|
একুশ শতকে মিসরের বদলে যাওয়া
জসিম উদ্দিন |
|
আরব বসন্ত জনগণের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দিলো। প্রথম সুযোগে জনতা বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যে। মিসরে বড় জয় পেয়েছে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি)। এটি মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা। মূল সংগঠনের জন্ম ১৯২৮ সালে হলেও জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির বয়স আট মাসের কিছু বেশি সময় মাত্র। তাহরির স্কোয়ারে বিপ্লবের টালমাটাল সময়ে এটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হয়।
স্বাধীনতা ও সুবিচার, বিশেষ করে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায় এফজেপি। দলটির ওয়েবসাইটে এ ঘোষণা দেয়া আছে। তারা সুদবিহীন একটি ইসলামি অর্থব্যবস্থা চান। তাদের আইন প্রণয়নের উৎস হবে শরিয়া। মিসরীয়দের সমাজ, বিচার, প্রশাসন ও অর্থব্যবস্থা বর্তমানে পশ্চিমাদের অনুকরণে গঠিত। এক দিনে এটি বদলে ফেলতে চান না তারা। ধীরে ধীরে তারা ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ ইসলামি সংস্করণের মডেল তৈরি করতে চান। তাদের মতামত হলো, জনগণের নির্বাচিত একটি স্বাধীন সংসদ এগুলো তদারকি করবে। ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ৪৭ শতাংশের বেশি সমর্থন পেয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল গঠন করেছে। নিজ দল থেকে সংসদ নেতা ও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে তাদের আসনসংখ্যা ২৩৫টি।
নির্বাচনে ২৫ শতাংশের বেশি জনসমর্থন পেয়ে আল নূর পার্টি সংসদে দ্বিতীয় প্রধান দল। কঠোর ইসলামি নিয়মনীতির বাস্তবায়নের কথা বলে আল নূর পার্টি। সব কর্মকাণ্ডের ভিত্তি আল কুরআন এবং ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর হাদিসের কঠোর অনুশীলন তাদের মূলনীতি। তারা সমাজে ফিরিয়ে আনতে চান ১৪০০ বছরের বেশি সময় আগের মদিনায় প্রতিষ্ঠিত খেলাফত। ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির মতো এরাও অন্যান্য ধর্মীয় সমপ্রদায়ের প্রতি নমনীয় ভাব পোষণ করেন। মিসরের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ খ্রিষ্টান। নূর পার্টি পেয়েছে ১২১টি আসন। এ দুটো দল মিলে মোট ভোটের প্রায় ৭৫ শতাংশ পেয়েছে।
দ্য নিউ ওয়াফদ পার্টি নির্বাচনে ৯ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছে। সংসদে তাদের আসন ৪৭টি। এটি একটি উদার জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক জোট। প্রায় আট শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইজিপশিয়ান ব্লক নামের রাজনৈতিক জোট। ৩৯টি আসন পেয়েছে এরা। এই জোটের ক্ষুদ্র একটি অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা চায়। তাহরির স্কোয়ারে বিপ্লবের উত্তাল সময়গুলোতে মিডিয়ায় বেশি করে সেকুলারদের কথা শোনা যায়। ভোটের ফলাফল কিন্তু তার প্রমাণ দিচ্ছে না। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে আল-ওয়াসাত পার্টি। দুই শতাংশ ভোট পেয়ে তারা সংসদে ১০টি আসন লাভ করেছে। এই দলটিও উদার ইসলামপন্থী। তারা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠন চান। এ ছাড়া সংসদে বাকি আসনগুলো পেয়েছে বিভিন্ন স্বতন্ত্র ব্যক্তি ও ছোটখাটো কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন। ৫০৮ সদস্যবিশিষ্ট সংসদের বাকি ১০টি আসন সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়।
সংসদের উচ্চকক্ষ শূরার ২৭০টি আসনের নির্বাচন শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে তিন দফায় এ নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এরপর দুই কক্ষের ১০০ সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। জুনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এরপর সামরিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। জনসমর্থনের ধারা দেখে আঁচ করা যাচ্ছে, শূরা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এফজেপির সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সংবিধান প্রণয়নে তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে কুরআন-সুন্নাহ মৌলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আল নূরসহ ক্ষমতার বেশির ভাগ ভাগিদার একই মনোভাবাপন্ন হওয়ায় দেশ পরিচালনায় ব্রাদারহুডের নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তাই বলা যায়, আগামী দিনে মিসরের শাসন কর্তৃত্ব যাচ্ছে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির কাছে। ব্রাদারহুড মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইউরোপে এর সংগঠন রয়েছে। গোটা বিশ্বব্যবস্থায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে চান তারা। মিসরে এটি অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় বৃহৎ সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। জনগণের স্বাধীন মতামত পাওয়ার প্রথম সুযোগেই তাদের রাজনৈতিক শাখা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পেয়েছে।
ব্রাদারহুডের লক্ষ্য হচ্ছে পর্যায়ক্রমে মুসলিম পরিবার, ব্যক্তি, সমপ্রদায় ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসন সঞ্চার করা। লক্ষ্য অর্জনে জন্মলগ্নে বিপ্লবী উপায় অনুসরণ করলেও সংগঠনটি ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে আসে। ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলে। ইসলামের প্রচার, নিরক্ষরতামুক্ত অভিযান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নানা সেবা নিয়ে জনগণের দোরগেড়ায় পৌঁছার চেষ্টা করে।
ব্রাদারহুড মিসরীয় শাখার বর্তমান প্রধান ডক্টর মোহাম্মদ বদি। শিল্প শহর মাহাল্লা আল-কুবরায় জন্ম নেয়া বদি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশুচিকিৎসার মেডিসিনের ওপর ডিগ্রি নেন ১৯৬৫ সালে। একই বছর আসুত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিযুক্ত হন। স্বৈরশাসকের সামরিক আদালত ওই বছরই তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। মেয়াদপূর্তির ছয় বছর আগে মুক্তি পেয়ে একই সাথে উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ বাস্তবায়নে সমানতালে কাজ চালিয়ে যান। পরবর্তীকালে আরো তিনবার তাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ কারাবরণের পরও সংগঠন ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম কোনোটাতেই পিছিয়ে পড়েননি। অর্জন করেন ডক্টরেট ডিগ্রি, হন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক। তার তত্ত্বাবধানে ১২ জন পিএইচডি নেন। লিখেছেন এক ডজনের বেশি গবেষণাপত্র। দীর্ঘ দিন ধরে পেশাদার পশুচিকিৎসকদের সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রের বাইরে ‘কুরআনিক থট’ নামে ধারাবাহিক লেখেন। ইসলামের দাওয়াত বিষয়েও তিনি বই লিখেছেন। তার আগে নিযুক্ত ব্রাদারহুডের সাতজন প্রধানই শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে উঁচু দক্ষতাসম্পন্ন ছিলেন।
ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির শীর্ষনেতারা ব্রদারহুড থেকে এসেছেন। দল গঠনের আগে তারা ব্রাদারহুড থেকে অবসর নিলেও ব্রাদারহুডের অভিভাবকত্বে রাজনৈতিক মৌলিক সিদ্ধান্ত নেবেন, এমনটি প্রতীয়মান হচ্ছে। এফজেপি থেকে পার্লামেন্টের স্পিকার সাদ আল-কাতানি ও সংসদীয় দলের নেতা হুসাইন ইব্রাহিম নির্বাচিত হয়েছেন। দলে তাদের চেয়ে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র নেতা রয়েছেন। এ নেতারাই মূলত তাদের পথনির্দেশনা দেবেন। পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার প্রতিযোগিতা এদের মধ্যে দেখা যায়নি। সাফল্যের পেছনে এ ধরনের নির্মোহ ব্যক্তিত্ব বেশি করে মানুষকে আকৃষ্ট করেছে।
নবনিযুক্ত স্পিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। ইসলামি শিক্ষার ওপরও তার রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। গাছগাছালির বিভিন্ন রোগ বিষয়ে তার ৩৬টি মৌলিক গবেষণাপত্র রয়েছে। বিপ্লবের সময় হোসনি মোবারকের বাহিনী ব্রাদারহুডের আরো দু’জন শীর্ষস্থানীয় নেতার সাথে তাকেও গ্রেফতার করে। এর আগেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। সংসদ নেতা হোসাইন ইব্রাহিম ব্রাদারহুড আলেকজান্দ্রীয় অফিস প্রধান। একজন দক্ষ সংগঠক ও রাজনীতিক তিনি। ব্রাদারহুডের দায়িত্বশীল নেতাদের বেশির ভাগই শিক্ষাবিদ। একটা অংশ ডাক্তার ও প্রকৌশলী। দলটির শীর্ষ চার নেতার তিনজনই ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। অন্যজন শীর্ষস্থানীয় ডাক্তার।
রাজনৈতিক ফ্রন্টের সম্মুখভাগে দেখা যাচ্ছে সমাজের আলোকিত মানুষ। জনগণের আস্থা অর্জনে তাই দ্রুত সমর্থ হচ্ছেন তারা।
প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি তাদের ঘোষিত লক্ষ্যপানে অগ্রসর হতে পারবে কি না। দেশটির অর্থনীতি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। এর সাথে স্পটগুলোতে আগের মতো বিদেশীদের খোলামেলা অবাধ চলাফেরার সুযোগের বিষয়টি জড়িত। নাচগান পার্টি ও অ্যালকোহলের অবাধ বেচাকেনার কী হবে? মিসরীয় অর্থনীতির মাত্র তিন-চার শতাংশ ইসলামি ব্যাংকিং অনুসরণ করে। কিভাবে তারা পুরো অর্থনীতিকে সুদমুক্ত করবেন। ইসরাইলের সাথে ক্যাম্পডেভিড চুক্তির কী হবে? এসব চ্যালেঞ্জ এখন ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাওয়া ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির সামনে।
তবে বাইরের বড় শক্তিগুলো বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। যেমন বাস্তবতাকে অহরহ মোকাবেলা করে আসছে ব্রাদারহুড প্রতিনিয়ত। দীর্ঘ প্রতিকূলতা কাটিয়ে এরা এখন ক্ষমতায় আসার দোরগোড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্রাদারহুডের নেতৃত্বের সাথে এরই মধ্যে বৈঠক হয়েছে। তারা এর রাজনৈতিক শাখার সাথে একসাথে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। পরাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও সিনেটে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জন ক্যারি এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন।
অন্য পরাশক্তি চীনও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। মিসরে চীনা রাষ্ট্রদূত সং আইকোওয়া জানুয়ারির প্রথম দিকে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মরসির সাথে সাক্ষাৎ করেন। সামপ্রতিক রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে মরসির সাথে আলোচনা করেন চীনা দূত। মরসি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের তৎপর ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে চীনের সমর্থন চাই।’ আইকোওয়া এ সময় ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির বিপুল বিজয়ের জন্য তাকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি ভবিষ্যতে দুটো দেশের আরো জোরদার সম্পর্কের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। চীনা কোম্পানি দেশটিতে বর্ধিতহারে বিনিয়োগ করার জন্য তাকিয়ে আছে উল্লেখ করে দেশ দুটোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রস্তাবও রাখেন তিনি।
অন্য দিকে ইসরাইলের মিসরীয় দূতাবাস থেকে বারবার ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ইসরাইলি পত্রিকা জানিয়েছে। দলটি ইসরাইলের প্রতি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তারা মিসরীয় জনগণের মনোভাবকে আস্থায় নিয়েই এ ব্যাপারে অগ্রসর হবেন।
jjshim146@yahoo.com
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০১/০২/১২] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/JashimUddin |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|