পলাশী ট্র্যাজেডি ও আজকের বাংলাদেশঃ একটি নির্মোহ পর্যালোচনা
মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন (বাবু)
ভূমিকাঃ
পলাশী ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছিল ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশী যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ও যুদ্ধের ব্যাপকতার দিক দিয়ে বিচার করলে একে বৃহত্তর যুদ্ধের পর্যায়ভুক্ত করা যায় না। যেমনটি মেলিসন (Melleson) বলেছেন “Plessy, though, decisive can never be considered a great battle”; কিন্তু তাৎপর্য ও গুরুত্বের দিক থেকে পলাশী ট্র্যাজেডি ছিল বাংলার স্বাধীন স্ব-শাসনের অবসান এবং দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন ও গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হবার প্রধান কেন্দ্র বিন্দু (Pivot)।
যে কোন ঘটনা বা ট্র্যাজেডির-ই একটা ইফেক্ট (Effect) থাকে সত্য, কিন্তু সে ঘটনা বা ট্র্যাজেডি অকস্মাৎ কিংবা আপনা আপনি ঘটেনা। কতগুলো যোগাযোগ, লেনদেন (Transaction) এবং ঘটনাপ্রবাহের অনিবার্য পরিণতিতেই সেই ঘটনা বা ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়। পলাশী ট্র্যাজেডিও এর ব্যতিক্রম নয়। পলাশী ট্র্যাজেডি হল ক্ষমতা লিপ্সা, ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, যোগসাজেস এবং বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার ক্রনোলজিক্যাল দীর্ঘসূত্রিতার এক অনিবার্য ফল। একে ঠেকানোর কোন উপায় ছিলনা। অধিকন্তু, এহেন দীর্ঘসূত্রিকাকে কোন সুক্ষ্ম অংশেই অস্বীকার করার উপায় নেই। পলাশী ট্র্যাজেডি শুধুমাত্র বাংলা, বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশের জন্য যতটুকু তাৎপর্য বহন করে তার চেয়ে বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এতদঅঞ্চলের মুসলিম সমাজের জন্য। কেননা পলাশী ট্র্যাজেডির মাধ্যমে বাংলার মুসলিম শাসনের অবসান হয়। তাই এতদঅঞ্চলের মুসলমানদের পশ্চাদপদতা এবং অনগ্রসরতার জন্য পলাশী ট্র্যাজেডি বহুলাংশেই দায়ী।
পলাশী ট্র্যাজেডির জন্য কারা দায়ীঃ
কি ঘটেছিল পলাশীর সেই কয়েকঘন্টার ছোট্ট ঘটনাপ্রবাহে যার পরিণতি এত ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ? পলাশী ট্র্যাজেডির জন্য মূলতঃ দায়ী কারা? এটা সত্য যে, যে সব বিশ্বাসঘাতকরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করেছে তাদের একজন এবং অন্যতম হল মীরজাফর। কিন্তু কতিপয় ঐতিহাসিকের পলাশী ট্র্যাজেডির ইতিহাস রচনায় একচেটিয়াভাবে মীরজাফরকেই একমাত্র ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করা হয়। আর এ কারণেই সম্ভবতঃ আমাদের সমাজে মীর জাফর মানে ‘বিশ্বাসঘাতক’, এমনই একটা গালি সূচক অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসলেই কি তাই? মীর জাফরই কি একমাত্র বিশ্বাসঘাতক? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য পলাশী ট্র্যাজেডির পূর্বেকার ঘটনাপ্রবাহের সামান্য পোষ্টমর্টেমের প্রয়োজন হবে।
বিশ্বাসঘাতকতা, জালিয়াতি, স্বার্থপরতা ও দেশদ্রোহীতার এক অতি নীচ ও জঘন্য ষড়যন্ত্রের সাহায্যে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মসনচ্যুত করার চেষ্টা চালানো হয়। এসব ষড়যন্ত্রের প্রতিষ্ঠানিক আঞ্জাম দেয়া হয় ইংরেজদের ‘সিলেক্ট কমিটি’র মাধ্যমে। ষড়যন্ত্রকারীদের পূর্ণ প্রস্তুতি সস্পন্ন হবার পর কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী রবার্ট ক্লাইভ সামান্য অজুহাত দেখিয়ে ১৩ জন নবাবের বিরুদ্ধে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে যাত্রা করেন। ১৯ জুন ক্লাইভ কটোয়া পৌছান। কিন্তু মীরজাফরের নিকট থেকে কোন নিশ্চয়তা না পেয়ে সেখানে অবস্থান করেন। ২২ জুন বিকালে ক্লাইভ মীরজাফরের বহু প্রতিক্ষীত চিঠি পেলেন এবং সে চিঠিতে মীরজাফর ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশী উৎসাহ দেখালেন। চিঠি পেয়েই ক্লাইভ পলাশী অভিমুখে রওনা হলেন। ইতিমধ্যেই নবাবও ষড়যন্ত্রের কথা জ্ঞাত হয়ে সসৈন্যে পলাশীতে ইংরেজদের মোকাবেলায় প্রস্তুত হন।
মীরজাফর কেন এত দেরীতে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেন? কারা ছিল ষড়যন্ত্রের মূল হোতা? এসব বিষয় একটু খতিয়ে দেখা দরকার।
নবাব হবার পর সিরাজদউদ্দৌলা প্রয়াত নবাব আলিবর্দীখানের ভগ্নীপতি ও বাংলার ‘সিপাহসালার’ মীরজাফর এবং দিওয়ান রায়দুর্লভকে পদচ্যুত করেন। জগৎশেঠ নবাবের কোন রাজকর্মচারী নয়; তিনি ছিলেন তৎকালীন বাংলার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। মুর্শিদকুলী খানের নেক নজর ও ছত্রছায়ায় থেকে জগৎশেঠ বাংলায় একচেটিয়া ব্যবসা কায়েম করেন এবং তখন থেকেই নবাব মহলে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। উমিচাঁদ ছিলেন মাড়োয়ারীর ব্যবসায়ী এবং জগৎশেঠের অন্যতম সহযোগী এবং নবাবের বিশ্বস্ত একজন। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য সিরাজউদ্দৌলা এ দুজনকে প্রকাশ্যে তিরষ্কার করেন। এভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে জগৎশেঠ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করে। কেননা তরুণ নবাবের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জগৎশেঠ গংদের ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার কষ্টকরই ছিল বটে।
কতিপয় ইতিহাসবিদদের রচনায় মীরজাফরকেই একমাত্র বিশ্বাসঘাতক ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিত্রিত করা হলেও ঘটনাপ্রবাহের চুলচেরা বিশ্লেষণে পলাশী ট্র্যাজেডির ষড়যন্ত্রে এদেশীয় ষড়যন্ত্রীকারীদের মধ্যে মীরজাফরের চাইতেও জগৎশেঠদের ভূমিকা সবচাইতে ভয়াবহ ও জঘন্য প্রতীয়মান হয়।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মঁসিয়ে জ্যাঁ ল লিখেছেন-
“আমি ভাল করেই জানি যে, বাংলায় এ ঘটনার পিছনে মূল প্রেরণা জগৎশেঠদের। ইংরেজরা যা করেছে তাদের সমর্থন ছাড়া তা করতে তারা কখনো ভরসা পেতনা।”
তিনি আরো লিখেছেন-
“অনেক দিন ধরে বাংলায় যেসব রাজনৈতিক বিপ্লব হয়েছে তার প্রধান হোতা ছিল জগৎশেঠরা।”
১৭৫৭ সালের ৩০ এপ্রিল ক্লাইভ তার চিঠিতে লিখেছেন-
“কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এ চক্রান্তের নেপথ্যে থাকলেও আসল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জগৎশেঠ নিজেই।”
ক্লাইভ আরো লিখেছেন-
“যেহেতু জগৎশেঠ তিনটি সুবার মধ্যে সবচেয়ে বেশী ধনসম্পত্তির মালিক এবং সবচেয়ে বেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি, এবং যেহেতু মোঘল দরবারেও তার যথেষ্ট প্রতিপত্তি, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় নবাবের সঙ্গে ব্যাপারগুলো নিষ্পত্তির জন্য তাকেই যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।”
জগৎশেঠের জীবন চরিতে বিশ্বাসঘাতকতা আর ষড়যন্ত্রের গুণাবলী ফুটে উঠে নিম্নোক্ত ঘটনাগুলোর মাধ্যমেঃ
১। জগৎশেঠ মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুশয্যার পাশে বসেই নবাবের জামাতা সুজাউদ্দিনকে দিয়ে মুর্শিদবাদ আক্রমন করান এবং নবাবী মসনদ দখল করতে সাহায্য করেন।
২। নবাব সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র সরফরাজ খাঁ’র নবাব হবার কথা থাকলেও জগৎশেঠের বিশ্বাসঘাতকতায় আলিবর্দী খাঁ’র সাথে যুদ্ধে সরফরাজ খাঁ নিহত হন এবং আলিবর্দী খাঁ নবাব হন। জগৎশেঠও আলিবর্দী খাঁ’র বিশ্বাসভাজন হন।
৩। আলীবর্র্দী খাঁর আমলে যতবারই তিনি ইংরেজদের দৌরাত্ম দমনের উদ্যোগ নিয়েছেন ততবারই জগৎশেঠ মধ্যস্থতা করে মিটিয়ে দিয়ে ইংরেজদের শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন।
৪। সিরাজউদ্দৌলার মসনদে আরোহনের পর তাঁর বিরুদ্ধে খালা ঘসেটি বেগমের ষড়যন্ত্রের পেছনেও ছিল জগৎশেঠের প্রত্যক্ষ মদদ।
৫। ১৭৫৭ সালের ১৯ মে পলাশী ষড়যন্ত্রের চুড়ান্ত বৈঠকটি হয়েছিল জগৎশেঠের-ই গৃহে। ইংরেজ দূত মিঃ ওয়াটসন স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশে পালকিতে চড়ে সেখানে উপস্থিত হন। ওয়াটসন বলেছিলেন- ‘সিরাজের সাথে লড়তে যে প্রস্তুতি এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন বর্তমানে তা তাদের নেই’। জগৎশেঠই সেদিন ইংরেজদের আস্বস্থ করে বলেছিল যত টাকা প্রয়োজন আমি দেব। ঐ সভাতেই সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাত করার চুড়ান্ত চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। এতে সর্বপ্রথম স্বাক্ষর করেন জগৎশেঠ। এরপর একে একে উর্মিচাঁদ, রায়দূর্লভ, রাজবল্লভ তাতে স্বাক্ষর করেন। মীরজাফর সেদিন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেননি। পরে যখন দেখলেন তার বদলে ইয়ার লতিফ খানকে নবাব বানানো হবে তখন নবাব হবার লোভে মীরজাফর ৫ জুন তাতে স্বাক্ষর করেন। ষড়যন্ত্রের চুড়ান্ত নীলনকশা এখানেই প্রণীত হয়।
৬। এছাড়াও নবাব হবার পরে মীর জাফর স্বীয় অপরাধ উপলব্ধি করে ১৭৫৮ সালে ওলন্দাজদের সাহায্যে ইংরেজদের দেশছাড়া করার এক কর্মসূচী গ্রহণ করে। বেঈমান জগৎশেঠ সেই পরিকল্পনার কথাও ইংরেজদের জানিয়ে দেয়।
সুতরাং সন্দেহতীতভাবে বলা যায়, পলাশী চক্রান্তের মূল নায়ক জগৎশেঠরা; মীরজাফর নয়।
সাম্প্রদায়িক বিভক্তি এবং ইংরেজদের অভিসন্ধিঃ
পলাশী ট্র্যাজেডির হেতু ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতালিপ্সা, প্রতারণা, যোগসাজেস প্রভৃতির জন্য নবাবের প্রতি কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির অসন্তোষকে নির্দেশ করা হলেও তৎকালীন বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিভক্তি তার চাইতেও বড় কারণ হিসেবে অনেকে মনে করছেন। কেননা জগৎশেঠ গংদের দীর্ঘ বিশ্বাসঘাতকতার চর্চায় এ গ্রাউন্ডকে উড়িয়ে দেবার কোন অবকাশ নেই।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিক জ্যাঁ ল এবং স্কট এর উদ্ধৃতি দিয়ে এস.সি.হিল উল্লেখ করেছেন-
“পলাশী যুদ্ধের আগে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলমান শাসনে অতিষ্ট হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা মুসলমান নবাবের শাসনাবসান কামনা করছিল।”
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তপন মোহন ভট্টাচার্য তাঁর ‘পলাশী যুদ্ধ’ বইতে লিখেছেন- “ষড়যন্ত্রটা আসলে হিন্দুদেরই ষড়যন্ত্র।”
স্যার যদুনাথ সরকার লিখেছেন, “মূলত হিন্দুরাই মুসলমান শাসনের পরিবর্তন চাইছিল।”
এতদস্বত্ত্বেও পলাশী যুদ্ধে নবাবের দুজন বিশ্বাসভাজন হিন্দু সেনাপতি মোহনলাল ও মীর মদনের নবাবের পক্ষে বীর বিক্রমে আমৃত্যু যুদ্ধ করাটা প্রাক পলাশী বাঙ্গালী সমাজ হিন্দু ও মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিবিভক্ত-একথাকে বিশ্বাস করায় না। অধিকস্তু আলিবর্দী খাঁ এবং সিরাজউদ্দৌলার সময় অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদার হিন্দু ছিল। মুর্শিদকুলী খাঁ-ই মুসলমান জমিদার ও দিওয়ানদের সরিয়ে হিন্দুদের এসব পদে বসিয়েছেন। বলার অপক্ষো রাখেন যে, মুর্শিদকুলী খাঁর জন্ম এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে। ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমের তালিকায় দেখা যায় ১৭৫৪ সালে দিওয়ান, তন-দিওয়ান, সাব-দিওয়ান, বকশী প্রভৃতি সাতটি গুরুত্বপূর্ন পদের মধ্যে মীরজাফর ছাড়া বাকী ছয়ঠি পদই হিন্দুরা অলংকৃত করেছেন। আবার ১৯ জন বড় জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই ছিল হিন্দু।
রবার্ট ওরম মন্তব্য করেন-
“The gentoo (Hindu) connection become the most opulent influence in his (Alibardi`s) government, of which it pervaded every department with much efficacy, that nothing of moment could move without their participation or knowledge.”
সুতরাং হিন্দুদের এহেন প্রাধান্যতায় পলাশীর ষড়যন্ত্র তাদের পক্ষে করাটা সহজ ও স্বাভাবিক ছিল বটে। কেননা ষড়যন্ত্রের শুরুতে মীরজাফরের অংশগ্রহণ ছিলনা। মীরজাফর কেবলমাত্র নবাব হবার লোভে ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছিল।
ঐতিহাসিক ব্রিজেন গুপ্ত উল্লেখ করেছেন-
“ হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণীর স্বার্থ ইউরোপীয় কোম্পানীগুলোর স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।”
একইভাবে বেইলী উল্লেখ করেন-
“হিন্দু ব্যবসায়ী ও জমিদারদের স্বার্থ ইউরোপীয়দের ভাগ্যের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে, কলকাতা থেকে ইংরেজদের তাড়ানোর ব্যাপারটি তারা সহ্য করতে পারছিলনা এবং সেজন্যই পলাশীর ঘটনাটা ঘটল।”
আর এটা উল্লেখ করার অবকাশ আছে যে, তৎকালীন বাংলায় ব্যবসায় বাণিজ্য ও জমিদারীতে একচেটিয়া কতৃত্ব ছিল জগৎশেঠ, উমিচাঁদ গংদের মত প্রভাবশালী হিন্দুদের হাতে।
ক্লাইভ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন “সেদিন (পলাশীর যুদ্ধে) স্থানীয় আদিবাসীরা ইংরেজদের প্রতিরোধ করতে চাইলেই লাঠিসোটা আর হাতের ইট পাটকেল মেরেই তাদের খতম করে দিতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি।”
তাহলে কি এটা বলা যায় না যে, সেদিন পলাশীর সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থানীয় আদিবাসিরা (হিন্দুরা) নবাবের পতন ও ইংরেজদের বিজয় কামনা করেছিল? প্রশ্ন আসতে পারে যে, হিন্দুরা কি নবাবী মসনদ দখল করতে পারত না? এর উত্তর হল, তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশের কোন রাজ্যই হিন্দুদের শাসনাধীন ছিল না। তাই তারা মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠার সাহস দেখানোর চাইতেও ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা করাকেই অধিকতর শ্রেয় মনে করে।
কিছু কিছু ঐতিহাসিকদের বক্তব্য হচ্ছে পলাশী সম্বন্ধে ইংরেজদের কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিলনা। এ চক্রান্তের উদ্ভব বা বিকাশে ইংরেজদের কোন ভূমিকাই নেই, বরং মুর্শিদাবাদ দরবারের অন্তর্দ্বন্দ্বই ইংরেজদের অনিবার্যভাবে বাংলার রাজনীতিতে টেনে এনেছিল। কিন্তু এহেন বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। এহেন বক্তব্যের মাধ্যমে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগন ইংরেজদের দোষস্থলনের অপচেষ্টা করেছেন মাত্র। কারণ, শাসকের প্রতি একশ্রেণীর ব্যক্তিদের অসন্তোষ, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা যে কোন শাসনব্যবস্থারই একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনা। ইংরেজদের সুদূরপ্রসারী দুরভিসন্ধি না থাকলে এরূপ ঘটনায় শাসকের পরিবর্তন হত মাত্র, শাসনের নয়। কিন্তু পলাশী ট্র্যাজেডির পরিণতি হল বাংলায় একজন পুতুল নবাব বসিয়ে ইংরেজদের শাসন ও কর্তৃত্ব কায়েম হওয়া।
মঁসিয়ে জ্যাঁ ল স্পষ্ট করে বলেছেন- “ইংরেজরা নবাবের প্রতি বিরূপতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং বুদ্ধিমানের মত ঠিক জায়গায় টাকা ছিটিয়ে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাত করেছিল।”
বস্তুতঃ পোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিল কর্তৃক ক্লাইভ ও ওয়াট্সনের নেতৃত্বে বাংলায় সৈন্যদল পাঠাবার সময় যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তার মধ্যেই (১৩ অক্টোবর ১৭৫৬) ইংরেজদের সুদূরপ্রসারী অভিসন্ধি প্রতীয়মান হয়। নির্দেশনায় বলা হয় “শুধুমাত্র কলকাতা পুনরুদ্ধার এবং যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায় অভিযাত্রীদলের উদ্দেশ্যে হবে না, বরং বাংলায় নবাবের অত্যাচারে বিক্ষুব্ধ বা নবাব হবার মত উচ্চভিলাষী কোন শক্তি গোষ্ঠীর সাথে তারা যেন আঁতাত করার চেষ্টা করে।”
ক্লাইভ তার পিতাকে লেখা চিঠিতে লিখেছেন- “বাংলায় এ অভিযান সার্থক হলে আমি বিরাট কিছু করতে পারব।”
এছাড়া ফরাসীদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের ক্রমোন্নতির মোকাবেলায় ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তিগত বণিজ্য স্বার্থকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ফরাসীদের বিতাড়ন এবং রাজ্য জয়ের মাধ্যমে ইংরেজদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজন ছিল।
পলাশী ট্র্যাজেডির তাৎপর্যঃ
পলাশী ট্র্যাজেডির পরিণতিতে বাংলার জনগণকে এর মূল্য দিতে হযেছিল দু’শ বছরের উপনিবেশিক শাসন আর গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ থেকে। যার আবহ থেকে এখনো আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। উপরন্তু দিনকে দিন আমরা আমাদের জাতিস্বত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে গোলামীর আরো গভীর জিঞ্জিরে প্রোথিত হচ্ছি।
পলাশী ট্র্যাজেডির তাৎপর্যকে নিম্নোক্তভাবে দেখা যেতে পারেঃ
১। পলাশী ট্র্যাজেডির ফলে ভারতের সর্বাধিক সমৃদ্ধ অর্জন বাংলা বিদেশী শক্তির পদানত হল। এ যাবৎ ইংরেজ কোম্পনী ভারতের শাসকগোষ্টীর নিকট ছিল কৃপা ও অনুগ্রহ প্রাথী। কিন্তু পলাশী ট্র্যাজেডির পর ইংরেজরা নিজেরাই অনুগ্রহ বিতরণের অধিকার অর্জন করল। ইংরেজগণ প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং অতঃপর তারা নৃপতি স্রষ্টার (king maker) ভূমিকায় অবর্তীণ হয়।
২। বাংলার ব্যবসায় বাণিজ্য ইংরেজদের একচেটিয়া হয় এবং দেশীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে পলাশী ট্র্যাজেডির অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সদূরপ্রসারী হয়েছিল।
৩। পলাশী ট্র্যাজেডির ফলেই বাংলা তথা ভারতবর্ষে বৃটিশ সার্বভৌমত্বের বীজ রোপিত হয়েছিল। পলাশী যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ ইংরেজগনকে ভবিষ্যতে ভারতে রাজ্য বিস্তারে প্রভূত সাহায্য করেছিল। বস্তুতঃ বাংলা থেকেই ইংরেজরা ভারতের অন্তর্দেশে প্রবেশ করে প্রভূত্ব স্থাপন করার সুযোগ পেয়েছিল।
৪। পলাশী ট্র্যাজেডির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের স্বকীয়তার অবসান ঘটে এবং ইউরোপীয় শাসনের শুরু হয়। ইউরোপীয় সামরিক সংগঠন, কূটনীতি, আইন কানুন, শিক্ষা সংস্কৃতি প্রভৃতি ভারতে প্রবেশ করে আজও তা সর্বজনভাবে গৃহীত হয়ে আসছে।
পলাশী ট্র্যাজেডি ও আজকের বাংলাদেশঃ
একটা প্রশ্ন এখন স্বতঃই উঠে আসে যে, আজকের বাংলাদেশ ২৫৩ বছর আগের পলাশী ট্র্যাজেডির প্রতিক্রিয়া থেকে কতটুকু উত্তোরণ ঘটাতে পেরেছে?
দুটি উত্তোরণ উল্লেখযোগ্য ভাবে ঘটেছে বলা যায়। একটি হল ’৪৭ সালের ভারত বিভক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন এবং আরেকটি হল ’৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। কিন্তু এ যেন আধিপত্যবাদ বা উপনিবেশবাদ থেকে বেরিয়ে আসার এক ক্ষীণ প্রচেষ্টা মাত্র। প্রথমটি ছিল দীর্ঘ দু’শ বছরের গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ থেকে হাঁপিয়ে উঠা এদেশের জনগণের জন্য আধিপত্যবাদীদের প্রদত্ত করুনা বা সান্ত্বনা এবং অন্যটি হল এক আধিপত্যবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আরেক আধিপত্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জোরালো সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আধিপত্যবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদ হতে মুক্তি বা উত্তোরণ আজও আমাদের হয়নি। বরং উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর প্রধানরা প্রতিবছর এক জায়গায় মিলিত হয়ে পুরনো প্রভুকে স্মরণ ও ‘স্যালুট’ করছি নির্লজ্জ্বভাবে। পলাশী ট্র্যাজেডির পর থেকে এখনো আমরা বিদেশীদের কৃপা ও অনুগ্রহের পাত্র রয়ে গেছি। ব্যবসায় বাণিজ্যে তাদের পদানত থেকে গেছি। যে সম্পদ বিদেশীরা এ দেশ থেকে লুট করে নিয়ে নিজ দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আমরা সে সম্পদের অংশীদার না হয়ে অসহায় যোগানদাতা রয়ে গেছি। আর আমাদের সম্পদের জন্য আমরা তাদের কাছে হাত পাতছি। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যে সুদূরপ্রসারী সাম্রাজ্য বিদেশীরা আমাদের চাপিয়ে দিয়েছে আজও আমরা সে সাম্রাজের পদতলে পিষ্ট হচ্ছি। যে শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থার বিস্তৃতি তারা এ দেশে ঘটিয়েছিল তার আলোকে আমাদের দৈনন্দিন কার্যনির্বাহ ও বিচার প্রশাসন চালাচ্ছি। উপরুন্তু সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা এখন শুধু ইউরোপ থেকেই পড়ছেনা; আরও ভয়ঙ্করভাবে পড়ছে আমেরিকা থেকেও। ফলে আগে গোলামী করতাম এক সাম্রাজ্যবাদের আর এখন নতুন নতুন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে।
পলাশী বিজয়ের ২৫৩ বছর পর আজও স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে নির্মোহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বাস্তবত: পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়নি। দিন দিনই বাংলাদেশ একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই নিয়ন্ত্রণ করছে এমন ব্যক্তিরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীন জাতিসত্ত্বায় কতটা বিশ্বাসী তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা। জাতিসত্ত্বা বিরোধী এনজিওদের অপতৎপরতা চলছে বেপরোয়াভাবে। যেন এ যুগের জগৎশেঠ, উমিচাঁদ।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এ দৃশ্যগুলোই চিত্রিত হয়। স্বাধীনতার ৩৮ বছরেও আমরা পারিনি সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য নিজস্ব কোন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বে বজায় রাখতে যে নিজস্ব শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামোর প্রয়োজন এখন পর্যন্ত তা গড়ে উঠেনি। পারিনি নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটাতে। বারবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হয়েছে, ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দাঁড়ায়নি। পরষ্পরকে গালমন্দ করার প্রশিক্ষণ যত হয়েছে, তার তুলনায় দেশপ্রেমের প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে।
কিন্তু কেন? কারণ আমরা আমাদের সত্ত্বাকে এমনভাবে বিসর্জন দিয়েছি যে, সামান্য স্বার্থের লোভে আমাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। জাতীয় স্বার্থের চাইতেও দলীয় স্বার্থ,তার চাইতেও ব্যক্তিস্বার্থ আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশ প্রেমিকের ছদ্মদেশে স্বার্থস্বেষী আমাদের নেতৃবৃন্দ কথায় কথায় বিদেশীদের তোষণ করছেন; তারা নিজ দেশের জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহন করছেন বিদেশী দূতাবাসে বসে। বিদেশী দূতদের চায়ের দাওয়াতকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের নিয়ামক মনে করেন। সামান্য ব্যক্তিস্বার্থের লোভে জাতীয় সম্পদ উত্তোলনের দায়িত্ব অযোগ্য বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে দেশের শত শত কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করছেন। সুশীল সমাজের ছদ্মাবরনে একশ্রেণীর অতি উৎসাহী বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা জাতীয় স্বার্থে অতিমাত্রায় ঔন্নাসিক খবরদারি করেন, যারা একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলছেন আবার অন্যদিকে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই জাতীয় সরকারের সাফাই গেয়ে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। আরো ভয়ঙ্কর ভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছেন একশ্রেণীর বিচ্ছিন্ন মতাবলম্বী মহল যারা প্রতিবেশী দেশে গিয়ে বাংলাদেশ দখলের পরামর্শ দেন, বিদেশে গিয়ে নিজ দেশের স্বাধীনতা হরণের প্রস্তাব দেন, বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী জঙ্গীদের আস্তানা বলে প্রমানের চেষ্টা চালান।
এসবই হল এ যুগের জগৎশেঠ, রায়দুলর্ভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, মীরজাফরদের কার্যকলাপ। সুতরাং বস্তুতপক্ষে পলাশী ট্র্যাজেডির পরিণতি থেকে আমরা কতটুকু উত্তোরণ ঘটিয়েছি তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।
একটু লক্ষ্য করুন, ক্ষমতালিপ্সা, অর্থলিপ্সা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাস ঘাতকতা যে কোন সমাজেই কমবেশি বিদ্যমান। পৃথিবীর তাবৎ শাসনব্যবস্থাতেই এটি লক্ষ্য করা যায়। জগৎশেঠ, মীরজাফরদের এ দোষগুলো স্বাভাবিক ঘটনার অংশ হিসেবে বাদ দিলে যে ভয়ঙ্কর গ্রাউন্ড পলাশী ট্রাজেডির পিছনে ফুটে উঠে তা হল বাংলায় মুসলিম ও স্বাধীন নবাবী শাসনের অবসান এবং বিদেশী আধিপত্যবাদের সম্প্রসারণ। জগৎশেঠ গংরা মূলতঃ এ কাজেরই সহযোগী ও হোতা। পৃথিবীর তাবৎ শাসনব্যবস্থার মত স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে ক্ষমতার লোভ, অর্থলিপ্সা, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার দোষে দুষ্ট জগৎশেঠদের ক্ষমা করা গেলেও একটি জাতিসত্ত্বার স্বাধীনতা হরণ করে বিদেশী অধিপত্যবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ দিয়ে জাতিকে দীর্ঘ গোলামীর অষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ করার চরম ধৃষ্টতার দায়ে তাদের কখনোই ক্ষমা করা যায় না।
আর স্বাধীন বাংলাদেশে যারা একইভাবে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তোষণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত, বিদেশীদের হাতে নিজ দেশের সম্পদ তুলে দেন, কথায় কথায় জাতীয় স্বার্থে বিদেশীদের ডেকে আনেন, বিদেশীদের প্রেসক্রিপশনে দেশ চালান, তাদের পরামর্শে দেশের কলকারখানা, উৎপাদন খাত, কৃষিখাত, একে একে বন্ধ করে দেন, সাম্প্রদায়িক উস্কানী ছড়িয়ে দেন, সর্বোপরি নিজ জাতিসত্বার বিসর্জন দিয়ে বিদেশী সাম্রাজ্য বাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেন-তাদেরকে ক্ষমা করা যায় কি?
দুঃখজনক হলেও সত্য, এ যুগের জগৎশেঠদের আমরা ভালভাবেই চিনি। কিন্তু তারপরও তাদেরকে আমরা নেতা বানাই, তাদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিই, সুশীল সমাজের স্বীকৃতি দিই, তাদেরকে দিয়ে আমাদের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করি। এ যেন পলাশী ট্র্যাজেডির অবিরাম (Incessant) ঘটনাপ্রবাহ।
এই মুহূর্তে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার সেই অমোঘ পংক্তির কথা স্মরণ করছিঃ
“মনে পড়ে আজ পলাশীর প্রাস্তর-
আসুরিক লোভে কামানের গোলাবারুদ লইয়া যথা
আগুন জ্বালিল স্বাধীন এ বাংলায়।
সেই আগুনের লেলিহান শিখা শশ্মানের চিতাসম
আজো জ্বলিতেছে ভারতের বুকে নিষ্ঠুর আক্রোশে।
দুই শতাব্দী নিপীড়িত এ দেশের নর ও নারী
আঁখিজল ঢেলে নিভাতে নারিল সেই আগুনের শিখা
এ কোন রাক্ষুসী তার রক্ত রসনা মেলি,
মজ্জা অস্থি রক্ত শুষিয়া শক্তি হারিয়া যেন
চল্লিশ কোটি শবের উপর নাচিছে তা থৈ থৈ !
অক্ষমা অভিশপ্তা শক্তি তামসী ভয়ঙ্করী।
এ পরিস্থিতিতে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতিগঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে পলাশীর বিপর্যয় থেকে যথাযথা শিক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে করা যাবে। নয়তো ইতিহাসের সেই নির্মম সত্যই বাস্তবে পরিণত হবে যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণেই বিপর্যয় নেমে আসে।
গাজির পাড়া, দক্ষিন সুরমা, সিলেট থেকে মোহাম্মদ সানা-উল গাজী লিখেছেন,
০৫ জুন ২০১১; রাত ১০:০২
“মনে পড়ে আজ পলাশীর প্রাস্তর-
আসুরিক লোভে কামানের গোলাবারুদ লইয়া যথা
আগুন জ্বালিল স্বাধীন এ বাংলায়।
সেই আগুনের লেলিহান শিখা শশ্মানের চিতাসম
আজো জ্বলিতেছে ভারতের বুকে নিষ্ঠুর আক্রোশে।
দুই শতাব্দী নিপীড়িত এ দেশের নর ও নারী
আঁখিজল ঢেলে নিভাতে নারিল সেই আগুনের শিখা
এ কোন রাক্ষুসী তার রক্ত রসনা মেলি,
মজ্জা অস্থি রক্ত শুষিয়া শক্তি হারিয়া যেন
চল্লিশ কোটি শবের উপর নাচিছে তা থৈ থৈ !
অক্ষমা অভিশপ্তা শক্তি তামসী ভয়ঙ্করী"।
আমার মনে হয়,
আমরা নিজেকে নিজে বদলায়েছি না যতক্ষন
সেই আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলিব ততক্ষন।
58721
২
সৌদি থেকে করিম লিখেছেন,
০৫ জুন ২০১১; রাত ১০:৫৬
কাজী নজরুল যদি বেচেঁ থাকতেন কবিতা টি এভাবে লিখতেন
এ কোন রাক্ষুসী তার রক্ত রসনা মেলি,
মজ্জা অস্থি রক্ত শুষিয়া শক্তি হারিয়া যেন
১৬ কোটি বাঙ্গালীর উপর নাচিছে তা থৈ থৈ !
অক্ষমা অভিশপ্তা শক্তি তামসী ভয়ঙ্করী।
58728
৩
New York থেকে Probashi লিখেছেন,
০৯ জুন ২০১১; রাত ১১:৩৭
লেখাটি অপূর্ব বাবুকে অশেষ ধন্যবাদ। এই চণ্ডালীর নৃত্যের কি শেষ নাই?
59026
৪
Law Department, DIU থেকে Mohiuddin Apu লিখেছেন,
১২ জুন ২০১১; বিকেল ০৪:২৪
ato valo article jine lekchan Tine amar sir..a jonno sotty e ami gorvito.
59326
৫
কাওরান বাজার, ঢাকা। থেকে ইন্জিনিয়ার মো: জাহাঙ্গীর আলম লিখেছেন,
১২ জুন ২০১১; বিকেল ০৪:৫০
বিশ্লেষনধর্মী লেখার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
কিন্তু লেখকের কাছে সামান্য আবদার, আজকের যারা তথাকথিত দেশপ্রেমিক শাসক, তারা পলাশীর ট্রাজেডি থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছে কিনা, কিংবা শিক্ষা নেওয়া উচিত কিনা, সে ব্যপারে অন্যকোনো লেখা উপহার দেবেন আশাকরি।
আবারও ধন্যবাদ।
59334
৬
রিয়াদ,সৌদি আরব থেকে জসিম লিখেছেন,
১৩ জুন ২০১১; রাত ০৪:২৫
ধন্যবাদ এই বিশ্লেষনধর্মী লিখার জন্য।
আমাদের দেশের রাজনীতি বিদেরা কোন ইতিহাস পড়েন না। ১/১১ এর কথা আমাদের রাজনীতি বিদেরা ভূলে গিয়েছে আর ২৫৩ বছর আগের কথা। সেটা ইতিহাসের পাতায়। কয় দিন হলো আমাদের দেশের রাজনীতি বিদদেরকে ধরে ধরে মইন উ নাকি গরম ডিম কোন জায়গা দিয়ে ডুকিয়ে ছিল ? আবার এটা জন সম্মূখে প্রকাশ ও করেছে, তাহলে এদের কি কোন মান সম্মান আছে। এরা কেন রাজনীতি করে ? আমাদের অর্থ মন্ব্রী "মাল" কত বড় বেহায়া শেয়ার বাজারে এত বড় ঘটনা, ঘটার পর ও এখনো সে বহাল তবিয়তে অর্থ বাজেট দিচ্ছে। পদত্যাগের কোন কথা তার মূখ দিয়ে বাহির হলো না।
আওয়ামী লীগ সরকার দেশটাকে কি বানাতে চাই দেশের জনগন এখন তাহা ভাল করে জানে। সত্য কথা বলতে কি এরা কখনো শিক্ষা নিবে না শেখ মুজিবকে মারার পর দেশের মানুষ ইন্নাল্লিলাহ পড়ে নাই। এ কথাটা কি শেখ হাছিনা জানে না ? মানুষে মিষ্টি বিতরন করেছে? তাহলে এরা শিক্ষা নিবে আর কবে?
59393
৭
Cox's Bazar থেকে Dr. Farooque লিখেছেন,
১৭ জুন ২০১১; রাত ১০:৫৬
গরম ডিম দিতে হবে জগৎশেঠ, রায়দুলর্ভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভদেরকে
59807
৮
ঝনঝনিয়া, বাশাইল । থেকে হাসান খান লিখেছেন,
১৮ জুন ২০১১; দুপুর ১২:৩১
প্রচুর গুরুত্ব পুর্ন ঐতিহাসিক তথ্যবহুল আর জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষনি লেখা । আপনার এই লেখার তত্ব-তথ্য আমার কিছু সাম্প্রতিক লেখার বিষয়-বক্তব্যকে দারুন ভাবে সমর্থন করে । আমি আশ্চর্য হলাম এই জন্য যে, বিষয় গুলো সম্পর্কে আমি এতো জানতাম না । আপনার এই লেখাটা থেকে আমি ভবিষ্যতে ঐ ধরনের আরো কিছু লেখার উপাদান-উদাহরন পাবো ।
59849
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
আসুরিক লোভে কামানের গোলাবারুদ লইয়া যথা
আগুন জ্বালিল স্বাধীন এ বাংলায়।
সেই আগুনের লেলিহান শিখা শশ্মানের চিতাসম
আজো জ্বলিতেছে ভারতের বুকে নিষ্ঠুর আক্রোশে।
দুই শতাব্দী নিপীড়িত এ দেশের নর ও নারী
আঁখিজল ঢেলে নিভাতে নারিল সেই আগুনের শিখা
এ কোন রাক্ষুসী তার রক্ত রসনা মেলি,
মজ্জা অস্থি রক্ত শুষিয়া শক্তি হারিয়া যেন
চল্লিশ কোটি শবের উপর নাচিছে তা থৈ থৈ !
অক্ষমা অভিশপ্তা শক্তি তামসী ভয়ঙ্করী"।
আমার মনে হয়,
আমরা নিজেকে নিজে বদলায়েছি না যতক্ষন
সেই আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলিব ততক্ষন।