মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৪:০৬ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
দারিদ্র্য ও আমাদের সমাজ (২৪/০৩/২০১২)
সেদিন দু’জনে (১১/০২/২০১২)
ছুটির ফাঁদে (০৯/০৭/২০১১)
মাতৃত্ব (১৪/০৫/২০১১)
এক কাল-বৈশাখীর ঝড়ে (২৩/০৪/২০১১)
প্রতীক্ষা (১৯/০২/২০১১)
পরিণীতা (১২/০২/২০১১)
ক্ষুধার তাড়ণায় (১৮/১২/২০১০)
মরা গাঙ্গে বান (১৩/১১/২০১০)
অমাবস্যার চাঁদ-২ (গল্প) (০৯/০৯/২০১০)
অমাবস্যার চাঁদ (০৪/০৯/২০১০)
অমাবস্যার চাঁদ (গল্প) (০৭/০৮/২০১০)
এক নিঝুম সন্ধ্যায় (১৭/০৭/২০১০)
হারায়ে খুঁজি (কবিতা) (১৯/০৬/২০১০)
ভ্রান্তি বিলাস (গল্প) (১২/০৬/২০১০)
মনপাখীর গুঞ্জরণ (কবিতা) (০১/০৫/২০১০)
স্মৃতির পটভূমি (কবিতা) (২৪/০৪/২০১০)
একাত্তরের এক রজনী (০১/০৪/২০১০)
জীবনের সাজঘরে (কবিতা) (১৫/০১/২০১০)
তুমিই কি সেই! (কবিতা) (০১/০১/২০১০)
নিছক অঙ্গীকার (কবিতা) (১৫/১২/২০০৯)
জীবন ও জীবিকা (০১/১১/২০০৯)
স্বপ্নে দেখা চাঁদ (কবিতা) (০১/১০/২০০৯)
নতুন দিগন্ত (গল্প) (০১/০৯/২০০৯)
গল্পের মত সত্য (০১/০৭/২০০৯)
এক মাধবী রাতে (কবিতা) (০১/০৬/২০০৯)
জীবন তৃষ্ণা (গল্প) (১৫/০৫/২০০৯)
আগুনের পরশমণি (০১/০৫/২০০৯)
কি আশায় বাঁধা এ খেলাঘর (১৪/০৪/২০০৯)
এ কোন্‌ ভুবন (১৫/০৩/২০০৯)
আগের লেখা
178


দারিদ্র্য ও আমাদের সমাজ

যুথিকা বড়ুয়া

আমাদের দেশে ধনী ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী মানুষের তুলনায় নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার এবং গরীবের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। তন্মধ্যে বেশীরভাগই হতদারিদ্র্য এবং অসমর্থ। বিশেষ করে জীবন ও জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন কঠোর সংগ্রামে লিপ্ত থাকে, দুঃখ-দীনতাই যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বিশেষতঃ যারা আর্থিক সংকটে কখনো অর্ধাহারে, কখনো বা অভূক্ত জীবনযাপন করতে হয়। যাদের মাথা গোঁজার ছাদ থাকে তো পরনের বস্ত্র থাকে না, দু’বেলা অন্ন জোটে তো বিদ্যার্জনের সামর্থ থাকে না। বেঁচে থাকে নামমাত্র। যাদের নিজস্ব মাটিতে মেরুদন্ড সোজা করে শক্তপায়ে দাঁড়াবার মতা থাকে না। আত্মরক্ষা করে ফুটপাতে কিংবা মফঃস্বল অঞ্চলের নিকটবর্তী খাল-বিল-নদী-নালার সংলগ্ন এলাকায় গাছের ছালবাকল কিংবা ছেঁড়া বস্তা ঘেরা ছোট্ট ঘুপচি ঘরের কোণে। যেখানে সামান্য বর্ষণে রাজ্যের কীট-পতঙ্গ, মশা-মাছি, পোকা-মাকড়, বিষধর সাপ, কেঁচো-ব্যাঙ গিয়ে বাসা বাঁধে। আবার কারো কারো সেটুকুও জোটে না। দীর্ঘ রজনী অতিবাহিত করে উন্মুক্ত নীল সামীয়ানার নীচে। যারা আমাদের সুশীল সমাজে আজও নিগৃহীত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত এবং নিপীড়িত। মূলতঃ যারা মনুষ্যকূলে জন্ম গ্রহণ করেও মানবাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। যাদের ভাগ্যবিড়ম্বণায় পদে পদে অপদস্থ হতে হয়। যারা আমাদের দেশে অতি নগণ্য, দেশের নাগরীক হিসেবে কখনোই বিবেচিত হয় না। কিন্তু তারা কিভাবে জীবনযাপন করে, কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করে, পেটের ক্ষুধা মেটায়, কেইবা রাখে তাদের সেখবর! যা প্রত্য দৃষ্টিপাত না হলে গহীন অনুভূতি দিয়ে কখনো উপলব্ধি করা যায় না। সে এমনি এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা কোনদিনও ভোলবার নয়। জলছবির মতো আজও আমার মনঃশ্চে ভেসে ওঠে, এক অসহায় আশ্রয়হীন দুর্বল নারীর ত্রাণ রার সেই করুণ আবেদন, তীব্র আর্তনাদ।

অনেক বছর আগেকার কথা। আমার আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, তখন কত আর বয়স আমাদের! বারো কি তেরো হবে। তখন চৈত্র্য মাস। প্রতি বছরের মতো সেবারেও চৈত্র্য সংক্রান্তির মেলা বসেছিল, আমাদের নিকটবর্তী বুড়ো শীবতলা মন্দিরের সংলগ্নে একটি বিশাল চত্তরে। আমরা কৈশোরীরা সবাই সকাল থেকেই মেলার অন্যতম আনন্দে মেতে উঠি। মেলা মানেই তো তালপাতার বাঁশির অপূর্ব মূর্ছণা, সূঁতোয় বাঁধা কাঠপুতুলের নাচন, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা, ঝাল মুড়ি খাওয়া, ঐতিহাসিক চিত্রকলার স্লাইট্ শো-এর প্রদর্শনী উপভোগ করা, নাগর দোলায় চড়া, আরো কত কি! কিন্তু বিধি বাম। সেদিন ঊষার প্রারম্ভেই আবছা কূয়াশায় ছেয়ে গিয়ে চারদিক নীরব, নিস্তদ্ধ। গুমোট মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। একটু হাওয়া নেই, বাতাস নেই। পশু-পাখীর কলোরব নেই। বিকেল হতেই শুরু হয় এলোপাথাড়ী ঝড়-তুফান, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। তখন শোচনীয় অবস্থা আকাশের। মনে হচ্ছিল, এক্ষুণিই ঝুপ্ ঝুপ্ করে বৃষ্টি নামবে। কিন্তু গ্রাহ্য করছে কে! তা উপেক্ষা করেই আমরা কিশোরীরা দলবেঁধে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বেড়িয়ে পড়ি চৈত্র্য সংক্রান্তির মেলা দেখতে।

যাচ্ছিলাম শর্টকাট পথ ধরে, একটা ফুটবল খেলার মাঠের উপর দিয়ে। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ শুরু হয় মুসলধারে বৃষ্টি। যেন আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি। সহসায় থামার কোনো লক্ষণই ছিল না। সেই সঙ্গে গুড়ুম গুড়ুম মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের বাঁকা ঝিলিক। গাছের ডালপালা ভেঙ্গে মুছড়ে সে একেবারে প্রলয়ঙ্করী বেগে ছুটে চলে দ্বিগ্বিদিকে।

কি করি! ক্ষণিকের বিভ্রান্তিতে অস্থির হয়ে উঠি। ফিরে যাবারও কোনো উপায় ছিল না। অগত্যা, দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ি নিকটবর্তী একটি প্রাইমারী স্কুলের ভিতরে। ততক্ষণে ভাটা পড়ে যায় আমাদের আনন্দ-উল্লাসে। শিথিল হয়ে আসে মেলায় ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি। তন্মধ্যে বিদ্যুৎ নেই। বেড়ে যায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। অচীরেই ঘনিয়ে আসে অন্ধকার। আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপ পরিস্থিতির কবলে পড়ে ভয়ে আশঙ্কায় বুক শুকিয়ে আসছিল। হঠাৎ কর্ণগোচর হয়, মানুষের কোন্দল, কোলাহল, চিৎকার-চেঁচামিচি।

আমরা চমকে উঠি। স্কুলের জানালা দিয়ে গলা টেনে চারিদিকে চোখ বুলাতেই হ্যাজাকবাতির জোড়ালো রশ্মি আমাদের দৃষ্টি আর্কষণ করে। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, যেন অথৈ জলে কিনারা খুঁজে পেলাম। দেখলাম, একটু দূরে ঐ ফুটবল খেলার মাঠের বিপরীত দিকে অবস্থিত, একটি বিশাল দালান বাড়ির প্রাঙ্গণে প্রচন্ড ভীঁড়। লোকে লোকারণ্য। খুউব হৈ চৈ হচ্ছে। কিন্তু হেতু বোঝা যাচ্ছে না। আমরা ঘাবড়ে যাই। বিচলিত হয়ে পড়ি। এমন বৃষ্টি বাদলের দিনে কারো কোনো অঘটন ঘটল না কি! তবু বুকে সাহস জুগিয়ে অবিলম্বে আড়ি পেতে শোনবার চেষ্টা করি। অনুমান করে ছিলাম, নিশ্চয়ই কারো মাথার উপর বজ্রপাত হয়েছে।

কিন্তু না, লোকের কানাঘুষোয় অবগত হলাম, শিশু অপহরণের দায়ে একটি মহিলাকে আটক করে রেখেছে। মনে মনে ভাবলাম, এ আর নতুন খবর কি! দিনকাল কবেই বা ভালো ছিল! অহরহই তো ঘটছে! কিন্তু এমন দুর্যোগের মধ্যেও?

তবু স্বভাবসুলভ কারণে মহিলা চোরকে স্বচোক্ষে দেখবার ইচ্ছাটা আমাদের প্রবলভাবে জেগে উঠল। সম্বরণ করতে পারলাম না। বৃষ্টিটা ধরে আসতেই খানিকটা কৌতূহলে দ্রুত ছুটে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি, অবাক কান্ড! সে এক নতুন বিস্ময়! একেবারে গল্প, নোবেলের মতো ঘটনা। ময়লা অপরিস্কার ছেঁড়া ফাটা বস্ত্র পরিহিতা এক মহিলা একহাত ঘোমটা টেনে, কাঁথা জড়ানো একটি ছোট্ট শিশুকে বুকে নিয়ে, একহাঁটু জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ওর আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে দেখলাম, ওর দুইহাত ভর্তি রং-বেরং-এর প্লাষ্টিকের চুরি। পায়ে স্যাঁতলাপড়া হাওয়াই চটি। নোংড়ায় ভর্তি হাতে পায়ের বড় বড় নখ। পা-দুটোও ফুলে ফেটে বিন্দু বিন্দু রক্তকণায় লাল হয়ে উঠেছে। হ্যাজাকের আলোতে যেটুকু বোঝা গেল, তাতে মনে হলো, বেশ কয়েকদিন জলের মধ্যে ডুবেছিল। আঙ্গুলের ফাঁকগুলিকেও জলে খেয়ে একেবারে ঘা করে ফেলেছে। কিন্তু মহিলাটিকে খুব অস্বাভাবিক লাগছিল। কিছু বলবার ব্যকুলতায় কেমন অস্থির হয়ে উঠছিল। ওর ঠোঁট কাঁপছিল। চোখদু’টোতেও আঁতঙ্কে ভরা।

কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই স্থানীয় মস্তান গোছের কয়েকজন ছেলে উত্তেজিত হয়ে বলছে,-“ধর চুলের মুটি, বেটি দু-চার ঘা খেলেই মুখ দিয়ে অনায়াসে বুলি উতরে আসবে!”

কেউ বলছে,-“কূলটা, পাপীষ্ঠা!”

