শিক্ষা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম। এটি অর্জনের সুযোগ এদেশের সকল নাগরিকের। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯(১) ধারায় সুযোগের সমতা নিশ্চিত করণে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন” আরও বলা হয়েছে, “মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন” ১৯(২)। এ তো গেল সমান সুযোগ লাভের অধিকারের কথা। অপরদিকে সকল নাগরিকের প্রতি বৈষম্য নিরোধকল্পে সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।” সর্বোপরি ২৮(৩) অনুচ্ছেদে আছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী,বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলীল যখন একথা বলে তখন সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান শ্রেণীতে ভর্তির ক্ষেত্রে যে অনৈতিক শর্ত জুড়ে দিয়েছে তা কি সংবিধানের পরিপন্থি নয়? এর ফলে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে দাখিল ও আলিম পাশ করা হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতা নিরূপণের মাপকাঠী ভর্তি প্রতিযোগিতায়ই অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করে এই সুযোগটুকু নষ্ট করা শুধু যে সংবিধান পরিপন্থি এবং মানবাধিকার লংঘন তাই নয়, বরং এটি শান্তিপূর্ণ ভাবে পরিচালিত একটি দেশকে দ’ুটি বিবাদমান দলে বিভক্ত করে দেয়ার এক ঘৃণ্য অপপ্রয়াস। আর এই অপপ্রয়াসের কারণেই দানা বেধেছে আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং সর্বোপরি মাননীয় উপাচার্যের ক ভাংচুর করা হয়েছে।
যে কোন পরিস্থিতিতে ভাংচুর এবং তৎসঙ্গে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা নিঃসন্দেহে অন্যায় কাজ। কিন্তু এর সঙ্গে এটাও দেখতে হবে যে একই নিয়মের অধীনে সরকার কর্তৃক পরিচালিত মাদ্রাসা শিাবোর্ড থেকে পাশ করা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়া অন্যায় ও অবিচার নয় কি? তদুপরি এরূপ অবিচারমূলক সিদ্ধান্ত নেয়ার পরেও তার উপর অটল থাকা এবং এর প েগণমাধ্যমগুলোর ঘৃণ্য অপপ্রচার কিসের ইঙ্গিত দেয়।? ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সাথে সাথে যারা প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করে বড় হয়ে উঠছে তাদেরকে খোঁড়া বানিয়ে দেয়ার এ অশুভ চক্রান্ত তো দেশকে ধ্বংস করার নামান্তর। বর্তমানে কয়েকটি বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজীতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০০ নম্বর করে পরীক্ষা দেয়ার যে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে তার পরিধি আগামীতে যে বাড়বে না এর নিশ্চয়তা কোথায়? অথচ মাদ্রাসা বোর্ড কর্তৃক প্রণীত সিলেবাসে বাংলা ও ইংরেজীতে একটি পত্র অর্থাৎ ১০০ নম্বর করে থাকলেও এর বিষয়বস্তু ও পরিধি ব্যাপক অর্থাৎ প্রায় ২০০ নম্বরের সমান। এটি এজন্য করা হয়েছে যে, সাধারণ বিষয়গুলোর সাথে সাথে তাদের কুরআন, হাদীস আরবী সাহিত্যসহ আরও অনেক বিষয়ে পড়াশুনা করতে হয়। এরপরেও একজন ছাত্র তো ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে তার যোগ্যতা প্রমাণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, সে তো কোনরূপ করুনা ভিক্ষা করেনা। যদিও সংবিধানে অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
অথচ যখনই এই অধিকার আদায়ের জন্য কোমলমতি ছাত্ররা সোচ্চার হয়েছে তাদেরকে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, তালেবান এবং জামায়াত, শিবির বলে গাল দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই অন্যায়কে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে এই ইচ্ছাকৃত ভুল এবং এই ঘটনাকে গণমাধ্যমগুলোর ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অশুভ তৎপরতা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অন্যায়, অবিচার, বঞ্চনা ও বৈষম্য প্রদর্শন করে বাঙ্গালী জাতিকে কেউ কখনও ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। যার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। সকল প্রকার বৈষম্য ও অপতৎপরতাকে পরাজিত করে এ জাতি ন্যায়ের পথে, সাম্যের পথে ও আলোর পথে অগ্রসর হয়েছে বারবার। আঘাত এসেছে, হোঁচট খেয়েছে কিন্তু থেমে থাকেনি তাদের আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ভর্তির ক্ষেত্রে নেয়া অযৌক্তিক ও অন্যায় শর্তসমূহও জাতিতে জাতিতে বিভেদ সৃষ্টি করার তেমনি এক অপপ্রয়াস। দেশের সচেতন জনসাধারণের এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে যাতে করে কোন প্রকার অপশক্তি এই সোনার বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে না পারে। তাই অবিলম্বে সকল প্রকার বৈষম্যমূলক নীতি পরিহার করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে অন্যায্য শর্তসমূহ তুলে নেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
লেখকঃ প্রভাষক, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইলঃ mahmud509@yahoo.com