অস্থীরতা বাড়ছে; রান্নাঘরের চুলা জ্বলেনা, বাসা- বাড়ি-ঘরে বিদ্যুতের আলো থাকেনা; শিক্ষার্থীরা পড়া-লেখার টেবিল ছাড়া; কৃষক সময়মত তাঁর জমিতে সেচের পানি পায়না- এ হচ্ছে দেশের বাস্তব চিত্র।

পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের চোট্ট এই দেশে এত গুলো বিমান বন্দর থাকার পরও আরো দশ হাজার একর বিস্তৃত এলাকাজুড়ে নতুন বিমান বন্দর নির্মাণের প্রচেষ্টায় আমারমত অনেকের মনে ভিন্ন শঙ্কাও উঁকি দিচ্ছে। ভূ-কৌশলগত রাজনীতি ও শক্তি প্রদর্শনের আজকের বিশ্বে বর্তমান বা নব পরাশক্তির কোন ঘাটি হিসাবে অদূর ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য এই বিমান বন্দর নির্মাণের উদ্দেশ্য কিনা তাও আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ ভৌগলিক দিক থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। সম্প্রসারণবাদী ও সম্রাজ্যবাদীগোষ্ঠী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কৌশল নিয়ন্ত্রণের জন্য এ অঞ্চলে তাঁদের অবস্থান সুসংহত ও নিশ্চিত করতে মরিয়া। ভিতরে ভিতরে এমন কোন সমঝোতা কোন প্রভু রাষ্ট্র শক্তির সাথে হয়েছে কিনা বলতে পারিনা। তবে সরকারের বিমান বন্দর নির্মাণের হঠাৎ তোড়জোড় আমাদের তা ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ বিদেশী প্রভাবশালী প্রভুর ক্রীড়নক ও আনুকূল্য লাভ হলে সরকারে আসাও যায় থাকাও যায়। এদেশে একথা এখন আর মিথ্যে নয়।

আশার কথা হলো সরকার আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলো। বলতে হবে সরকার শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। আড়িয়ল বিলের মাধ্যমে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার যে প্রশ্ন উঠলো তার ব্যত্যয় ঘটলোনা। কিন্তু সরকার বিমান বন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। ফলে নতুন বিমান বন্দর নির্মাণে এর যুক্তিকতা ও বাস্তবতার প্রশ্ন থেকেই গেল। সরকার ঘোষণা দিল পদ্মার ওপাড়ে বিমান বন্দর নির্মাণ করবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস সঙ্কট নিরসন না করে বিশাল অর্থের ঋণের বোঝার ঝুঁকি নিয়ে এ মুহূর্তে দেশে আরেকটি বিমান বন্দর নির্মাণ সরকারের অগ্রাধিকার খাত ও তোড়জোড় হওয়া কোন অবস্থাতেই বাঞ্চনীয় নয়।

লেখকঃ সংগঠক, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজকর্মী
Email: jakirmajumder@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/JakirMajumder
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy