|
না পাওয়ার বেদনা
মো. ওমর ফারুক |
|
কণা জয়কে আদর করে জানু বলে ডাকত আর জয়ও কণাকে আদর করে জান বলে ডাকত। এইতো ক’দিন আগের কথা, তাদের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা গড়ে উঠেছিল অল্প সময়ের ব্যবধানে। তবে এই ভালবাসা যে একতরফা কিছুটা ছিল তা বললেও অসত্য হবে না। কারণ কণার ভালবাসার পাল্লা ভারী ছিল এবং তা ছিল অনেক খাঁটি ও বিশুদ্ধ। জয়েরও যে পাল্লা কম ছিল বা তা যে খাঁটি ও বিশুদ্ধ ছিল না সে কথা আমি বলছি না। তবে প্রথম দিকে খুব বেশি না থাকলেও শেষের দিকে তার ভালবাসার কমতি ছিল না। যাইহোক একদিন কণা জয়কে ফোন করে বলে ভাইয়া আমার তো কোন বড় ভাই নেই যে আমি তার কাছে পড়াশোনার ব্যাপারে পরামর্শ নেব। আপনি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর আমিও সেখানে ভর্তি হতে চাই। এজন্য আমার কিছু দিকনির্দশনা দরকার তাই আপনাকে বড় ভাই হিসাবে মাঝে-মাঝে ফোন দিয়ে বিরক্ত করব কিন্তু । সে বলল ঠিক আছে কোন সমস্যা নেই। তখন থেকে শুরু হল তাদের প্রেম-ভালবাসা কাহিনী।
প্রথম দিকে কিছু দিন চললো পড়াশোনার কথা, তারপর ব্যক্তিগত খোঁজখবর, এরপর পারিবারিক খোঁজখবর। এভাবে কিছু দিন চলার পর তাদের মাঝে ভাললাগা থেকে ভালবাসার জন্ম হয়। এরপর প্রেম নামের কঠিন রোগ তাদের উপর সওয়ার হয়। এখানে একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার যে, কণার মা তাদের সম্পর্কের কথা জানত। কণাও তার মায়ের কাছে সব কিছু খুলে বলতো। আর মা তার একমাত্র আদরের মেয়ের জন্য সবকিছু করতে রাজি, তাই মা তাদের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি। তবে মা তাকে একটি কথা বলেছিল যে, এমন কিছু করিসনি যাতে তুই কষ্ট পাছ। কণা মাকে বলে আমি যাকে ভালবাসি আর আমাকে যে ভালবাসবে আমি তাকে পরবর্তীতে বিয়ে করব। কণা ছিল অনেক চালাক এবং বুদ্ধিমতি, তাই সে প্রেম পীরিতের শুরতেই বিয়ের প্রসঙ্গটি টেনে আনে। কিন্তু জয় তা আমলে নেননি কেননা সবে মাত্র তাদের প্রেমের হাতে খড়ি, তাই এখনই এ প্রসঙ্গটি আনা সমীচীন মনে করেনি। শুরুতেই তাদের প্রেম নামক রেল গাড়ীতে ধাক্কা লাগে অথ্যাৎ তাদের মধ্যে একটু মনোমালিন্য হয়। কিন্তু তাই বলে কি তাদের গাড়ী থেমে গেছে, না থামেনি বরং গাড়ী তার নিজস্ব গতিতে চলছে।
তবে তাদের প্রেম-ভালবাসা গতানুগতিক কোন প্রেম-ভালবাসা ছিল না। যাইহোক কণা স্বভাবতই একটু রাগী ছিল, তাই মাঝে মাঝে একটু বেশি রাগ করত। কিন্তু তার আমল-আখলাক ও পারিপার্শিক অন্যান্য বিষয় অনেক ভাল ছিল। কণা তাকে এত বেশি ভালবাসত যে, তার সাথে কথা না বলে বা খোঁজখবর না নিয়ে একমূহূর্ত থাকতে পারতো না। কোন কারণে ফোন রিসিভ করতে না পারলে অনেক রাগ করত ও বকা দিত। কিন্তু জয়েরও অনেক বাস্তবতার কারণে সবসময় কথা বলার সুযোগ হতনা। তাই এ বিষয় নিয়ে তাদের মাঝে মাঝে মনোমানিল্য হত। যাইহোক এভাবে চলতে থাকে তাদের প্রেমের গাড়ী। কিন্তু সমস্যা হল কণা একপর্যায় জয়কে সন্দেহ করতে শুরু করে যে, সে অন্য কোন মেয়ের সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু তার ধারনা ভুল ছিল, অতএব কণা বিয়ের বিষয় খুব চাপ সৃষ্টি করে যাতে সে অন্য কারও না হয়। আর বলে আপনাকে হারানোর ভয় আমাকে সব সময় তাড়া করে। আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচবো না। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন, কারণ ছেলেটির এখনো পড়া-লেখা শেষ হয়নি। তাছাড়া পারিবারিক অনেক সমস্যা আছে বলে বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সে বোঝে না, তার কথা আমরা গোপনে বিয়ে করব কেউ জানতে পারবে না। ছেলেটি গোপনে বিয়ে করার পক্ষপাতিত্ব নয়। কারণ তার পরিবারে ও সমাজে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা ছিল । যদি কখনো কেউ জেনে যায় তাহলে তার মান সম্মানের বিষয় জড়িত, তাই এ ভয়ে গোপনে বিয়ে করতে নারাজ। আরেকটি অন্যতম কারণ হল তার চাচাতো ভাইয়েরা ইতিপূর্বে প্রেম করে গোপনে বিয়ে করেছিল। এতে তাদের পিতা-মাতা
কষ্ট পায়, যদি সেও তাদের মত গোপনে বিয়ে করে তাহলে তার ও তার চাচাতো ভাইয়েরা মধ্যে পার্থক্য কি থাকলো। তাকে তো সবাই অন্য চোখে দেখে, আদর করে ও সম্মান করে। এই ভয়টা তাকে সব সময় তাড়া করে। আর এ জন্য তার কথা আমলে নেইনি। তাছাড়া আর কি বা কারণ থাকতে পারে। এমন সুন্দরী মেয়ে,সম্ভ্রান্ত ঘরের একমাত্র আদরের কন্যা, তা আবার বেকার অবস্থায় বিয়ের প্রস্তাব, কোন যুবকের পক্ষে এই লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখান করা দুষ্কর। যাইহোক জয় সুদুর প্রসারী চিন্তা করে এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেই, আর তাকে বলে সময় হলে ও পরিবেশ পরিস্থিতি র্সষ্টি হলে সবই হবে একটু ধৈর্য্য ধর। সে বলে ঠিক আছে, তাহলে একটা শর্ত আছে আমাকে কথা দিতে হবে, আপনি আমাকে বিয়ে করবেন আর এক বছর পর আপনি আপনার পরিবার কে রাজি করে নিয়ে আমার পিতা –মাতার সাথে কথা বলতে হবে । তখন জয় চিন্তায় পরে যায় । কারণ তার পরিবার যদি না মানে তাহলে তার পক্ষে বিয়ে করা দুষ্কর । আর তাকে যদি কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারি তাহলে কণার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে । তার পিতা যেহেতু তাদের সর্ম্পক জানে না ত্ইা বিভিন্ন জায়গা হতে বিয়ের প্রস্তাব আসায় বিয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় বাসায় । মা যেহেতু কণার বিষয় জানত তাই এমন আলোচনা মা এড়িয়ে যেত। কিন্তু ভয় হয় পিতা কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা পরিবর্তন করা অসম্ভব । আর কণাই শুধু নয় বাসার সবায় তাকে ভয় করতো । এই জন্য কণার মা জয়কে ফোন দিয়ে বলে আ্মি যেহেতু আমার মেয়ের ভাল চাই, তাই তার সুখের জন্য আমি সব কিছু করতে রাজি ।
আমি মনে করি তোমার হাতে কণাকে তুলে দিলে সে সুখী হবে । তুমি যদি কথা দাও ও তোমার পরিবারকে রাজি করে নিয়ে আসতে পারো তাহলে যতদিন ইচ্ছা তোমার জন্য আমার মেয়েকে রেখে দিতে রাজি । আর যদি না পারো তাহলে বল তাকে আমাদের পছন্দে বিয়ে দিয়ে দেব। কারণ তার বিয়ের বয়স হয়েছে এবং অনেক ভাল জায়গায় হতে প্রস্তাব আসছে । জয় কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে যায়, সে হ্যাঁও করতে পারছে না আবার নাও করতে পারছে না । এভাবে কিছু দিন অতিবাহিত হলে কণা তাকে ফোন দিয়ে ভিরু, কাপুরুষ ইত্যাদি নানা ভাষায় গালা-গালি করে এবং তাদের মধ্যে অনেক রাগা-রাগী ও কথা কাটা-কাটি হয়। তারপর সে তার ফোন বন্ধ করে এবং সিম ভেঙ্গে ফেলে। অনেকদিন তাদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এরমধ্যে তার বিয়ের প্রস্তাব আসে । পাত্র একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, কণাকে দেখার পর তাদের পছন্দ হয়ে যায়। কিন্তু কণা এমূহুর্তে বিয়ে করবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেয়। তারপর মায়ের সাথে রাগ করে বাসায় থাকবেনা বলে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে মেসে চলে যায়। এমতাবস্তায় হঠাৎ মা জয়কে ফোন দিয়ে ঘটনাটি বলে।আর বলে বাবা তুমি একটা কিছু কর। তখন সে মাকে বলল ঠিক আছে আমি আগামী সপ্তাহে বাড়ি যাব এবং বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব। কথানুসারে সে বাড়ি গেল, আলাপ-আলোচনা করল এবং বাসার সবায় ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করল। কিন্তু ভাগ্যের নিমর্ম পরিহাস, কণার মা তাকে ফোন করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে তার মেয়ে আর বেঁচে নাই। এ খবর শোনার পর জয় অনেক কষ্ট পায়। তারপর সে নিজেকে সব সময় দোষী মনে করত। যখন তার কথা মনে পরতো তখন চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারতো না। আর বলত হায়! আমার ভুলের কারনে ফুলের মত একটি জীবন নষ্ট হয়ে গেল। তখন ড. কাজী নুরুল ইসলাম সারের একটি গল্প মনে পড়ে গেল । তিনি আমাদের ক্লাসে বলেছিলেন, দর্শন বিভাগের একটি মেয়ে ও একটি ছেলে পরস্পর পরস্পরকে খুব ভালবাসত। কিন্তু কেউ কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি। এভাবে অনেকদিন যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন
মেয়েটি ছেলেকে ফোন করে তার বিয়ের দাওয়াত দেয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর ছেলেটি মেয়েকে বলে : ও খড়াব ণড়ঁ অথ্যাৎ আমি তোমাকে ভালবাসি। তখন মেয়েটি প্রতিত্তরে বলে, এখন আর বলে কি লাভ সময় যে আর নেই। তখন ছেলেটি অনেক কষ্ট পায়। আলোচ্য গল্পটি ঠিক কাজী স্যারের গল্পের অনুরুপ।
বি:দ্র: উপরোক্ত গল্পটি বাস্তব ও সত্য। আমার বন্ধু জয় যখন আমার কাছে আবেগাফ্লুত হয়ে তার জীবনে “না পাওয়ার বেদনার” কথা বর্ণনা করল, ঠিক তখনই কাজী স্যারের গল্প মনে পরে যায়। তাই আমি এটা প্রত্রিকায় প্রকাশ করার চিন্তা করি এবং এখান থেকে একটি মেসেজ দিতে চাই - শোন হে মন, সখ করে কেউ প্রেম কর না। প্রেম যে কাঁঠালের আঠা, লাগলেতো আর ছারে না।
লেখকঃ বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MdOmarFaruk |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|