ঈদ মানেই আনন্দ । দুনিয়ার এপ্রান্ত থেকে অপ্রান্ত, যেখানেই মুসলমান সেখানেই ঈদ উৎসব। আনন্দ উৎসব । ঈদের আনন্দ এখন বিশ্বব্যাপী । কানাডা থেকে কাসাব্ল্যাংকা , মুসলিম দুনিয়ার সবত্রই আনন্দ উৎসব । প্রতিবারের মত এবারেও এই ঈদ এসেছে মুসলিম উম্মার জীবণে সৌভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য আর আল্লাহর উপর নিজেকে সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখার বারতা নিয়ে । ঈদ মুসলিম বিশ্বের উৎসবের দিন । ইসলামে এ দিনের মর্যাদা সমধিক । মুসলমানদের জীবনে বছরে দুবার ঈদ ফিরে ফিরে আসে মহা আনন্দ আর খুশির বারতা নিয়ে । একটি ইদুল ফিতর অপরটি ঈদুল আযহা ।
ফিতর অর্থ ভঙ্গ করা । সুদীর্ঘ একটি মাস রোজা রাখার পর এই ঈদের দিনে রোজা ভেঙ্গে আনন্দ উৎসব করা হয় বলে একে বলা হয় ইদুল ফিতর । দ্বিতীয় হিজরি থেকে ঈদ উৎসব এর সূচনা হয় । মদীনায় হিজরত এর পর মহানবী (সঃ) দেখেন মদীনাবাসীগণ ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামক দুটি উৎসব নিয়ে মেতে উঠত । শরতের পূর্নিমায় নববর্ষ বরণের উৎসব ছিল ‘নওরোজ’ আর বসন্তের উৎসব ছিল ‘মিহিরজান’, এটি ছিল পারসিকদের অনুকরণে আনন্দ উৎসব । ৬ দিন ব্যাপী এই সব উৎসবে অশালীন আনন্দ-উল্লাস, কুরুচীপূর্ণ নাচ গান, হৈ চৈ, অশালীনতা আর অশ্লীতার উৎসব ছিল এই দুটি । নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা আর বিত্তবানদের অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও অশ্লীলতার কেন্দ্র ছিল এই সব উৎসব অনুষ্ঠান । বিশ্বনবী মদীনাবাসীদের এই সব অশ্লীলতা ও অসভ্যতা থেকে বিরত হতে আহবান জানান । আর এর বদলে ইসলামী মহিমা মণ্ডিত নির্মল আনন্দে ভরপূর ইসলামী সাম্যের প্রতীক ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা নামে দুটি উৎসব পালনের জন্য নির্ধারন করে দেন । মাহে রমজানের শেষে ঈদুল ফিতর আর হজ্জের পরে ঈদুল আযহা । এভাবেই শাওয়ালের এক ফালি নতুন চাঁদ দেখে হিজরী ২য় বর্ষে মুসলিম জীবনে প্রবর্তিত হয় ঈদ ফিতর উৎসব । প্রথম ঈদ পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরির ১লা শাওয়াল ৬২৪ খৃষ্টাব্দের ৩১ মার্চ মদীনায়, আর পবিত্র মক্কা মুকাররমায় ৬৪০ খৃষ্টাব্দে ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের ১১ দিন পর প্রথম ঈদ উদযাপিত হয় ।
আমাদের নানা হতাশা, দুঃখ, অপূর্ণতা, ব্যদনা , ক্লান্তি, শত ব্যস্ত কর্ম ময় জীবনে এই ঈদ যেন নিয়ে আসে ঠাণ্ডা হাওয়া । সব কিছু ভুলে গিয়ে কি ধনী কি গরীব , কি বাদশাহ কি ফকির সবাই এক সাথে মেতে উঠে ঈদ আনন্দ উৎসবে ।
বাংলাদেশে ঈদ উৎসব ।। সেকালে একালে
শহরে গ্রামে গঞ্জে বাংলাদেশের সর্বত্রই মুসলিম মননে এক অনন্য আনন্দ উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে ঈদুল ফিতর । ঈদের চান্দ রাতে রাতভর জেগে থেকে শিশু-কিশোর-কিশোরী যুবতী-গৃহিনী সবাই মিলে আনন্দ ফুর্তি করে মেহদি লাগানো , আর সেই সাথে সারা রাত মায়েদের কত বিচিত্র রকমের ঈদের রান্নাবান্না , সে যে কি আনন্দ । আজকাল শহুরে জীবনে নানা ব্যস্ততার কারণে মেহদী আর সাজসজ্জা অনেকেই বিউটি পারলারে সেরে নেন । এক সময়ে রমজানের শেষে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার উৎসবে ঢাকার বুড়িগঙ্গার পারে মানুষের ভীড় জমতো । নারী-পুরুষ সবাই মিলে ছাদে উঠে নতুন চাঁদ দেখার আনন্দে উৎদেলিত হতেন । মোগল আমলে নতুন চাঁদ দেখার সাথে সাথে সেনা শিবিরে বেজে উঠত শাহী তূর্য । গোলন্দাজ বাহিনী ছুড়তে থাকত গুলি । বড় কামান দাগা হত মধ্যরাতে । এখন নতুন চাঁদ দেখে ঈদের ঘোষণা দেয়ার কাজটি করেন ‘জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি’ । ভিন্নমত এড়িয়ে সারা দেশে এক সাথে ঈদ পালনের এ এক মহত প্রচেষ্ঠা ।
ঈদ উৎসবের সাথে রং বেরং এর নতুন জামা কাপড় কেনাকাটার সংস্কৃতি একাকার হয়ে আছে । মা বাবা, ছেলে মেয়ে, ভাই বোন সবাইর জন্য এবং নিজের জন্য ঈদে নতুন জামা কাপড় চাই । ইদানিং বিত্তবানরা তাদের ঈদের কেনাকাটা করেন দেশী বাজারে নয় , তারা উড়ে চলে যান ব্যাংকক , সিংগাপুর, কলকাতা , দুবাই আর লন্ডন শহরে । এক সময়ে ঢাকায় ঈদের মেলা বসত । ইসলামপুর , সোয়ারীঘাট , লালবাগ আর চকবাজারে বিরাট আয়োজনে ঈদ মেলা হত । ঢাকার বুড়িগঙ্গা আর সিলেটের সুরমা নদীতে আজো ঘটা করে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয় । ইংরেজ আমলে ঢাকায় ঈদের মিছিল ছিল এক অনন্য আকর্ষণ ।
ঈদের দিনে সবচেয়ে আনন্দময় ব্যাপার হল ঈদগায় গিয়ে জামাতে ঈদের নামাজ পড়া । ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে একসাথে একলাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন । এখন যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, সেই স্থানটিতে মহিলাদের ঈদের জামাত হত । এক সময় ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এখানে মহিলাদের প্রথম ঈদের জামাতে ইমামতি করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন ।
আরব বিশ্বে ঈদ উৎসব
রমজানের মাঝামাঝি থেকেই আরব দেশগুলোতে ঈদের আগমন বার্তা বইতে থাকে । শপিং মলগুলো মধ্যরাত অবধি খোলা থাকে । চলতে থাকে কেনাকাটার ধুম । ঈদের তিন চার দিন আগে থেকেই বাড়ি ঘর , অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাট, শপিংসেন্টার ইত্যাদিতে ব্যাপক আলোক সজ্জা করা হয় । উৎসব আনন্দে ভেসে উঠে সারা দেশ । আমাদের দেশের মত ৮টা / ৯ টায় নয় , আরবরা সূর্য উদয়ের আধ থেকে এক ঘন্টার মধ্যে ঈদের নামাজ আদায় করে নেয় । ঈদগাহ ময়দানে , মসজিদে ঈদের নামাজ হয়ে থাকে । ঈদের জামাত শেষে সবাই আত্মীয় স্বজনদের কবর জিয়ারত করে । পরিবারের সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করে । দুপুরে ও রাতে বিত্তবানদের বাড়ীতে ভোজের আয়োজন করা হয় । কেউ কারো সাথে দেখা হলেই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে । আহলান সাহলান , ঈদ মোবারক । মরক্কো , মিশর , বাহরাইন ইত্যাদি কোন কোন আরব দেশে রাস্তায় রাস্তায় সুসজ্জিত ঈদ শোভাযাত্রা বের হয়। তিন দিন ধরে উৎসব উদযাপিত হতে থাকে। এ সময়টি ছেলে মেয়েদের বিয়ের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় বলে মনে করা হয় ।
কানাডা আমেরিকায় ঈদ উৎসব
একেবারে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অনুমান করা হয় উত্তর আমেরিকায় মুসলমানদের সংখ্যা চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ । হাজারে অধিক মসজিদ রয়েছে এখানে । এবং দ্রত বারছে মুসলমানদের সংখ্যা । ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকা, ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা সহ শতাধিক ইসলামিক অরগেনাইজশন রয়েছে এখানে । শুধু এই টরন্টো শহরেই ৩ থেকে ৪ লাখ মুসলমানের বসবাস । টরন্টো, মনট্রিয়ল , নিউ ইয়র্ক , ডেট্রয়েট, শিকাগো , অটয়া ইত্যাদি বড় বড় শহরগুলোতে রমজনের শেষের দিকে শুরু হয় ঈদ বাজার । শত ব্যস্ততার মাঝে চলতে থাকে ঈদের জন্য কেনাকাটা । একেবারে দেশের মতই সবার জন্য সব কিছু নতুন হওয়া চাই । এখানকার সব গুলো মসজিদে ঈদ জামাত হয় থাকে । কোন কোনটিতে দুটি তিনটি করে জামাত হয়ে থাকে । আবার বড় বড় কমিউনিটি সেন্টার, স্টেডিয়াম ইত্যাদি ভাড়া করে , পার্ক ইত্যাদি স্থানে বড় বড় ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয় । এরকমই একটি, টরন্টো্র ডেন্টনিয়া পার্কের ঈদ জামাত শহরবাসীর প্রশংসা কুড়ায় । তবে মুসলিম কমিউনিটি লিডারগন এবং তাদের সংগঠনগুলো প্রায় প্রতি বছরই চাঁদ দেখা/ না দেখা বির্তকে জড়িয়ে যান , দেখা দেয় বিভক্তি, ঈদ হয় দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে । আবার কোন কোন গ্রুপ সৌদি আরবকে অনুসরণ করেন । এই ভিন্ন মত গুলোকে এক করে একই দিনে ঈদ পালনের মানসে সব ইসলামিক সেন্টার/ মসজিদ সমূহের পরিচালকগণ সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে এগিয়ে আসবেন, এটিই সবাইর কাম্য ।
কর্ম ব্যস্ত এই প্রবাসে ঈদ নিয়ে আসে এক ফালি আনন্দের বার্তা । সবাই মেতে উৎসবে আনন্দে । আয়োজন করা হয় ঈদ পূর্ণমিলনী উৎসবের । ঈদের দিন হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোতে শাড়ী, সালোয়ার-কামিজ, পাজাম-পাঞ্জাবী পরিহিত শিশুকিশোর, যুবকযুবতী আর নারী পুরুষের অবাধ বিচরণ দেখে ক্ষনিকের জন্যে হলেও সবাই ভুলে যায়, আমরা পরবাসে বসবাস করি । আহলান সাহলান ।
I hope you will continue it.I wish every success in your life.
EID MUBARAK.
shamim