শেষ পর্যন্ত হিমেল এমন একটা কাজ করল যে আমি হাসতে হাসতে তিনতলা থেকে পড়ে যাবার উপক্রম। অন্য কেউ হলে রাগে ফেটে পড়ত কিনা জানিনা। আমার আবার রাগ ভাগ বলতে কিছু নেই।
হিমেল আমার রুমমেট। ডিপার্টমেন্টে একবছরের জুনিয়র। হ্যাংলা লিকলিকে শরীরের দৈন্যতা ঢাকতেই হয়তো মাথায় একগাছি ঘোড়ার লেজের মতো চুল ছড়িয়ে রাখে। হাটা চলার মাঝে একটু বিশেষ দুলুনি, জিন্সের প্যান্টের বিশেষ ভাজ, ব্যাক পকেটের রেফারেন্সে টি শার্টের তালি, একটা মেটাল বেল্ট কোমরের সাথে অদ্ভুত কায়দায় ঝুলে থাকে। স্মার্ট হওয়ার যতো উপায় পদ্ধতি আছে তার কোনটাই বাকী আছে বলে মনে হয়না। তবুও তার টেনশন যায়না।
আসাদ ভাই দেখেন তো আমায় কেমন লাগছে! ঠোটে তার কেমন একটু করুণ আবেদন ঝুলে থাকে।
বিজ্ঞের মতো ধীরে সুস্থে মাথা নাড়িয়ে আমি বলি মন্দ নয়। এতটুকুতেই সে খুশি।
কদাচিৎ সে একটু ইয়ে... টেনে থাকে। এ নিয়ে একটু ফিসফাস তবে সে বিশেষভাবে প্রতিবাদ করে। এবং আমি তাতে প্রবলভাবে সমর্থন জুগিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে যদিও বিরক্ত হই তথাপি রুমমেটের বদনাম মানেই নিজের বদনাম। বাইরে এখানে আমি ঈমাম আবু হানিফার উদারতাকেও যেন অতিক্রম করে যাই।
তবে হিমেল ছেলেটা খারাপ নয়। আমাকে নামাজ পড়তে দেখলে সাউন্ডবক্সের ভলিয়্যুম লো করে। একজন নামাজিকে যতটা সম্মান করা উচিত তার চেয়েও বেশি আন্তরিকতা তার আচার আচরণে। আকালের যুগে এই মূল্যবান সেবার জন্যই আমি তার উপর প্রসন্ন হয়ে উঠি।
আচ্ছা আসাদ ভাই আপনার বাড়িটা যেন কোথায়?
কেশবপুরে।
কেশবপুরে তো অনেক বানর আছে তাই না?
শুধু বানর নয় মানুষও আছে।
হা হা হা । ও সরি ভাই, আপনি আবার মাইন্ড কইরেন না।
কি যে বলো । তোমার উপর মাইন্ড করার কোন কারণ নেই।
আসাদ ভাই আপনি আসলে খুব ভাল মানুষ।
সাধারণত অনেক কাজের ভীড়ে আমার সাথে বাতচিত করার সময় থাকেনা হিমেলের। তবে হঠাৎ হঠাৎ এমন আলোচনা জমে ওঠে। আলোচনার সমাপ্তিতে এসে সে এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌছে যে আসাদ ভাই রিয়েলি একজন ভালো মানুষ।
হিমেল মাঝে মাঝেই অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করে থাকে। সে যখন করে তখন সে অবশ্য ভীষণ সিরিয়াস। সিরিয়াস থেকে সে আরো সিরিয়াস হয়ে ওঠে। অন্যদের হাসির মাত্রা আরো বাড়তে থাকে। চূড়ান্তভাবে সে যখন ক্ষান্ত দেয় তখন আমাদের আর হাসারও শক্তি থাকেনা। কেবল আমিই অপেক্ষায় থাকি। তার মন খারাপ করা বিকেল, রক্তাক্ত সন্ধ্যা কিংবা হিচড়ে পড়া বেদনার্ত রাত্রির পরিসমাপ্তিতে আসাদ ভাইই তার শেষ ভরসা। আসাদ ভাইয়ের মুখের দুটো কথা শুনে সে পরদিন ঘুম থেকে উঠার ভীষণ অনুপ্রেরণা লাভ করে।
যাই হোক, বলছিলাম হিমেল যথারীতি এমন একটা কাজ করল যে আমি কিংবা আমরা হো হো করে হাসতে হাসতে তিনতলা থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। কিন্তু একটু সমস্যা হয়ে গেছে। হিমেল যে কি করেছিলো তাই আমি ভুলে গেছি।