আবার কেউ বলছে,-“পালিয়ে যাচ্ছিস কোথায়? বল্ কোথা থেকে বাচ্চা চুরি করেছিস? কাদের বাচ্চা চুরি করেছিস শীগ্গিরি বল, নয়তো এক্ষুণি তোকে পুলিশে ধরিয়ে দেবো!”

পুলিশের নাম শুনেই ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে মহিলাটি থর থর করে কাঁপতে শুরু করে। ভয়ে আঁতঙ্কে আড়ষ্ঠ হয়ে বাচ্চাটাকে শক্তহাতে বুকে চেপে ধরে। কিন্তু বিক্ষিপ্ত জনতার দল নাছোরবান্দা। মারধোর করবার হুমকি দেখায়। অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। রীতিমতো প্রস্তুতি নিয়ে ছেলেরা তেড়ে আসতেই মহিলাটি কাঁন্নাজড়িত কন্ঠে চিৎকার করে ওঠে,-“আমি চোর নই বাবু! চোর নই! ও’ আমারই বাচ্চা! কত্তকষ্টে নয়টামাস প্যাটে রাইখ্যা অড়ে আমি জনম দিছি! আমিই অড় মা!”

বাচ্চাটাকে সজোরে বাহু বেষ্টনে আলিঙ্গন করে ওর কপালে গালে একটা চুম্বন করে বলল,-“সংসারে আমাদের কেউ নাই গো বাবু, কেউ নাই! সব বন্যার জলে ভাইস্যা গ্যাছে! আমারে দয়া করেন!” বলতে বলতে মহিলাটি হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে একটু একটু করে উন্মোচন হতে লাগল, ওর জীবনের করুণ কাহিনী।

মহিলাটির নাম সরলা। অজ্পাড়া গাঁয়ের অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের কূলবধূ। জরা-জীর্ণের মতো রোগা শরীর। গায়ের রং শ্যাম বর্ণ। বয়সের তুলনায় বেশ বুড়িয়ে গেছে। চোখমুখ গর্তে ঢুকে গেলেও খুটিয়ে দেখলে বেশ বোঝা যাচ্ছিল, যৌবনের প্রাক্কালে সরলা কম সুন্দরী ছিল না। ভাগ্যের নিমর্ম পরিহাসে অনাদরে অবহেলায় ময়লার আবরণে চড় পড়ে ওর লাবণ্যময় সৌন্দর্য্য একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। ঘটা করে না হলেও রীতিমতো পুরোহিত এনে শাস্ত্র মতেই ওর বিবাহ হয়েছিল ওদেরই পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটা অশিক্ষিত অসমর্থ দুর্বল লুলা ল্যাংড়া তরুণ যুবক রঘুনাথের সাথে।

কথায় বলে,-“খাঁটি সোনা বেঁকে গেলেও সেটা সোনাই! তার মূল্য কখনো কমে যায় না!” তেমনি একজন পুরুষ মানুষ শত কালো কুৎসিৎ কিংম্বা বিকলাঙ্গ হলেও তার পুরুষত্ব কখনো কমে যায় না। আর গেলেও সরলার মতো মেয়ের তাতে কিইবা এসে যায়। বরং ওর জন্যে শাপে বরই হয়েছিল। আর তা’ছাড়া, বিমাতা কতৃক অমানবিকভাবে নির্যাতিত এবং লাঞ্ছিত হয়ে অর্ধাহারে জীবনযাপন করবার চে’ লুলা ল্যাংড়া অক্ষম স্বামীর ঘর-সংসার করা ঢের ভালো! এ তো পরম সৌভাগ্য সরলার! বিধাতারও অসীম দয়া। নইলে ওর মতো অজপাড়া গাঁয়ের ঘরকুনো আনস্মার্ট, আন্এ্যডুকেটেড্ এবং স্বল্প বস্ত্র পরিহিতা মেয়ের বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, জীবনসাথী পাওয়া, স্বামীর সোহাগী হওয়া, তার হৃদয় নিঃসৃত ভালোবাসা পাওয়া, এ কি কম সৌভাগ্যের কথা! স্বপ্নেও তো ভাবতে পারেনি কোনদিন।

রঘুনাথ ক্র্যাচ্ ছাড়া চলতে পারতো না। চলার শক্তিও ছিল না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে শুধুমাত্র মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ওকে অনেক হিমশিম খেতে হতো। তবু ওর মনের শক্তি ছিল প্রকট। ছিল অসাধারণ আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সংকল্পপ্রবণ এবং সৃজনশীল মন মানসিকতা। শারীরিক ভারসাম্যহীনতায় কখনো ভেঙ্গে পড়েনি। পিছুপাও হয়নি। দুঃখ-দৈনতায় ওকে কখনো ঘায়েল করতে পারে নি। বিকলাঙ্গ শরীর নিয়েই গরুর গাড়ির মতো ধিক্ ধিক্ করে ঠেলাগাড়ি টানতো। বাজারে ডাব বিক্রি করতো। বাড়িতে হাঁস-মুরগীর একটা ছোট্ট পল্ট্রিও ছিল। যার দেখাশোনা করতো সরলা। তাতে যা আমদানি হতো তা দিয়ে ওদের দু’জনের পেট কোনরকমে চলে যেতো। কোনদিন অর্ধাহারেও কাটাতে হতো। তবু কোনো অসন্তোষ, অভিযোগ কিচ্ছু ছিল না। ছিল সুখ, শান্তি। ছিল সরলার অনাবিল মুখের অনিন্দ্য সুন্দর হাসি। যা কখনোও ম্লান হতো না। বাস করতো, খড়-কূটোর ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটি মাটির ঘরে। যেখানে প্রত্যেক বছর বর্ষার জলে ধস্ নেমে গৃহহীন হয়ে পড়ে বাচ্চ-বুড়ো সহ গ্রামের শত শত অসমর্থ দুর্বল মানুষ। মারাও যায় অনেকে। আর যারা না মরে অর্ধমৃত অবস্থায় বেঁচে থাকে, তারা সর্বস্ব নিঃস্ব হয়ে এতিমের মতো অন্ন-বস্ত্র এবং আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় পথেঘাটে, রাজ্যের অখ্যাত কুখ্যাত পল্লীর অলি-গলিতে, শহরের জনপথে। যেখানে প্রতিনিয়ত প্রবঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হয় গৃহহীন, আশ্রয়হীন, সম্বলহীন অগণিত অভূক্ত মানুষের জীবন।

সেবার প্রবল বর্ষণ ও ঝড়-তুফানে সরলার স্বামী, ঘর-সংসার, হাঁস-মুরগী সব জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনিশ্চিত মোহনার দিকে। তারা জীবিত না মৃত, তা সরলার জানা নেই। কথায় বলে, -“চাচা, আপন পরাণ বাঁচা!”

বন্যার জলে ভয়ঙ্কর বিপদগ্রস্থ সরলার ভালোবাসার মাটির প্রাসাদখানি যখন টলমল অবস্থা, তখন মন-মানসিকতা ওর প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। ন্যায়-অন্যায়, বিচার-বিবেচনা করবার মতো কোনো শক্তিই তখন ওর ছিল না। যখন আসন্ন বিপর্যয়ের সম্মুখে পালিয়ে যাওয়াই ছিল সরলার একমাত্র বাঁচবার পথ। নতুবা মৃত্যু অবধারিত।

সরলা নিরুপায় হয়ে সদ্য নবজাত শিশুকে বুকে আলগে একটি কাপড়ের পোটলা সাথে নিয়ে, স্বামী, ঘর-সংসার এবং ওর বৈবাহিক জীবনের বিশ্বাস-ভালোবাসার সকল বন্ধন ছিন্ন করে ওর ছোট্ট ঘুপচী ঘর ছেড়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে বাইরের পৃথিবীতে। যে ঘরে জন্ম নিয়েছিল সরলার প্রথম প্রেম, ভালোবাসা। কত আশা বুকে বেঁধে সাজিয়ে ছিল ওর নতুন সংসার। গড়ে তুলেছিল স্বর্গসুখ। কত না স্বপ্নীল আকাঙ্ক্ষা সঞ্চিত করে রেখেছিল ওর মনের মণিকোঠায়। যা ভাগ্যবিড়ম্বণায় অবাঞ্ছিত, অর্থহীন মনে হতেই হারিয়ে গেল ওর মনের শক্তি, আত্মবিশ্বাস। যখন জীবনের নিষ্ঠুর পরিণতির পূর্বাভাষে বোধগম্য হয়েছিল, প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিমর্মতায় আজই বন্যার জলে ভেসে যাবে ওর সাজানো সংসার। ভেঙ্গে যাবে ওর সুখের নীড়। ভেসে যাবে ওর দেবতূল্য স্বামী রঘুনাথ। যার ছুটে পালাবারই ক্ষমতা নেই। জলের স্রোতে ওকে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, কোনো নিশানাই পাওয়া যাবে না। হয়তো গাছের লতাপাতায় লেপটে থাকবে। হয়তো বা দম আঁটকে সেখানেই মরে পড়ে থাকবে। যাকে শনাক্ত করা কিংবা জীবিত না মৃত তা অনুসন্ধান করবার মতো কোনো সুযোগই আর থাকবে না। হয়তো কোনদিনও আর দেখা হবে না রঘুনাথের সাথে। কখনো জবাবদিহিও আর করতে হবে না। আজই ওর শেষ দেখা।

আশা করেছিল, শহরে এসে কূল-কিনারা একটা নিশ্চয়ই খুঁজে পাবে। মাথা গোঁজার মতো একটুখানি আশ্রয় কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই জুটে যাবে। কোলের সন্তানই আজ ওর একমাত্র সম্বল। যার মুখ চেয়ে জীবনের দুঃখ যন্ত্রণা সব ভুলে যাবে। ভুলে যাবে ওর অতীত। ভুলে যাবে স্বামী রঘুনাথকেও। দুঃখই যার নিত্যসঙ্গী, প্রতিদিনকার খোরাক, লোকের বাড়ি বাড়ি ঝি-কাজ করে অনিশ্চিত জীবনের বাকী দিনগুলি সে অনায়সেই কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু মুখে বলা যতটা সহজ, বাস্তব ততই কঠিন।

বলতে বলতে বিকলাঙ্গ স্বামী রঘুনাথের অসহায় মুখখানা চোখের পর্দায় ভেসে উঠতেই বুকটা ওর তীব্র বেদনায় মোচড় দিয়ে ওঠে। শোকে বিহ্বলে দুইহাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে হঠাৎ বিলাপ করে ওঠে,-“আমি তারে একেলা ছাইড়্যা আইছি। পারি নাই রা করতে। আমি যে বচন দিছিলাম, সারাজীবন তার পাশে থাকুম, আপদে বিপদে তারে দেখুম, রক্ষা কুরুম। আমি পারি নাই তারে বাঁচাইতে, রক্ষা করতে। আমি বড়ই নিষ্ঠুর, স্বার্থঃপর। আমারে ক্ষমা করো প্রভু, ক্ষমা করো। আমার বাচ্চাটারে বাঁচাও। ওরে দয়া করো। আমারে পথ দেখাও।”

কিন্তু সঠিক পথ ওকে দেখাবে কে? সেদিনকার মতো সাময়িক আশ্রয় পেলেও রাতের গভীর নিশী পোহায়ে দিগন্তের প্রান্তরে উষার প্রথম সূর্য্যরে স্নিগ্ধ কোমল আলো ফুটে ওঠার পূর্বেই সরলাকে হতাশ হয়ে শূন্য হাতে বিদায় নিতে হয়েছিল। কোনো সাহায্য, সহানুভূতি ওর কপালে জোটে নি। কিন্তু বিপন্ন জীবন নদীর স্রোতের টানে ও যে কোণ্ মোহনায় গিয়ে আটকে আছে, কিভাবে যে জীবিকা নির্বাহ করছে, তা কেউই জানে না। কারণ আমাদের সমাজ বড়ই কঠোর, নিষ্ঠুর। কোনপ্রকার অনুদান কিংবা আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আমরা কুণ্ঠিতবোধ করি, পিছুপা হই। যার ফলে সরলার মতো শত শত গৃহহীণ আশ্রয়হীন সম্বলহীন অসহায় দুর্বল মানুষেরা আমাদের সমাজে আজও নিগৃহীত, নিপীড়িত। যারা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে নিমর্মভাবে জীবন পাত করে চলেছে। যারা পেটের দায়ে নিজের মান-ইজ্জত বির্সজন দিয়ে শহরের অখ্যাত কুখ্যাত পল্লীর অলিতে গলিতে বসে ভিক্ষে করছে। কেউ লোকের এঁঠো বাসন-পত্র ধুয়ে মেজে অন্ন যোগাচ্ছে, দু’বেলা পেট ভরছে। কেউ কূলি বিত্তি করে পাখীর ছানার মতো নিজের সন্তানের মুখে আহার তুলে দিচ্ছে। আর কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে নিজেকেই বেঁচে দিচ্ছে দয়া-মায়াহীন, নিষ্ঠুর অত্যাচারী পাষন্ডের হাতে। কি হবে এদের ভবিষ্যৎ? কে দেবে এদের সাহারা? কে নেবে এদের দায়িত্ব? কি হবে এদের পরিণাম? যার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

অতঃপর, সেদিন চৈত্র্য সংক্রান্তির মেলায় আমাদের আর যাওয়া হয়নি। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, এতক্ষণ আমরা ছবিঘরে বসে বসে রূপালী পর্দায় সরলার জীবন কাহিনীর সাক্ষাৎ রূপ প্রদর্শন করছিলাম। কিন্তু ওর বুকের যন্ত্রণা সেদিন অপরিণত বয়সে আমরা কেউই অনুভব করতে পারিনি। পারিনি তার মূল্যায়ন করতে। কিন্তু সেইরাতে দু’চোখের পাতা কিছুতে আর এক করতে পারিনি। পারিনি মন থেকে তা অপসারিত করতে। প্রত্যেক বছর চৈত্র্য সংক্রান্তির মেলা এলেই আমার চোখের পর্দায় জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে, অতীতের হৃদয়বিদারক সেই দৃশ্যপটের সর্বহারা অভাগিনী জননী সরলার করুণ আবেদন, আকুতি, মিনতি। কানে বাজে ওর আর্তনাদ, ক্রন্দন, বিলাপ। দৃঢ়ভাবে অনুভূত হয়, ওর বুকের ভিতরে লালিত সেই কঠন যন্ত্রণার গভীরতা। যা আজও আমাকে পীড়া দেয়।

সমাপ্ত.........

লেখকঃ গল্পকার ও সঙ্গীত শিল্পী।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/JuthikaBarua
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুতাসিম বিল্লাহ নাসির লিখেছেন, ২৯ মার্চ ২০১২; দুপুর ০৩:১৪
লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো, সেজন্য লেখিকাকে ধন্যবাদ। লেখাটি যে জীবন থেকে নেয়া তাই পড়লে ভালো লাগতেই হবে। আসলে আমাদের আসে পাশে এ রকম হাজারো অনাথ অর্ধাহারে অনাহারে না খেয়ে দিনাতিপাত করা মানুষ রয়েছে, আমাদের ছোট একটু সহযোগিতা হতে পারে এদের সংগ্রামী জীবনে আশার আলো তার বেচে থাকার স্বপ্ন হয়ত আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে আমাদের সামান্য প্রয়াসে, মানুষ মানুষের জন্য সেটা আমাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে উপলদ্ধি করলে হয়ত সমাজ কিছুটা হলেও পরিবর্তন হতে বাধ্য।
81971
টরোন্টো, কানাডা থেকে যুথিকা বড়ুয়া লিখেছেন, ২৯ মার্চ ২০১২; রাত ১০:৩৭
সত্যিই তাই। কিন্তু কাজের বেলায় তা বাস্তবায়িত হয় না।
যাই হোক, আপনার সুন্দর ও মূল্যবান মন্তব্যের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ নাসির সাহেব।
82018
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
কানাডার টরোন্ট প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy