বর্তমানে আমরা এমন এক সময় অতিবাহিত করছি যেখানে বিজ্ঞান ব্যতিত একটি মুহূর্তও চলতে পারছি না। আমাদের প্রতিটি কাজ, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারনা, আনন্দ-বেদনা সবই আজ বিজ্ঞান দ্বারা চালিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের এ সুফল আজ একজন রিক্সা চালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সকলেই ভোগ করছে। কিন্তু অতি পরিতাপের বিষয় বিজ্ঞানের এ সকল উন্নত প্রযুক্তি আমাদের অন্য দেশ থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্থ দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আমরা কি সারা জীবনই এভাবে অন্যের উপর ভরসা করে বেঁচে থাকবো? আমরা কি জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত হতে পারিনা? আমাদের দোকানগুলোতে গেলে দেখা যাবে জাপান, চায়না, ভারত প্রভৃতি দেশের তৈরী জিনিস-পত্রে ভরপুর আর আমরা সেগুলো কিনতেও যেন মর্যাদা বোধ করি। আমাদের কি লোক সংখ্যা কম আছে, না জ্ঞানী ব্যক্তির অভাব? যেমন- আমাদের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন এসইসি পুনর্গঠনে যোগ্য লোকের অভাব (Bdnews24.com, Sat, Apr 23rd, 2011). পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এসইসিকে বদলে দেওয়ার সুপারিশ করলেও এক্ষেত্রে যোগ্য লোক খুঁজে পাচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী। মাননীয় মন্ত্রীর কথার সাথে একমত পোষণ করতে পারছিনা। আমি মনে করি আমাদের দেশে যোগ্য লোকের অভাব নেই তবে তাঁকে খুঁজে বের করে উপযুক্ত পদে বসাতে হবে। আর যদি এমন লোক না থাকে তাহলে পুঁজিবাজার বন্ধ রেখে সেই যোগ্যতম লোক খুঁজা বা তৈরী করাই আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
কিন্তু বিজ্ঞানকে বন্ধ রেখে আমরা একদিনও চলতে পারব না। সুতরাং আমাদেরকে আধুনিক প্রযুক্তির আলোকে কল্পনা করতে হবে, তৈরী করতে হবে এমন সব দক্ষ ব্যক্তি যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে আলোকিত হয়ে আলোকিত করবে বর্তমান সমাজকে, আধুনিকতায় ভরে তুলবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশকে। আমাদের যে কৃষক আজ ভিনদেশীয় কলের লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করছে তাকে ও আর সেটা করতে হবে না। কম দামে ও সহজ শর্তে আমরা কিনতে পারব আমদের সব অতি প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। তাহলেই আমরা টিকে থাকতে পারবো প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিযোগিতাপূর্ণ বর্তমান বিশ্বে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান শিক্ষার হার দিন দিন যে হারে হ্রাস পাচ্ছে তাতে বিজ্ঞান আমাদের থেকে দিন দিন আরও দূরে সরে যাচ্ছে। এভাবে জাতিকে উন্নত করা বা আলোকিত জাতি পাওয়া আদৌও সম্ভব নয়। ফলে আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা কাল্পনিকই থেকে যাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবেনা।
বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত “বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষা” নামক গবেষণা বইয়ের মতে গত আট বছরে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমার হার ৩১.৩৩%। ১৯৮৮ সালে এসএসসি পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৪১.৩৫% ছিল বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী, ১৯৯৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছিল ২৫.৪০% এবং ২০০৮ সালে ২৩.৭৬%। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি শিক্ষার্থী ছিল মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৫.৪%, ১৯৯৪ সালে ছিল ৪.৬% এবং ১৯৯৫ সালে ছিল ৩.৩%। এ হলো আমাদের দেশের বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা। প্রতিনিয়ত সর্বস্তরে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী যে কমছে সেটা গবেষণা কেন আমাদের আশে-পাশে তাকালেই দেখতে পাওয়া যাবে। এটা দিনের আলোর মত পরিস্কার যে, দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা খুবই করুণ আর এ অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করে উন্নত জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের অভিভাবক সরকারকেই এ মহান দায়িত্ব নিতে হবে। দূর করতে হবে বিজ্ঞান শিক্ষার সকল বাঁধা, উন্নত করতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এটা করতে না পারলে জাতি যে তিমিরে আছে সেখান থেকে মুক্তি পাবেনা। এ ক্ষেত্রে সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার মহামান্য প্রেসিডেন্ট Park Jeong-hee (1961 to 1979) এর মত ব্যক্তিদেরকে অনুস্মরণ করতে পারেন যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র দক্ষিণ কোরিয়াকে যার সুফল কোরিয়ান জাতি আজ ভোগ করছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যেটা বিশ্ব কবি রবীন্দনাথ ঠাকুরের ভাষায়- “আমাদের ছেলেরা বুদ্ধি ও জিজ্ঞাসা লইয়া বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিল আর বাহির হইল পঙ্গু মন এবং জ্ঞানের প্রতি বিতশ্রদ্ধা লইয়া”।
আমি গত তিনটা বছর দক্ষিণ কোরিয়াতে পিএইচডি প্রোগ্রামে লেখা-পড়া করছি। দেখেছি এদের ছেলেরা বিজ্ঞানে আমাদের মত এত ভীত না, বিশেষ করে কোন প্রাকটিক্যাল বা প্রজেক্ট ওয়ার্কে খুবই পটু। ওরা আমাদের মত বসে বসে এত থিওরি পড়ে না। যেটা আমাদের ছেলেদের পাগল বানায়ে ছাড়ে। যদিও আমাদের সিলেবাস আগের তুলনায় অনেক আধুনিক হয়েছে। আমি মনে করি বিজ্ঞান শিক্ষা আধুনিকীকরণ ও যুগপোযুগী করতে আমাদের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন-(১) স্কুল ও কলেজগুলোতে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে (২) শিক্ষা জীবন শেষে মেধাবীরা যেন শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করে সে ব্যপারে তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে (৩) স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে (৪) বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে সম্পূর্ণ উচ্চ শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে সেখানে যেন সরাসরি এমএস (MS) ও পিএইচডি (PhD) প্রোগ্রামে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে পারে (৫) দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের নূতন নূতন পদ বের করতে হবে।
বিজ্ঞানে এত পরিশ্রম করে লেখা-পড়া শেষ করার পরও যদি ভালো চাকুরী বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে কোন ছাত্রছাত্রী বা তাদের অভিভাবক বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত হবে না যা উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যায়। আর এমন করা না গেলে আশানুরূপ ফলও পাওয়া যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রে জাতি কিছুটা লাভবান হতে পারে উন্নত আধুনিক মানব দ্বারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে। এখানে চীনকে আমরা অনুস্মরণ করতে পারি, চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি সম্পদ ও সামাজিক নিশ্চয়তা বিধান মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, গত বছরের শেষ নাগাদ বিদেশে অধ্যয়নরত চীনা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১২ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বে চীন বিদেশে অধ্যায়নরত সর্বোচ্চ ছাত্রছাত্রীদের দেশে পরিণত হয়েছে (সমকাল, ৩০ এপ্রিল ২০১১)।
চীন জ্ঞান-বিজ্ঞানে বর্তমানে বিশ্বে এমন অবস্থান দখল করেছে যা থেকে ধারণা করা হয় আগামীতে তারাই বিশ্ব পরিচালনায় প্রধান হিসেবে বিবেচিত হবে। যা সম্ভব হয়েছে তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান লাভের মাধ্যমে। তাই ভীতিময় বিজ্ঞান শিক্ষা নয় পরিকল্পিত ও গঠনমূলক বিজ্ঞান শিক্ষাই হক নতুন ও আধুনিক মানব তৈরীর প্রধান হাতিয়ার।
লেখকঃ গবেষক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ ও পিএইচডি ফেলো ইনহা ইউনিভারসিটি, দক্ষিণ কোরিয়া।
taher_ru@yahoo.com
ধন্যবাদ জানাচ্ছি সুন্দর একটি লেখা আমাদেরকে উপহার দেবার জন্য। আশা করি, আমাদের সরকার উক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।
57314
২
Korea থেকে Keshab K. Adhikary লিখেছেন,
২১ মে ২০১১; রাত ১১:২৮
লেখক কে ধন্যবাদ এই সুখপাঠ্য এবং চিন্তা জাগানীয়া লেখাটির জন্যে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে বিজ্ঞান পঠন পাঠনে উপযোগী পরিবেশ তৈরী করা প্রয়োজন আগে। যেদেশে শিক্ষককূলের সিংহভাগই বিজ্ঞান মনষ্ক নন, সেদেশে এর প্রসার ঘটবে কি করে? যেদেশে সময়-অসময়ে মন্দিরে-গীর্জায় হামলা চলে, সুখে-অসুখে পীর-ফকীরের দরবারে ধর্ণা দেওয়া রেওয়াজ, ফতোয়ার নামে নির্যাতন চলে, মুক্ত বিজ্ঞান-চর্চা যেখানে অসম্ভব, ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারের কথা তো বাদ-ই দিলাম, সেখানে স্বাভাবিক বিজ্ঞান চর্চা কি সুদূরপরাহত নয়? তবুও লেখকের সুন্দর ইচ্ছে আর অদম্য উৎসাহ সবার প্রেরণা হোক সেই প্রত্যাশা রইলো।
57321
৩
জাপান থেকে ই ম তি য়া জ লিখেছেন,
২২ মে ২০১১; বিকেল ০৫:৪২
Excellent theme.... we want your continuation...do ur best
57395
৪
Incheon, South Korea থেকে Mohammad Masum Billah লিখেছেন,
২৫ মে ২০১১; বিকেল ০৪:৩২
I think we must clarify following points:
1) we must have a constant Science policy..
2) We must have research fund in our higher educational institutions.
3) we must facilitate our teachers and researchers.
I want to say one thing about china: though they have the highest number of students outside china, still their inland universities playing vital role for their poverty reduction and GDP up gradation. thanks for impressive writing.
57626
৫
রংপুর থেকে মোঃ আবু তাহের লিখেছেন,
২৫ মে ২০১১; রাত ১০:৩২
সুন্দর একটা লেখা উপহার দেওয়ার জন্য প্রথমেই আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি উৎসাহ না থাকার পিছনে যেসব কারন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ছাত্র-ছাত্রীরা যে বিষয় নিয়ে পড়বে বাস্তবে তার প্রয়োগ না থাকা। কেউ হয়তো রসায়নে পড়লো অথচ তার চাকুরী হল ব্যাংকে আবার অন্য কেউ পড়লো একাউন্টিংএ অথচ তার চাকরী হলো সাধারন কোন কোম্পানীতে।
সরকার হয়তো আপনার কোন প্রস্তাবই গ্রহণ করবে না কিন্তু এভাবে লেখা-লেখি অব্যাহত থাকলে একদিন না একদিন এই অবস্থার অবসান হবে ইনশাল্লাহ।
57651
৬
Rajshahi থেকে Md. Mayeedul Islam লিখেছেন,
২৬ মে ২০১১; সকাল ১০:৫৩
Certainly a good effort to make the government understand about the necessity of science learning. We do expect more constructive and thoughtful suggestions and continuation in writing from the author.
57678
৭
Dhaka,Bangladesh থেকে Abul Ahsan লিখেছেন,
২৯ মে ২০১১; রাত ০৯:০২
In addition, I want to say that government should increase the capacity of science related subject in the university & they should have budget for research work. In the intermediate level science student have to go to the private tutor for all subject which is so costly. So it is one of the cause which discourages poor student to study in science.
58146
৮
রাজশাহী, বাংলােদশ থেকে েমা: নূরুল ইসলাম লিখেছেন,
৩০ মে ২০১১; বিকেল ০৫:১১
Renovation of our education system is necessary. Could you, please, mention Mr. Park Jeong-Hee's contributing steps to change Korean People's mentality towards prosperity?
A very big CONGRATULATION for your eye-opening article.
58223
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: