প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়নে সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে
জুয়েল আমিন
১.
দিনকয়েক আগে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে দেশে শকুনের সংখ্যা আশংকাজনকহারে কমে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে,গত দুই দশকে শকুনের সংখ্যা দেড় লাখ থেকে কমে দুই হাজারে নেমে এসেছে। এই ন্যাচারাল ক্যাভেঞ্জার বা প্রাকৃতিক ঝাড়–দার প্রকৃতিকে পরিষ্কার ও রোগমুক্ত রাখতে বিশেষ করে অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক, যক্ষা, ক্ষুরা রোগের প্রকোপ বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে রোগাক্রান্ত পশু কুকুর, ইঁদুর খেলে তাদের পেটে কোটি-কোটি জীবানু থেকে যায় কিন্তু শকুনের পরিপাকতন্ত্র এসব জীবানু ধবংস করে দিতে সক্ষম। কিন্তু পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ব্যবহার করলে সেই পশুর মৃতদেহ খেলে শকুন নিজেই ধবংশ হয়। ২০০৩ সালে এক মার্কিন গবেষক বিষয়টি প্রমান করে দিয়েছেন। আমাদের দেশের প্রকৃতিপ্রেমীরা শকুন রক্ষায় পশু চিকিৎসার জন্য উৎপাদিত ডাইক্লোফেনাক বন্ধের দাবী জানিয়েছেন । পশু চিকিৎসার জন্য উৎপাদিত ডাইক্লোফেনাক বন্ধে সরকারও ত্বরিৎ উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এমন উদ্যোগে পাখিপ্রেমী তথা সাধারন জনগনও খুশী হয়েছে নিশ্চয়ই। প্রাথমিক শিক্ষকদের কথা লিখতে গিয়ে শকুন কাহিনীতে গেলাম সেজন্য, যেজন্য কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর অমর সৃষ্টি পন্ডিত মশাই প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনের তুলনা করেছিলেন তিন ঠ্যাংওয়ালা বনেদী কুকুরের প্রতি (ঠ্যাং) পায়ের পিছনে ব্যয়িত খরচের সঙ্গে। ‘পন্ডিত মশাই’ গল্প নতুন করে না বলে এখন বলা যায়, শকুন রক্ষায় সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিতে পারে কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরনের নায্য দাবী যুগ-যুগান্তরেও বাস্তবায়ন হয় না।
২.
মাস কয়েক আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী একটি সেমিনারে বলছিলেন,উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রমোশন পেয়ে হন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তার ঐ উদ্ধৃতির মধ্যেই আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকদের কি করা উচিত তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।আমরা ২০১১ সালের মধ্যে শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে নিতে চাই,পাশের হার শতভাগ করতে চাই,২০১৪ সালের মধ্যে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা চাই। কিন্তু যারা এই গুরু দায়িত্ব পালন করবেন সেই কারিগরদের মান বৃদ্ধির কোন আন্তরিক ও কার্যকরী উদ্যোগ নেই। শিক্ষকদের জীবন মান উন্নয়নে উন্নত স্কেল, স্বতন্ত্র স্কেল ইত্যাদি দেয়া হবে বলে সরকার দীর্ঘদিন ধরে ঢোল বাজিয়ে চলেছে কিন্তু বাস্তবায়ন না করায় এ নিয়ে সচেতন মহলে নেতিবাচক গুঞ্জন উঠেছে। অনেকেই এসব আশ্বাস বাণীকে মন্ত্রীদের মস্করা হিসেবে বিবেচনা করছেন। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিতরা।যাদের অনেকেরই প্রাথমিক শিক্ষার উপ-পরিচালক,মহাপরিচালক হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। শুধুমাত্র কম বেতনের কারনে তাদের জীবনযাত্রা অনুন্নত,লোকের কটাক্ষের শিকার আর তারা কর্মক্ষেত্রে অসন্তুুষ্টি ও হীনমন্যতায় ভোগেন। ফলে তাদের মেধার সর্বোচ্চ সেবা থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকদের যুগ- যুগ ধরে দেড় টাকা মাইনের পন্ডিত মশাই বানিয়ে রেখে মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষার স্বপ্ন দেখা হবে আকাশ কুসুম কল্পনা। নাম উল্লেখ না করে বলছি সম্প্রতি কয়েকটি সেক্টরের ৩য় শেণীর কর্মচারীদের ২য় শ্রেণীতে, ২য় শ্রেণীর কর্মচারীদের ১ম শ্রেণীতে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভায় তারা হীনমন্যতায় ভোগেন। আবার তারা সংখ্যায় অল্প হওয়ায় সরকারকে বছরে খুব বেশী বাড়তি অর্থ দিতে হবে না,এমন যুক্তিও দেয়া হয়েছে। প্রাইমারি টিচারদের বেলায় সরকার এক পা এগুলে দু’পা পিছিয়ে আসে তাদের সংখ্যার দিকে তাকিয়ে। সংখ্যায় বেশী তো তাদের জাতীয় অবদানও অনেক বেশী। তারপরও কেন সেকেলে ও হাস্যকর এই হিসেব? আরও হাস্যকর একটি বিষয় হ’ল ২০০৬ সালে শিক্ষকদের আমরণ অনশনের মুখে সরকার একশ’ টাকা বেতন স্কেল বাড়িয়েছিল। কিন্তু চাতুর্যপূর্ণ আদেশের কারনে শিক্ষকদের বেতন না বেড়ে বরং কমে গেছে। অবিশ্বাস্য হলেও বিষয়টি সত্য এবং দীর্ঘদিনেও সমস্যাটির সমাধান করা হচ্ছে না।
৩.
শতভাগ পাশের নাম কি মানসম্মত শিক্ষা? অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার কম হলে শিক্ষকদের বিপদ, তাই এখন বেশী পাশ করানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সেই হাওয়া লেগেছে প্রাইমারি সেক্টরে। চাকরি বাচাতে শিক্ষকরা অযোগ্য শিক্ষার্থীদেরও পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। সব শিশুর মেধা সমান নয় এই বাস্তবতা আমাদের মানতেই হবে। ইউনিসেফ এর সাম্প্রতিক গবেষনা রিপোর্টেই বলা হয়েছে দেশের ৩০ শতাংশ শিশু চরম দারিদ্রের শিকার। শহরের চেয়ে গ্রামের শিশুরা বেশী দরিদ্র ও বঞ্চনার শিকার। গবেষণায় বলা হয় পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। লক্ষ্যনীয় বিষয় হ’ল এই বয়সী শিশুরা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করে। এছাড়া আবাসন,পয়োনিষ্কাশন, পানি,তথ্য,খাদ্য,শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এ সাতটি নির্দেশকের আলোকে শিশু বঞ্চনা পরিমাপ করা হয়েছে। নির্দেশনায় দেখানো হয় প্রায় ৬৪ শতাংশ শিশু পয়োনিষ্কাশন সুবিধা থেকে, ৪১ শতাংশ শিশু আবাসন সুবিধা থেকে,১৬ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে,প্রায় ৫২ শতাংশ শিশু তথ্যের যোগাযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। টেলিভিশন, বেতার, কম্পিউটারসহ কোন যোগাযোগ মাধ্যমেই তাদের কোন প্রবেশের সুযোগ নেই। গবেষনায় দেখা গেছে, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী অর্ধেক শিশু খর্বকায় ও কম ওজনের। পুষ্টির দিক দিয়েও পিছিয়ে আছে গ্রামের শিশুরা।গবেষনার সুপারিশে পরিস্থিতি পরিবর্তনে শিক্ষার পাশাপাশি পুষ্টি,স্বাস্থ্য,শিশুর সুরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার উপর জোর দেয়া হয়।
দুঃখজনক বিষয় হ’ল গবেষনা রিপোর্ট কিম্বা সেমিনারে এসব সমস্যা তুলে ধরা হলেও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচী বাস্তবায়নকালে তা বিবেচনায় আনা হয়না কিম্বা সচেতনভাবে প্রতিবন্ধকতাসমূহ এড়িয়ে যাওয়া হয়। সেমিনার বা টক শো-তে বলা হয় শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে গর্ভবতী ও প্রসূতি মাকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো জরুরী, শিশুকেও পুষিটকর খাদ্য খাওয়ানো ও বাড়তি যত্ন নেয়ার কথা বলা হয।অস্বাস্থ্যকর ও সহিংস পরিবেশে শিশু বেড়ে উঠলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হওয়ার বিষয তুলে ধরা হয়। এসব সমস্যা সমাধান না হলে কীভাবে শতভাগ শিশুকে মেধাবী করে গড়ে তোলা তথা শতভাগ পাশ করানো সম্ভব? প্রাথমিক বিদ্যালযগুলোতে অরেক ভয়াবহ সমস্যা ড্রপআউট বা ঝরে পরা। এই ড্রপআউটের সাথে দারিদ্রের নিবিঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিসেফ-এর গবেষনা রিপোর্টেই দেখি ৫৮ শতাংশ শিশু ভয়াবহ দারিদ্রের শিকার। সরকার দরিদ্র ঘরের শিশুদের মাসিক সর্বোচ্চ ১০০ টাকা হারে উপবৃত্তি দিয়ে থাকে। কিন্তু মাসিক ১০০ টাকা বর্তমান বাজারমূল্যে বলতে গেলে কিছু না। সেজন্যই স্কুলত্যাগী শিশুদের রিক্সা-ভ্যান চালাতে কিম্বা কল-কারখানা,দোকানপাটে কাজ করতে দেখা যায। সেখানে তাদের দৈনিক আয়ই কমপক্ষে শতটাকা। তাহলে বাস্তবতার নিরিখে কি উপবৃত্তির লোভ দেখিয়ে দরিদ্র ঘরের শিশুদের স্কুলে ধরে রাখা সম্ভব? কিন্তু সব অসম্ভবের দায়ভার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষকদের উপর। শিশুদের মেধাবী করে গড়ে তুলতে হবে, শতভাগ পাশ করাতে হবে, শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরেও রাখতে হবে তাদের।
৪.
প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মঘন্টা ও পরিশ্রমের বিষয়টি সবার গা -সহা হয়ে গেছে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিন আটটি ক্লাস নিতে হয়। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে বিকেল সোয়া চারটা পর্যন্ত একাধারে ক্লাস নেন তারা। উন্নত কোন দেশে যা কল্পনাও করা যায় না। এদেশেই যদি কলেজ শিক্ষকদের সাথে তুলনা করি তাহলে দেখি কলেজ শিক্ষকরা প্রতিদিন ক্লাস নেন একটি আর প্রাথমিক শিক্ষকরা নেন আটটি। অন্যান্য সেক্টরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সপ্তাহে ছুটি ভোগ করে দুই দিন, আর প্রাথমিক শিক্ষকরা একদিন। তাদের এই বাড়তি কাজের জন্য বাড়তি পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। এখন কথা উঠতে পারে প্রাথমিক শিক্ষক তাই তাদের পরিশ্রম বেশী।প্রাথমিক শিক্ষক তাই বেতন স্কেলও প্রাথমিক স্তরের। প্রাথমিক শিক্ষক, তাই তারাই করবেন ভোটার লিষ্ট, আদম শুমারি,তারাই খাওয়াবেন টিকা, তারাই করবেন শিশু জরিপ! এভাবে নামকরণের সার্থকতা যাচাই করলে আর হটেনটট সুলভ কায়দাকানুন না বদলালে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন হবে কি? ২০১৪ সালের মধ্যে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রাথমিক শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে সবার আগে।
৫.
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের সর্বশেষ উদ্যোগ শিক্ষকপুল গঠন। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি -কমিউনিটি মিলিয়ে ৭২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন বছরের জন্য ২০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। এসব শিক্ষক মূলত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সাময়িক অনুপস্থিতিজনিত কারণে বদলী শিক্ষক হিসেবে কাজ করবেন। শিক্ষক সংকটজনিত কারণে বিদ্যালয়সমূহে পাঠদানে যে সমস্যা হয় তা দুর হবে।এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভাল , তবে এখনই এর ভবিষ্যত চিন্তা করা হবে আরও ভাল। ভবিষ্যতে এসব খন্ডকালীন শিক্ষক নিশ্চয়ই তাদের চাকরি স্থায়ীকরনের দাবী জানাবেন। আমাদের দেশের বাস্তবতা তো তাই বলে। সেজন্য খন্ডকালীন বলে যেনতেনভাবে শিক্ষক নিয়োগ না করে যোগ্যতমদেরই নির্বাচন করা উচিত হবে। এদিকে এসব শিক্ষকদের মাসিক বেতন ধরা হচ্ছে মাত্র তিন হাজার টাকা। কম তেলে ভাজা কত মচমচে হবে সেটাও নীতি-নির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার।
আমি নিজেও একজন কলেজ শিক্ষক। এরপরও প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কষ্ট হয়। আমি নিজে একজন শিক্ষা কর্মী হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কিছু কাজ করছি। প্রাথমিক শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করি।তবে একথাও বাস্তব যে, যদি শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো কিছু করতে হয় তবে প্রাথমিক সেক্টর থেকেই শুরু করতে হবে।ভালো মানের শিক্ষার্থীদের যদি আকৃষ্ট করা না যায় এ সেক্টরে তাহলে দেশের ভবিষ্যত কী হবে বলতে পারবো না। তাই ভর্তুকি মনে করেই তাদের আরো অধিক হারে বেতন দিতে হবে।
36484
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: