দিনটি ছিল সোমবার। কানাইঘাট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়ি। বার্ষিক পরীক্ষা সবে মাত্র শেষ হয়েছে। হঠাৎ করে ক্লাসের দুষ্ট ছেলে টিটু বায়না ধরল সবাইকে ১০০ টাকা করে দিতে হবে। আমি প্রথমে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালাম। সে বলল আমরা কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি লোভা-মূলাগুলে নৌকা ভ্রমণে যাব। আমি ও তাদের কথায় একমত হলাম। ভ্রমণে যাব যেমন কথা তেমন কাজ। স্কুল ছুটির পর সবাই মিলে তারিখ ঠিক করলাম। সোমবার বিশেষ কোন কারণে স্কুল বন্ধ ছিল। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সবাইকে কানাইঘাট থানার (পূর্বের নাম) সামনে এসে একত্রিত হতে হবে। যথাসময়ে সবাই এসে উপস্থিত হল। ২৫০ টাকা দিয়ে ভাড়া করা ইঞ্জিন নৌকাটি ও ঠিক সময়মত এসে পৌঁছল। সবাই নৌকায় উঠলাম। সে সময় মোবাইল ফোনের তেমন একটা প্রচলন ছিলনা তাই টেইপ রেকর্ডারে দেশের গানের ক্যাসেট বাজিয়ে দিলাম গান বেজে ওঠল “একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ট সোনার গায়” নৌকার ভেতরে আমরা দেশের গান শোনার পাশাপাশি খোশ-গল্প, আড্ডায় মেতে উঠলাম। এদিকে নৌকার ছাদের উপর টিটু বাহিনীরা গানের তালে তালে নৃত্য শুরু করল। আমি প্রথমেই বলেছিলাম ক্লাসের দুষ্ট ছেলে টিটু পড়া-লেখায় ভালো হলে ও খুবই দুষ্ট প্রকৃতির। দেশের গান চলতে চলতে ১ ঘন্টা পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম সুরমা লোভা আমরি ত্রিমুখী পয়েন্টে যেখানে এসে তিনটি নদী মিলিত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে তিনটি নদী একত্রিত হলেও লোভা কিন্তু খরস্রোতা। লোভা নদীর পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ। ৫/৭ ফুট নিচে অবস্থানরত মাছের চলাফেরা খালি চোখে পরিষ্কার দেখা যায়। লোভা পাড়ি দিয়ে উজান বেয়ে নৌকা চলতে লাগল। খাসিয়া-জৈয়ন্তিয়া পাহাড়ের মনোরম দৃশ্যে চোখে ভাসতে লাগল। ভারতের যানবাহনগুলো পিপিলিকার মতো চলতে দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের উচু নিচু টিলা আর গাছ-পালা দেখার জন্য নৌকা নিয়ে আমরা নুনছড়া নদী (লোভার শাখা) দিয়ে প্রবেশ করলাম নদীর দু’পাশে শত শত জাতের গাছপালা, আর বনজ ফুল-ফলে শোভিত টিলার বন-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নৌকায় চড়ে উঠলে কি এক অপরূপ মনোরম দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। নৌকা থেকে নেমে পড়লাম নদীর উপর। নির্মিত রাঙামাটির ব্রীজের মত ১৯২৫ সালে ইংরেজদের নির্মিত ঝুলন্ত ব্রীজ দেখে সত্যিই আমরা আনন্দিত হলাম আর আপন মনে ছবি তুলতে লাগলাম। ব্রীজের পাশেই চোখে পড়ল বিশাল চা বাগান। চা বাগানে শত শত শ্রমিক আপন মনে কচি কচি পাতা তুলছে। সুবিশাল চা বাগানটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম, চা বাগানের পাশে আছে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি গাঁথা শহীদ মিনার, আছে ৩৬০ আউলিয়ার হযরত শাহজালালের সঙ্গী ২ জনের মাজার। আবার উচু নিচু টিলা এসব টিলায় লিচু, আম, কাঠাল, সুপারী, তেজপাতা, পান, কামরাঙ্গা প্রভৃতি ও চোখে পড়ল। কামরাঙ্গা দেখে জিভে জল এসে গেল টিটু বাহিনীর আর আসবে নাই বা কেন? প্রচুর কামরাঙ্গা দেখে গাছের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো বিক্রি করবেন কিনা? ভদ্র মালিক বললেন পয়সা লাগবেনা আপনারা ছাত্র মানুষ যা খেতে পারেন খেয়ে যান। সবাই ইচ্ছেমতো কামরাঙ্গা খাওয়া শুরু করলাম। তারপর উচু পাহাড়ে উঠা অভিযান প্রতিযোগিতা শুরু করলাম কে কত দ্রুত গতিতে উপরে উঠতে পারে। হঠাৎ সবার মনে ভয়ের সঞ্চার হলো কারণ শুনেছি এসব পাহাড়ে বানর, শুকর, হাতি, বাঘ ইত্যাদি প্রাণী থাকে। এখনো শরৎ হেমন্তকালে বাঘ নামে।
মূলাগুল, বড়বন্দ, সুরইঘাট, কালিনগর, নিহালপুর, ইত্যাদি পাহাড়ী এলাকার গ্রামগুলোতে বাঘ নামলে লোকজন সুকৌশলে বাঘের অবস্থানের বন, টিলা, ঘিরে জাল দিয়ে বাঘকে আটকে রেখে। এসব উঁচু পাহাড় থেকে নেমে এসেছে অসংখ্য ছড়া, ছড়ার পানি অত্যন্ত সুন্দর, পাহাড়ী এলাকার লোকেরা এসব পানি গর্ত করে সংগ্রহ করে রেখে পান করে। পাহাড় থেকে নেমে নৌকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আবার ও নৌকায় উজান বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম কিছু দূর পেরিয়ে যাওয়ার পর নাস্তা করার জন্য নেমে পড়লাম মুলাগুলের নয়াবাজারে, নদীর দু'পাড়ে দুটি বাজার আছে। হালকা নাস্তার পর বেরিয়ে পড়লাম ভারত সীমানা সংলগ্ন স্থানে যেখানে পাথর উত্তোলন করা হয়। ভারত ও বাংলাদেশের উঁচু-নিচু পাহাড়ের মনোরম দৃশ্যে দেখতে দেখতে কখন যে ভারতের সীমানা সংলগ্ন স্থানে চলে এলাম ভাবতেই পারিনি। সীমান্তরক্ষী বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) বার বার বাশির সিগন্যাল আমাদেরকে সতর্ক করে দিল। তারপর নৌকা থামিয়ে পাথর কোয়ারী দেখতে লাগলাম। বিশাল পাথর কোয়ারী। হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক এ কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলন করে নৌকা, ষ্টীমারে তুলছে। সারা বছরই কম বেশী পাথর এখান থেকে আহরিত হয়। শত শত কার্গো, ট্রলার, ষ্টীমার, ট্রাকযোগে প্রতিনিয়ত এসব পাথর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নেয়া হচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে বেলা পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। সূর্য ডোবার সাথে সাথেই জোনাকী পোকার মতই ভারতের বিজলী বাতিগুলো জ্বলে উঠল। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি লোভা এলাকায় পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌরভ-সম্ভার আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলল। যা লেখার নয় দেখার, উপলব্ধি ও উপভোগ করার।
যে ভাবে আসবেন লোভা-মূলাগুলেঃ
কানাইঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৫১.২ কিলোমিটার (৩২ মাইল) দূরে উত্তর পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে কানাইঘাটে আসতে হলে সিলেট-তামাবিল রোড অথবা জকিগঞ্জ রোডে কানাইঘাট উপজেলা সদরে আসা যায়। কানাইঘাট বাজার ঘেঁষে প্রবাহিত সুরমা নদীর দু’পারেই দু’টি বাস ষ্টেশন আছে। উপজেলা সদর থেকে সুরমা নদী দিয়ে নৌকায় লোভা-মূলাগুল এলাকায় যাতায়াত করতে পারবেন। এতে দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগবে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে কানাইঘাট বজার থেকে লোভা-মূলাগুল (রিজার্ভ করে) ২-৩ শত টাকা খরচ পড়ে। তবে রিজার্ভ ছাড়াও নৌকা পাওয়া যাবে।
'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ'- মুলাগুল ভ্রমণ করলে এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে হয়তো কবি নজরুল এই মুলাগুলকেও কেন্দ্র করে এরকম কবিতা রচনা করতেন।
উদীয়মান এবং প্রানবন্ত সাংবাদিক মাহবুবুর রশীদের লেখায় মুলাগুলের অনেক চিত্র উঠে এসেছে। সত্যি কথা বলতে কি....
এই মুলাগুল সম্পর্কে অনেকেই না-ওয়াকিফ।
এসব তরুণ সাংবাদিকরা লিখছে বলে পর্যটন সম্ভাবনার মুলাগুল এক সময় হয়তো পর্যটকদের পদচারনায় মুখর হবে।
ধন্যবাদ মাহবুব সাহেবকে তার সুন্দর এবং সাবলীল লেখার জন্য।
54413
২
সিলেট থেকে টুরিজম ইন সিলেট লিখেছেন,
১৭ এপ্রিল ২০১১; রাত ০২:৪৪
লেখককে অনেক ধন্যবাদ অপরূপ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য। আপনি জেনে খুশি হবেন পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন চাই এরূপ কয়েকজন মিলে আমরা সিলেটের পর্যটন খাতকে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীর সামনে ছড়িয়ে দেবার উদ্যোগ নিয়েছি। সবেমাত্র কাজ শুরু করেছি। আপনার মতো ভ্রমণপিপাসু মানুষের সহযোগিতা আমাদের খুব প্রয়োজন। আশাকরি আমাদের ফেসবুক পেজটি দেখবেন এবং এর উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। http://www.facebook.com/pages/Tourism-in-Sylhet/199831306721804
54449
৩
কানাইঘাট, সিলেট থেকে ফৃয়াদ হাসান মুহসিন লিখেছেন,
১৮ এপ্রিল ২০১১; দুপুর ০৩:১৩
কানাইঘাট আসলেই প্রকৃতির এক সুন্দর এলাকা। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে এ এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।
ধন্যবাদ লেখককে সুন্দর লেখার জন্য।
54609
৪
রাজশাহী থেকে রাবিদ মাহমুদ নয়ন লিখেছেন,
১৮ এপ্রিল ২০১১; বিকেল ০৫:৩১
লেখাটি পড়লাম। মুলাগুল ভ্রমণ করব।
54622
৫
usa থেকে ৃawlad লিখেছেন,
১৯ এপ্রিল ২০১১; সকাল ০৮:৩৫
Thank you for informing us an very interesting location in our lovely home land sylhet.
উদীয়মান এবং প্রানবন্ত সাংবাদিক মাহবুবুর রশীদের লেখায় মুলাগুলের অনেক চিত্র উঠে এসেছে। সত্যি কথা বলতে কি....
এই মুলাগুল সম্পর্কে অনেকেই না-ওয়াকিফ।
এসব তরুণ সাংবাদিকরা লিখছে বলে পর্যটন সম্ভাবনার মুলাগুল এক সময় হয়তো পর্যটকদের পদচারনায় মুখর হবে।
ধন্যবাদ মাহবুব সাহেবকে তার সুন্দর এবং সাবলীল লেখার জন্য।