মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৪:৫৪ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বাংলাদেশ (পর্ব-২)

মো: আরাফাত হোসেন

৫.
যুবসমাজ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি অংশ। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তাদের উপর নির্ভর করে। স্বাধীনতার পর সর্বত্র যে অরাজকতা, লুটপাট, সুযোগের সদ্ব্যবহার ও তাড়াতাড়ি অর্থলাভের সংস্কৃতি গড়ে উঠে তার প্রভাব যুবসমাজের উপর স্বাভাবিকভাবেই পড়ে। যুবসমাজ জীবিকা নির্বাহের জন্য করার সুষ্ঠ পরিবেশ না পাওয়ায় এবং তাদের সামনে কোন সঠিক রাজনৈতিক আদর্শ না থাকায় হতাশ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে চারিদিকে যে দুর্নীতি চলছিল তার কাছে থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার কোন যৌক্তিক কারণ তারা দেখতে পেল না যেহেতু সবাই এর মাধ্যমে রাতারাতি উন্নতি করছে। ধীরে ধীরে তারাও এই ব্যবস্থার অংশ হয়ে নিজেদের উন্নতি করতে থাকে। এর ফলে যুবসমাজের একটি প্রজন্মের মধ্য থেকে নৈতিকতা, সততা ইত্যাদি বিষয়গুলো চরিত্র থেকে উঠে যায়। বর্তমানে যে যুবসমাজ তারা এদেরই উত্তরসূরী। তারা পেশাজীবনে আসার আগেই কিভাবে কোন পেশায় ঢুকলে বেশী করে সুবিধা নিয়ে দ্রুত ধনী হওয়া যাবে তার হিসাব-নিকাশ করে। সবাই এখন একে স্বাভাবিক ব্যাপার হিসাবে দেখে। যে যত কৌশলে এগিয়ে যেতে পারে তাকে সবাই তত চালাক-চতুর ও আধুনিক ভাবে, এটা যে অবৈধ সে কথা কেউ উচ্চারণও করে না।

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনও নড়বড়ে এবং সব অঞ্চলের উন্নয়ন সমানভাবে না হওয়ায় জীবিকা নির্বাহের কোন সুস্থ্য ও সম্মানজনক পরিবেশ যুবসমাজ এখনও পায়নি। এখন দেশে জীবিকা নির্বাহের হাতে গোনা কয়েকটি মাধ্যমই আছে। দেশের শিক্ষিত যুবকদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক, বেসরকারী দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানী এবং সরকারী চাকরী। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় কোন উৎপাদনশীল কর্মকান্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এনজিওগুলোতে যুবকেরা সুদের ব্যবসায় জড়িত হয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে দরিদ্রলোকদের দরিদ্র রাখার প্রক্রিয়ায় অংশ এবং মাস শেষে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কিছু বেতন পায়। দেশে এখন সরকারী-বেসরকারী ব্যাংক খোলার হিড়িক চলছে ফলে এতে শিক্ষিত যুবকদের কিছু চাকরী জুটছে। কিন্তু দেশে নতুন নতুন ব্যাংক খুলছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে বলে নয় বিদেশ থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে তা জমা রাখার জন্য এবং দেশের ভেতর সৃষ্ট হওয়া নব্য কোটিপতিদের বৈধ অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য। বর্তমানে বেসরকারী ব্যাংকগুলোয় যুবকদের দিয়ে যে পরিমান কাজ করানো হয় তা এক কথায় অমানবিক। যুবকরাও আর কোন পথ না পেয়ে রোবটের মতো দিনের পর দিন কাজ করে যায়। দেশের যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে সেটা মূলত ঢাকা শহর কেন্দ্রিক। ভাগ্য ফেরানোর আশায় আসা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষিত, অশিক্ষিত লোকজন এখানে এসে আস্তানা গাঁড়ায় এবং সম্পদ আসায় অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এটি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, ফলে স্বাভাবিকভাবে দেশী-বিদেশী কোম্পানীগুলোরও গ্রাহক ধরার টার্গেট এই ঢাকা শহর। জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে আসা যুবকদের বেশীরভাগই এই কোম্পানীগুলোতে নামমাত্র টাকায় মার্কেটিং তথা মাল বেচার ক্যানভাস করে বেড়ায়। বড় যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতে কর্মরত যুবকদের বেতন, সুয়োগ-সুবিধা এবং চাকচিক্য বেশী হলেও তাদের কাজও একই। বাকী যে সুযোগটি যুবকদের সামনে খোলা থাকে সেটি হচ্ছে সরকারী চাকরী। কিন্তু চাইলেই তো সেটা পাওয়া যায় না। সাধারণ জনগণের সন্তানদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অনেক আগেই এটি চলে গেছে। যে শ্রেণীর লোকজন এখন সরকারী চাকরী পাবার আশা করে তাদের মধ্যেও এখন তুমুল প্রতিযোগিতা দরকার হলে মারা-মারি, কাটা-কাটি করতেও প্রস্তুত। সরকারী চাকরী পেতে এখন শুধু মেধা থাকলেই হয় না, সাথে থাকতে হয় ক্ষমতাবান লোকের সুপারিশ এবং সঠিক জায়গায় দেবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান টাকা। অনেক সময় তিনটি জিনিস জোটালেও কোন অলৌকিক কারণে চাকরী হয় না । আর যারা এর কোনটাই করার সুযোগ পায় না তারা নিজের পরিবার ও দেশের বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং হতাশ হয়ে জীবনে অলৌকিক কিছু ঘটার আশায় দিন গুজরান করে।

৬.
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, অর্থ উপার্জনের বৈধ ও অবৈধ পথের মধ্যে কেউ পার্থক্য করছে না। কোন সমাজের কেউই যখন ভালকে ভাল এবং খারাপকে খারাপ বলে মনে করে না তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের নৈতিক অবক্ষয় একেবারে চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছে। সবাই নিজ নিজ স্বার্থকে হাসিল করে অন্যকে সৎ ও ভাল কাজ করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু স্ব সামাজিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে এর দোষ-ত্রুটি বের করে নিজে না শুধরালে মানুষ সৎ চিন্তা করা ও সত্য বলার সাহস অর্জন করে না। অনেকে আবার মনে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য তাদের অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ কি মানুষের সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে? মানুষের নিরাপত্তা অনেক বিষয় এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের উপর নির্ভর করে। যেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই সেখানে ব্যক্তি বিশেষের নিরাপত্তার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন হতাশ হয়ে নিজের ও পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিদেশে পাড়ি দেবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। মানুষ যখন দেখছে তার জীবন যাপনের কোন পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা এদেশে নেই তখন সে দেশ ছাড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ জীবন-যাপন করে এবং যাবতীয় কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত সেই বিষয়টিই যখন নড়বড়ে অবস্থানে চলে যায় তখন দেশের প্রতি কোন মায়া না করে বিদেশে পাড়ি জমায়। দেশপ্রেম শুধু আবেগের উপর টেকেনা এর সাথে বৈষয়িক বিষয়ও জড়িত।

৭.
আমাদের প্রচলিত রাজনীতি এবং গণতন্ত্র যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং সেটা যে জনগণের আশা আকাক্সক্ষাকে প্রতিফলিত করে না সেটা দিনের আলোর মতোই সত্য। এই রাজনীতিতে সরকার ক্ষমতায় যায় নিজে সুবিধা নিতে এবং সুবিধাভোগী শ্রেণীকে আরও সুবিধা দিতে। এর সাথে জোটে বুদ্ধিজীবি নামে কিছু চামচা যারা জনগণের মাঝে সরকারের গুণগান করে। অন্যদিকে বিরোধী দলও নিজের ভাগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আন্দোলনের নামে জনগণকে জিম্মি করে সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় যায়। রাজনীতি যারা করেন তাদের মধ্যে আদর্শ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। নির্বাচনের সময় নিজের দল থেকে তারা যদি নমিনেশন না পান তাহলে রাতারাতি নিজের আদর্শ ও দলবদল করে অন্যদলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করেন। তাদের রাজনীতি করার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে কি করে ক্ষমতায় গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। দেশে যারা এখন রাজনীতি করেন তাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে তারা ক্ষমতায় গিয়ে যতটা না জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা করেন তার চেয়ে বেশী ক্ষমতা দিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা করেন। দেশে নির্বাচন করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়, তাই রাজনৈতিক দলগুলো কোটিপতি ছাড়া নির্বাচনের সময় অন্য কাউকে নমিনেশন দেয় না। যারা সত্যিকারের রাজনীতি করেন, সৎ এবং জনগণের কথা ভাবেন জনগণের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন করার সুযোগ না পাওয়ায় তারা সংসদে যেতে পারে না। আর তারা যদি কোনভাবে ভোটে দাঁড়ানও তাদের পরাজিত করার জন্য বিপক্ষ দলের লোকেরা টাকা এবং পেশীশক্তির অবাধ ব্যবহার করে। এই অবস্থা অতীতে চলেছে এখনও চলছে। নির্বাচনের মাধ্যমে যদি নিজের পছন্দমত সৎ লোককে যদি সংসদে পাঠাতেই না পারি তাহলে এই গণতন্ত্রের মূল্য কোথায়? আমাদের দেশে যে গণতন্ত্র চালু আছে তা এদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাইরের শক্তি যারা সারা বিশ্বকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় তাদের দেওয়া ফর্মুলা অনুযায়ী এই গণতন্ত্রের চলন হয়েছে আমাদের দেশে। এটি তৃণমূল থেকে উঠে না আসায় এতে অনেক ভুল-ত্রুটি রয়েছে এবং অনেকটা জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা, সাম্যের নামে সাধারণ জনগণের মগজ ধোলাই দিয়ে এই গণতন্ত্র মুষ্টিমেয় লোকদের হাতে বন্দী করে বিদেশীরা এদেশে তাদের স্বার্থ হাসিল করে চলছে আর ভোট দেবার অধিকার পেয়েছি বলে গর্বে মাটিতে আমাদের পা পড়ে না। যতদিন না গণতন্ত্র মুষ্ঠিমেয় ক্ষমতালোভী লোকদের হাত থেকে মুক্ত হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের প্রতিনিধি এবং দেশের খেটে খাওয়া মানুষের চাহিদাকে বোঝে এমন লোক গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করছে না ততদিন এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

দেশের জনগণকে শাসন করার জন্য আরেকটি পক্ষ আছে তারা হলেন বেসামরিক ও সামরিক আমলা। সরকার যেমন তাদের উপর ভর করে নিজেদের সুবিধামত কাজ করে নেয় তেমনি তারাও রাজনৈতিক সরকারকে ব্যবহার করে নিজেদের পদোন্নতি ও বৈষয়িক সুবিধা আদায় করে নেয়। সরকার বদলালেও তাদের কোন বদল নেই। স্বাধীনতার পর থেকে পালাক্রমে বেসামরিক ও সামরিক আমলা জনগণকে শাসন করে গেছে। জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও তাদের কঠোরভাবে শাসন করার ইচ্ছা পোষণ করা এই আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা এতই যে তাদের সমর্থন ছাড়া কোন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। ইংরেজরা গর্ব করে বলত ভারতেবর্ষের আমলাতন্ত্র বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং ইস্পাত কঠিন এই আমলাতন্ত্র সমগ্র ভারতবাসীকে কঠোরভাবে শাসন করার জন্য অপরিহার্য। পাকিস্তান আমলেও এটা সত্যি ছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও সেটা আরো সত্য ও বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। যে দেশে আমলাতন্ত্র যত শক্তিশালী সেই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ততই দুর্বল। আমলারা যতই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন ততই তারা জনগণ ও কাছের লোকজনের থেকে ইচ্ছা না থাকলেও দূরে সরে যেতে থাকেন তাদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে। এর ফলে তারা যে একাকীত্বে ভোগেন তার ফলাফল তাদের আচরণে বেরিয়ে আসে। ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ভূত এখনও আমাদের গণতান্ত্রিক আমলের আমলাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। রাজনীতিবিদ এবং সরকারী আমলারা যতই এক অপরের মুন্ডুপাত করুক না কেন নিজেদের স্বার্থের বিষয়ে তারা সবসময় এক এবং জনগণকে ঘৃণা ও অনুগত দাসের মত শাসন করার মানসিকতা তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আমলারা যত ভাল মানুষই হোক আর যত ভাল কাজ করুক না কেন জনগণের জন্য, তারা যদি জনগণকে শ্রদ্ধার চোখে না দেখে তাহলে তাদের সকল কর্মকান্ডই ব্যর্থ হয়ে যায়, এবং যত বড়ই মানুষ হোক না কেন তার কোন মূল্য নেই। মানুষকে মানুষ বলে গণ্য না করলে এবং তাকে শ্রদ্ধার চোখে না দেখলে তাদের জন্য মঙ্গলজনক সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। গত শতাব্দীতে আমরা দু’বার স্বাধীন হলাম কিন্তু সাধারণ জনগণ কোনবারও মুক্তি পেল না। যুগ যুগ ধরে শোষিত ও বঞ্চিত জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক কোন সরকার এবং তাদের চাহিদাকে বোঝে এমন আমলারা ক্ষমতায় না এলে দেশ আরো দু’বার স্বাধীন হলেও কোন লাভ হবে না।

৮.
শোষিত জনগণের কথা বলে সমাজতন্ত্রীরা কিন্তু তারা জনগণের কাছাকাছি কখনই যেতে পারেনি। তাদের দেওয়া তত্ত্ব জনগণের বোধগম্য হয়নি, হবেও না কারণ সেই তত্ত্ব বিদেশ থেকে ধার করা এবং দেশের পরিবেশ মানুষ, সমাজ ও ধর্মকে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বের সাথে সমন্বয় করা হয়নি। পুঁজিবাদ যেমন দেশে এসেছে সুবিধাবাদী নীতি এবং বিকৃত হয়ে সমাজতন্ত্রও এসেছে একই পথে। আমাদের দেশের সমাজতন্ত্রীরা মার্কস-এর তত্ত্বকে ধর্ম মনে করে তার অনুশাসন মেনে চলার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সমাজতন্ত্র যে একটি বিজ্ঞান ও চলমান প্রক্রিয়া এবং এটাকে যে তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে একথা তাদের খুব কমই মনে হয়েছে। ধার করা তত্ত্ব দিয়ে তাদের সব কর্মকান্ড পরিচালিত হবার ফলে তদের দেখে মনে হয় তারা যেন এদেশের কেউ নয়। জনগণের চেয়ে চিন্তা-ভাবনায় অগ্রসর ভেবে তারা জনগণের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকায়। জনগণকে আপন মনে করে তাদের সাথে মিশে গিয়ে মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান ও নিজের উপর আস্থাশীল করে তাকে নিজ ভাগ্যের নির্মাতা করার সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্রে জনগণকে দীক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। তত্ত্ব যতই ভাল ও উঁচু পর্যায়ের হোক না কেন তা যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা না হয় তখন সেই তত্ত্বের কোন মূল্যই থাকে না। অন্যদিকে ধর্ম এবং এর অনুশাসনগুলি খারাপ ইত্যাদি বলে জনগনকে এর বন্ধন থেকে মুক্ত হবার কথা বলা হলে জনগণ সেটাতেও সাড়া দেয়নি। কেননা শতশত বছর ধরে তারা যে ধর্ম পালন করে আসছে এবং ধর্মের অভিভাবকত্ব মেনে আসছে তাকে এক কথায় ঝেড়ে ফেলে দেবার কথা বলায় একে তাদের কাছ থেকে শেষ সম্বল ছিনিয়ে নেবার মত মনে হয়েছিল। ধর্ম ছাড়া জনগণ কিসের ভিত্তিতে তার সামগ্রিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাবে এটা ঠিক না করে ধর্ম ত্যাগ করার কথা জনগণের মনে যে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে সমাজতন্ত্রীরা সেটা বুঝতে পারেনি। সুবিধা নেবার জন্য ডানপন্থী দলগুলোর সাথে আপোষ করার ফলে সমাজতন্ত্রীরা আজ তাদের প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তেমন একটা হুঙ্কার ছুঁড়ে না। তাদের মধ্যে দু’একজন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীতা করেন সাম্রাজ্যবাদীদের দালালী করা কিছু কিছু প্রগতিশীল ব্যক্তিদের বেঁধে দেওয়া বুলিগুলো চাবি দেওয়া পুতুলের মতো আউড়িয়ে। তাদের কথা শুনলে মনে হয় যেন তারা সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেই এখনও অবস্থান করছেন। সাম্রাজ্যবাদ যে সময়ের সাথে সাথে নিজের বাইরের খোলস পাল্টিয়ে তার মূল চরিত্র ঠিক রেখে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে হামলে পড়ছে তারা সে বিষয়ে তেমন সজাগ নন।

অন্যদিকে ইসলামের প্রতিনিধি বলে যারা নিজেকে দাবি করে তারা জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে এবং জনগণকে তাদের ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এছাড়া তারা মধ্যযুগীয় ধ্যাণ-ধারণাগুলো চাপিয়ে দিয়ে কুরআন ও হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এগুলোকে ইসলামের অনুশাসন বলে প্রচার চালিয়েছে। জনগণও তাদের কথায় বিশ্বাস করেছে। আমাদের দেশের জনগণের একটি সমস্যা হল এরা ইসলাম বলতে আগে মধ্যপ্রাচ্যকে বুঝত পরে আঁকড়ে ধরে পাকিস্তানকে এবং এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে। কিন্তু এগুলো কোনটাই প্রকৃত ইসলামের প্রতিনিধি ছিল না। ইসলামকে বুঝার জন্য কোন দেশ বা বিশেষ কোন দলকে আদর্শ হিসেবে দেখা জরুরী নয়। জরুরী হচ্ছে কুরআন, হাদীস এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর কর্মজীবনের সঠিক ব্যাখ্যা ও তার প্রয়োগ। বাঙালী সংস্কৃতি না ইসলামের অনুশাসন মেনে চলবে এই নিয়ে জনগণ সবসময় দ্বিধায় ভুগেছে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় আসলে ইসলামের অনুশাসন এবং বাঙালী সংস্কৃতির মধ্যে বৈরী কোন সম্পর্ক নেই। বাঙালীর যে সামাজিক মূল্যবোধ তা ইসলামের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর যেটুকু সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে তা দেশের মনীষীদের চিন্তাপূর্ণ জ্ঞান দ্বারা সমন্বয় হয়নি বলে সকলের কাছে তা এখনও সংশয়ের সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেখানে ইসলামের প্রসার ঘটেছে সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিরা ইসলামের মূলভাবকে অক্ষুন্ন রেখে নিজ দেশের পরিবেশ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের সাথে যুক্তিপূর্ণভাবে সমন্বয় করে একে গ্রহণ করেছে বলে সেখানে ইসলাম নিয়ে কোন সংশয় নেই।

৯.
আমাদের দেশে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আসলেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-ভাবনা একেবারেই আসেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বিজ্ঞান শেখানো হয় তা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব একদম জাগাতে পারেনি। শিক্ষকদের কারণে তারা সেখানে বিজ্ঞানকে দেখে একটি অলৌকিক ব্যাপার হিসেবে। বিজ্ঞানকে আপন করে নিয়ে একে তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করে জীবনকে সহজ ও আধুনিকভাবে দেখার কথা তারা চিন্তাও করে না। বিজ্ঞানকে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা নিয়েছে পেশাজীবনে সাফল্যলাভ করার হাতিয়ার হিসেবে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বস্তাপঁচা বিনোদনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা নিজেদের আধুনিক মনে করছি। বৈজ্ঞানিকতা না আসায় এই প্রযুক্তিগুলোকে নিজের মনেকরে নিতে পারছি না। প্রযুক্তিকে নিজেদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের হাতিয়ার না করে উল্টো এগুলোই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। আধুনিক চিন্তা-ভাবনায় জনগণকে শিক্ষিত না করে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসার ফলাফল কখনই ভাল হয় না। বর্তমানে সরকারও দেশকে আধুনিক করার জন্য প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে এগিয়ে না গেলে এর সুফল পাওয়া যাবেনা। দেশের মানুষকে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার না ঘটিয়ে শুধু যোগযোগ ও বিনোদনের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসা ঠিক যেন গরুর গাড়ীতে রকেট ইঞ্জিন লাগানোর মতো, যার ফলে চালক ও আরোহী উভয়ই বিপদে পড়ে। মৌলিক চাহিদাগুলোকে উপেক্ষা করে মানুষের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব নয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব নিয়ে আসার কথা বলা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও তাদের বিজ্ঞাপনে দেখায় যে, আমাদের কিছু নেই তো কি হয়েছে, যোগাযোগের যন্ত্র তো আছে তাই দিয়ে আপনজনের সাথে যোগাযোগ করো, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক হও। পেটে ভাত, পড়ার জন্য কাপড় আর থাকার জন্য ঘর থাক বা না থাক। মনের ভেতর হাজার বছরের জমে থাকা কুসংস্কার এবং পশ্চাৎপদ রক্ষণশীলতা রেখে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং চাকচিক্যময় পোশাক-আশাক পড়লেই মানুষ আধুনিক হয় না। সুশিক্ষায় শিক্ষিত, কুসংস্কারমুক্ত এবং যুক্তিবাদী মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার না করেও আধুনিক হতে পারে। ভোগ্যপণ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির পণ্য তৈরি করা কোম্পানীগুলো তাদের পণ্য বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপনে লোকজনকে নগ্নভাবে আকৃষ্ট করছে যেখানে দেখানো হয় এই প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে তার জীবন বৃথা এবং সমাজে অন্যান্যদের কাছে তার কোন মূল্য নেই এবং এমন ইঙ্গিতও করা হয় দরকার হলে এর জন্য চুরি-ডাকাতি করে পয়সা আনলেও সমস্যা নেই। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিকে আমাদের বিরুদ্ধে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিগুলো সেই দেশের আর্থ-সামাজিক চাহিদাকে মাথায় রেখে তৈরি হওয়ার ফলে সেগুলো তাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডকে সহজ করেছে এবং বৈজ্ঞানিক মানসিকতায় অভ্যস্ত হওয়ায় তারা সেই প্রযুক্তির প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন। একই প্রযুক্তিকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন চাহিদা ও কাজকে সহজ করা উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে করছি ভোগ্যবস্তু এবং বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে। অপরিণত হাতে প্রযুক্তি পড়ার কারণে আমরা এগুলোর কুফলগুলোই পাচ্ছি। পাশ্চাত্যের বিনোদনের প্রযুক্তিগুলো আমাদের ভোগসর্বস্ব, অশ্লীলতা প্রিয় শ্রমবিমুখ এক নির্জীব জন্তুতে পরিণত করছে যার কোন বিষয়ে ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা নেই। বর্তমানে আমাদের মধ্যে যে ক্লান্তি, বিষন্নতা এবং অন্যান্য বিষয়ে অবসাদ এসেছে তার মূলকারণ সুস্থ্য বিনোদনের বদলে এই প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের উপর আমাদের অধিক নির্ভরশীলতা। খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার পর মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্য বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে, এটি মৌলিক চাহিদার কাছাকাছি পড়ে। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যেমন: নাচ, গান, ছবি আঁকা, বই পড়া ইত্যাদি বিষয়গুলো সুস্থ্য বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু অনেক পূর্ব থেকে শিল্পের এই মাধ্যমগুলো দেশের বাস্তব ও সামগ্রিক অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চর্চা হবার ফলে একটি নির্দিষ্ট গন্ডীর ভেতরে আবদ্ধ হয়ে উৎকর্ষ লাভের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে যার ফলাফলস্বরূপ এগুলো একঘেয়ে এবং বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়েছে আমাদের কাছে। আশঙ্কাজনক কথা হল শিল্পের এই মাধ্যমগুলো বর্তমানে আমাদের পরিবারগুলোতে চর্চা হওয়া তো দূরের কথা তার অবস্থান পর্যন্ত নেই। সবার বিনোদন আজ বন্দী হয়ে পড়েছে টেলিভিশন, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের পর্দার মধ্যে। সেখানে যা দেখানো হয় এবং যা বলা হয় তাই আমরা দেখি ও শুনি, সেখানে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে কোনকিছু চিন্তা করে বের করার কোন অবকাশ নেই। এতে আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের সৃজনশীলতা প্রায় থেমে যাবার উপক্রম হয়েছে। সুস্থ্য বিনোদনের অভাবে মানুষ স্বভাবতই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আগ্রহী হয়, এক্ষেত্রে হাতের কাছে থাকা প্রযুক্তিগুলোকেই সবাই বেছে নেয় তখন নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা এবং কোন বাধাই মানুষ গ্রাহ্য করে না। বর্তমানে আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে এই বিনোদন প্রযুক্তি আমাদের গ্রামীণ সমাজের দিকে তার থাবা বাড়িয়েছে ফলে সেখানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু করেছে।

পাশ্চাত্যে আধুনিকতা আছে কিন্তু পাশ্চাত্য মানেই আধুনিকতা এই বিষয়টি আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে সবাই আধুনিক হবার জন্য পাশ্চাত্যের যা কিছু হাতের কাছে পাচ্ছে সবকিছু আঁকড়ে ধরছে। অনুকরণ করার মধ্যে নিজের মৌলিকত্বের কোন প্রকাশ নেই। নিজের সৃজনশক্তিকে ব্যবহার না করে এই অনুকরণ ও ভোগের মানসিকতা আমাদের সমূহ বিপদ ডেকে আনছে।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MdArafatHossain
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy