মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৫:০১ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: শহীদ পরিবারের জন্য কি আমাদের কোন করণীয় নেই?

মু. হাবিবুর রহমান তারিক

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের মাঝে জাগে এক বিশেষ সাড়া। কারণ ১৯৫২ সালের এই ফেব্রুয়ারি মাসেই আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে এদেশের ছাত্র-জনতা। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলা পেয়েছে রাষ্ট্র ভাষার সম্মান। মায়ের ভাষার মর্যাদা রায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের এই মহান আত্নত্যাগের ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। তাই আমাদের ভাষা আন্দোলন পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাংলাদেশে নয়, 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পরিপালিত হচ্ছে বিশ্বের বহু দেশে। পবিত্র কুরআনের মহান রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন:

‘আমি সব রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিস্কার করে বুঝাতে পারে।’ (সূরা ইব্রাহীম:৪ )
আসমানী ফরমান হিসেবে সমকালীন মানুষের জন্য বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন দুর্বোদ্ধ ভাষায় আল্লাহ ওহী নাযিল করেননি; নাযিল করেছেন সকলের বোধগম্য ভাষায়। কুরআনের উল্লেখিত আয়াতে মাতৃভাষার গুরুত্বকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ইসলাম যেমন বর্ণ, গোত্রের ভিন্নতা বা ভৌগলিক অবস্থানের ভিন্নতার জন্য মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য স্বীকার করেনা, তেমনি ভাষার পার্থক্যের কারণেও ইসলাম মানুষে মানুষে মর্যাদার কোন পার্থক্য করেনা। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মুখ, জিহবা, মস্তিষ্ক, তালু, ঠোঁট বা অন্যান্য ধ্বনি যন্ত্রের গঠনে তেমন বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু একেকজনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একেরকম ভাষা। শুধু ভাষার ভিন্নতাই নয়, একই ভাষার মধ্যেও কত আঞ্চলিক ভাষার ছড়াছড়ি। আমাদের দেশেও কোন কোন এলাকার খাঁটি আঞ্চলিক ভাষা অন্য এলাকার লোকের পক্ষে বুঝা সম্ভবই হয়না। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রত্যেক নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কথা বলার স্টাইল, উচ্চারণভঙ্গী, স্বর সবকিছু আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাই ব্যক্তিটিকে না দেখেও তার কণ্ঠস্বর শুনেই তাকে চেনা যায়। সবার কণ্ঠস্বর এক রকম হলে কি অসুবিধাই না হত। মানুষে মানুষে ভাষা ও স্বরের এই ভিন্নতা মহান সৃষ্টিকর্তার এক অপার মহিমা। মানবজাতির জন্য স্রষ্টাকে চেনার এক অপূর্ব নিদর্শন। আল্লাহ বলেন,

‘তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (আররূম:২২)

তাই মাতৃভাষা প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের জন্য আল্লাহর রহমত। একে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতিদান তাদের নিয়তের উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তায়ালা প্রদান করবেন। আমরা দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। কিন্তু আমরা প্রতি বছর ফেব্রুয়ারী মাস এলে যেসব কর্মসূচী গ্রহণ করছি, ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করছি তা কি ভাষার জন্য প্রাণ দানকারী বীর সন্তানদের কোন কাজে লাগছে? নগ্ন পদে প্রভাত ফেরী, শহীদ মিনারের বেদীতে ফুল প্রদান, শহীদদের জন্য দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন এসব ছাড়া যেন আমাদের কিছুই করার নেই। অথচ অন্যদিকে আমরা কী দেখি?

কয়েক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের ভাষা সৈনিক রফিক এর পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার কথা। ৫ ভাই, ২ বোনের মধ্যে বড় রফিক ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা মেডিক্যালের সামনে ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে নিহত হন। তার পরিবার আজ চরম অর্থ কষ্টে দিন-যাপন করছে। তাদের বসবাসের একটিমাত্র ঘর তাও আবার একটি এনজিও-র অর্থায়নে নির্মিত। রফিকের পরিবারের এক সদস্যের মন্তব্য, "ফেব্রুয়ারী মাস এলে অনেকেই আমাদের খোঁজ নেয়। কিন্তু মাস শেষে ভুলে যায়।’’

একই বছর একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার শেষ পাতায় তিন কলাম ব্যাপী একটি শিরোণাম সম্ভবত অনেক পাঠকের দৃষ্টি এড়ায়নি। ‘‘বেঁচে থাকার অবলম্বনও নেই ভাষা সৈনিক প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের পরিবারের’’। আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারী যখন জাতীয় পর্যায় ছেড়ে ‘‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর মর্যাদা লাভ করেছে, তখনও সেই ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার, ঢাকার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মীরপুর বাংলা কলেজ এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের পরিবার দু‘মুঠো অন্য যোগাতে হিম শিম খাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মুক্তিযোদ্ধার কোঠায় অনেকে বড় বড় পদে আসীন হয়ে আজ বাড়ি, গাড়িসহ বিলাস বহুল জীবন যাপন করছে। অথচ প্রতিবেদকের ভাষায়, ‘‘দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, আবুল কাসেমের বড় ছেলে (যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রীধারী) কামরুল আহসান (ভাল একটা চাকুরির অভাবে) সন্তানদের পড়াশুনার খরচ ও ছোট একটি পরিবার চালাতে হিম শিম খাচ্ছেন।’’

শুধু মানিকগঞ্জের রফিক কিংবা মিরপুরের প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের পরিবারই নয়, ভাষা শহীদদের পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার অনেক কথা প্রায়ই মিডিয়াতে আসে। এ বছরও একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে মিডিয়াগুলোতে হয়ত নির্মিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠান-ডকুমেন্টারি, শহীদদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে অনেক প্রতিবেদন। বিশাল সাইজের ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে ছুটে চলেছে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ঝাঁকড়াচুলো ক্যামেরাম্যান আর জিন্স পরা প্রতিবেদক। তোলা হচ্ছে শহীদ পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের ছবি, রেকর্ড করা হচ্ছে তাদের সুখ-দুঃখের স্মৃতিকথা। খোঁজ নিলে হয়ত এরকম বহু ভাষা সৈনিকের কথা জানা যাবে যাদের পরিবার আজ দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে টেনে চলেছে জীবনের ঘানি।

আজ যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে ভাষা শহীদদের সম্মানার্থে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন স্যুট-কোট, টাই পরা কেতাদুরস্থ ভদ্রলোক, কোটিপতি। আজ যখন একুশের সাজানো মঞ্চে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায় বাদ্যের তালে নৃত্য-গীত পরিবেশন করে বর্ণিল সাজে সজ্জিত কপোত-কপোতি, আজ যখন একুশ এলে অভিধান খোঁজে খোঁজে খাঁটি বাংলা শব্দ দিয়ে বক্তৃতামালা তৈরী করেন কড়কড়ে পাঞ্জাবী-পাজামা পড়া বড় বড় নেতা, সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, এমপি, মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ। মিছে কথার ফুলঝুরি আর নরম কণ্ঠে ভক্তিতে গদগদ, অভিনয়পূর্ণ ভাষণ শুনে আনন্দে হাততালি দেয় হলভর্তি শ্রোতা। ফেব্রুয়ারী এলেই শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলে লোক দেখানো ফটোসেশন, মিডিয়ার মাতামাতি; মহা আড়ম্বরে শুরু হয় একুশের মেলা। যে ভাষার মর্যাদা রায় প্রাণ দিয়েছে এদেশের বীর সন্তানেরা আজ সেই রক্তাক্ত দিনকে পূঁজি করে যখন মোড়ক উম্মোচিত হয় অশ্লীল কাব্য, উপন্যাস আর গল্প গ্রন্থের, বইমেলার নামে যখন চলে যুগলদের বেহায়া শরীর প্রদর্শনীর মহড়া তখন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের বিদেহী আত্মা কতটুকু শান্তি পায় জানিনা। তবে তাদেরকে পূঁজি করে প্রতিবছর স্বার্থান্বেষীদের পকেটে মালপানি ভালই জমা হয়- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

প্রতি বছর একুশ এলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যেসব প্রোগ্রাম, আচার-অনুষ্ঠান হয়, তার কিয়দংশও যদি শহীদদের পরিবারবর্গকে দেয়া হত তাহলে হয়ত তাদের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব ঘুচে যেত। ভাবলেও অবাক হতে হয়, আজ ল ল টাকা ব্যয়ে ভাষা শহীদদের পাথুরে মূর্তি নির্মান করা হচ্ছে, অথচ সেই শহীদদের রক্তের ধারা যাদের মাঝে প্রবাহমান, শহীদরা বেঁচে থাকলে যাদের জীবিকার অবলম্বন হতেন তাদের সেই পরিবারের খবর নেয়া হচ্ছেনা।

সুতরাং সময় এসেছে নতুন করে ভাবনার। শতকরা ৯০ জন মুসলমান অধ্যুষিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ। অথচ মহান মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে বিজাতীয় সংস্কৃতি। এভাবে আর কতদিন? ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের জন্য যদি আমাদের সত্যিই কিছু করার সদিচ্ছা থাকে তাহলে বর্তমানে আমরা যে পথে চলছি সে পথে নয়। বরং আমাদের উচিৎ ভাষার জন্য জীবন দানকারী বীর সন্তানদের শাহাদাৎ কবুলের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা, তাদের নামে দান-সাদাকাহ্ করা, তাদের পরিবারের পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। তাহলেই কেবল শহীদদের আত্মা শান্তি পেতে পারে, অন্যথায় নয়।

লেখকঃ ব্যাংকার, উত্তর মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা
mhr.tarik@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MdHabiburRahmanTarique
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy