রবিবার, ২৩ মাঘ ১৪১৯; ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২; রাত ০৯:২২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
সিয়ামের সাধনা ও হাট-বাজার সমাচার (৩০/০৭/২০১১)
মে’রাজের পরম শিক্ষা (২৫/০৬/২০১১)
সন্তানের অধিকার, নারীত্বের মর্যাদা এবং নবীজীর বিয়ে- ৩ (০৯/০৪/২০১১)
সন্তানের অধিকার, নারীত্বের মর্যাদা এবং নবীজীর বিয়ে- ২ (০২/০৪/২০১১)
সন্তানের অধিকার, নারীত্বের মর্যাদা এবং নবীজীর বিয়ে- ১ (২৬/০৩/২০১১)
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আল্লাহর সুবিচার এবং উপেক্ষিত এক চেতনার কথা (১৮/১২/২০১০)
বস্তুবাদী অপব্যাখ্যার কবলে সালাম-কালাম, হালাল-হারাম এবং কোরবানীর আদর্শ (১৩/১১/২০১০)
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ (০৯/০৯/২০১০)
স্মৃতিতে ভাস্বর আল্লাহর ওলী হযরত শাহ্ সৈয়দ ইমাম নজর আহমদ (রহঃ) (২১/০৮/২০১০)
কৃত্রিম প্রাণ, পাথরের জীবন এবং মানব ক্ষমতার সীমানা (২৪/০৭/২০১০)
ফেরীতে ট্রেন (১০/০৭/২০১০)
জীবনাবসানের জন্য প্রস্তুতি (২৬/০৬/২০১০)
সাসপেন্স ইন ইমিগ্রেশন (১২/০৬/২০১০)
আত্মহননের আগে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখুন (২৯/০৫/২০১০)
আলোকিত ডিএনআই স্যারের কথা (১৫/০৫/২০১০)
মাকে দেয়া আমার শেষ প্রতিশ্রুতি (০১/০৫/২০১০)
নেতার দুয়ারে দেখা দুর্ভিক্ষ (০১/০৪/২০১০)
অনন্ত জীবনের অন্যতম নিদর্শন ও নির্দেশনা (১৫/০৩/২০১০)
কাছে থেকে দেখা প্রিয় দুই মুখ (০১/০৩/২০১০)
পলাশীকেই যেন দেখলাম আবার ঢাকার পিলখানায় (১৩/০২/২০১০)
আমরা আর কতদিন নোংরা জাতি থাকবো? (০১/০২/২০১০)
যুক্তিহীনতার মহামারীতে আক্রান্ত শিক্ষিত সমাজ (১৫/০১/২০১০)
আগের লেখা
320


সিয়ামের সাধনা ও হাট-বাজার সমাচার

মঈনুল আহসান

বছর ঘুরে রমজানের রোজা এবং ঈদ আবার সমাগত। আর তাই এরই মধ্যে গরম হওয়া শুরু করেছে দেশের সব হাট, বাজার। তার সাথে তাল মিলিয়ে গরম হচ্ছে মানুষের মেজাজ, মর্জি, চাহিদাও। সুদূর প্রবাসে বসেও অনুভব করছি সেই উত্তাপ। কারণ স্বদেশের জন্যেই তো এই আমরা, আর স্বদেশই যে আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জন, তা আমরা যেখানে যত দূরেই থাকি না কেন। লক্ষ-কোটি মাইল দূরের নক্ষত্রমালাকে ‘দূরবীনে’ যেমন দেখা যায় অতি চমৎকার তেমনি সহস্র মাইল দূরের দেশে বসেও স্বদেশকে দেখা যায় পরিষ্কার ‘মনের দূরবীনে’। এই দেখাতে বরং অধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে আপাতঃ অদেখা অনেক কিছু, অনেক বিষয়। আবিষ্কার করা যায় এমন অনেক বিস্ময় যা দেশে থেকে সব সময় বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। তেমনই একটি বিস্ময় হলো আমাদের ‘খাওয়া সর্বস্ব’ রমজান। ভেবে পাই না বিচিত্র সব খাওয়া-খাদ্য নির্ভর এই রমজান আমরা পেলাম কোথায়? সাক্ষ্য-প্রমাণ বলে আমাদের প্রিয় নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীরা (রাঃ) সেহেরী-ইফতার সারতেন দু’একটা খেজুর, খোরমা, একটু দুধ অথবা শুধুই পানি দিয়ে। পুরো রমজান তাঁরা ব্যস্ত থাকতেন আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নৈকট্য লাভের একনিষ্ঠ চেষ্টায়। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার সময় কোথায়।

প্রিয় রসুল (সাঃ) বলেছেন, পৃথিবীর বুকে মসজিদ হলো সর্বোত্তম আর বাজার হলো নিকৃষ্টতম স্থান। আবার অন্য দিকে বছরের মাসগুলোর মধ্যে রমজানকে করা হয়েছে মহা মহিমান্বিত এক মাস যে মাসে রয়েছে হাজার মাসের চাইতেও উত্তম এক রজনী যে রাতে নাযিল হয়েছে মানব জাতির মুক্তি সনদ পবিত্র আল-কোরআন। তাই উচিত মতে পবিত্র এই মাসে আমাদের অবস্থান হওয়া প্রয়োজন পবিত্র স্থান মসজিদে। সম্ভব হলে বাসা বাড়ীর পরিবেশও এমন করে নেয়া যেতে পারে যাতে সেটা হয়ে উঠবে একটা পারিবারিক মসজিদের মত। তা হলেই না প্রকৃত মর্যাদা পাবে রমজানের পবিত্র সময়, আর আমরাও হবো সর্বত উপকৃত। অথচ লক্ষ্যনীয় যে এই মাসেই আমাদেরকে সবচেয়ে বেশী সময় ব্যয় করতে হয় হাটে, বাজারে অথবা বাজারের পথে রাস্তার ট্রাফিক জ্যামে। অর্থাৎ মহাপবিত্র সময় আমরা কাটিয়ে দেই অবলীলায় নিকৃষ্ট স্থানে, নিকৃষ্ট ভাবে। এ যেন ভরা জোৎস্নার সৌন্দর্য দেখবো না বলে নিজেকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখার মত অবস্থা। কিন্তু ঠিক এই সময়টাতেই কেন হচ্ছি আমরা বাজারমুখী? জবাব সহজ, সেহেরী-ইফতারে খেতে হবে প্রচুর। পুষিয়ে নিতে হবে সারা দিনের ক্ষুৎ-পিপাসার ক্ষতি। আর ইফতারে কাউকে দাওয়াত করে থাকলে তো কথাই নেই। মেহমানের তৃপ্তির নাম করে আমরা নেমে পরি অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। ইফতারে সেরা হওয়ার ইচ্ছায় যেন পুরো বাজারটাকেই তুলে আনতে চাই ঘরে। অথচ আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেছেন, মেহমানকে পানি দিয়ে ইফতার করালেও মেজবান পাবে তার পুরো সওয়াব।

বছরের মাসগুলোর মধ্যে রমজান মাসের গুরুত্বের মত প্রতিটা দিনের মধ্যেও বিভিন্ন মোবারক সময় রয়েছে যা দোয়া করার জন্য এবং দোয়া কবুল হওয়ার জন্য বিশেষ ভাবে নির্বাচিত ও নির্ধারিত। এর মধ্যে ভোররাতে ফজরের নামাজের আগে-পরের সময় এবং বিকেলে আছরের নামাজের পরবর্তী সময় দু’টো উল্লেখযোগ্য। এই সময় দুটোকে সাধারণতঃ দোয়া কবুলের সর্বোত্তম সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমানে দুনিয়া সর্বস্ব চিন্তায় মগ্ন আমাদের জন্য একমাত্র রমজানের মাসটাতেই অপূর্ব সুযোগ সৃষ্ট হয় এই সময় দু’টো কাজে লাগানোর। সেহেরীর জন্যে একটু আগে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে এবং আছরের পর থেকে ইফতার পর্যন্ত সময়টা দোয়া-দরূদ ও কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যে কাটিয়ে খুব সহজেই এই দু’টো সময়ের মূল্যমান আমরা যোগ করতে পারি আমাদের জীবনে পবিত্র এই রমজান মাসে। অথচ সেহেরী আর ইফতারের আধিক্য এবং সেসবের প্রস্তুতির অযথা ব্যস্ততায় আমরা খুব দুঃখজনক ভাবে বঞ্চিত হই এই সময়গুলোর যথাযথ ব্যবহার, উপকারিতা এবং উপযোগীতা থেকে।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য ছাত্রদের ক্ষেত্রে, যাদের জন্য অধ্যায়নই তপস্যা, তাদের সেই তপস্যাতেও কিন্তু ভোর আর সাঁঝের মূল্য অপরিসীম। কারণ ঐ সময় দু’টোতেই সাধারণতঃ অধ্যায়নের তপস্যা একনিষ্ঠ ভাবে করা সম্ভব হয়ে থাকে। লক্ষ্যনীয় যে লেখাপড়ার ঐ একান্ত তপস্যার সময়েও কেউ কিন্তু ভরা পেটে বা পেট পুরে খেয়ে বসে না। কারণ ভরা পেটে ঘুম পায়, পড়া হয় না। বোধকরি সেই একই কারণে আল্লাহকে পাওয়ার তপস্যাতেও ভোর আর সন্ধ্যাকে একই ভাবে করা হয়েছে গুরুত্ববহ। রমজানের পুরো একটি মাস সেহেরী আর ইফতারের একনিষ্ঠ অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষকে মূলতঃ বাধ্য করা হয়েছে ঐ গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর যথাযথ সদ্ব্যবহারে। পাঠভ্যাসের মত আল্লাহর জন্যে নিবেদিত এই একান্ত তপস্যাও ব্যর্থ হতে বাধ্য যদি ভরা পেটে তা করার চেষ্টা করা হয়। সেহেরী ও ইফতারের ভুরিভোজনের পর নামাজে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে থাকাটা মূলতঃ আমাদের সেই ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে অতি দুঃখজনক ভাবে।

পবিত্র এই মাসে ভোগ-বিলাসের পথে আমরা সমস্ত সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে যাই ঈদের ঠিক আগে রমজানের শেষ দিনগুলোতে। তখন আমাদের দিন কাটে রাস্তায়, ইফতার হয় বাজারে আর নামাজের সময় ফুরিয়ে যায় অন্তহীন কেনা-কাটায়। অথচ ঐ সময়ের মাত্র একটা রাতের ইবাদতই ঘুরিয়ে দিতে পারে আমদের সমস্ত জীবনের মোড়। অমিত মর্যাদাপূর্ণ ঐ রাতটাকে খুঁজে নিতে বলা হয়েছে রমজানের শেষ দশটি রাতের মাঝ থেকে। তাই সত্যিকার অর্থেই আমারা যদি হতাম শক্ত ঈমানের অধিকারী, মনে যদি সত্যিই থাকতো সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাকের কঠিন শাস্তির ভয় এবং তাঁর অফুরাণ করুণার প্রতি যদি থাকতো সত্যিকারের আকর্ষণ তাহলে রোজার শেষ দিনগুলোতে আমাদের পক্ষে হাট-বাজারের ধারে কাছে যাওয়াটাও সম্ভব হতো না। প্রকৃত মুসলিম সমাজের হাট-বাজার ঐ সময়টাতে অন্ততঃ শূন্য পড়ে থাকার কথা। ক্রেতাহীন বাজারে জিনিস-পত্রের দাম তখন পড়ে যাওয়ার কথা হু হু করে। আমরা সবাই জানি এসব তথ্য। আরও জানি যে হাট-বাজারের ফাঁকে ফাঁকে তথা দৌড়ের উপরে থেকে কোন রকমে কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে কখনই সম্ভব নয় রোজার রহমত, বরকত ও মাগফিরাতকে আয়ত্ব করা। অথচ বাস্তবাতা কি মর্মান্তিক ভাবেই না উল্টো। প্রকৃত সত্যের ব্যপারে কি নিদারুণ ভাবেই না নির্মোহ আমরা সবাই। বস্তুতঃপক্ষে প্রতিটি রোজার মাসে প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরের সমস্ত মোহ কেন্দ্রিভূত থাকা উচিত মহা মহিমান্বিত সেই রাতের জন্য, মাসব্যাপী বিরাজিত আল্লাহ পাকের অপার করুণার জন্য এবং নির্মোহ হওয়া উচিত বাজারের প্রতি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কে কাকে কিভাবে বুঝাবে যে মুক্তি কোথায় আর কেইবা ছাড়াবে আমাদের বাজারের নেশা।

সিয়ামের নিরবচ্ছিন্ন তপস্যা শেষে আসে অতি প্রতিক্ষীত উৎসবের দিন- ঈদ। যে ঈদকে ঘিরে শত-সহস্র হাট-বাজারের এত শত আয়োজন সেই ঈদকে বলা হয়েছে রোজাদারদের জন্য আল্লাহ পাকের বিশেষ উপহার। এটাও একটা ইবাদত। বস্তুতঃপক্ষে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষ এক ইবাদত। ঈদের রাতকে করা হয়েছে অন্যান্য পবিত্র রাতের মতই মহিমান্বিত এবং বরকতময়। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে অগণিত পাপীকে ক্ষমা করার, শুধু ক্ষমা প্রার্থনার অপেক্ষা মাত্র। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাকে, রুচিসম্মত আহারে এবং পবিত্র ভাবাবেগের সাথে উৎসব মুখর হতে বলা হয়েছে এই দিনে। বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে কঠোর ভাবে। নতুন কাপড়ের জন্য অথবা আরেকটা খাওয়া সর্বস্ব্য দিনের জন্য মানুষকে বাজারমুখী হতে বলা হয়নি কোন ভাবেই। বরং বলা হয়েছে দরিদ্র আত্মীয়, পরিজন ও পাড়া-পড়শীদের মনে করতে। সেজন্যে ঈদের নামাজের আগেই দিতে বলা হয়েছে ফেতরা যাতে সমাজের হত-দরিদ্র জনগোষ্ঠীও ঈদের আনন্দে সামিল হতে পারে সমান ভাবে।

অতএব সারা বছর আর যা-ই করি রমজানে অন্তত আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত বাজার ও খাওয়া-খাদ্যের বিষয়টিকে মূখ্য না করে বরং আল্লাহ পাকের একান্ত ইবাদতে বেশী মনোনিবেশ করা। এটা সম্ভব হবে তখনই যখন আমরা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো রোজা আর ঈদের মূল দর্শন যা নবী-রসুলগণ থেকে শুরু করে সাধক, দরবেশ ও ঈমানদার ব্যক্তিরা নিজেদের জীবনে চর্চা করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যুগে যুগে। শুধুমাত্র তাহলেই রমজানে আর কখনো বাড়বে না বাজার দর, চড়বে না মানুষের মেজাজ এবং ঘুষ-দূর্নীতিও হতে পারবে না লাগামহীন। তাই সমাগত এই রমজানসহ আগামী প্রতিটি রোজায় আমাদের প্রার্থনা হোক-

অল্প নিদ্রা ও পরিমিত আহারে, অন্তর রবে পূর্ণ আল্লাহর স্মরণে। রোজা হবে রোজার মত, ঈদ হবে ঈদের মত। যা আমাদেরকে পৌঁছে দেবে বে-হিসাব জান্নাতে।

হাদীস ভিত্তিক বর্ণনাগুলো বহু্ল ব্যবহৃত এবং সুবিখ্যাত, তাই যে কোন সহী হাদীস গ্রন্থেই সহজলভ্য।

লস এঞ্জেলস, ইউএসএ
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MainulAhsan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy