ইভটিজিং কে কোন ক্রমেই থামানো যাচ্ছে না। তা অব্যহত গতিতে চলছে। পহেলা বৈশাখে নরপিচাশের শিকার হয়েছিল ঢাবির টিএসসিতে কিছু তরুনী। জানুয়ারীতে ময়মনসিং এর আনন্দমোহন কলেজে এমন এক ঘটনা ঘটে। ২০০৬ সালে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চে এমন এক নারকীয় কান্ড ঘটেছিল। এটা কোন ক্রমেই থামানো যাচ্ছে। আমি মনে করি এই ঘৃন্য অভিশাপ বন্ধে আগে যারা উস্কানিদাতা তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। উস্কানিদাতা বলতে আমি তাদের কেই বোঝাচ্ছি যারা বিভিন্নিভাবে নারীর সৌন্দর্য্যরে বানিজ্যিকীকরণ করে যাচ্ছে। দেশের পত্রিকাগুলো যে ট্যাবলয়েড বের করে সেখানে কি নারীর প্রতি জৈবিক উস্কানি বৃদ্ধির কোন কারণ থাকেনা? রাস্তাঘাটে হাজারো অশ্লীল মেগাজিন বের হয় এগুলো কি দায়ী নয় ? বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নারীকে যেভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। এরাই ইভটিজিং কে প্রমোট করছে। ইভটিজিং একটা অভিশাপ। এর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হল , অনেক লেখা হল , অনেক কলাম পত্রিকায় কলাম প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেক সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, প্রতিবাদ সভা সমাবেশ হয়েছে হচ্ছে এবং ভবিৎষতেও হবে। এরপরও তা থেমে নেই। অব্যাহত গতিতে তা চলছে। প্রকৃত অর্থে ইভটিজিং এই ঘৃন্য অভিশাপ টি বন্ধ করার কী ক্নো কার্যকরী উপায় নেই? আইন প্রয়োগ করে কি সম্ভব? হয়তো অনেকে বলবেন সম্ভব। কিন্তু এই জন্য হয়তো অনেক আইন আছে তাতেও কাজ হচ্ছেন। কেউ বলবেন আইনের প্রয়োগ নেই। অর্থাৎ কাজীর গরুর মতো - কাগজে আছে গোয়ালে নেই।
এরপরও প্রশ্ন থাকে এই ব্যাপারে অনেক ভাইবোন মন্তব্য করবেন-নারীদের প্রতি পুরুষের নেতিবাচক মনোভাব অনেকাংশে দায়ী। অর্থাৎ পুরুষের মধ্যে নারীদেরকে শুধুমাত্র জৈবিক দৃষ্টিকোন থেকে পর্যবেক্ষণ করার প্রবনতা বেশি। এখন সম্মানিত পাঠকবৃন্দ একটু নিরপেক্ষ ভাবে বলুন পুরুষের মধ্যে এই যে নারীর প্রতি যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষা করার জন্য কী আইন প্রণয়ন করার দরকার । পুরুষের এই নেতিবাচক মানসিকতা দূর করার কোন আইন কি প্রণয়ন করা আদৌ সম্ভব? আর একজন পুরুষ তরূনীর প্রতি জৈবিক দৃষ্টিকোন না সহানুভূতিশীল দৃষ্টিকোন থেকে তাকাচ্ছে তা বিচার কোন মানদন্ড কি আবিষ্কৃত হয়েছে? না, হয়নি। হওয়া সম্ভবও নয়। এইজন্য অনেকে বলেছেন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হওয়া দরকার । যথার্থই বলেছেন। এর কোন বিকল্প নেই। পুরুষের মধ্যে যদি বিবেকবোধ জাগ্রত না হয় তাহলে ভয়াবহ শাস্তিমূলক কোন আইন রচনা করেও ইভটিজিং বন্ধ করা সম্ভব না। তাকে চিন্তা করা উচিত তার নিজেরও মা বোন আছে। তিনি কি কখন চাইবেন তা বোন টিজড্ হোক? কখনই না। তাহলে যাকে টিজ করা হচ্ছে সেও তো কারো না কারো বোন। এই জন্য সর্ব প্রথম পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন অতি জরুরী। বলা যাই মূখ্য বিষয়। এখন আসি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে যেটা নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকতে পারে। আমর সাথে দ্বিমত করতে পারেন। কোনসমস্যা নেই। তবুও আমার মতামত বলব। বিষয় টা হলো এই ইভটিজিং বন্ধে মেয়েদের অর্থাৎ যিনি এর শিকার তার কোন দায়দায়িত্ব আছে কিনা ? অনেকে বলবেন অবশ্যই আছে। প্রশ্ন হল কিভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন? প্রতিরোধ গড়ে, মিছিল করে , প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করে........ইত্যাদি ইত্যাদি।
অবশ্যই এইগুলো করতে কোন বাধা নেই। এখন বাস্তবে দেখুন এই সব পদ্ধতির ফলাফল কতটুকু ইফেকটিভ হয়েছে? ইভটিজিং বন্ধে কতটুটু সফল হয়েছে? আমার মনে হয় এই সকল পদ্ধতি কার্যকর কোনদিন হবেনা। কারণ ইভটিজিং কেন হচ্ছে তা নির্ণয়ে আমাদের গলদ আছে। রোগ যথাযথভাবে আমরা নির্ণয় করতে পারিনি। আবার রোগের ঔষধ নিবার্চনে রয়েছে মারাত্মক ভুল। ঔষধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরো মারাত্মক ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। আমাদের সমাজ কাঠামো শিক্ষা সংস্কৃতি মূল্যবোধ শিল্প সাহিত্য সবকিছুতেই গলদ রয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রথম অধ্যায় কলেজ জীবনে আমাদের বাংলা বিষয়ে পড়ান শকুন্তলা সেখানে শকুন্তলার জন্ম কিভাবে আমরা সবাই জানি। আমাদের মিডিয়া জগৎ নারীর প্রতি যে আচরণ করে থাকে তাকে কি আমরা কম দায়ী মনে করব? 'হেলো মেয়ে শোন..............' বিজ্ঞাপন ,'চুমকি চলেছে একা পথে' ইত্যাদি গানগুলো কি নারী প্রতি জৈবিক দৃষ্টিকোনকে উস্কে দিচ্ছে না? এই সাথে আমাদের তরুণী-যুবতী সমাজ কোন অংশে কি দায়ী নয়? পুরুষের মধ্যে আছে সপ্তরিপু। তার মধ্যে জৈবিকতা অন্যতম। মেয়েরা যদি পোশাক আশাকে বেপরোয়া হয় , উগ্র হয়। টাইট জিন্স, টি শার্ট পরে ভারতের হিরোইন সাজার মিথ্যা চেষ্টা করে এবং কোন যুবকের পাশ দিয়ে গমন করার সময় যদি ঐ যুবকটি দয়া করে তার দিকে না তাকান তাহলে তাকে মানুষ না বলে ফেরেশতাই বলতে হবে। কারণ ফেরেশতাদের কোন রিপু নাই। কথাগুলো অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। "বেপরোয়া" :"উগ্র" পোশাকের সংজ্ঞায়ন নিয়ে আপনাদের দ্বিমত থাকতে পারে।
কিন্তু এটাই চরম সত্য কথা। ইভটিজিং থেকে তরুণীরা নিজেদের কে রক্ষা করতে হলে তাদের ই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে। পোশাক আশাকে মার্জিত রুচিশীল হতে হবে। তা না হলে বিশ্বাস করুন পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত চিৎকার করলেও ইভটিজিং বন্ধ হবেনা। শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলছি। মেয়েরা যতবেশি স্বেচ্ছায় "অপরুপা": "চোখ ফেরানো যায়না": ইত্যাদি বিশষণে বিশেষায়িত হওয়ার জন্য " কোথায় তুমি আজকের সুপান স্টার"-এ ছুটবে ততবেশি তাদের ইভটিজিং এর শিকার হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। সর্বশেষ আবার পুরুষদের আগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আপনাদের মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া পোশাক আশাকে মার্জিত হওয়ার পরও তরুনীরা ইভটিজিং থেকে রক্ষা পেতে পারেনা। যে কথাগুলো বললাম সেগুলোর গুরুত্ব কার কাছে তা হয়ত জানতে পারব না কিন্তু বিশ্বাস করুন টিজিং বন্ধে আর কোন সমাধান নাই। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি। ঢাবিতে টিজিং বিরোধী যে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়েছিল তাতে ইভটিজিং বন্ধ হয়নি। এই সব পদ্ধতি প্রয়োগ করে এই অভিশাপ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সমস্যার শিকড় আগে উপড়িয়ে ফেলতে হবে। আমাদেও শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বাংলা বইতে “শকুন্তলা” গল্পে কি শেখার আছে? এখানে রাজা দুষ্মন্ত কতৃক শকুন্তলার যে রুপের বর্ননা তা এক প্রকার টিজিং এর মধ্যে পড়ে। একজন ছাত্র কে কলেজ লেবেল থেকেই তো নারী প্রতি সহিংসতা সৃষ্টি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। এই ভাবে অনেক অসংগতি তুলে ধরা যায়। পবিত্র মাহে রমজান মাসের প্রতি এদেশের গণমাধ্যমগুলো শ্রদ্ধ বোধ আমার প্রশ্ন আছে। গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন চরম অশ্লীল। এই রমজান মাসে এই সব নষ্টামি চলছে। পত্রিকা বিনোদন(?) পাতার নামে কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রকাশ রমজান মাসেও থেমে নেই। এই সব ন্ষ্ট সংস্কৃতি অব্যহত রেখে কোন ক্রমেই ইভটিজিং বন্ধ করা সম্ভব নয়। বিষয়গুলো একটু ভেবে দেখবেন। কোন বিতর্ক সৃষ্টি করতে লেখাটি নয়। সমস্যা সমাধানের পথ আবিষ্কার করার জন্য লেখাটি।
লেখকঃ সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, মাস্টার্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা