মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৫:২৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বিপ্লব দেশে দেশে

মোঃ সোহেল রানা

শুরুটা হয়েছিল খুবই নাটকীয়ভাবে, গত ১৭ ডিসেম্বর, ২০১০ আরববিশ্বের দেশ তিউনিসিয়ার এক বেকার কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট মোহাম্মদ বওকুজিজি নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুক ও টুইটারের কল্যাণে আত্মাহুতির এ ঘটনার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে পুরো তিউনিশিয়া জুড়ে। মানুষ নেমে পড়ে রাজপথে, উল্কার গতিতে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কয়েকদশক ধরে তিউনিশদের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসক বেন আলীর বিরুদ্ধে এত বড় আন্দোলন দমন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তিউনিশিয়া ছাড়তে বাধ্য হয় ২৩ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকা এ স্বৈরশাসক। তিউনিসিয়ায় বেন আলী ও তাঁর পরিবার ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। Democratic Constitutional Rally নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে বেন আলী ২৩ বছর ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। দীর্ঘ এ শাসনামলে তিনি তিউনিশিয়াকে শাসন করেছেন কঠোর হাতে, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ পাবলিক-তার কাছে কারো কোন দাম ছিলনা, মুসলিম রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েও দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট চ্যানেল থেকে আজানকে নির্বাসিত করেছিলেন, হিজাব ও পর্দার বিরুদ্ধে তার ছিল কঠোর অবস্থান -ঠিক যেন সে যুগের কামাল আতার্তুক কিংবা রেজা শাহ।

মূলত বেন আলীর পতনের মধ্য দিয়ে পুরো আরবজুড়ে শুরু হয় গণজাগরণ। তিউনিশিয়া, মিশর, ইয়েমেন, লিবিয়া,বাহরাইন হয়ে এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে ভূমধ্যসাগরীয় দেশ সিরিয়াতেও। অতিসম্প্রতি তিউনিসিয়ার ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত দল এন্নাহদার বিজয় নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে যাচ্ছে তিউনিসিয়ায়। ১৯৫৬ সালে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৭ সাল থেকে ২৩ বছর ধরে বেন আলী ছিলেন ক্ষমতায়। মধ্য ষাটের দশকে এনাহদা নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর চলতি বছরের মার্চ মাসে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় বেন আলী পরবর্তী সরকার। দলটির শীর্ষ নেতা রশিদ আল ঘান্নুচি দীর্ঘদিন ছিলেন লন্ডনে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার পরই তিনি তিউনিসিয়ায় ফিরে আসেন। তবে অন্যান্য ইসলামী দলের মত এনাহদা কট্টরপন্থী কোনো দল নয়। একসময় দলটি মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনীতি অনুসরণ করত। ১৯৮১ সালে দলটির জন্ম হয়েছিল। তখন দলটির নাম ছিল Islamic Tendency Movement। পরে ১৯৮৯ সালে এনাহদা (Awakening Movement) নাম ধারণ করে। ঘানুচির এ দলটির সঙ্গে তুরস্কের ক্ষমতাসীন Justice and Development Party’'র অনেক মিল রয়েছে। দলটির নেতারা তিউনিসিয়ায় একটি 'তুরস্ক মডেল' অনুসরণ করতে চান। এনাহদা এতটাই আধুনিক যে এবার নির্বাচনে এমন অনেক মহিলা এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা হিজাব এবং পর্দা কোনটাই করেননা। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে পারস্য অঞ্চলে নারীদের অধিকার কিছুটা সীমিত। বহুবিবাহ সেখানে স্বীকৃত, আর নারীরা পুরুষের মতো সমঅধিকার ভোগ করেন না। তিউনিসিয়ায় এ থেকে পার্থক্য ছিল। এমনকি এখন ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত এনাহদাও সমঅধিকারের পক্ষে!

তিউনিশিয়ায় সফল বিপ্লবের পর তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মিশরের "তাহরির স্কোয়ার" এ শক্ত অবস্থান নিয়ে জনতা হঠিয়ে দিয়েছে মার্কিন ও ইসরাইল পন্থী ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরশাসক হোসনে মোবারককে যিনি তার উত্তরসূরী আরব জাতীয়তাবাদী নেতা জামাল আবদেল নাসেরের মত মিশরের অন্যতম ইসলামপন্থী দল ইখয়ানুল মুসলেমীন (মুসলিম ব্রাদারহুড)কে বছরের পর বছর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক দশক পরে ১৯২৮ সালে হাসান-আল-বান্নার নেতৃত্বে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্ম। ধারণা করা হয় এটি আরববিশ্বের সবচেয়ে সুশৃংখল ও সংঘবদ্ধ ইসলামী সংগঠন। মিশরের সাম্প্রতিক গণবিপ্লবে এ দলটি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। মোবারকের পতনের পর মুসলিম ব্রাদারহুড Freedom and Justice Party নামে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলে এবং মিশরে চলতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে এ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে Freedom and Justice Party .

মোবারকের পতনের পর লিবিয়াতে শুরু হয় ব্যাপক গণবিদ্রোহ। লিবিয়ার বিদ্রোহীদের সরাসরি মদদ দেয় উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটো ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো। গণহত্যার দোহাই দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৯৬৯ সাল থেকে লিবিয়ার ক্ষমতা দখলকারী আরব জাতীয়তাবাদী নেতা লৌহমানব মোয়াম্মার গাদ্দাফিকে। লিবিয়ার গণবিদ্রোহ ছিল অন্যান্য আরবদেশ বিশেষ করে তিউনিশিয়া ও মিশর থেকে একটু ভিন্ন কারণ এখানে বাইরের শক্তির প্রকাশ্য ইন্ধন ছিল বিশেষ করে ইঙ্গো-মার্কিন ও ন্যাটোর ছিল সরাসরি অংশগ্রহণ। অর্থাৎ লিবিয়ার বিপ্লবকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমারা ফায়দা লুটতে মত্ত ছিল। উল্লেখ্য লিবিয়ায় রয়েছে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুদ। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিতে লিবিয়ার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লিবিয়ার প্রশাসনকে যদি হাতে রাখা যায়, তাহলে পুরো উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলে পার্শ্ববর্তী দেশ শাদ ও নাইজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। শাদ ও নাইজারে রয়েছে তেল ও ইউরেনিয়ামের পর্যাপ্ত ভান্ডার যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। একুশ শতকে যে নতুন অফ্রিকার জন্ম হতে যাচ্ছে, সেখানে ফ্রাঞ্চ ভাষাভাষী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের। কঙ্গো, রুয়ান্ডা, আইভরি কোস্ট একসময় ফ্রান্সের কলোনি হলেও এ অঞ্চলে এখন বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। ইতিমধ্যেই আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন একটি মিলিটারি কমান্ড AFRICOM। এ জন্য লিবিয়ায় 'বন্ধুপ্রতিম' পুতুল সরকারের খুব প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফিকে হত্যা করে যেন এ পথটাই পরিষ্কার করে নিল মার্কিনিরা।

লিবিয়ার পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে সিরিয়াতে। আর তাতেও পশ্চিমা ও তাদের আরব মিত্রদের রয়েছে প্রকাশ্য ইন্ধন। দিন যত যাচ্ছে, দেশটিতে গণঅসন্তোষ তত বাড়ছে, একই সাথে চলছে পশ্চিমাদের আসাদবিরোধী প্রচারণা। গত প্রায় আট মাস ধরে সেখানে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। গত ২ নভেম্বর কায়রোতে আরব লীগের প্রস্তাবনায় সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তির ভবিষ্যত ইতোমধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেননা চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে সিরিয়ার উপর নতুন অবরোধ আরোপ করেছে আরবলীগ। আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ ১৯৭১ সাল থেকেই সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। বাথ পার্টির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। ২০০০ সালে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান বাশার আল আসাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সিরীয় নেতা বাশার আল আসাদের পতন যেন এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরব বিশ্বের এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে বাহরাইনেও। শিয়াপ্রধান এ দেশটির ক্ষমতায় আছেন সুন্নীরা। সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শাসক হামাদ বিন ঈসা আল খলিফার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে শিয়াদের নেতৃত্বে। গত ৪ নভেম্বর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি বড়সড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণে। পুলিশের গুলিতে একজন বিক্ষোভকারী মারাও গেছেন। এছাড়া ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট সালেহ্ বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এ ব্যাপারে একটি চুক্তিও সই করেছেন।

সৌদি আরবে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে -এমন আশংকায় বাদশাহ আবদুল্লাহ আগে-ভাগেই সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছেন। এদিকে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে জনতাকে শান্ত রেখেছেন। মার্কিনপন্থী এ দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে একটি উদারপন্থী ইসলামী দল। সুতরাং বলা যায় বহুদশক পরে হলেও আরবরা অত্যাচারী ও ক্ষমতালিপ্সু স্বৈরাচারদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে, হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লবী।

লেখকঃ ফিন্যান্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইলঃ sohel.shalban@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MdShohelRana
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে Md. Mozammel Hoque লিখেছেন, ০৩ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১১:৪১
বাস্তব চিত্র ফুটে তুলেছেন।
72933
করোনেশন রোড, মোমেনশাহী থেকে আব্দুল্লাহ তাসনীম লিখেছেন, ০৫ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ০২:৫৫
পর্যবেক্ষণমূলক লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।
73044
চাপাঁই নবাবগন্জ্ঞ থেকে হযবরল লিখেছেন, ০৯ ডিসেম্বর ২০১১; রাত ১০:২৯
73364
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy