ছেলেটিকে নামিয়ে দিয়ে শামীমা সোজা চলে আসে তার বান্ধবী সীমার বাসায়। কলিং বেল চাপ দিতেই ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল। আসসালামু আলাইকুম। সাদর সম্ভাষণ জানাল সীমা। কিরে এত দিন পরে হঠাৎ কি মনে করে?
এইতো চলে আসলাম। মনটা ভাল ছিলনা ভাবলাম তোর সাথে অনেক দিন দেখা হয় না। একটু আড্ডা দিয়ে আসি। Surprise দিব বলে না জানিয়ে আসলাম।
খুব ভাল করেছিস। চল ভিতরে আস। (তানজিনা। এই তানজিনা একটু ঠান্ডা কিছু নিয়ে আয়। বাসায় মেহমান এসেছে – বলে কাজের মেয়েকে ডাকে সীমা।)
আমিও বেশ হাফিয়ে উঠেছি এই কয়দিনে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলেই ভাল লাগে। অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ আমার একদম ভাল লাগে না।
ভাল লাগলেই বা কি করতি? এদেশে পড়ালেখা করতে হলে এসবের মধ্যে দিয়েই আমাদের চলতে হবে। দেখিস না ঢা.বি. বন্ধ হওয়ার ক’দিন পরেই বন্ধ হয়ে গেল রা.বি. ও চ.বি.। পড়ালেখা করতে এসে ছেলেরা যে কি জন্য রাজনীতি করে দলীয় সন্ত্রাস করে আমার বুঝে আসে না। একই দলের আবার দুগ্রুপে মারামারি। বাবারে একদম ফাটাফাটি! ভাংচুর! কাটাকাটি! ব্যস! ইউনিভার্সিটি বন্ধ।
মাঝখানে আমরা সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সেশন জ্যামের শিকার। তোরা না হয় বড় লোকের সন্তান অসুবিধা নেই। আমরা তো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। পড়ালেখাই আমাদের একমাত্র অবলম্বন।
নারে সীমা। এটা বলিস না। কি বড়লোক? কি মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত। এই loss সকলের। এই loss পুরো জাতির। পুরো দেশের। আমাদের মত গরীর দেশের অর্থনীতির উপর এটা একটা বিরাট চাপ। অর্থনীতির ছাত্রী হিসাবে এটা আমি ভালই বুঝতে পারি।
আমি তো সেশন-জ্যাম কিংবা পড়ালেখার ক্ষতি টুকু চিন্তা করছিলাম। তুই তো দেখি পুরা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চিন্তা করছিস আজকাল। একটু খোলাসা করে বল তো দেখি।
দেখ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ মানে ছাত্রছাত্রীদের হল ছেড়ে চলে যাওয়া। কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রীর অনিশ্চিত যাত্রা। যাদের ঢাকা শহরে আত্মীয়স্বজন নেই তাদের গ্রামে ফিরে যাওয়া। এই কয়েক মাসের জন্য বাবা মার অতিরিক্ত খরচ। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কিংবা একাডেমিক staff দের বেতন তো চলবেই। যেখানে ১২ মাসে সেশন শেষ হওয়ার কথা সেখানে ১৩-১৪ মাস লাগে। ডিগ্রী অর্জনে ৪ বৎসরের জায়গায় লাগে ৫ বৎসর। এই Extra বাজেট Individual ছাত্রছাত্রীকে যেমন টানতে হয়। তেমনি মোটা অংকের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ টানতে হয় সরকারকেও ছাত্র-রাজনীতির এ কুফল সরকারকে বুঝতে হবে এবং কঠোর হস্তে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে।
এখন তো দেখা যাচ্ছে সরকার নিজের দলের ছাত্র সংগঠনের দমন না করে বিরোধী দলের দমনের নামে অতিরিক্ত সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশে। সেই যাই হোক, এই সব রাজনীতি আমার একদম ভাল লাগে না। চল আমরা নিজেদের খোঁজ খবর নেই। বল তো দেখি তোর আর কি খবর? আজকে তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। বিশেষ করে তো মাথায় কাপড় উঠেছে। একটু চুলও দেখা যাচ্ছে না। এতে তোর মুখের সৌন্দর্য অনেক বেড়ে গেছে। বল দেখি কবে থেকে এই পরিবর্তন। না! আসলে! এই আর কি? তোরা তো অনেক আগে থেকেই হিজাব পরিস। আমার ভাল লাগত। তবে কখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি নি। আজ একটি ঘটনা হঠাৎ আমার ইচ্ছাকে আরো শক্তিশালী করল।
তাই আজ থেকেই শুরু করলাম। আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ আজ থেকে মেনে চলার চেষ্টা করবো ইন্শাল্লাহ।
বাহ! বেশ ভাল সিদ্ধান্ত। আমি তোকে স্বাগতম জানাই। আল্লাহ তোর সিদ্ধান্তকে কবুল করুক আমিন। এবার বল দেখি কোন সে ঘটনা তোর মত একটি আধুনিকাকে এই back dated সেকেলে মেয়েদের মত চলতে অনুপ্রাণিত করল- বলেই সীমা হেসে দিল।
এটা Simple একটা ঘটনা। কিন্তু এটার Impact টা অনেক গভীর।
তুই তো জানিস আমি English medium স্কুল থেকে o’ level আর A level করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি। একটা সময় ছিল যখন আমার অনেক ছেলে বন্ধু ছিল। যাদের সাথে আমি অনেকটা ছেলের মতই মিশেছি। কখনো মনেই হয়নি আমি একটা মেয়ে।
যখন থেকে বুঝতে শিখলাম আমি একটা মেয়ে তখন আমি অনেক দুর এগিয়ে গিয়েছি। ছেলে বন্ধুদের সাথে মিশতে গিয়ে দেখছি ওদের লোলুপ দৃষ্টি। সুযোগ পেলেই ওরা পেতে চায়। ওদের relationship শুধু যেন তাদের Lust চরিতার্থ করার জন্য। কিন্তু মেয়ে হিসাবে আমি, ওদের সাথে মিশলেও কখনো এসবকে প্রশ্রয় দিতাম না। আমি বুঝতাম এই সব ছেলেদের উপর কখনো নির্ভর করা যায় না। সব সময় নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতাম। অথচ পোশাক আশাকে আমিও এতই আধুনিকা ছিলাম যে সবাই আমাকে খারাপ কিংবা উগ্র মনে করত। আমি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেবার চেষ্টা করতাম কিন্তু দীর্ঘ দিনের অভ্যাসকে পরিবর্তন করার মত সাহস পাচ্ছিলাম না। আজকের ঘটনা আমাকে সাহস যুগিয়েছে নিরাপত্তা দিয়েছে। আমি সম্মানিতা হয়েছি।
তাই অপর পক্ষকে সম্মান দিতে গিয়ে আমার এই পরিবর্তন। আজকের ঘটনাকে যদি শুধু বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়, তাহলে এটা অতি নগন্য। এটার জন্য মানুষের জীবনে হঠাৎ পরিবর্তন আসতে পারেনা যেহেতু আমার দীর্ঘ জীবনে এটা একটা সুন্দর addition, তাই হয়ত বা আল্লাহ আমার অনুভূতিতে এই পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন।
এতক্ষণ ধরে হা হয়ে সীমা শুনে যাচ্ছেন শামীমার কথা। অনেকটা গো-গ্রাসে গিলছিল যেন। কোন দিনই সে শামীমাকে এভাবে তার ব্যক্তিগত কথা বলতে শুনেনি। অনেক অজানা কথা শুনে শঙ্কিত হলেও সে বুঝতে পেল শামীমার এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে। পোড় খাওয়া জীবনে এ যেন নতুন শামীমার নতুন অধ্যায়।
আমি খুব খুশী হয়েছিল তোর সব কথা শুনে। এবার আসল ঘটনাটা বল দেখি। ওটা তেমন কিছু না। আমার পরিবর্তনটাই আসল। যাহোক তোর সাথে share করেই ফেলি।
আজকে বিকালে তোর বাসায় আসার পথে বিচ্ছিরি একটা ঘটনা ঘটে। আমার গাড়ীর গতিবেগটা একটু বেশী ছিল। ফলে রাস্তার কাদাপানি হঠাৎ ছিটকে পাশে চলমান এক ভদ্রলোকের জামা কাপড় নষ্ট করে দয়ে। Mirror –এ কান্ড দেখে আমি চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে যাই। ভদ্রলোককে Sorry বলার জন্য গাড়ী থেকে নিজেই নেমে আসি। ভদ্রলোক আমার উপর না রেগে এতটা সম্মানের সাথে আচরণ করেছেন যে আমি খুশী হয়ে তাকে Lift offer করে বসি। বেচারা কোনমতেই আমার গাড়ীতে যাবেন না। আর আমিও নাছোড় বান্দা। যাই হোক শেষ পর্যন্ত অনুরোধের ঢেঁকি গিলল আর কি। ভদ্রলোক কে আমি সামনের সীট offer করলেও উনি সুবোধ বালকের মত পিছনের সীটে উঠে বসলেন। প্রথমত: অচেনা লোককে গাড়ীতে উঠিয়ে শঙ্কিত হলেও Looking mirror –এ বার বার লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। ২৭-২৮ বৎসরের একটা নিষ্পাপ চেহারার লোক যেন উনি। একটি বারের জন্যও আমার দিকে তাকালেন না। প্রথম যখন কথা বলছিলেন নীচের দিকে তাকিয়েই কথা বলছিলেন। জীবনে অনেক পুরুষ দেখেছি। অনেক চাহনী পর্যবেক্ষণ করেছি আর পুরুষ লোকদের ঘৃণা করতে শিখেছিলাম। কিন্তু এই ভদ্রলোকের আচরণ ও চাহনী মধ্যে এমন একটা স্বর্গীয় অনুভূতি আমি পেয়েছি যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তবে তার প্রতি আমার সম্মানবোধ বেড়ে গেল।
দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকদের প্রতি আমার একটা তাচ্ছিল্যভাব ছিল। এদেরকে Back dated কিংবা মোল্লা হিসাবেই জানতাম। কিন্তু উনি একজন Engineer পোশাক ও আচরণে খুবই শালীন ও মার্জিত। খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বলতে না চাইলে সুন্দরভাবে এড়িয়ে যান। খুব courtesy maintain করে মেপে মেপে কথা বলেন। উনার সাথে খুব কম কথা হয়েছে। তবে যতটুকুই হয়েছে তাতে মনে হয়েছে এই ধরনের লোকদের উপর নির্ভর করা যায়। একজন যুবতী মেয়েও এদের কাছ থেকে নিরাপত্তা লাভ করে।
এই কথাগুলো বলতে গিয়ে শামীমা খুবই আবেগী হয়ে উঠল। তার সুন্দর গোলগাল চেহারা তে একটা রক্তিম আভা ফুটে উঠলো। ভালবাসার প্রচ্ছন্ন একটা আবেশে সে যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। সীমার চোখ তা এড়াল না।
বাহ! বাহ!! এতো যেন নতুন মানুষের জন্য নতুন পরিবর্তন। তা লোকটার নাম কি? কোথায় থাকে?
নামটা না জানলেও উনি থাকেন পিলখানা রোডে BDR ২নং গেইটের আশে পাশে কোথাও।
সীমা নিজেকে গুছিয়ে নেয়। শামীমার নৈতিক পরিবর্তন শ্রদ্ধা করে সে। অনেক চেষ্টা করেও যাকে সে পথে আনতে পারেনি, অজানা এক ভদ্রলোকের কিঞ্চিৎ সাহচর্যে তা হয়ে গেছে। মনে মনে সে তাদের জন্য দোয়া করে।
রাত অনেক হয়ে যাচ্ছে। এবার আমাকে উঠতে হয় সীমা। please তুই কাউকে আমার কাহিনী বলিস না। আামার জন্য দোয়া করিস আমি যেন আল্লাহর পছন্দনীয় পোশাকে চলতে পারি। অনেক জোর করে শামীমাকে রাতের খাবার খাইয়ে বিদায় দেয় সীমা। ঘরে ফিরে আল্লাহর কাছে আবারও দোয়া করে শামীমার জন্য। (সমাপ্ত)
May Allah give you opportunity to compose such for positive change.....
20262
৩
Lohagara, Chittagong, Bangladesh থেকে Abdullah Mahmud Nazib লিখেছেন,
৩০ মে ২০১০; সকাল ০৯:৩৩
Dear elder brother,
Really your story taught my heart. Take my salaam and best wishes from core of heart. May Allah accept you, accept your writing. Go ahead... Be happy.......
20318
৪
কুয়ালালামপুর থেকে তারিক রিদওয়ান লিখেছেন,
৩০ মে ২০১০; রাত ০৮:৫৭
সত্যিই দারুণ!!! অনবদ্য!!!
20426
৫
দোহা থেকে অহিদ ছাদের লিখেছেন,
০১ জুন ২০১০; দুপুর ০২:৫০
খুউব ভালো এবং হৃদয়গ্রাহী লেখা। তবে আমরা যারা ভালো লেখক হতে চাই তাদের একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার - বাংলাদেশের উচ্চশ্রেণীর ছেলেমেয়েদের পরিবর্তনটা বিশেষকরে ভালোর দিকে পরিবর্তনটা এতো দ্রুত দূর্বার বেগে হয়না। কলম ধরেই কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মেয়েকে হিজাবধারিণী বানানো আর শত্রুতার কারণে কথাবার্তা ছাড়াই শত্রুকে ধরেই আছাড় মারা একই ধরণের অবিশ্বাস্য ঘটনা। লেখার চমৎকারিত্বের পাশাপাশি এই বাস্তবতার দিকে খেয়াল রাখা খুবই প্রয়োজন। লেখকের প্রতি এটা আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য ও অনুরোধ।
20732
৬
ahmad 992@hotmail থেকে ahmadtashfeen লিখেছেন,
০২ জুন ২০১০; সকাল ০৮:৪৩
inspirational..!! carry on
may allah blessd you
20811
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: