|
নূরজাহানের দীর্ঘ নিঃশ্বাস
এম এম ওবায়দুর রহমান |
|
নূরজাহান ১৪ বছরের কিশোরী এক মেয়ে। পদ্মার পাড় ঘেষা মাদবরের চর নামক গ্রামে তার জন্ম। গাছ-পালা তেমন নেই শুধু বালুর চর চারপাশে। এখানকার গ্রাম গুলো অস্থায়ী। নদীর ভাঙনের শিকার হওয়া মানুষের আশ্রয় স্থল যেন এই চরের পাড়ে গড়ে উঠা গ্রাম। তখনও সন্ধা হয়নি সূর্যর লাল আলোয় চারপাশের পৃথিবীটা আলোকৃত। লাল সেই আলোর আভা এসে লেগেছে নূরজাহানের মুখে। নুরজাহান খেজুর পাতার পাটি বুনিয়ে যাচ্ছিল। উঠানের বামপাশে বাশেঁর খুটিতে বাধা ছাগলটা অনেকক্ষণ যাবৎ ম্যা ম্যা করে ডাকছে। তার ভারি মায়া হল ছাগলটার জন্য। বাবার উপরও অভিমান জমলো। সে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বললো-
- মা দেখছো বরকিডা ক্যামনে মা মা কইরা কানতাছে! বাচ্চা দুইডারে না বেচলে হইতোনা?
নুরজাহানের মা খেকিয়ে উঠল।
- বরকির বাচ্চা না বেইচা করবো কি? তোগর খাওন আইবো কোনহান থোন? ৩০ টাহা সের চাউল! একজন মাইনষের কামলার পয়সায় পাঁচ জন মাইনষের খাওন যোগাইতে গিয়া তোর বাপেরতো অহন কব্বরে যাওনের যোগাড়! তার উপর আবার ছমেদ ঢালীর সুদের পয়সা।
নূরজাহান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
বাবার জন্য বুকের ভেতর ভারি মায়া হয় তার, আহারে এই বয়েসে বাপটাকে কত কষ্ট করতে হয়! দিনভর পরের জমিনে কামলা খাটা আর বিকালে ভ্যান গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়। এখন আবার নতুন যন্ত্রনা হিসেবে রাস্তায় নামছে ব্যাটারী চালিত অটো গাড়ি। মানুষ গুলো লাল নীল অটোতে চড়ে ফুরুৎ করে চলে যায়। ধির গতির ভ্যানে এখন সহজে কেউ উঠতে চায়না। তাই রোজগার কমেছে।
মাগরিবের আজান মাইকে দুর হতে ভেসে আসে। নুরজাহান পাটি ভাজ করে তুলে রাখে। কুপি বাতি জ্বালিয়ে ঘড় আলো করে সে। ছনের চাল আর পাট কাঠির বেড়া দেওয়া ঘড়। ঘরের ভেতরে বাশেঁর পায়া আর তক্তার সাথে পেড়েক মেরে চোকি বানিয়েছে তার বাবা। সে চোকিতে সোডায় ধোয়া কাথা বিছিয়ে দেয়। তারপর দুই বোন কে নিয়ে যায় ঘরের পেছনে শুপারী পাতার বেড়া দিয়ে তৈরী গোছল খানায়। ওদের হাত পা ধুইয়ে দিয়ে সে রান্না ঘড়ে গিয়ে মায়ের পাশে বসে। তার মা রান্না করছে পাট শাক দিয়ে ডাল। নুরজাহান বলে -
- মা আমার আইজ ডিম ভাজা খাইতে মন চায়। আধখান ডিম ভাজা দিবা?
- ডিম পামু কৈ? দেহি তোর বাপে হাটে থোন কি আনে, আনলে দিবানে।
নুরজাহান মায়ের সাথে আরো ঘেষে বসে তারপর আবদারের স্বরে বলে “ছাগল দুইডারেতো আমিই পালছি আমারে একটা হলুদ কামিজ কিন্না দিবা?”
নুরজাহানের মা বিরক্ত হয় সে বলে, তুই যা অহন এতো তাক্ত্য করিস না।
নুরজাহান অভিমানি সুরে বলে তোমার কাছে কিছু চাইলে খালি দুর-দুর কর, তোমার মতন কর্কশ মা জগতে দেহি নাইক্কা।
: হ, তুই হাচাই কইছোস আমিতো র্ককসই। এর লাইগা তোর বড় ভাই বিয়া কইরা ভিন্ন খায়। দোফরে তরমুজ খাইল এক টুকরা তোগরে দিছে? পেডে রাখছি বলে মনে করেনি আমারে?
মায়ের কথা শুনে নুরজাহানের চোখ ছলছল করে উঠে। তিন বোনের একমাত্র বড় ভাই কালাম। পদ্মার পাড় ফেরি ঘাটে ফল বিক্রি করে। আয় রোজগার ভালই। আগে কামাই রোজগার যা করত সংসারের খরচ দিতো। মা তারে শখ কইরা বিয়ে করালো, তিন মাসের মাথায় কালাম বউ নিয়া ভিন্ন খেতে শুরু করলো। মায়ের পেটের ভাই চোখের সামনে পর হয়ে গেল। নুরজাহান ভেবে পায়না কি করে এমন হল। ভাবির প্রতি খুব রাগ হয় তার। সে প্রতিজ্ঞা করে বিয়ের পর সে কখনো এমন বদলাবে না। ভাই কি ভুলে গেছে যে মা তরমুজ খুব পছন্দ করে? পারতো না একফালি তরমুজ মাকে দিতে?
উঠানের ওপাড় ওদের ঘড় অথচ অথচ মনে হয় যেন কতদুর!
তার খুব কান্না পায়। সে কাদতে থাকে।
নুরজাহানের মা খুব অবাক হয়। সে বলে কানতাছোস কেন? ডিম তোর বাপের আনতে কমানে।
- মাগো আমি ডিমের জন্য কানতাছি না। ভাই হারানোর শোকে কানতাছি । তুমি পুতের বউ আইনা আমগোর ভাই খোয়াই হালাইছো।
মা মেয়ে দু’জন এক সাথে কাদতে থাকে।
রাত নয়টার ফেরির সাইরেন শোনা যায়। নুরজাহান বলে মা রাইত কম হইলো না বাজান আহে না কেন?
কি হইলো কে জানে? কুপি জ্বালাতো। ভালো ঠেকতাছে না।
নুরজাহান বাতি জ্বালায়। দু জন না-না গল্প করে। ঘন্টা খানেক পরে দরজার কাছে ক্ষিন কন্ঠে নুরজাহানের বাবা ডাক দিয়ে বলে-
কালামের মা দুয়ার খুলো-
এত রাইত করলা ক্যান?
আমার সর্বনাশ হইয়াগেছে। ডুকরে কেদে উঠে সে।
বাতি মুখের কাছে নিয়ে নুরজাহান বলে এমুন করতাছো কেন বাপ? কি হইছে তোমার?
ছাগল বেচা টাহা পকেট কাইটা লইয়া গেছে।
কি কও!
সমস্বরে কেদে উঠে তিনজন। কান্নার শব্দে ছোট দুই বোনও জেগে উঠে। কিছু না বুঝে ওরাও কান্নায় যোগ দেয়। রাতের নিস্তবতা ভেংঙ্গে কান্নার শব্দ পদ্মার পানিতে আছড়ে পড়ে।
সাত সকালে ছমেদ ঢালী এসে উপস্থিত। নুরজাহানকে দেখে বলে তোমার বাপ কৈ?
নুরজাহান তাকে বসতে জলচোকি দেয়। নুরজাহানের বাবা মাথা নিচু করে ঘর হতে বের হয় তার চোখ লাল। সারা রাত কেদেছে সে। নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি তার চোখে মুখে।
- কি মিয়া কেমুন আছো?
- ভালো না । কাইল হাটে পকেট মাইরা আমার বরকি বেচা সব টাহা নিয়া গেছে। আমি শ্যাষ!
ছমেদ ঢালী হাতের খাতা খুলে বলে ভ্যান কেনার লিগা তুমি তিন হাজার টাহা নিছিলা অহন সুদ আসল মিল্লা পাচঁ হাজার হইছে। এত টাহা শোধ দিবা কেমনে? নুরজাহানের মা কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে ভাই এট্টু ধৈর্য ধরেন। আপনার টাহা না দিয়া কব্বরে যামুনা।
ছমেদ ঢালি মাথা চুলকায় এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, এক কাম কর তোমাগো নুরজাহানরে আমার মাইয়ার ঢাহার বাসায় কামে দেও। ছয় মাস কাম করলে পয়সা শোধ। এরপর মন চাইলে থাকবো। তখন ১২০০ টাহা বেতন দিমুনে। কি কও মিয়া?
নুরজাহান ছমেদ ঢালীর কথা শুনে পাথরের মূর্তির মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
পিন পতন নিরবতা ভেদ করে ছমেদ ঢালী বলে আমি উঠি ,হয় এক সপ্তার মইধ্যে টাহা দিবা নইলে প্রস্তাব মাইনা নিবা। কামের মানুষ নাই বইল্লা মাইয়া আমারে খুব জ্বালাইতাছে। দেশের মানুষ হগলতে ধনী হইয়া গেছে। আমি যাই।
নুরজাহান পলেথিনের ব্যাগ হাতে ঘড় হতে বের হয়। ছাগলটা ডাকছে। তার মা-বাবা আর ছোট বোনেরা কাদছে। কিন্তু কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। সে রোবটের মত ছমেদ ঢালিকে অনুসরন করছে।
লঞ্চে উঠার পর তার দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়। মনে হয় আহা কেউ বুঝি তার নাই। সবার উপর খুব অভিমান হয়। চোখ থেকে জ্বল ঝরে। গরীব হওয়ার জন্য নিজের ভাগ্যকে দোষারুপ করে। পাশে বসা এক ভদ্রলোক জানালা দিয়ে পদ্মা দেখে বলে “ ঢেউয়ের উপর ঢেউ আহা কি সুন্দর এই পদ্মা”।
নুরজাহান হটাৎ করেই দাড়িয়ে বলে “বড় কুৎসিত,রাক্ষস এই পদ্মা। আমাগো জমি-জমা সব খাইছে। আমারে দাসী বানাইছে, আমার কৃষক বাপরে কামলা বানাইছে। তির্ব দুঃখে সে থুতু ছিটিয়ে দেয় পদ্মার বুকে। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MMObidurRahman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
এম এম ওবায়দুর রহমান। পিতা আবদুর রাজ্জাক মুন্সি মাতা ফজিলাতুননেচ্ছা। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার রামরায়ের কান্দি গ্রামে তার জন্ম। শিবচর নন্দ কুমার ইনষ্টিটিউট থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে তিন মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারীং পাশ করে বর্তমানে পেশায় তিনি একটি বেসরকারী কোম্পানীর ব্যাবস্থাপক পদে কাজ করছেন।
কিন্তু ছোট বেলা থেকেই সাহিত্যর প্রতি দুর্বার ঝোঁক ছিল তার। বই আর ম্যাগাজিন সংগ্রহ করার নেশা ছিল। প্রচুর বই পড়তেন। কিশোর বেলা হতেই লিখতে শুরু করেন। তার লেখা বেশ কিছু গল্প, কবিতা আর প্রবন্ধ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি শফিক রেহমান সম্পাদিত যায়যায়দিন ও পরবর্তীতে মৌচাকে ঢিলে নিয়মিত লিখছেন। দৈনিক আমার দেশ, যুগান্তর নয়া দিগন্ত এবং ইদানীং বিভিন্ন বাংলা ব্লগে লিখছেন। তার স্বপ্ন লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। খুব শির্ঘই তার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প নিয়ে একটি গল্পের বই প্রকাশ হবার অপেক্ষায় আছে। |
|