মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৪:৪৪ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

ঈদ যেনো বয়ে আনে শান্তির সুবাতাস

মাসউদুল কাদির

আনন্দ খুশির বারতা নিয়ে আবার এলো ঈদ। আবার সেই উৎসবমুখর পরিস্থিতি-কেনাকাটার ধুম-যানজট-ঘরমুখো মানুষের ভিড়। কুরবাণীর হাটে হাটে তৃপ্তিময় দৃশ্য। কিন্তু ঈদ কি সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনতে পারছে-সেটিই হলো আসল প্রশ্ন। আমাদের মত দারিদ্র্যপীড়িত দেশে এ প্রশ্ন প্রতিবছরই জাগে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। প্রশ্নটি আমাদের সবার মনে যে দাগ কাটে তা নয়- আমাদের আচরণ ও অভ্যাস আগের মতই থাকে। কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু কেন এমন হয়। আমরা কি ঈদের ‘স্পিরিট’ বা তাৎপর্যই ভুলতে বসেছি।

ঈদ আনন্দের উৎসব মিলনের উৎসব। ঈদের দিন নামাজের পর সবাই পরিচিত সবাইকে আলিঙ্গন করছে, হাসিমুখে অভিবাদন করছে, ‘ঈদ মোবারক’ জানাচ্ছে-এ এক আনন্দময় দৃশ্য। কারো সঙ্গে কারো বিরোধ থাকলে, রাগ অভিমান হলে, এদিন সবাই সব কিছু ভুলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে-যারা মুসলমান নয়, তাদেরকেও ডেকে এনে খাওয়ান হয়, কুশল বিনিময় হয়। এতে মানব প্রেমের সৌহার্দ্যরে সেতুবন্ধন রচিত হয়। এখানেই ঈদের সামাজিক যথার্থতা-এখানেই ঈদের আনন্দ। আজ কাল টেলিভিশনে, ডিস এন্টেনা’ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা ঈদ আনন্দ উৎসব দেখতে পারি। দু:খজনক বিষয় হলো এসব গণ মাধ্যমগুলোতে ঈদের পূর্ণাঙ্গ তাতপর্য নিয়ে তেমন কোনো অনুষ্ঠানই হয় না। এমনকি প্রিন্টমিডিয়া গুলোতেও তেমনি।

এক সময় যে যেখানেই থাকুক না কেন, ঈদের সময় স্বজনদের সঙ্গে এক জায়গায় হওয়া ছিল অবশ্য করণীয় ব্যাপার। এখনো অবশ্য ঈদের সময় ট্রেনে বাসে ভিড় লেগে যায় ঘরে ফেরার জন্যে। তবে এর কারণ কিছুটা ভিন্ন। মহানগরীতে যারা চাকরি করে (বিশেষ করে নিু পর্যায়ে) তারা অনেকেই আর্থিক কারণেই বৌ-ছেলেপুলেকে শহরে রাখতে পারেনা-দেশের বাড়িতে রেখে আসে-ঈদের সময় কিছুটা বাড়তি সময় পরিবারের সঙ্গে কাটাবার জন্যে তারা আগেভাগে ঘরমুখো হয়। কিন্তু যারা শহরে বসবাস করে, তারা দেশের বাড়িতে বেশি একটা যায় না। । আমাদের সকলেরই একটি গ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে। নিজে অথবা নিজের বাপ অথবা দাদা অথবা তার বাপ একটা গ্রামে ছিলেন। এদেশের অধিকাংশ এলাকাই গ্রামসর্বস্ব। শহর নগর কয়টি! দেশে শতকরা আশি ভাগ লোক এখনো গ্রামেই বাস করে । একথা গুলো বলতেই হচ্ছে একটি বিশেষ কারণে, আসলে গ্রামে যে ঈদের আনন্দ তা শহরে কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে এবারের নির্বাচনী আমেজ সম্বলিত ঈদে কিন্তু এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে । দুয়ারের কাছে নির্বাচন থাকায় এবার হয়তো সুশীল সমাজ গ্রামের দিকে কদম ফেলবেন । এখন দেখার বিষয় হলো কে কতটা পশু জনগণের জন্য কুরবানী করেন । যাদের সামর্থ আছে তাদের শুধু ঈদে-চান্দে এবং নির্বাচনের মূহুর্তে গ্রামমুখী হওয়া উচিত নয়।
প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী সবসময় জনগণের পাশে থাকা উচিত।

ইংরেজদের কিন্তু ক্রিষ্টমাস্ট বা ইসলামেরই রাসূল ঈসা আ.র জন্মদিন (যাকে বড়দিন বলা হয়ে থাকে) ইংরেজদের কাছে এখনো ‘হোম কামিং’ গৃহে প্রত্যাবর্তনের সময়। লন্ডন, এডিনবারা, বারমিংহ্যাম, ম্যানচেস্টার যে শহরেই বাস হোক না-বাবা-মা, একটি ক্ষুদ্র প্রদেশে বাস করলে, সবাই ছেলেপুলে নাতিপুতিসহ সেখানে গিয়ে হাজির হয়- এ প্র্যাকটিস কম হলেও এখনো চালু রয়েছে । আমাদের দেশে কিছুদিন আগে পর্যন্ত ঈদ-বকরীদে পালাক্রমে নিজের বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ির বাড়িতে ঈদের উৎসব পালন করা হতো। এখন আর তেমনটি হচ্ছে না-আর্থিক সমস্যা, যানজট সমস্যা ইত্যাদির কারণে। কিন্তু এর একটা বাড়তি লাভ ভুলে গেলে চলবে না। দেশের বাড়িতে ঈদ করলে শুধু কী পারিবারিক বন্ধন শক্ত হয়- তা নয় দেশের যে তরুণ ছেলেমেয়েরা আছে-তারা নানাভাবে উৎসাহিত হয়। নিরক্ষরতা দূরীকরণের ব্যাপারে, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, পুকুর ডোবার উন্নয়নে, শহর থেকে আগত সুশীল বন্ধুদের কাছ থেকে খুঁজে পায় সুন্দর পরামর্শ। আমাদের কাছ থেকে তাদের এতটুকু পাওনাও কি খুব বেশি। আগে হিন্দু জমিদাররা তাদের পূজো পার্বণের সময় এমনটিই কিন্তু করতেন। তারা প্রথমে এসে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন, কারো খাজনা মাফ করতেন, কিছুটা দান খয়রাত করতেন-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি হত। গ্রামে আনন্দ আসতো। আমাদের ঈদ প্রসঙ্গে এতোসব বলার উদ্দেশ্য শুধু গ্রামে ঈদের আনন্দকে ফিরিয়ে আনা।

গ্রামে এখনো ঈদকে উপলক্ষ করে বিয়ে-শাদি, তাফসির মাহফিল, সুন্নাত খতনাসহ আরো বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদী হয়ে থাকে। যেখানে ঈদ আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। একে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যায় আত্মীয়রা।

ঈদ উপলক্ষে আমাদের দেশের মায়েদের কি যে আয়োজন, তা বলাবাহুল্য। কতো রকমের পিঠাপুলির উতসব হয় ঘরে ঘরে। কুরবাণীর ঈদে অবশ্য রুটি আর গোস্তের বাহারী আয়োজন হৃদয়ে অন্যরকম তৃপ্তি এনে দেয়। তখন কতো মা বার বার চোখ মুছেন, জোর করে জিজ্ঞেস করতে গেলেই তার কান্না আরো বেড়ে যায়। প্রবাসী ছেলেকে রেখে মা কিছুই খেতে চান না। প্রবাসী ছেলেদের অবস্থাও কি আর ভালো থাকে! ফোন করে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে। মায়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, আরো কতো আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলে নিজেকে হালকা করে। তবু কি আর মাতৃভূমির ঈদ আনন্দ পাওয়া যায়? তা কিছুতেই সম্ভব নয়।

আমরা আশা করবো এবারের ঈদ আমাদের সমাজ জীবনে সুখ-শান্তি বয়ে আনুক। আমরা যে যার মতো করে ভাতৃত্ববোধের পরিচয় যদি দিতে পারি তাহলেই সৌহার্দ্যপূর্ণ পৃথিবী গড়তে পারবো। আমরা সে সব শিশুদের জন্য দোয়া করবো, যাদের প্রতিটি সময় কাটে বোমারু বিমানের গর্জন শুনে। বারুদের গন্ধে যাদের ঘুম আসে না, আমরা তাদের জন্য প্রাণ খুলে দোআ করবো। ইরাক, কাশ্মির, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনসহ যুদ্ধ বিদ্ধস্ত প্রতিটি দেশেই মুসলমানরা নির্যাতিত।নির্যাতনের স্বীকার আমাদের মা-বোনেরা। এসব নিপীড়িত মানুষের কথা আমরা এই ঈদে স্মরণ করবো। নবীজী ঈদের দিনে ইয়াতিম শিশুদের বুকে তুলে নিতেন। তিনি উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন তার পিতা আজ বেঁচে থাকলে তার কতই না আনন্দ হতো। সে রকম আনন্দের ভাগ কিন্তু এসমাজের অভাবী মানুষকে দিতে পারি, পৌঁছে দিতে পারি পিতাহারা সন্তানের বাড়িতে এক বাটি গোস্ত। যেখানে ইয়াতিম শিশুটি খুঁজে পাবে ঈদ আনন্দের ছিটেফোঁটা। এসো না ভাই সমাজ পরিবর্তনে আমরাও অংশীদার হই।
mkadir1983@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MasudulKadir
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy