জীবনের লক্ষ্য ও পরিণতিঃ-
মানুষের প্রতিটি অগ্রগতির বাস্তব রূপায়নের আগে তা ছিল কল্পনা মাত্র। লক্ষ্য শুধুই অলীক স্বপ্ন নয়-এটা এমন স্বপ্ন যার জন্য আমি তৎপর হয়ে কাজ করছি। প্রয়োজনে জীবনও দিতে পারি এটাই হচ্ছে স্বপ্ন। জীবনের জন্য যেমন বায়ুর প্রয়োজন, তেমনি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্য। জীবনের জন্য লক্ষ্য স্থির না করা পর্যন্ত কিছুই করা সম্ভব নয়। লক্ষ্যহীন মানুষ বিভ্রান্ত, জীবনে সে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। হোঁচট খেতে খেতে সে এগোয় বটে তবে যেহেতু তার সামনে কোন গন্তব্য নেই তাই কোথাও পৌছাতে পারে না। আপনি কোথায় ছিলেন বা আছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসল বিষয় হলো আপনি কোথায় পৌঁছাতে চান। জীবনকে পরিচালিত করে আমাদের প্রত্যেকের জীবন দৃষ্টি।
জীবন দৃষ্টি দুই ধরনেরঃ-
ক. সাধারণ জীবন দৃষ্টি এবং
খ. আলোকিত জীবন দৃষ্টি ।
সাধারণ জীবন দৃষ্টিঃ- হচ্ছে চাওয়া, পাওয়া না পাওয়া, অতৃপ্তি, দুঃখ, দুর্দশার বৃত্তে আবর্তিত জীবন।
আলোকিত জীবন দৃষ্টিঃ- হচ্ছে চাওয়া, পাওয়া না পাওয়া, অতৃপ্তি, দুঃখ, দুর্দশার বৃত্ত থেকে মুক্ত জীবন।
জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আলোকিত জীবনের অধিকারী হতে চাওয়া। আমরা সবাই অবচেতনভাবে আলোকিত জীবনের অধিকারী হতে চাই। যুগে যুগে মানুষ অতৃপ্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে। যত বস্তুর পিছনে দৌড়াবেন তত অভাব বাড়বে, যত অর্থ তত চিন্তা বাড়বে। টাকা, সম্পদ, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা কোন কিছুই আপনাকে সাধারণ জীবন দৃষ্টি থেকে মুক্তি দিতে পারবে না, নিরাপত্তা দিতে পারবে না। জীবনের লক্ষ্য ও পরিণতি সম্পর্কে যদি আপনার সঠিক জীবন দৃষ্টি থাকে তাহলে আপনি নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্ত থাকবেন।
জীবন দৃষ্টির শক্তির দ্বারা দুইটিঃ-
ক. জৈবিক শক্তি এবং
খ. আত্মিক শক্তি
জৈবিক শক্তিঃ-
জৈবিক শক্তি উজ্জীবনী পায় বস্তু থেকে। যা মানুষকে অল্প পরিশ্রমেই কর্ম ক্লান্ত করে দেয়।
আত্মিক শক্তিঃ-
আত্মিক শক্তি উজ্জীবনী পায় বিশ্বাস থেকে। যা মানুষকে করে পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ী।
জৈবিক শক্তিকে আত্মিক শক্তিতে রূপান্তরের পথ হচ্ছে Meditation এর পথ, মোরাকাবার পথ, ধ্যানের পথ। যখন আত্মার সাথে মন প্রশান্ত হয়ে যুক্ত হয় তখন বিশ্বাসের শক্তি জাগ্রত হয়। আর বিশ্বাস আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে । যুক্তি= খুড়া + অন্ধ। যুক্তি কখনই মুক্তি দিতে পারেনি।
বিশ্বাস যত সুন্দর হবে তত দ্রুত আপনি জৈবিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন। মুক্তির আনন্দে অবগাহন করবেন। আর বিশ্বাস হতে হবে প্রশ্নশূন্য ও পরিপূর্ণ।
যিনি আত্মিক শক্তিতে উজ্জীবিত তিনি দুঃখ, কষ্ট, পরিশ্রম, অপমান আঘাত সব কিছুই হাসিমুখে সইতে পারেন। তার মূলশক্তি হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। আমরা তার (স্রষ্টার) কাছ থেকে এসেছি, তার কাছেই ফিরে যাব। আমাদের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। আমরা পৃথিবীতে কিছু সময়ের জন্য পরিভ্রমণ করছি মাত্র।
আমরা মহাজাগতিক মুসাফির এবং স্রষ্টার প্রতিনিধি। নিজের মেধার বিকাশ ও সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন শেষে তৃপ্তির সাথে বিধায় নিতে পারব। যদি আমরা আমাদের জীবনে আলোকিত জীবন দৃষ্টি লালন করি। সমুদ্র আমার হতে পারে না বরং আমি সমুদ্রের হতে পারি। আমি ট্রেনিং প্রাপ্ত হলেই শুধু জীবন সমুদ্রে ভাসতে ও ডুবতে পারব। তা না হলে জীবন সমুদ্রে হাবু ডুবু খাব।
দেহকে সৃষ্টি করা হয়েছে একাকিত্ব দিয়ে আর আত্মার সাথে যখন স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসের মিলন হয় তখন সৃষ্টি হয় প্রশান্ত প্রত্যয়। যার ফলে দেহ মুক্তি পায় জৈবিকতার শৃঙ্খল থেকে। যিনি তৈরী হন যে জিনিস পাওয়ার জন্য সে জিনিস তার দিকে আকৃষ্ট হয়। আর আমাদের জীবনে যদি পরিবর্তন চাই তাহলে মেডিটেশনের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। তবেই আমরা মুক্তি পাবো মনজাগতিক দাসত্ব থেকে। সৃষ্টিকর্তার কাছে সব মানুষ সমান। তাই তিনি সবাইকে বড় হওয়ার জন্য, জীবনে বড় কিছু অর্জন করার জন্য স্বপ্ন দেন। যারা তাঁর স্বপ্নটা দেখামাত্র চিনতে পারেন এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা করেন, তাদেন জীবনেই স্বপ্ন পূরণ হয়। আর যারা স্বপ্নটা মাঝ পথে ছেড়ে দেন, তারা সাধারণ জীবন যাপন করেন। আবার আরেক ধরণের মানুষ আছেন যারা স্বপ্ন দেখার সাহসই রাখেন না। তাদের জীবনে দুঃসময়ের শেষ থাকে না। আর এখন থেকে আমাদের মনে রাখতে হবে আমার একটি স্বপ্ন আছে। একে লালন করতে হবে নিজের মাঝে। আর নিজের স্বপ্নকে লালন করার সহজ পথ হচ্ছে মেডিটেশনের পথ, মোরাকাবার/ ধ্যানের পথ। মেডিটেশনে আত্মনিমগ্ন হলে একজন মানুষ সংযোগ সাধন করতে পারে অন্তরের আমির সাথে। প্রত্যেকের হৃদয়ে একজন মানুষ বসবাস করে। সে কথা বলে, আত্মনিমগ্ন হয়ে কান পাতলে তার কথা শোনা যায়। সে যা বলে ঠিক সে অনুযায়ী কাজ করলেই জীবনে সফল হওয়া যায়, বড় কিছু করা যায়। কারণ সেখানে আমি বা আপনি সম্পূর্ণ একা। আপনার বা আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। একেবারে রাজার মত একা। রাজা নিঃসঙ্গ, কারণ একই সিংহাসনে একসাথে দুইজন বসতে পারেন না। তখনই সে নিজেকে বুঝতে পারে, নিজের সাথে কথা বলতে পারে, প্রকৃতির নৈঃশব্দকে উপলব্ধি করতে পারে। তাই নিজে কে চেনার জন্য, নিজেকে বুঝার জন্য প্রয়োজন মেডিটেশন। আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবতন করতে পারলে আপনিও হতে পারবেন সফল, এর জন্য চাই স্বপ্ন দেখার সাহস, কল্পনাশক্তি এবং স্বপ্নের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখার সাহস। আপনার অসম্পূর্ণ ক্ষমতা আয়ত্বে আনা, সব শক্তি কাজে লাগানোর একমাত্র উপায় হলো মনের মত কাজ করা। স্বপ্নের নিকট আত্মসমর্পণ করা। আপনি যদি স্বপ্নের নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারেন, তাহলে আপনি উৎসাহ-উদ্দিপনা, শক্তি, মনোবল, এমন কি সুস্বাস্থ্যও পাবেন। আর স্বপ্নের নিকট আত্মসমর্পণের কোন নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই।
জর্জ ফোরম্যান ১৯৯৪ সালে ২০ বছর পর মুষ্টিযুদ্ধের খেতাবী লড়াইয়ে জয়ী হয়ে প্রমাণ করেছিলেন স্বপ্নের নিকট আত্মসমর্পণের কোন বয়স সীমা নেই, যদি সমর্পণ করা যায় তা হলে জয় সুনিশ্চিত। ১৯৭৪সালে মোহাম্মদ আলীর হাতে নক আউট হওয়ার ২০ বছর পর ১৯৯৪ সালে ৪৫ বছর বয়সে ২৬ বছরের মাইকেল মুরারকে পরাজিত করে বক্সিং এর খেতাবী লড়াই জেতার মত অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করেছিলেন , তার স্বপ্নের জোরেই। জেতার পর সংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন কিভাবে সম্ভব করলেন এই অসম্ভব কাজটি? সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিনে “স্বপ্ন দেখে, ২০ বছর ধরে বিজয়ের এই স্বপ্নই-তো আমি সব সময় দেখেছি। বয়স বাড়লেই মানুষ তার স্বপ্ন বিসর্জন দেয় না।” আপনি মনে প্রাণে যা চান তা পাবেনই।
“ঊষর মরুর ধুসর বুকে বিরাট যদি শহর গড় একটি জীবন সফল করা তার চাইতে ও অনেক বড়।” প্রতিকুল পরিবেশকে জয় করে একটি শহর গড়ার চাইতেও একজন মানুষের জীবনকে আলোকিত করা অনেক বেশি কৃতিত্বের, অনেক বেশি পূণ্যের। অনেক বেশি সাফল্যেও এবং অর্থবহ। আমাদের সবার মাঝে আলোকিত পথে চলার শক্তি সুপ্ত রয়েছে।
আপনি যতই বড় হবেন নিজেকে আলাদা করে আবিষ্কার করবেন। আপনি যা চান, যা বিশ্বাস করেন, যে ভাবে ভাবতে ভালবাসেন, হয়তো কিছুই মিলবে না। একেবারে কাছের মানুষদের সাথে, কিন্তু নিজের স্বপ্নের সাথে আপোস করবেন না। নিজেকেও ভালবাসতে হয়। আগে নিজেকে ভালবাসুন, তারপর অন্যকে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। আপনার জীবনেও স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। বৃষ্টি হলে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে যেমন ছাতা বা বৃষ্টির পোশাক ব্যবহার করেন, নিজের স্বপ্নকেও সেভাবেই রক্ষা করতে হবে আপনাকে। আপনার মাঝেই আছে আলোর দ্যুতি। আপনিও হতে পারবেন আলোকিত সফল জীবনের অধিকারী এবং আপনার স্বপ্নের সমান বড়।
এমন একটি সুন্দর লেখার জন্য।