|
জন্মদিন কি, কেন?
মুহাম্মাদ শরীফ হোসেন |
|
বিশালায়তন এ পৃথিবীতে মানব শিশুর আগমন নিয়ে কেউ করেছে কাব্যিক প্রকাশ, কেউবা বলেছে আসার উদ্দেশ্য, কেউবা এ খুশিতে রঙ্গলিলায় ব্যস্ত। সুকান্ত তার ছাড়পত্রে বলেছে ”এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান/ জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ পিঠে/ চলে যেতে হবে আমাদের”। দার্শনিক কবি বলেছেন ”জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভাল” জীবন সম্পর্কে দীর্ঘ দর্শনের ফলই এটা যা মানুষকে করেছে প্রকৃত মানুষ, যে চিন্তা মানুষকে করেছে প্রকৃত মানুষ হবার চেষ্টা। আর ভোগবাদীরা বলেছে ”কিসের এত হিসাব নিকাশ কিসের ভালো-মন্দ/ যতদিন বেঁচে আছো করে যাও আনন্দ” কিংবা কেও বলেছে ”দুনিয়াটা মস্ত বড় খাও দাও আর ফুর্তি কর”।
এই জন্মের সাথেই জড়িত জন্মদিন। জন্মদিন পালনের যত ইতিহাস পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় খ্রীষ্ট্রপূর্বে Pagan (জড়বাদী, প্রকৃতবাদী) সভ্যতায় লোকেরা বিশ্বাস করতো প্রত্যেকে তার জন্মদিনে খারাপ আত্মারা তার উপর ভর করতে আসে আর এ সময় তার চারপাশে সমস্ত লোকজন তাকে ঘিরে ধরে তাকে আনন্দের মধ্যে রাখতো সাথে সাথে তার চারিদিকে এত শব্দ করা হতো যাতে খারাপ আত্মারা তাকে আক্রমন করতে না পারে।। এসময় কেক আনার প্রচলন শুরু হয়নি। পরবর্তী সময় কেক আনাকে আগত অতিথিকে সম্মান জানানোর প্রক্রিয়া মনে করা হতো। পরবর্তী সময়ে গিফট হিসাবে ফুলের বেশ সমাদর লক্ষ্য করা যায়। তবে ইহুদিদের মধ্যে tzedakah (charity) box নড়ী দেবার প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে। এরা এ বক্সে নিয়মিত অর্থ সঞ্চয় করে তা তাদের স্কুল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করে। ইসরাইলে প্রিয় প্রতি ঘরে রয়েছে এমন বাক্স।
ইহুদিরা তাদের ছেলে সন্তানরা ১৩ বছর ও কন্যা সন্তানরা ১২ বছর বয়সে পড়লে ঘটা করে এই দিবস উদযাপন করে। পুত্র সন্তানদের ক্ষেত্রে এটিকে বলা হয় [Son of Mitzvah (commandment ] এবং কন্যা সন্তাদের ক্ষেত্রে এটিকে বলা হয় (Daughter of Mitzvah). ধারণা করা হয় এ বয়সে পৌঁছলে তারা তাদের ধর্মের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, আইন, প্রথা, বিশ্বাসে আগ্রহী হবে। পুরুষ সন্তানেরা তাদের প্রার্থনা পরিচালনা করা, কন্যা সন্তানেরা শারিরীকভাবে সন্তান জন্মদানে সমতা আসা ইত্যাদির প্রতীক মনে করা হয়। তারা মনে করে এই বয়সে আসা মাত্র Torah নির্দেশনা মতো চলার যোগ্যতা অর্জন হয়।
পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে মানুষের জন্মদিন পালনের এই প্রথা আসলেও আমাদের দেশে বর্তমানে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার জন্মদিন ব্যাপক লক্ষ্যণীয়। এখানে আসা না আসা নিয়েও রাজনীতি কম নয়। সম্প্রতি স্বৈরশাসক এরশাদ কোন এক ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বার্থডে তে তাদের রুমে প্রবেশ করার পূর্বেই বর্তমান শাসক দলের ধমকের কারণে সেখাই থেকেই দৌড় দিয়েছেন।
জন্মদিন পালন পশ্চিমা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংগ তা সুস্পষ্ট। পশ্চিমা সংস্কৃতি খাতা কলমে খিষ্ট্রধর্মে বিশ্বাসী হলেও মূলত তারা ভোগবাদী ধর্মে বিশ্বাসী। আর এ কারণেই প্রকৃতি তাকে জন্মদানের মাধ্যমে তার রুপ সৌন্দর্য্য অবলোকন করার সুযোগ দেবার জন্য প্রকৃতিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই তারা এসব জন্মদিন পালন করে।
জন্মদিনের উম্মাদনায় আজ জাতি এতই দিশেহারা যে জন্মদিন পালন যেন জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশের অন্যতম। কিন্ত এই জন্ম দিনে বাঁধ সেধেছে দু’টি কারণে প্রথমত প্রকৃত জন্মদিন দ্বিতীয়ত সার্টিফিকেটের জন্ম দিন। জন্মদিন আসলে কোনটা? আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে জন্ম তারিখটাই জানা যায় সালটি নয়। এছাড়াও আমাদের দেশের গ্রামের মায়েরা পূর্বে কিংবা এখনও সময় তারিখ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করেননা। কিন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গ্রামের সহপাঠিদেরই দেখেছি বিশাল কেক নিয়ে লেডিস হলের সামনের কোন স্টলে বা স্বল্প সংখ্যক স্বজাতি সহ মেয়েদের সম্মানে জন্মদিন পালন করতে। আসলে সে কি জানে তার জন্মদিন কবে? তবে এসব চটুল কথার পরও যে কথা থাকে তা হলো জন্মদিন কি বা কেন? কেনইবা এর এত গুরুত্ব, কেনইবা পশ্চিমা বিশ্ব এটা নিয়ে তৎপর? অনুকরণপ্রিয় এ জাতির নতুন অনুসঙ্গ যোগ হয়েছে আমেরিকান বার্থডে হ্যাট।
যদি আমি জন্ম দিনের পক্ষে হই তাহলে কেন জন্মদিন পালন করবো? যদি এক কথায় বলি তাহলে পৃথিবিতে সুন্দরভাবে, সুস্থতার সঙ্গে বেঁচে থেকে পৃথিবীর জন্য কিছু করতে পারার কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এটা করবো। তাহলে এই দিন এমন কিছু করতে হবে যা দেখে স্বয়ং স্রষ্টা খুশি হন যেমনঃ কোন অনাহারীকে খাদ্য প্রদান, কোন শিক্ষা বঞ্চিতকে শিক্ষিত করার পদক্ষেপ, কিংবা কোন বস্ত্রহীনকে বস্ত্র প্রদান। কিন্ত আমরা কি তা করি? আমারাতো ইয়ার বন্ধু, বান্ধব নিয়ে আড্ডা আর খাই দাই করি। এতে কি কোনো উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়? চিন্তা করুন তো যে পৃথিবীতে একটি হাত কিংবা চক্ষু ছাড়া এসেছে তার কি বার্থ ডে কোন আনন্দের? তাহলে এই মহৎ দিবসে সে কি করবে?
জন্মদিনের হ্যাট সহ নব্য সংস্কৃতিতে পশ্চিমা সভ্যতা।
পশ্চিমা বিশ্ব ভোগবাদী বিশ্ব। তারা প্রকৃতবাদী বা স্রষ্টার ক্ষমতার ব্যাপারে তাদের ধারনা অস্পষ্ট। আর এ কারণেই দুনিয়ার এ জীবনকে তারা ভোগের মধ্যে থাকাকেই শ্রেয় মনে করে। যেহেতু জন্ম মানুষকে এ ভোগ করার সুযোগকে সৃষ্টি করেছে এ জন্য তারা জন্মের জন্য প্রকৃতির উপর চরম কৃতজ্ঞ।
আল্লাহ পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন সব সৃষ্টির মধ্যে ব্যতিক্রমি করে আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম করে। মানুষ বেঁচে থাকে তার কাজের মাধ্যমে। পৃথিবীকে যারা আলো দেখিয়েছেন, করেছেন বাসযোগ্য, যাদের স্মরণ করে প্রতিমুহূর্ত পৃথিবী নিজেকে গর্ববোধ করে তারা কিন্ত বার্থ ডে করেননি, কিংবা এখনো হয়না। তাহলে কি তারা দুনিয়াকে বোঝেননি কিংবা ব্যর্থ্য হয়েছেন উপভোগ করতে? বরং তারা আছেন হৃদয় জুড়ে। মূলত তারা পৃথিবীকে সবকিছু দিয়েছেন আর পৃথিবীকে সুন্দরতম করে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়েছেন।
আসুন আমরা কোন কিছু করার আগে চিন্তা করি কি কারণে এটা করছি? আমরা চিন্তা করতে পারি শুধু এ কারণেই আশরাফুল মাখলুকাত।
লেখকঃ কৃষিবিদ ও ব্যাংকার
E-mail: mdsharifhossain1978@gmail.com
mdsharifhossainagri@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MdSharifHossain |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|