তখন রাত ৭টা। আমার মেয়ে রুকাইয়া রাহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওকে ওর বড় ভাই রাহি বলেছে এখনই বাস চলে যাচ্ছে আমাদেরকে ছেড়ে। তাই ওর যত তাড়া। রাত ১০টায় বাস চলে যাবে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মংলার উদ্দেশ্য সুন্দর বন দেখার জন্য। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন দেখার ইচ্ছা কার না থাকতে পারে। ভ্রমন পিপাসু আমার ৬ বছরের মেয়ে রুকাইয়া রাহা। বেড়াইতে খুব পছন্দ করে। সবাই বলে রাহা দাদার আদর্শ পেয়েছে। আমার বাবা বাংলাদেশের এমন কোন স্থান নেই যেখানে তিনি ভ্রমণ করেন নাই। চাকুরীর কারণে পাকিস্তানের অনেক জায়গা দেখেছেন। আমার বাবার গল্পে উজ্জীবিত রাহা। আমাদের প্রধান শিক্ষক যখন গাড়ীর আসনের ঘোষণা দিলেন তখন খরগোসের মত কান খাড়া করে ছিল রাহা। কখন বাবার নাম ঘোষণা হবে। যখন সে জানতে পেল টিকিট নম্বর তখনই ভাইয়ের সাথে নিয়ে দুইজনে বাসে উঠে বসে পড়েছে। অনেকেই ওকে দেখে, ওর কাজ দেখে মজা পাচ্ছে। সারা রাত বাসে কেটে সকাল দশটায় মংলা পোর্টে গিয়ে পৌছিলাম। আমার প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ রমজান আলী স্যার খুব দক্ষতার সাথে জাহাজের কেবিন বন্টন করে দিলেন। রউফ স্যার যিনি মংলায় আমাদের ভ্রমণের সকল কাজে সহায়তা করেন তিনি উপস্থিত। তাকে দেখে ভাল লাগলো। তিনি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে ভ্রমণ ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন। অবশ্য তিনি নিজেই আমাদের সাথে সারাক্ষণ ছোট জাহাজে ছিলেন। উৎসাহ দিয়েছেন, বিভিন্ন গল্প করেছেন। নদীতে এবং সমুদ্রে বিভিন্ন সময় সাহস জুগিয়েছেন।
মংলায় ভাটার কারণে জাহাজটা তীর থেকে দুরে থাকায় আমরা নৌকা করে জাহাজে উঠলাম। তখন বেলা ১১টা হবে। রমজান আলী স্যার জাহাজে এসে আবারো সকলের খোঁজ নিলেন। সব ঠিক আছে কিনা। আসলে আমাদের ভ্রমণের জন্য রমজান আলী স্যারের অবদান অনেক। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। এতবড় দল নিয়ে ভ্রমণ করার জন্য। সে সাথে সৈয়দ শহীদুল হুদা স্যার এবং মহিউদ্দিন স্যারকে। ভ্রমণের কথা শুনলে উল্লেখিত স্যাররা চঞ্চল হয়ে উঠেন। জাহাজে সকালের নাস্তার সময় পার হয়ে গেছে তাই রমজান স্যারের তাড়া নাস্তার খাওয়ার জন্য। নাস্তা খেয়ে জাহাজের ডেকের ওপর চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার মেয়ে তার বাইনোকুলার গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে দক্ষ পর্যটকের মত এদিক ওদিক দেখছে আর আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন ও বেশ কবার সুন্দর বন ভ্রমণ করেছে। পশুর নদীতে বড় বড় জাহাজ দেখলাম মাল খালাস করছে। আর ছেলে রাহি ক্যামেরায় ছবি তুলছে আমার জন্য। সুন্দর আবহাওয়া আর হালকা বাতাসের সাথে মিষ্টি রোদ পরিবেশটা এমন করছে ওখানে উপস্থিত থাকলে বুঝা যেত।
নদীতে মাঝে মাঝে শুশুক দেখা যাছে। ছেলেকে ডেকে দেখতে না পেয়ে খোঁজ নিয়ে দেখি জাহাজের চালকের রুমে জাহাজ চালানো দেখছে ওর বন্ধুদের সাথে। আমাদের জিলা স্কুলের শিক্ষকদের এই পারিবারিক ভ্রমণে যাহারা যেতে পারেন নাই তাহারা সেল ফোনে কথা বলে আফসোস করেছে এমন একটা ভ্রমনে না যেয়ে। আমি বিমানে লন্ডন, স্কটল্যান্ড গিয়াছিলাম আর আজ সমদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজে করে সুন্দর বনের হিরণ পয়েন্টে যাচ্ছি। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। ডেকে বসে আমি আমার স্ত্রীর সাথে গল্প করছি ওদের স্কুলের। ও সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও আমার সাথে গিয়াছে। দু স্কুলের দুটা জাহাজে সুন্দর বন ভ্রমণ। এক সাথে দুটো জাহাজ যাচ্ছে হিরণ পয়েন্টের দিকে মজা লাগছে খুব। হঠাৎ করেই রাহা জানালো বাইনোকুলের মাধ্যমে বাঘের লেজ দেখতে পেরেছে আমাকেও দেখতে বললো। এই কথা শুনে ডেকের সবাই হেসে উঠলো। ওদিকে সোয়েব স্যারের আড়াই বছরের ছেলের ডোরে মনের গান শুনেও হাসছে সবাই। দুপুরের খাওয়ার আগেই আমরা পৌছে গেলাম করমজল পয়েন্টে। জাহাজ থেকে নামার আগেই সর্তক করে দেওয়া হল সুন্দর বনের সকল স্থানেই বাঘ আছে এবং দলবদ্ধ হয়ে এক সাথে বেড়ানোর জন্য। দুজন গার্ডম্যান দলের আগে ও পিছনে রয়েছে যেন বন্য পশুদের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। জাহাজ থেকে নেমেই বানরের পাল্লায় পড়লাম আমি আর মেয়ে রাহা। বার বার ছোট্র বানরটা মেয়ের কাছে আসছে। ও ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা প্রথমে একটা ঘরে হরিণের কঙ্কাল দেখতে পেলাম চামরা সহ পাশে রয়েছে করমজলের মানচিত্র। কুমির আর হরিনের প্রজনন কেন্দ্র দেখলাম।
হরিণের দল লোহার বেড়ার কাছে এসে বাদাম খাওয়ার জন্য চেহে আছে। রুবা, রাহা বাদাম দিচ্ছে হরিনেরা খাচ্ছে। বাদাম খাওয়ার দৃশ্য দেখে ভাল লাগলো এ কারণে যে আজ খাচাঁয় বন্ধি বলেই বাদাম খেতে পেল। অনেক লোক এসেছে দেখতে, দুজন আমেরিকানকে দেখলাম এবং কথা বললাম তারা আমাকে জানালো খুব খুশি সুন্দর বন দেখতে পেয়ে, তবে আরো খুশি হত নিজ চোখে প্রকাশ্যে বাঘ দেখতে পেলে এবং এই অপেক্ষায় তারা রয়েছে। আমি একজন গার্ডকে জিজ্ঞাসা করলাম এখানে বাঘ আছে কিনা সে বললো বনের সকল স্থানেই বাঘ আছে। সুন্দর বনটা একটা একটা দ্বীপ। বনের মাঝে দিয়ে খাল চলেছে। রয়েছে ব্রিজের মত করে পাটাতন যার ওপর দিয়ে যাতায়াত করা যায়। কুমিরের খাঁচারে হেলান দিয়ে পিছন হয়ে দাড়িয়ে গল্প করছে দুজন লোক দুর থেকে দেখে একটা লোক ছুটে এসে নিষেধ করলেন এমন ভাবে না থাকতে। কারণ এখানেই পিছন থেকে বড় কুমির লাফিয়ে উঠে মানুষকে ধরে মারাত্বক ভাবে আহত করেছে, কোন রকমে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এদিকে মহিউদ্দিন স্যারের বাঁশির শব্দ পেয়ে চলে আসলাম জাহাজে। দুপুরের খাবার খেয়ে ডেকের ওপর বসলাম। জাহাজ চলছে নিদিষ্ট গন্তব্যর দিকে। বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে । সুন্দর বনে আসার আগে আমি আমার বাবা,মা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে দেখা করতে গিয়াছিলাম। বাবা আমাকে সাবধানে থাকতে বলেছে কারণ এই সময়ে বাঘেরা হিংস্র হয়ে থাকে। আমার বাবাও বাঘের পাল্লায় পড়েছিল। তাঁর কাছে অনেক গল্প শুনেছি আর আজ সেই সুন্দর বন দেখতে এসেছি। সন্ধ্যা নেমে আসায় ডেকের ওপর থেকে নামিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলাম। মনে মনে খুব ভয় লাগছে সামনেই সাগরের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে রাতের বেলা মাত্র দুটো ছোট জাহাজ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাটার কারণে জাহাজ নঙ্গর করলো। দুঘন্টা পর জোয়ার আসলে জাহাজ আবার সামনে এগিয়ে যাবে। সারা রাত জাগার কারণে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি জাহাজের পিছনের পাটাতন বনের তীর থেকে মাত্র আট/দশ ফিট দুরে অবস্থান করছে তাও আবার আমার কেবিনের সাইট। এমন দৃশ্য দেখেই আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বাঘ কেন বিড়াল, বানর ইচ্ছা করলেই লাফিয়ে জাহাজে উঠতে পারবে। আমার স্ত্রী রুবা কথা শুনে বললো তুমি তো আগেই ঘুমিয়ে গেলে। রাতে সমুদ্রের ঢেউ দেখলে আরো ভয় পেতে। পানির ঝাপটা এসে জাহাজের তৃতীয় তলায় পড়েছিল এবং এমনভাবে দুলছিল যেন এখনই কাত হয়ে সমুদ্রে ডুবিয়ে যাবে। শুনে ভয় পেলেও আমিও সাহসের সাথে বলালাম এটা তেমন একটা ব্যাপার না। আমার ছেলের চেয়ে মেয়েটা সাহসী। ঘুম থেকে উঠে বাইনোকুলার গলায় ঝুলিয়ে অন্যান্যদের সাথে যাচ্ছে নীল কমল দেখতে। আমি বললাম লাল কাপড় পড় না। বাঘের চোখে সহজেই পড়ে লাল এবং হলুদ রং। না মেয়ের লাল কাপড় পছন্দ। নৌকায় চড়ে নীল কমলে নামলাম।
নেমেই দেখলাম প্রবেশ পথে লেখা রয়েছে ৭৯৮ তম বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা, নীল কমল এবং দেখলাম বিশ্ব ঐতিহ্য ফলক। যে ফলক বর্তমান প্রধান মন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। বিশ্বের ৭৯৮ তম বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা দেখে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। গার্ডম্যান সবাইকে একত্র করে আবারো কিছু পরামর্শ দিলেন বললেন বাঘ বলা যাবে না মামা বলতে হব , বাঘ দেখে কেহই দৌড়াতে পারবেন না, চিৎকার দিতে হবে, কোথাও থামা যাবে না, পথ চলতেই হবে। এমন সময় নীল কমলের দায়িত্ব প্রাপ্ত জনাব আলতাফ হোসেন সাহেব আসলেন। বললেন গত কাল বিকালে বাঘের তাড়া খেয়ে প্রায় একশর মত হরিণ এসেছিল এবং তাদের পিছনে ছিল দুটো বাঘ। এই স্থানটা মারাত্বক এখানে প্রায় সময় প্রকাশ্যে বাঘ আসে মিঠা পানি খেতে। নীল কমলে একটা বিরাট পুকুর রয়েছে যার পানি লবণাক্ত নয়। টাওয়ার দেখিয়ে বললেল ওর নিচে বাঘ দুটো খেলা করেছিল। আমার মেয়ে জিজ্ঞাসা করলো আপনি বাঘকে ধরেন নাই কেন? ওনি কথা শুনে বললেন, তোমার অনেক সাহস মা। এখানে বাঘ আসলে সবাই উঁচু ভবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং বাঘকে কোন বিরক্ত করে না। এমন অবস্থায় আমার ছেলে সহ অনেকেই আর বনের ভিতর যেতে সাহস না পেলেও আমরা অনেকেই গিয়েছিলাম। গার্ডম্যান একজন সামনে অন্যজন পিছনে আর আমরা সবাই মাঝ খানে চলছি বনের ভিতরে রাস্তা দিয়ে সামনের দিকে। গার্ডম্যান বলছে চলার পথে থামবেন না, বাঘ যদি এসেই পরে দৌড়াদোড়ি করবেন না, চিৎকার দিবেন। রাস্তায় হরিণের পথ দেখলাম, বাঘের পায়ের ছাপ দেখে ক্যামেরায় পায়ের ছাপের ছবি তুলে রাখলাম। কেওড়া, গোলপাতা, কাকড়া গাছের সারি ভালই লাগছিল।
আমার মেয়ে আরো ভিতরে যাবে, বাঘ দেখবে নিজ চোখে কেমন করে বাঘেরা থাকে, কোথায় থাকে, কি কি খায় ইত্যাদি প্রশ্ন করতে লাগলো। আমি রাহাকে চুপ থাকতে বলতেই আমার সহপাঠিরা রাহার পক্ষে নিয়ে তাকে আরো উৎসাহিত করলো। আমাদের রমজানের স্যারের চোখে পড়লো হরিনের লেজ। দেখে মনে হল রাতে অথবা বিকালের দিকে বাঘ হরিণটাকে খেয়েছে। তখন মনে হল সত্যিই গতকাল এখানে প্রকাশ্যে বাঘ এসেছিল। বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে টাওয়ারের ওপর উঠার বায়না ধরেছে মেয়েটা। গতকাল এখানেই বাঘ বসেছিল তাই আমার সাহস হারিয়ে যাচ্ছিল টাওয়ারে উঠার কিন্তু রাহা ও রাহার মা দুজনে টাওয়ারে উঠলেও আমি আর ছেলে রাহি টাওয়ারে না উঠে একদিক ওদিক দেখলাম। আমাদের একটু পরেই সরওয়ার ও জাহাঙ্গীর স্যার টাওয়ারের কাছে বাঘের গর্জন শুনতে পেয়ে ভয়ে চলে এসেছে। এ কথা রাহা শুনতে পেয়ে বাঘ দেখবে বলে আবার বায়না ধরলো। ওকে ওর মা, ভাই বুঝিয়ে পুকুরের পাড়ে এনে কয়েকটি ছবি তুলে নৌকার কাছে ফিরে আসছি এমন সময় দেখি কয়েক জন দাড়িয়ে কি সব দেখছে। কাছে যেয়ে দেখি মাটি ফেটে গ্যাস বের হচ্ছে এবং হালকা পানি। নৌকায় আমরা মাত্র কয়েক জন তাই নৌকা চালক নৌকা ছাড়বে না। নৌকা চালক বলল নয়, সাড়ে নয়টার মধ্যে জাহাজ না ছাড়লে তুফানের পাল্লায় পড়তে হবে শুনে বললাম তুফান আবার কি? মাঝি বললো সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় ঢেউ উঠবে? শুনে ভয় পেলেও অন্যরা আসছে জাহাজে ফিরে যেতে। জাহাজে সকলেই ফিরে রওয়ানা হল মংলা পোর্টের দিকে। সকাল বেলার সুন্দর রোদ সুন্দর বনকে আরো সুন্দর লাগছে। কিছু দুর আসতেই দেখা গেল হরিন পারে এসেছে পানি খেতে আর এক দুরে দেখা গেল কুমির মনের আনন্দে রোদে শুয়ে আছে। রাতে আমরা অনেক কিছু না দেখলেও দিনে দেখতে পেলাম বিভিন্ন চর, জাহাজ। বিকাল চারটায় মংলায় এসে জাহাজ থেকে নেমে যার যার বাসের আসনে বসলাম। তার পর বাড়ীর উদ্দেশ্য যাত্রা। ধন্যবাদ সুন্দর বন।