আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুলঃ কে শুনবে আমার আকুলতা
জসীম বিন শফিক
আমরা বরাকপারবাসীরা খুবই উদ্বিগ্ন, চিন্তিত। অবশ্য সে সাথে গোটা দেশের মানুষজনও। বরাক বলতে সুরমা নদীর কথাই বলছি। সুরমা নদীর উজান তথা ভারতের অংশকে বরাক বলা হয়। আমাদের বাড়ি সুরমা নদী তটে । পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন আমাদেরকে বরাকপারবাসী হিসেবে অভিহিত করে । আমরাও নিজদেরকে বরাকপারের বাসিন্দা পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি । কিন্তু আজ আমাদের যত চিন্তা আর উদ্বেগ এই বরাকপারের বাসিন্দা হওয়ার কারণে । যে সুরমা কুশিয়ারা তথা বরাক ছিল আমাদের গর্বের একটি ঠিকানা- আনন্দের একটি সীমানা, সে বরাক নাকি আজ আমাদের জন্য একটি কাল হয়ে যাচ্ছে ।
আহ ! ভাবতেও অবাক লাগছে- হে প্রিয় বরাক, প্রিয় সুরমা কুশিয়ারা ···· তোমরা না-কি অচিরেই আমাদের জন্য সর্বনাশা হয়ে যাচ্ছ । কয়েক বছর আগে একটি গান শুনছিলাম । ঠিক এই মূহুর্তে গানটি মনে না পড়লেও তার একটি অংশ মনে পড়ছে- ‘সর্বনাশা পদ্মারে ············’। আরও কিছুদিন পর তোমাদেরকে উদ্দেশ্য করে আমরাও কি গান গাইব- ‘মে মাটির সুরমা কুশিয়ারা পিয়াস মিটাইতোরে, সে মাটির সুরমা কুশিয়ারা আজ সর্বনাশারে’ । সত্যিই সত্যিই কি প্রিয় সুরমা কুশিয়ারা, আমাদেরকে না-কি তোমরা করবে বাস্তুহারা, তোমাদের কারণেই এ জনপদ থেকে না-কি বেরিয়ে আসবে উদ্বাস্তু ভিটে-মাটিহারা ছিন্নমূল মানুষের মিছিল । এমনকি তোমরা না-কি তোমাদের উদর থেকে পানিকে শূন্য করে দেবে । ফলশ্রুতিতে গোটা সিলেট অঞ্চল না-কি দেবে যাবে, হারিয়ে যাবে কালের অতল তলে । কারণ, তোমার পানিশূন্য ধূ ধূ বালুচর উত্তপ্ত দেহ নিয়ে শুধু খা খা করবেনা; পানিশূন্যতার যন্ত্রণা রুপ নেবে ভয়াবহ ভ্থমিকম্পে । কালের অতলতলে হারিয়ে যাবে প্রকৃতির অপরুপ দান-নয়নাভিরাম সৌন্দর্যেøর লীলাভ্থমি প্রিয় জনপদ সিলেট । প্রিয় বরাক আর সুরমা কুশিয়ারা ···· তোমাদেও পানিশূন্যতার অভিমান ভ্থমিকম্পে রুপ নিলে তোমরা কি টিকে থাকতে পারবে আপন অস্থিস্ত নিয়ে । তোমাদের যে নাম-নিশানাও মুছে যাবে- ভেবেছ কি তা কখনোও ।
উপরের কথাগুলো আবেগের আতিশয্যের নয়, কল্পনার রাজ্যে বিচরণও নয় । সুরমা কুশিয়ারা নদীর উজানে ভারতের বরাক নদীর উপর সে দেশের সরকার যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে-সে বাঁধ নির্মিত হলে পরে যা ঘটবে তার কিয়দংশের উলেস্নখ মাত্র। ভারতের মণিপুর রাজ্যে বরাক নদীর টিপাইমুখ নামক স্থানে আন্তর্জাতিক নদী আইনকে বৃদ্বাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত সরকার যখন এ বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণ এর প্রতিবাদে সোচ্চার এবং কঠিন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে । বাংলাদেশের জন্য মরণ ফাঁদ এ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে রাজধানী ঢাকা, সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে, নগরে-বন্দরে প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ হচ্ছে; পালিত হচ্ছে মানববন্ধন, সেমিনার, গোলটেবিল সহ বিভিন্ন কর্মসূচী। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামে-গঞ্জেও । প্রতিবাদে সোচ্চার গ্রামীণ জনপদের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোও। এদিকে ভারতের মণিপুর রাজ্য ও এর আশে-পাশের রাজ্যের মানুষগুলোও সে অনেক আগ থেকেই সোচ্চার । প্রতিবাদে সোচ্চার সেখানকার জনগণ আজ রাস্তায় নেমেছে । টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রতিহত করতে আজ তারা বদ্ধপরিকর । কারণ, টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষতিকর এবং মারাত্মক প্রভাব শুধূ বাংলাদেশে পড়বেনা । ভারতের মণিপুর সহ কয়েকটি রাজ্য বাংলাদেশের সাথে সমভাবে ভ্থক্তভোগি হবে ।
ভারত সরকারের উপর যখন এভাবে চাপ প্রয়োগ হচ্ছে তখন মণিপুর রাজ্য সরকার সম্প্রতি সিন্দান্ত নিয়েছে প্রস্তাবিত সময়ের আগে তড়িগড়ি করে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের কাজ সমাপ্ত করবে এবং এজন্য তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিচ্ছে । গত ২১ জুন তারিখে ইংরেজী জাতীয় দৈনিক The New Nation প্রথম পৃষ্ঠায় এ ধরণের সংবাদ সম্বলিত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে । রিপোর্টের একটি অংশ এরকম In spite of there being strong opposition from various sections inside and outside India against the proposed Tipaimukh Dam Projct, the Monipur state government of India has formulated special proposed vehicle (SPV) for speedy implementation of the project.
অর্থাৎ, ‘ভারতের অভ্যন্তরের এবং বাহিরের বিভিন্ন অবস্থান থেকে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের প্রবল বিরোধিতা হওয়া সত্ত্বেও সেদেশের মণিপুর রাজ্য সরকার দ্রুত বাঁধ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য হাতে নিয়েছে বিশেষ প্রস্তাবিত যানবাহন প্রকল্প (এসভিএস)’।
কাজ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয় সেজন্য এর তদারকিও চলছে । রিপোর্টের আর একটি অংশ এরকম ‘A meeting chaired by the state chief secretary, Rakesh held last month reviewed the progress of implementation of the Tipaimukh project and decisions which include state power department.’
The New Nation পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটি আমাদের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠাকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে । বাংলাদেশের জনগণ যেখানে শংকিত, শংকিত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণও টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো নিয়ে; সেখানে মণিপুর রাজ্য সরকারের এ সিন্দান্ত যেন মরার উপর খাড়ার ঘা । জনগণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে ভারত সরকার টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের কাজ বন্ধ না করলেও অন্তত পক্ষে স্থগিত করবে-এটাই ছিল ন্যুন্যতম প্রত্যাশা । কিন্তু তা না করে তড়িগড়ি করার সিন্দান্ত আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে ।
আফসোস আর হতাশার এখানেই ইতি হলে একটা কথা ছিল । কথা রয়ে যায়, ব্যাথা বেড়ে যায় । সেকথায় আসার আগে আর একটু আলোকপাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত সিলেট বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠন সিলেট বিভাগ উন্নয়ন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা প্রায় মাস তিনেক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের আহ্বান জানিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচী শুরু করেছিলাম । এ সময়ে আমরা আমাদের দাবী সম্বলিত স্মারকলিপি পানিসম্পদ মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বরাব দিয়েছি । এরপরও আমরা পানিসম্পদ মন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী, বানিজ্য মন্ত্রী সহ অনেকের মুখ থেকে শুনেছি অনেক বিতর্কিত বক্তব্য । টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে না-কি বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আসবে, এ বাঁধের ফলে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবেনা, আগে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হোক তারপর ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করব ·······এরকম আরো কত কি ?
আন্দোলনের প্রচন্ডতা বাড়তে থাকে । বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক আর পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলনে নামে, সমালোচনা উঠে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মন্ত্রীদের আপত্তিকর আর দেশের স্বার্থবিরোধি বক্তব্যের । থামে মন্ত্রীদের কণ্ঠ । আবোল-তাবোল বক্তব্য নিয়ে এবার মাঠ গরম করেন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী । আলোচনায় উঠে আসেন মিডিয়ায়-তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বাংলাদেশের জনগণের ।
বলছিলাম আফসোস আর হতাশার কথা । আমাদের বক্তব্য ভারতের সরকারের কর্ণকুহরে পৌছেনা, আমাদের প্রতিবাদের ধ্বণিগুলো তারা শুনেনা বলে মণিপুর রাজ্য সরকারের তড়িগড়ি করে বাঁধ নির্মানের কাজ সমাপ্ত করার সিন্দান্ত । সহ্য হয়না মোটেও যখন এ সিন্তান্দের রিপোর্ট একটি পত্রিকায় পড়ার পর আর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত আর একটি রিপোর্ট পড়তে হয় যে আমাদের দেশের অনেক মন্ত্রী টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে কিছুই জানতেননা । ২১ জুন তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী কিছুই জানতেন না । বিষয়টি আলোচনায় আসার পর তিনি ইন্টারনেট সার্চ করে যা জানলেন তাতে তিনি মনে করেন এ বাঁধ বাংলাদেশের জন্য কোন সমস্যা নয় । এখন বাংলাদেশের সমস্যা বিদ্যুৎ সংকট ও অন্যান্য আরো কিছু সমস্যা । পাটমন্ত্রী গত ২০ জুন বিবিসির একটি অনূষ্ঠানে এমন বক্তব্য প্রদান করেছেন । সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে এ হতভাগা জাতি এমন বক্তব্যই শুনল।
গত ২১ জুন তারিখে রাজধানীর একটি হোটেলে একটি সেমিনারে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ না-কি বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করে হচ্ছে । কাদের সাথে কখন আলোচনা হয়েছে সেকথা উহ্য রয়েই গেল । তিনি আর একটু এগিয়ে যা বললেন তা রীতিমত সবাইকে অবাক করে দিয়েছে । আন্তôর্জাতিক কোন আইন এ বাঁধ নির্মানের অন্তরায় নয়, আন্তর্জাতিক কোন আইন এ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে পারবেনা । পিনাক যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মণি সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন । তিনি কোন প্রতিবাদ করলেন না- নিরবে সমর্থন করে গেলেন ।
আমাদের কথাগুলোতো ওরা শুনবেনা । আমাদের দেশের সরকারও যদি আমাদের হৃদয়ের একান্ত কথাগুলো না শুনে তাহলে আমরা রাজপথে আন্দোলন কার জন্য করব-কেন করব? আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা যদি টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের পক্ষে সাফাই গান, তারা যদি ভারতীয় কতৃপক্ষের বক্তব্যকে সরবে-নিরবে সমর্থন করে যান- তাহলে আমাদের কি অবস্থা হবে । টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের বিরুদ্ধে আজ আমরা সোচ্চার । আমাদের হৃদয় আজ ব্যাকুল । আমরা হৃদয়ের কথা বলিতেও ব্যাকুলঃ কে শুনবে আমাদের আকুলতা ? ভারতের সরকার না বাংলাদেশের সরকার ? না বাতাসে শুধু গুঞ্জনই শুনা যাবে-আমারা টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি ·································।
লেখকঃ ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আহবায়ক, সিলেট বিভাগ উন্নয়ন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ইমেইল, jasim.shafique@yahoo.com
তুমি হূদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, আর তোমার ব্যাকুলতা পুরো দেশবাসীকেই আকূল করেছে, শুধুমাত্র পিণাকপন্থী সরকারকে ছাড়া। ক্যাম্পাসে তুমি যেমন সাহসী, এই লেখাটাও বেশ সাহসী হয়েছে। অশেষ ধন্যবাদ তোমাকে.....
1920
২
Dhaka University থেকে Ehsanul Haque Jasim লিখেছেন,
০৪ জুলাই ২০০৯; রাত ০৯:১৪
Farhana,
I congratulate you very much.
May Allah bless you.
Pray for me.
1952
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: