নববইয়ের দশকটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নি:সন্দেহে আশা জাগানিয়া সময়কাল। দীর্ঘ সময়ধরে সামরিক শাসনে নিবর্তিত জনগণের আশা আকাঙ্খা রূপ পাচ্ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার সুখস্মৃতির ইতিহাস তৈরী হয় তখন। অর্ন্তবর্তী সরকারের বীজ রূপিত হয় জাতির মনোজগতে। পরবর্তীতে মাগুরা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ঘটনায় কেয়ারটেকার গভর্মেন্ট ফর্মূলার ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে ধারণাটিকে তখন গণ-আকাঙ্খায় রূপান্তর করেন। দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। কেয়ারটেকার ফর্মূলার সাফল্যের আলোচনা-পর্যালোচনার তুঙ্গমুহূর্তে তিনি এটিকে তার ‘ব্রেইন চাইল্ড’ আখ্যা দেন।
কোন মানুষই তার অর্জনকে খাটো করে দেখতে চায় না। আর যা অর্জিত হয় অনেক ত্যাগ, ঘাম আর রক্তের বিনিময়ে সেটি তো অবশই ভিন্ন মাত্রিক। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় অনেক অনেক সচেতন মানুষ। তিনি তার কোন অর্জনের ব্যাপারে উদাসীন এটা আমরা পয়েনট জিরো পারসেন্টও বিশ্বাস করতে চাইনা। বিশেষ করে কয়েক দিন আগেও তিনি কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। সেই তিনি যখন বলেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার আর কোন সুযোগ নেই, তখন অবাক না হয়ে পারা যায় না।
দেশে কী এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হল যে তিনি বিপ্রতীপ হয়ে উঠলেন। অবশ্য তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের শিরোধার্যতার কথা বলেছেন। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট তো এখন ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেনি। কবে প্রকাশ করা হবে - সপ্তাহ, মাস না বছর অতিক্রান্ত হলে তাও নিশ্চিত নয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য অবগত না হয়ে সিদ্ধান্তকর কোন বিবৃতি দেবেন তা কতটুকু যৌক্তিক, সে প্রশ্ন অবশ্যই উঠতে পারে। তা অনেক ভাবনার পথ উন্মুক্ত করবে। তিনি কি পূর্ণাঙ্গ রায়ে তার ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে চান? জনমনে সে ভাবনা তৈরী হয়েছে। তার ও মহাজোটের নেতাদের মাঝে এ ভয় কাজ করতে পারে যে নির্বাচন তার সরকারের অধীন না হলে তারা পূননির্বাচিত হতে পারবেন না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার যৌক্তিকতা তিনিই দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। অসহযোগের মত কঠিন আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সেই সময়ের বিএনপি সরকারকে বাধ্য করেছেন। তার সেই সংগ্রাম ও কেয়ারটেকার ফর্মূলা ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ।তাই এখন সুপ্রিমকোর্ট এ ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করলেই জনগণ তা বিনাপ্রশ্নে মেনে নিবে, এটা মনে করা কতটুকু বাস্তব তা ভাববার বিষয় বটে। বিগত আড়াই বছরে সরকারের পারফরমেন্সকে সামনে রাখলে ও সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠিত হওয়ার পর থেকে একের পর এক রায় প্রদানে সুপ্রিমকোর্টের তোড়জোড়ের বিষয়টি খেয়াল করলে জনগণ তা থেকে ভিন্ন বার্তা গ্রহণ করতেই পারে। সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতির ব্যর্থতা ও নৈতিকতা নিয়েও বাজারে কানাঘোষা আছে।
সুপ্রিমকোর্টের সব কথাই নৈতিকদৃষ্টিকোণ ও গণ-আকাঙ্খার নিরিখে সুপ্রিম নয়। আমাদের সুপ্রিমকোর্টসহ পৃথিবীর বহু সুপ্রিমকোর্টের এমন রায়ের নজির আছে যা গণ-আকাঙ্খার পরিপন্থি তো বটেই এমনকি দাস প্রথার মত ঘৃণ্য মানবতা বিবর্জিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে বিনাকুন্ঠ।টিক্কা খানের মত জল্লাদ প্রকৃতির লোককে শপৎ এ্যাপারেল কোর্টই দিয়েছিল। এদেশের মানুষের কন্ঠে তাই বেজে উঠেছিল বিচারপতির অবিচারের সুরসুধাময় গানের প্রতিবাদ। আওয়ামীলীগের চেয়ে বেশী তা আর কে-ই বা জানে।দেশের মালিকানা যদি জনগণের থাকে, সংবিধান যদি হয় গণ-আকাঙ্খার প্রতিফলনের নাম আর গণতন্ত্র যদি হয় জনমতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা তা হলে গণ-আকাঙ্খার রূপকার প্রধানমন্ত্রীর কথায় সুপ্রিমকোর্টের রায় নয় জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছা’ই প্রতিধ্বনিত হওয়া উচিত ।
তিনি যদি মনে করেন সংবিধান ও আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধার বহি:প্রকাশ থাকা শোভন তবে অবশ্য তা প্রশংসাযোগ্য। তবে এর মাধ্যমে তিনি কি স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, এই অবৈধ শিশুটির জন্য তিনি একদা মাঠে নেমে ছিলেন! রাজপথ কাপিয়ে তুলেছিলেন! তার ঘোর শত্রু বলে বিবেচিতদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন অনেক শভাকাঙ্খী,সুহ্রদের মতামত ও অনুরোধ উপেক্ষা করে! তা হলে তো ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার আন্দোলন – সংগ্রাম সবই অবৈধ হয়ে পড়ে। সে সরকারের অধীনে নির্বাচনে তার নির্বাচিত হওয়া, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করা এবং তারই ধরাবাহিকতায় প্রলম্বিত তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালে পূণরায় প্রধানমন্ত্রীত্ব লাভ ও তাদের সকল কাজের রেটিফিকেশন করা একইভাবে অবৈধ।
আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের যে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দলীয় সরকারের বিকল্প সন্ধানে তার মত শীর্ষ রাজনীতিককেও তাড়িত করেছিল তার কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি। প্রধান বিচারপতি কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি অনুগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচনে সেই বিষয়টিও এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত। সেই অবস্থায় কোন রাজনীতিকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা অস্বীকার করা বিশেষ করে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায়, তাকে কতটুকু গণ-আস্থার সংকটে ফেলবে তা অবশ্যি বিচার্য। জনমনে এ ভাবনা জাগ্রত হওয়া অমূলক হবেনা যে ক্ষমতায় আকড়ে থাকার স্বার্থেই এসব বলা হচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কেউ কেউ গোজামিলের ব্যবস্থা বলছেন। কেউ বলছেন এ ব্যবস্থা সংবিধান সম্মত নয়। যা বলা অপরিহার্য তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি স্বীকৃত বিষয়। এ ব্যাপারে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। বিতর্ক চলতে পারে তার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে। কিভাবে একে আরো গণতান্ত্রিক ও গ্রহণ যোগ্য করা যায় তা নিয়ে। প্রধান বিচারপতিকে এর প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত রাখা কতটুকু যৌক্তিক বা অযৌক্তিক এসব বিষয় নিয়ে। পৃথিবীর অন্যকোন দেশে এ ব্যবস্থা চালু নেই তাই আমাদেরও তার দরকার নেই-এটা কোন যুক্তি নয়। পৃথিবীতে বাংলাদেশ নামে আর কোন রাষ্ট্রও নেই। তাই বলে কি আমাদের রাষ্ট্র থাকবে না? রাজনীতি করার অধিকার থাকবে না? এ দেশের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যায়ন আমাদের রাজনীতিকদেরই করতে হবে। কারণ তাদের দুর্দিনে জনগণ তাদের পাশে দাঁড়ায় অন্য কেউ না।
বলা হচ্ছে, অবৈধ বোঝার দায় সরকার এককভাবে নিতে চায় না। বিএনপি চাইলে সংসদে এসে তা বলুক। বিএনপি তো আগেও তা চায় নাই। এখনকার সরকারের মত তারাও তখন চেয়েছিল পরবর্তী সংসদ নির্বাচন তাদের সরকারের অধীনেই হউক। বিএনপি কে তখন বাধ্য করা হয়েছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আজকের অবৈধ ব্রেইন চাইল্ডটিকে প্রসব করতে। এ ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য এত প্রয়োজনীয় ছিল যে ১৫ই ফেব্রুয়ারির ভূয়া নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্টে এক রাতে প্রসূত ত্রুটিযুক্ত জাতককে মেনে নিয়েছিল কোনরূপ বিচার বিবেচনা ছাড়াই। যার তিক্তফল পরে জাতিকে আস্বাদন করতে হয়েছে এবং এখনও করতে হচ্ছে। যাদের আত্মদান ও রক্তের বিনিময়ে এ ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল তাদের সে ঋণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার কিভাবে অস্বীকার করবেন?
ক্ষমতায় কে আসল আওয়ামীলীগ না বিএনপি সাধারন জনগণের কাছে সেটা মূখ্য বিষয় নয়। জনগণ চায় শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ উপায়ে নিখাদ গণ রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আরোহন এবং মেয়াদ শেষে তাদের মতের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ক্ষমতা হস্তান্তর। জনগণ চায় তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। পাওয়ার ষ্ট্রাগলের কাজিয়ায় দেশ ও জনগণের কোন কল্যাণ নিহিত না। পজিশনে কি অপজিশনে সর্বাবস্থায় রাজনীতিকগণ ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে গণ-আকাঙ্খার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন এটাই বিনীত প্রত্যাশা।