১লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ‘মে দিবস’ নামে খ্যাত এই দিনটি পৃথিবীর তাবৎ দেশে (আমেরিকা ছাড়া) শ্রমজীবি মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ইতোপূর্বে বিশ্বের শ্রমজীবি মানুষের জন্য শ্রমের কোন সময়কাল নির্ধারন করা ছিল না। শ্রমিকদের ১৪/১৫ ঘন্টারও অধিক সময় কাজ করতে হতো। দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রাম ও সহস্রাধিক শ্রমিকের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে দৈনিক ৮(আট) ঘন্টা শ্রমের দাবী বাস্তবায়িত হয়। ১৮৮০ সাল থেকে পৃথিবীর সব দেশেই ১লা মে আর্ন্তজাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে গন্য হয়ে আসছে।
১৮৭২ সালে কানাডায় শ্রমিক আন্দোলন সফলতা লাভ করলে ১৮৮৪ সালে Federation of organized Trade and Labour Union নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। অতঃপর ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে দৈনিক আট ঘন্টা বৈধ কর্মদিবস হিসেবে পালন করার জন্য এই সংস্থা সিদ্ধান্ত গ্রহন করে এবং সমগ্র বিশ্বে শ্রমিকদের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সাধারন ধর্মঘটের আহবান জানালে পুঁজিবাদী শক্তি তাদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। অবশ্য কিছু কিছু পুঁজিবাদী সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলন বানচাল করার জন্য নাশকতামূলক কার্যক্রম গ্রহন করে। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। ১৮৮৬ সালে এপ্রিল মাসে বিশ্বের সকল শ্রমিকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাতে আড়াই লক্ষ শ্রমিক অংশ গ্রহন করে। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর। আর্ন্তজাতিক শ্রমিক সমিতি ((International working People’s Association) এ আন্দোলনের সূত্রপাত করে।
এই শ্রমিক আন্দোলন ক্রমবর্ধমান বৈপ্লবিক চরিত্র পরিগ্রহ করায় ব্যবসায়ী সমাজ আতংকিত ও ভীত হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের অর্থায়নে ও পুঁুজিবাদী প্রশাসনের সহযোগিতায় এই শ্রমিক আন্দোলন ধবংশ করে দেয়ার জন্য অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করে পুলিশ ও মিলিশিয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়।
ধর্মঘটীদের প্রতিহত করার জন্য এই ব্যবসায়ী মহল ইলিনয় ন্যাশনাল গার্ড এর জন্য ২০০০ মেশিনগান ক্রয় করে। এতদসত্বেও ১লা মে নাগাদ এই আন্দোলনে শিকাগোর অনেক দর্জি, মুচি এবং পেকিং হাউজ ওযার্কারেরা শুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ১৮৮৬ সালের ৩রা মে মেককরমিক রিপার-ওর্য়াকারস ফেক্টরীতে ধর্মঘটী শ্রমিকদের উপর পুলিশ গুলি চালালে ৪জন নিহত এবং অনেকে আহত হয়। আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদে পরের দিন হে মার্কেট স্কোয়ারে গণ-সমাবেশের ডাক দেয়।
এই সমাবেশ যখন শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হচ্ছিল এবং শেষ বক্তার বক্তব্য শেষে জনতা যখন বিদায় নিতে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহুর্তে ১৮০ জন পুলিশ স্কোয়ারের দিকে অগ্রসর হয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অতঃপর পুলিশের আক্রমনে একটি বোমা ছোঁড়া হয়। বোমার আঘাতে একজন শ্রমিক নিহত এবং পঞ্চাশজন শ্রমিক আহত হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে যদিও কখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে বোমাটি কে বা কারা নিক্ষেপ করেছিল তথাপি এ ঘটনা সত্য যে শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের কাজেই এই বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। পুলিশ আন্দোলনকারীদের বাসা এবং অফিসে ভাংচুর করে এবং বিনা দোষে শত শত শ্রমিকদের গ্রেফতার করে। আন্দোলনকারীরা নিগৃহীত হয় এবং শিকাগোর সবচেয়ে সক্রিয় আটজন শ্রমিককে হে মার্কেট বো্বিং এর হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত করে দোষী সাব্যস্থ করা হয়। কোন প্রকার তথ্য প্রমান ছাড়াই কোর্ট ৮ জনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আলবার্ট পারসন্স, আগষ্ট স্পাইস, এডলফ ফিশার এবং জর্জ এনজেলকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। লুইস লিংগ আত্মহত্যা করে করাগারে। বাকী ৩জনকে ১৮৯৩ সালে ক্ষমা ঘোষনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ মূলধারার ইউনিয়ন কর্মকর্তাবৃন্দ মে দিবসের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চেয়েছে অনেকবার।এই দিনটিকে তারা কেবল মস্কোর রেড স্কোয়ারে উদযাপিত একটি ছুটির দিন হিসেবে গন্য করতে চেয়েছে। মে দিবসের ইতিহাস এবং তাৎপর্যকে মুছে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ১লা মে কে খধ িফধু হিসেবে ঘোষনা করে। শ্রমিক দিবসের পরিবর্তে ‘ল ডে’ ঘোষনা করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক তাৎপর্যহীন একটি ছুটির দিন মাত্র হিসেবে মে দিবসকে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র সবসময় চালিয়ে আসছে।
শ্রমিক এবং শ্রম আন্দোলনকে দমন পীড়ন চালানো সত্বেও ১৮৮৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ এবং শিকাগোর দন্ডিতদের ইতিহাস যুগ যুগ ধরে এ ধরনের আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করেছে দাবী আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এ আন্দোলনের সুবাদে অনেক নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে, ধনীদের প্রতি ঘৃনা জন্ম নিয়েছে, বহু আন্দোলন ও সংগঠনের জন্ম হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতার ইতিহাসে অনেক কলংকজনক ঘটনার মধ্যে এটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাস্তবতা। তারপরও মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য সভ্যতার দাবীদাররা নিত্য গলধগর্ম। পৃথিবীর কোথায় মানবাধিকার গেল, কোথায় নারীর স্বাধীনতা শ্রমিকের অধিকার হরন করা হলো তা নিয়ে খবরদারী করতে তারা সতত ব্যস্ত। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী পাশ্চাত্য সভ্যতা যত যুদ্ধ, গণহত্যা, মারনাস্ত্র, ধ্বংসলীলা বিশ্বকে উপহার দিয়েছে কোন মধ্য যুগ, বর্বর যুগ তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি।
মহান মে দিবসের প্রাক্কালে আমরা বিশ্বের অগণিত শ্রমজীবি মানুষকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। শ্রমিকের পবিত্র ঘাম যাতে বিশ্বময় যথার্থ মূল্যায়িত হয় সে কামনা করি। আজ শ্রমজীবি অভিবাসীদের হয়রানি করার যে অভিযাত্রা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ পাশ্চত্যের সভ্য দেশ সমুহে চলছে তার অবসান কামনা করে মানবতাবাদী বিশ্বসমাজ। বিশ্বের দেশে দেশে নির্যাতিত প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের সাথে, দেশের অগনিত শ্রমিক সমাজের সাথে যথার্থ আচরণ যাতে হয়, শরীরের ঘাম আর চোখের পানি যাতে একাকার না হয় সেদিকে বিবেক বান সমাজের কাছে সকলের প্রত্যাশা। আজ যে কৃষক চড়ামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক কিনে ফসল ফলাতে গিয়ে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত হচ্ছে সে কৃষক উৎপাদিত পন্যের মূল্য পাচ্ছেনা। মধ্যস্বত্বভোগী, মুনাফাখোরদের কবলে পড়ে তারা দিশেহারা। চালসহ কৃষিপন্যের মূল্য হ্রাসে ক্ষমতাসীন সরকারসহ শোষকগোষ্ঠী খুবই পুলকিত কিন্তু কৃষকের, মজুরের, হাড্ডিসার শরীর, দূর্বিসহ জীবন কারো নজর কাড়ে না। কৃষি নির্ভর এ দেশের ৮০% মানুষ যেখানে কৃষিকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে সেদেশে এ বিপুল শ্রেণীর শ্রমজীবি মানুষের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে সর্বাগ্রে। কৃষকের ফসল বিক্রয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে তা জানা ও মেনে চলা দরকার। তাহলে মধ্যস্বত্ত্ব ভোগীদের উৎপাত থেকে তারা রক্ষা পেতে পারে। মূলত পাশ্চাত্যের উপলব্ধির বহু পূর্বেই ইসলাম শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষন করেছে যথাযথ মর্যাদায়। শ্রমজীবি মানুষের অধিকার, দূর্বলের স্বার্থ, অসহায়দের হক ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনেক অনেক আগে মানবতার মহান দূত হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যে বানী বিশ্ববাসীর সামনে রেখে গিয়েছেন; যাঁর বানী ও কর্মে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যিনি বলেছেন - যে ব্যক্তি কোন শ্রমিক দ্বারা কাজ করাইয়া শ্রমিকের পারিশ্রমিক পরিশোধ না করিবে, কেয়ামত দিবসে স্বয়ং আল্লাহ তা আলা তাহার বিরুদ্ধে বাদী হইবেন। (বোখারী শরীফ)
নবী (সাঃ) বলেছেনঃ
মজদুর দারা কাজ করাইলে মজদুরের ঘাম শুকাইবার পূর্বেই তাহার মজুরী আদায় করিয়া দাও। (মেশকাত শরিফ)
নবী (সাঃ) বলিয়াছেন, দড়ি লইয়া জঙ্গলে যাও এবং জ্বালানী কাঠের বোঝা পিঠের উপর বহন করিয়া বিক্রি কর; ইহা দ্বারা আল্লাহ তোমার মান ইজ্জত রক্ষা করিবেন ইহা ভিক্ষাবৃত্তি অপেক্ষা উত্তম। (বোখারী শরিফ)
মে দিবস কে আমরা স্মরণ করছি কেবল মাত্র এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে আলোচনার জন্য শুধু নয় বরং আজকে বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু সমুহকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি ও কল্যাণমুখী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য। দেশে দেশে শ্রমজীবি মানুষের জয়হোক, শ্রমের মাহাত্মে উদ্ভাসিত হউক মানুষের এই পৃথিবী।
As IWW song writer Joe Hill wrote in one of his most powerful songs:-
Workers of the world, awaken!
Rise in all your splendid might
Take the wealth that you are making
It belongs to you by right.
No one will for bread be crying
We’ll have freedom, love and health
When the grand red Flag is flying
In the workers’ common wealth.
এই প্রসংগে শ্রমিকদের পাওনা ও তাদের আধিকার সম্পর্কে ইসলামের মনোভংগি সম্পর্কে কবি ইকবাল যা বলেছিলেন তার ভাবানুবাদ কাব্যে প্রকাশ করেছেন কবি ফররুখ আহমদঃ-
ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো দুনিয়ার গরিব ভুখারে জাগিয়ে দাও আজ জাগিয়ে দাও
ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও
স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে কেন আড়াল
মধ্যবর্তী মোল্লাদের সব হাঁকিয়ে দাও
কিষান মজুর পায়না যে মাঠে শ্রমের ফল
সে মাঠের সব শস্যে আজ আগুন জ্বালিয়ে দাও আজ আগুন জ্বালিয়ে দাও।